তৃতীয় সন্তান

এক.
ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনেই অস্থিরতা বাড়ে। হৃদপিণ্ডের দম ছোট হয়। মায়ার সুতায় টান লাগে রিজনের। তারপর ধীরে ধীরে বাসার পথ ছোট হতে থাকে। তবে অপরাধবোধ হতে থাকে দীর্ঘ। কিছুদিন শিপু খুব বিরক্ত করছে রিজনকে। শিপু একটি ওষুধের নাম ধরিয়ে দিয়ে বলে, এটা নিয়ে এসো।
রিজন আনি আনি করে আনে না। কখনো ভুলে গেছি, কখনো পকেট খালি এভাবে চলে কিছু দিন; কিন্তু শিপু যেন নাছোড়বান্দা। ওষুধ আনতেই হবে।
তিন মাস শিপুর ঋতুস্রাব বন্ধ। প্রেগন্যান্সি টেস্ট পজেটিভ। রিজন-শিপু এমন কাণ্ডে অবাক। কি করে সম্ভব? এমনটি তো হওয়ার কথা নয়। রিজন পদ্ধতি গ্রহণ করছে। শিপু কয়েক রকমের পদ্ধতি নেয়। কোনোটিই শরীরে সেট হয় না। একটা না একটা শারীরিক সমস্যা লেগেই থাকে। বাধ্য হয়ে রিজন কনডম ব্যবহার করে। শিপু কনসিভ করায় মানসিক বিপর্যস্ত সে। কতেক প্রশ্ন আওড়ায় মনের কোণে। এই যেমন, বিভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করেও কীভাবে প্রাণের স্পন্দন তৈরি হলো? রিজন কি আমাকে সন্দেহ করছে? সন্দেহ করাত যৌক্তিকও বটে। সে তো নিজেই প্যাকেট ব্যবহার করে। তাহলে কীভাবে শুক্রাণু জরায়ুতে প্রবেশ করল? রিজন কি দ্বৈত সম্পর্ক বিশ্বাস করে? নাকি আমাকে অবিশ্বাস করে। এমন নানামুখী প্রশ্নে জর্জরিত হয় শিপু। প্রশ্ন থেকে মুক্ত হতে শিপু গর্ভে আগত ভ্রুণ হত্যা করতে প্রস্তুত। কোনো ভাবেই এ প্রাণের মুক্তি দেওয়া যাবে না শিপু সংকল্প করে। রিজন কোনো মতেই আগত উত্তরাধিকারকে হারাতে চায় না। রিজন মনে প্রাণে চায় বেঁচে যাক অনাগত প্রাণ। ফোটার আগে যেন না ঝরে কলি। শিপুর চাপাচাপিতে স্বপ্নের ভাবনাও প্রকাশ করতে পারছে না। বেশ কিছুদিন মানসিক টানাপড়েনে কাটছে সময়। কোনো কথা শুনতে বা বুঝতে চাচ্ছে না শিপু। ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাধ্য হয়ে আজ ওষুধ কিনেছে রিজন। হাঁটতে হাঁটতে বিবিধ ভাবনায় মিশে মিশে বাসার সামনে এসে দাঁড়ায়। কলিং বেল চাপতেই দরজা খোলে শিপু। ছেলে মেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। শিপু ওষুধ এনেছে কিনা জানতে চায়।
-এনেছি। মাগো মা। এতদিন পর তোমার মনে ছিল। আমি তো চিন্তায় অস্থির। এখনি যদি ওষুধ না খাই পরে ডিএনসি করতে হবে। বান্ধবীদের কাছে শুনেছি এ যে অসহ্য যন্ত্রণা। আমি অমন যন্ত্রণা সইতে পারব না।
রিজন হাত মুখ ধোয়। যেন কত বড় পাপ করে এসেছে সে। শরীরে ঘুম ঘুম ভাব। সারা দিনের ক্লান্ত শরীর বিছানা খোঁজে। অথচ একটি ব্যর্থতা যেন আচ্ছন্ন করে রেখেছে রিজনকে। ডাইনিং-এ ভাত রাখা আছে। খেয়ে নাও। রিজন ভাত নেয়। মাখে; কিন্তু লোকমা মুখ পর্যন্ত ওঠে না। বৌ-ভাত খেলে যেমন পেঠ ভরে থাকে। মন না চাইলে খাবার মুখে ওঠে না। খাবারও যত্ন চায়।
একই বিছানায় রিজন-শিপু এবং দুই ছেলে-মেয়ে ঘুমায়। বাকি দুই বেডরুম খাঁ খাঁ করে। ডায়নিং টেবিল থেকে রিজন বিছানায় আসে। লম্বা হয়ে শোয়। শিপু মাথার কাছে বসে চুলে হাত বোলায়। শিপুরও যে শরীর ভালো যাচ্ছে তাও কিন্তু নয়।
শিপু বলে, কিগো তোমার মন খারাপ?
