ভার্জিলিও পিনেরার তিনটি গল্প

ভার্জিলিও পিনেরার জন্ম ১৯১২ সালের ৪ আগস্ট কিউবার কারডেনাসে। তিনি একাধারে লেখক, নাট্যকার, কবি, ছোট গল্পকার এবং প্রাবন্ধিক ছিলেন; কিন্তু প্রকাশ্যে সমকামিতার জন্য তিনি তার সাহিত্যজীবনে বিখ্যাত হতে পারেননি, বরং কুখ্যাত হয়েছেন। সমকামিতার দায়ে ১৯৬১ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। কারাগার থেকে ফেরার পর বাকি জীবন লেখালেখি করেই কাটিয়েছেন, কোনো লেখা প্রকাশ হবে না জানা সত্ত্বেও। ১৯৭৯ সালের ১৮ অক্টোবর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাভানায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। পরবর্তীতে তার লিখে যাওয়া ৪৩টি গল্প নিয়ে ‘কোল্ড টেলস্’ নামক বইটি প্রকাশিত হয়।

পাহাড়
পাহাড়টি তিন হাজার ফিট উঁচু। তবুও আমি এটাকে একটু একটু করে খাই। সব পাহাড়ের মতোই এর গায়েও গাছপালা, মাটি, পাথর, পশুপাখি, এমনকি মানুষও চড়ে। প্রতি সকালে আমি পাহাড়ে চড়ি আর সামনে যা পাই, তা ই চিবুতে শুরু করি। এভাবেই খাওয়া চলে ঘণ্টা খানেক। তারপর ক্লান্ত দেহ আর নষ্ট মাড়ি নিয়ে ঘরে ফিরে আসি। হালকা বিশ্রাম করে দরজার কাছে এসে বসি, চোখ দিয়ে মাপি পাহাড়টির নিত্য দিনের ক্ষয়। আমি স্পষ্ট দেখতে পাই কিভাবে এটি দিনে দিনে ভর আর উচ্চতা হারাচ্ছে। অথচ আমার প্রতিবেশী কাউকে বললে এই ঘটনা বিশ্বাসই করবে না। হাসবে খুব, বলবে আমি পাগল। আর শেষ পর্যন্ত তারাই ভূতাত্ত্বিক উত্থান নিয়ে আলাপ দেবে। এটাই আসলে আমার জীবনের ট্র্যাজেডি, কেউ মানতেই চাইবে না যে তিন হাজার ফিট উঁচু পাহাড়টি আমিই আত্মসাৎ করেছি।

নরক
ছোটবেলায় ‘নরক’ বলতে আব্বা-আম্মার মুখে শয়তানের নাম ছাড়া আর কিছুই বুঝতাম না। একটু বড় হলে কৈশোরের নরক-যন্ত্রণা নিয়ে এপাশ-ওপাশ করতে করতে যখন কাটিয়ে দিই অন্তহীন রাতগুলো- তখন আমাদের এই ‘কল্পনার নরক’ সম্পর্কে ধারণাগুলো একটু জটিল হয়ে ওঠে। আরও বড় হয়ে যখন আমরা আয়না দেখা ছেড়ে দেই, যখন আমাদের একেকটা চেহারাই শয়তানের অনুরূপ, তখন এই নিদারুণ যন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে ‘নরক’-এর ধারণাকে কমাতে কমাতে কেবল এক ‘বুদ্ধিবৃত্তিক ভয়’-এ এনে ঠেকাই। বৃদ্ধ বয়সে এসে নরক যখন হাতের এতই কাছে, তখন এটাকে ‘মন্দের প্রয়োজনীয়তা’ বলে চালিয়ে দেই, কখনো হয়তো একটু উদ্বিগ্নও হয়ে উঠি। আরও পরে, যখন আমরা নরকের আগুনে, তখন দেখা যায় যে চাইলেই এতে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব। দীর্ঘ এক হাজার বছর পর, এক মলিন চেহারার শয়তান আমাদের জিজ্ঞেস করে- আমরা এখনো নরক-যন্ত্রণা ভোগ করছি কি না। আমরা জবাব দিই- এই ‘নরক-যন্ত্রণা’ ভোগান্তির চেয়ে বরং নিত্যকর্মই বেশি মনে হয়। অবশেষে একদিন ছুটির সময় আসে, কিন্তু তখন আমরা সহানুভূতিশীল হয়ে ‘নরক’ ছেড়ে যেতে নাকচ করে দিই, কে-ই-বা এত লালিত-পালিত অভ্যাস ছেড়ে চলে যেতে চাইবে?

ইনসমনিয়া
লোকটা সকাল সকাল বিছানায় যায়। কিন্তু ঘুমাতে পারেনা, এপিঠ ওপিঠ করে কাটায়। বিছানায় শুয়ে আউলে যায়। সিগারেট ধরায়। একটু পড়ে। আবার লাইট বন্ধ করে। তাও ঘুমাতে পারে না। রাত ৩টার দিকে লোকটা উঠে পড়ে, পাশের বাড়ির বন্ধুকে জাগায়, আর জানায় যে সে ঘুমাতে পারছে না। কি করবে জিজ্ঞেস করে। বন্ধু বলে, একটু রাস্তায় হেঁটে আসতে, নিজেকে একটু ক্লান্ত করে লিনডেন ব্লসম চা খেয়ে লাইট বন্ধ করে শুয়ে পড়তে। সে সবটাই করে, তাও তার ঘুম আসে না। আবারও উঠে পড়ে এবং একজন ডাক্তারের কাছে যায়। যথারীতি ডাক্তার প্রচুর বক বক করে, তাও তার এক ফোটাও ঘুম আসে না। ভোর ছয়টার সময় সে তার রিভলভার লোড করে এবং তার খুলি উড়ায় দেয়। সে এখন মৃত, তাও তার ঘুম আসেনা। ইনসমনিয়া বড়ই নাছোড়বান্দা।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh