ক্রসফায়ার, কান্না ও গণতন্ত্র

রাজেকুজ্জামান রতন

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪:৪৫ পিএম

‘বাবা তুমি কান্না করতেছ যে!’ সাদা পোশাকের কেউ বাবাকে ধরে নিয়ে যাবার পর মেয়ের সঙ্গে বাবার কথোপকথনের একটা অংশ ছিল এই সংলাপ। এর পর গুলির শব্দ, আহত মানুষের যন্ত্রণার শব্দ এবং মৃত্যু। টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে শুনছে কন্যা এবং স্ত্রী। ঘটনার নাম ক্রসফায়ার। সেদিন মেয়ের সঙ্গে টেলিফোনে বাবার কথা এবং বাবাকে করা মেয়ের এই প্রশ্ন অনেককে বিচলিত করেছিল, কাউকে কাঁদিয়েছিলও; কিন্তু ক্ষমতায় থেকে যারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেন তাদের কতটা ভাবিয়েছিল, তা বলা মুশকিল। কারণ এটাই প্রথম ঘটনা ছিল না, বা ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি। ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের কেউ কেউ এটাকে ভুল বলে আখ্যায়িত করলেও, ভুল সংশোধনের কোনো পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। কক্সবাজারের একজন প্রবীণ সাংবাদিক ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘২০১৮ সালের ৪ মে থেকে গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত কক্সবাজারে ক্রসফায়ারে ২৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশের গুলিতে ১৬৯ জন, বিজিবির গুলিতে ৬০ জন ও র‌্যাবের গুলিতে ৫১ জন মারা গেছেন।’ একরামের মতো অনেকের মৃত্যুর কথা মানুষ ভুলে গেছে, তাদের প্রিয়জনদের কান্নার শব্দ মিলিয়ে গেছে; কিন্তু ইয়াবা চোরাচালান যে বন্ধ হয়নি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

গণতান্ত্রিক সমাজ হবে আতঙ্কমুক্ত। যাদের ক্ষমতা বেশি আতঙ্ক ছড়ানোর ক্ষমতাও তার বেশি। বিচ্ছিন্নভাবে দুর্বৃত্তরাও সাময়িক আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে; কিন্তু গণতান্ত্রিক আইন ও গণতান্ত্রিক আইনের শাসন বহাল করেই দুর্বৃত্ত দমন করা উচিত। এতে জনগণের মনে আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি হয়।

অতীতের অনেক ঘটনা, মানুষের ক্ষোভ এবং দেশ-বিদেশে সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রসফায়ারের সাজানো গল্পবিরোধী জনমত প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। ২০০৭-এর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর নির্বাচিত সরকার কি পুরনো এই পথ অনুসরণ করবে কি না, পুরনো গল্পের কাঠামো একই রেখে শুধু নাম পাল্টে দেবে কি না; এ ধরনের প্রশ্ন উঠতে থাকে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনি ইশতেহারে আওয়ামী লীগ ঘোষণা করেছিল, ‘দল ক্ষমতায় গেলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা হবে।’ কিন্তু নির্বাচনে জিতে গেলে আগের প্রতিশ্রুতি যে শুধু শ্রুতি কথায় পর্যবসিত হয়, তা আবার প্রমাণিত হতে সময় লাগল না। ক্ষমতায় যাওয়ার পর ২০০৯ সালে প্রথম আট মাসে র‌্যাব ও পুলিশের হাতে ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে ক্রসফায়ারে ২০১৬ সালে ১৭৭, ২০১৭ সালে ১৪১, ২০১৮ সালে ৪২১ এবং ২০১৯ সালে ৩৮৮ জন নিহত হয়েছেন। আর ২০২০ সাল তো চলমান। পথের শেষে কি দেখা যায় দেখি!

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, জনগণের জানমাল রক্ষা, দুর্নীতি দমন, চোরাকারবার বন্ধ, মজুদদার নিয়ন্ত্রণসহ জনপছন্দ কথা বলে বিনা বিচারে হত্যা চলে আসছে স্বাধীনতার পর থেকেই। স্বাধীনতার আগে বিদেশি শাসকরা যেভাবে শাসন চালাত, দমন পীড়ন করত, তা থেকে মুক্তি পাবার জন্যই তো স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল আমাদের। স্বাধীনতার পরও যদি এসব চলতেই থাকে তাহলে তো স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা মার খায় আর তার ওপর চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পরবর্তীতে আরো বলা হয়, সন্ত্রাস এতদূর বিস্তৃত হয়েছে এবং সন্ত্রাসীদের ক্ষমতা এত বেড়েছে যে, প্রচলিত আইনে এসব নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তাই এলো সন্ত্রাস দমন আইন প্রবর্তনের কথা; কিন্তু এতেও নাকি কাজ হচ্ছে না আবার মাদকের নীল দংশনে বিপর্যস্ত যুব সমাজকে রক্ষা করতে হবে। তাই বিচারের দীর্ঘসূত্রতা নয়, ডাইরেক্ট অ্যাকশন চাই। ফলে বন্দুকযুদ্ধ, এনকাউন্টার, ওৎ পেতে থাকা সহযোগীদের সঙ্গে ক্রসফায়ার ইত্যাদি নামে হাজার হাজার মানুষকে বিনা বিচারে মেরে ফেলা হলো; কিন্তু তাতে সন্ত্রাস, মাদক ব্যবসা বা মানব পাচার কি কমলো কিছু? এসব ঘটনায় যারা মারা যাচ্ছে, তাদের বেশির ভাগই ছোটখাটো অপরাধে জড়িত, মাদক বহনকারী, দালাল বা এই জাতীয় অপরাধী; কিন্তু বড় অপরাধীরা সাধারণত ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে। আর সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠছে যে, এসব কর্মকাণ্ড বেশিরভাগটাই পরিচালিত হচ্ছে বিরোধীমত দমনের উদ্দেশ্যে। একটা ভয়ের পরিবেশ ও আতঙ্কের সংস্কৃতি গড়ে তোলা হচ্ছে। ল্যাটিন আমেরিকান সিনড্রোম এর সঙ্গে তুলনা করে অনেকে বলছেন এভাবে অপরাধ নির্মূল হবে না বরং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দুর্নীতিগ্রস্ত ও নিপীড়ক হয়ে উঠবে। পুলিশের একজন সাবেক আইজি তো বলেছিলেন, পুলিশকে দিয়ে আইনবহির্ভূত কাজ করালে একদিন তারা তার সুযোগ নেবে। বেআইনি হত্যা করে যদি কোনো কর্মকর্তা পুরস্কৃত হন, তাহলে তার জুনিয়রদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