-না। শরীরটা ভালো লাগছে না। সারাদিনের জার্নিতে খুব ক্লান্তি ছুঁয়েছে শরীর-মন। তুমিও শুয়ে পড়। ও... আর তোমার ওষুধ ওয়ারড্রবের ওপর রাখা আছে।
-খেয়ে নিই?
-তোমার ইচ্ছা। আমাদের যেহেতু দুই সন্তান আছে। আর সন্তান-সন্ততির দরকার কী?
-হুম। তাইতো। ঠিক বলেছ?
রিজন অবশ্য শেষ পর্যন্ত শিপুর এমন হ্যাঁ সূচক বাক্যের প্রত্যাশা করেনি। ভেবেছে, হয়তো শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে। কারণ পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণের আহার সৃষ্টিকর্তাই নির্ধারণ করেন। প্রবীণ লোকেরা বলে, যে অতিথি আচমকা বাড়ি এসে হাজির হয় তাকে ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। অমঙ্গল হয়। তাছাড়া আমরা তো তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি না হত্যা করছি। খুন করছি; কিন্তু কোনোভাবেই শিপু বিষয়টিকে সহজ করে নিচ্ছে না। আচ্ছা ঘুমিয়ে গেলাম বলে বিপরীত দিকে কাত হয় রিজন। এ শুধু ঘুমের ভান ধরা। মূলত মুখ আড়াল করা। মুখ আড়াল করতে পারলে পৃথিবীর অনেক কিছুই আপনাকে আঘাত করতে পারবে না। শিপু একগ্লাস পানি নিয়ে ওষুধের ওপর থেকে চামড়া সরায়। মনে মনে ভাবে, নিশ্চয় রিজন সন্দেহ করছে। আমি বাবার বাড়ি বেশি বেশি বেড়াতে যাই। সে পছন্দ করে না। বিয়ের আগে যে সম্পর্ক ছিল তাও সে জানে। প্রায়শই ওই ছেলেকে নিয়ে কথায় কথায় ঝগড়ায় গিয়ে শেষ হয়; কিন্তু আমাদের দুই সন্তান আছে আর সন্তান লাগবে না এমন ভাবনা থেকেই তো সে সন্দেহ না করলেই পারে। যা হোক, যতই চিন্তা করি কোনোভাবেই এ ভ্রুণ বড় হওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না। বাজে ভাবনা আর প্রসারিত না করাই শ্রেয়।

দুই.