বিনা বিচারে হত্যার সংস্কৃতি যে দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেয় তার নজির কম নেই। ক্রমাগত এর পক্ষে প্রচারণা চালাতে থাকলে এমন এক মানসিক জগৎ গড়ে ওঠে যে, কেউ কেউ এমনকি সংসদে দাঁড়িয়েও পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে বলতে থাকে- এমন পরিস্থিতিতে ক্রসফায়ার ছাড়া যেন অপরাধ দমনের বিকল্প উপায় নেই। প্রকৃতপক্ষে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তারই ধারাবাহিকতায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা রাশেদ খান হত্যার শিকার হলেন। একটা বিষয় কিন্তু খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, মেজর রাশেদ সিনহার হত্যার সঙ্গে যে পুলিশ কর্মকর্তাদের নাম জড়িয়ে আছে, তাদের নামে এবং বেনামে বিপুল সম্পত্তির খবর পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হলো ঘটনার পর পরই। এত বিপুল সম্পদ তো হঠাৎ করে হয়নি, যে বেতন তারা পেতেন, তা থেকে সঞ্চয় করেও এত সম্পত্তির মালিক হওয়া সম্ভব ছিল না। তাহলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা সব জেনেও যথাযথ ভূমিকা পালন করেননি কেন, এই প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।

আদালত হচ্ছে জনগণের শেষ আশ্রয় এবং অপরাধীদের আতঙ্ক। মানুষ আদালতের কাছে ভরসা পায় আর অপরাধী পায় ভয়। ব্যাপারটা এখন আর তেমন থাকছে না। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে ক্রসফায়ারের ঘটনায় উচ্চ আদালতে গিয়েও লাভ হচ্ছে না। ২০০৯ সালের ১৭ নভেম্বর ক্রসফায়ার নিয়ে সুয়োমোটো রুল জারি করেন হাইকোর্ট। ১৪ ডিসেম্বর শুনানি শুরুর কথা ছিল এ রুলের। তবে ওই দিন হাইকোর্ট বেঞ্চে সময় আবেদন নিয়ে হাজির হন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। ক্রসফায়ার বন্ধ রাখার মৌখিক নির্দেশ দিয়ে ওই সময় পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেন হাইকোর্ট। বার্ষিক অবকাশ শেষে ২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি উচ্চ আদালত খোলার পর দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ভেঙে দেয়া হয় বিচারপতি এএফএম আবদুর রহমান ও মো. ইমদাদুল হক আজাদের বেঞ্চ। এখন পর্যন্ত এ সুয়োমোটো রুলের শুনানি হয়নি। ‘জাস্টিস ডিলেইড জাস্টিস ডিনাইড’, বিচার বিলম্বিত না করার এবং বিচারপ্রার্থীর অধিকারের সুরক্ষা নিয়ে বহুল কথিত এই নীতি যেন মুখ থুবড়ে পড়ল এক্ষেত্রে। এ ছাড়াও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে হাইকোর্টে আরও তিনটি রিট রয়েছে। এগুলো রাষ্ট্রপক্ষের হস্তক্ষেপে আর এগোয়নি। এসব দেখে এবং শুনে এখন সাধারণ মানুষও ভাবছে আর কিছু হবে না।

গণতান্ত্রিক সমাজ হবে আতঙ্কমুক্ত। যাদের ক্ষমতা বেশি আতঙ্ক ছড়ানোর ক্ষমতাও তার বেশি। বিচ্ছিন্নভাবে দুর্বৃত্তরাও সাময়িক আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে; কিন্তু গণতান্ত্রিক আইন ও গণতান্ত্রিক আইনের শাসন বহাল করেই দুর্বৃত্ত দমন করা উচিত। এতে জনগণের মনে আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি হয়। 

এ ধরনের আতঙ্ক তো গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের অন্তরায়। এভাবে যে চলছে সবকিছু তাতে সমাজ কি বাসযোগ্য থাকবে? শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা মানুষের কোনো সামাজিক জীবন নয়। সেই কারণে জেলখানা কোনো আদর্শ সমাজের চিত্র হতে পারে না। সমাজকে মানুষের বিকাশের উপযোগী করতে হলে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব পালন করতে হবে।


লেখক: কেন্দ্রীয় সদস্য, বাসদ

প্রধান সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