বেশ কিছুদিন অসুস্থ থাকে শিপু। সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে গিয়ে ওঠে। রিজন তাদের সঙ্গে যায় না। রিজনের শ্বশুরবাড়ি ভালো লাগে না। কেমন যেন পরাধীন মানুষের মতো লাগে। নিজের বাড়ি যেন বেহস্তখানা; কিন্তু আজকাল ঘরের ভেতরেও ভালো লাগে না। রাতে ঘুমালে পাশের রুম থেকে শিশুর কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। লাইট জ্বালালে সে কান্নার শব্দ আর শোনা যায় না। মাস খানেক পর শিপু বাসায় আসে। তখন আর রাতে ওই কান্নার আওয়াজ আসে না। এরপর থেকে  শিপু কোথাও বেড়াতে গেলে রিজন কোনো না কোনো বন্ধুকে বাসায় নিয়ে আসে। একসঙ্গে ঘুমায়; কিন্তু কখনো কখনো কোনো বন্ধুই আসতে চায় না। তখনি বাঁধে বিপত্তি। রিজন একা হলেই কান্নার শব্দ শুনতে পায়। ভেসে আসে করুণ সুর। মানুষের কোলাহলেও একনিষ্ঠ ধ্যান করলেও ছুটে আসে কোমল কণ্ঠে কান্নার সেই আওয়াজ। তাই রিজন এখন আর একা হয় না। নীরব থাকে না। যখন একা থাকতে হয়, তখন কানে হেডফোন দিয়ে গান শোনে। অথবা মোশারফ করিমের নাটক দেখে। ইদানীং রাশেদ সীমান্ত নামের একজনও খুব ভালো অভিনয় করছে। মোশারফ করিমের রাজত্বে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হয়েছে। ‘আমার বাবা’ বা ‘মধ্যরাতের সেবা’ নাটকগুলোতে চমৎকার অভিনয় করেছে রাশেদ সীমান্ত।

তিন.
প্রায় এক যুগ পর। হঠাৎ সেই পূর্বের কান্না। তবে সেই আগের মতো নয়। এখন কান্নায় একটু পরিপূর্ণতা এসেছে। রিজনের বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। শরীরে ডায়বেটিস বাসা বেঁধেছে। তাই সকাল-বিকাল হাঁটতে হয়; কিন্তু যখন একা হয় তখনি বাঁধে বিপত্তি। কেউ একজন যেন সঙ্গে সঙ্গে হাঁটে। ঠিক রিজনের মতো; কিন্তু আশপাশে তাকালে কাউকে দেখা যায় না। রিজনের মনে ভয় ধরে। একদিন হঠাৎ করে শুনতে পায় ‘বাবা আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি’। রিজন থমকে দাঁড়ায়। দূরে মানুষ হাঁটছে। আশপাশে কেউ নেই; কিন্তু এমন কথাতো কখনো কাউকে বলতে শোনেনি রিজন। বাবাকে ভালোবাসে এমন শব্দ মানুষের মুখ থেকে খুব কমই উচ্চারিত হয়। মানুষ মাকে ভালোবাসে। কেউ কেউ মাকে ভালোবাসার কথা বলে ফেলে; কিন্তু বাবারা সবসময় বঞ্চিত হয়। সন্তানের দৃষ্টিতে পৃথিবীর প্রায় সব বাবাই রসহীন। রুক্ষ। অথচ প্রাণের জন্য বাবাদের থাকে প্রাণপণ চেষ্টা। সন্তান প্রতিষ্ঠিত না হওয়া অবধি সব পরিকল্পনা, ধ্যান বা টেনশন যেন স্থায়ী লিজ নিয়ে রাখেন তারা।
আবার একই কথা বাতাসে ভেসে আসে ‘বাবা আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি’। রিজন এবার নিজের সঙ্গে কথা বলে। কে?
-আমি তোমার ছেলে বাবা।
-আমার ছেলে?
আমাকে ছুঁয়ে দেখ আমি ঠিক তোমার সমান হয়ে গেছি। আমার খুব কষ্ট হয় বাবা। তোমার কোলে উঠতে পারি না বলে। তোমার বুকে গড়াগড়ি করতে পারি না। অথচ আমি সবসময় তোমার আশপাশেই থাকি। তোমার ছায়া হয়ে থাকি। সেদিন তুমি যখন আনমনে মোটরবাইক চালাচ্ছিলে অল্পের জন্য ট্রাক তোমাকে চাপা দেয়নি। আমিই তোমার ব্রেক কষে ছিলাম। তুমি ভাবতেই পারনি তুমি বেঁচে আছ।
আরেক দিন অটোরিকশার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে তুমি যখন রাস্তায় ছিটকে পড়লে। তোমার ঠিক মাথার কাছ দিয়ে ট্রাকের চাকা চলে গেছে। তুমি ভেবেছ তোমার মাথা পিষে গেছে। তুমি তোমার হাত ধরে দেখ, বুকে হাত দিয়ে দেখ তুমি বেঁচে আছ কি? তুমি বেঁচে ছিলে। তুমি যখন বাসায় একা থাক আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেই। শরীরের ঘামাচি খুঁটে দিই। তুমি খুব দ্রুত ঘুমিয়ে পড়। বিছানায় পিঠ বিছালেই তোমার ঘুম চলে আসে। কখনো ভাবনি শুলে এত তাড়াতাড়ি ঘুম চলে আসে কেন? আজও আমি কথাগুলো বলতাম না। শুধু বলেছি তুমি আমাকে ভুলে গেছ। আমি জানি, তুমি আমাকে খুব ভালোবাসতে। মা কি কারণে ভালোবাসতে পারেনি আমি জানি না। অথচ মা আমায় আলো দেখতে দেয়নি। তুমি মন থেকে চেয়েছ আমি যেন পৃথিবীর আলো দেখি। তারপরও তোমার একটা ভুলে আমি তোমার আদর বঞ্চিত। তুমি মাকে বুঝিয়ে বলতে পারতে। বলনি। মা তোমার কথা অবশ্যই রাখত। মা যখন আমায় আঘাত করল, আমি চিৎকার দিয়েছি। খুব চিৎকার দিয়েছি। বারবার বলেছি, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। খুব করে কেঁদেছি। আমার চিৎকার কেউ শোননি। তুমিও শোননি বাবা।
রিজন রাস্তার পাশে বসে পড়ে। খুব খারাপ লাগছে। পেছন থেকে কেউ একজন এসে ধরে দাঁড় করায়। ভাই আমাকে একটু বাসায় নিয়ে চলুন। আমি হাঁটতে পারছি না। আমার পা চলে না। ভদ্র লোক রিজনকে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। বাসায় এসে ঘুমিয়ে পড়ে রিজন। ক্লান্ত শরীরে আজ আর অফিসে যেতে পারেনি। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অফিসের বসকে ফোন করে জানায় আজ আসতে পারবে না। চাকরিজীবনে এই প্রথম অপ্রত্যাশিত ছুটি নিল রিজন। পুরো দিন বাসায় খুনসুটি করে। নিজে নিজে কথা বলে রিজন। শিপু অবাক হয়। রিজনের আনমনে কথা বলা শুনে ভয় পায় শিপু। রিজন কথা বলে যায়। কথাগুলো কখনো স্পষ্ট, কখনো অস্পষ্ট; কিন্তু শিপু কোনোভাবেই পুরো বাক্য বুঝতে পারে না। শিপু কথা বললে রিজন স্বাভাবিক হয়। স্বাভাবিক হওয়ার পর শিপু এভাবে কথা বলার বিষয়ে জানতে চাইলে রিজন কিছু বলে না। অথবা বলতে পারে না। কিংবা ইচ্ছে করেই বলে না। রিজন বলতেও চায় না। এতদিনে সন্তান যে তার সমান হয়ে গেছে, সে খবর কেইবা রাখে? একযুগ আগের ভ্রুণ হত্যার বিষয়টি কারোরই মাথায় আসে না। মানুষের জীবন কতো শত ঘটনায় সাজানো। সব ঘটনা মানুষ মনে রাখে না। স্মৃতিও ভুলে যায়। যদিও কিছু ঘটনা আপনাআপনি মনে গেঁথে থাকে। হৃদ মন্দির দখল করে নেয়। শিপু ভুলে গেছে সব। কথায় আছে বিষাদ মনে রাখতে নেই। রাখলে বিষাদ বাড়ে। রিজন প্রায়ই অনুতপ্ত হয়। অনুসূচনায় ভোগে। যখন ছায়া হয়ে পাশে দাঁড়ায় তৃতীয় সন্তান।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh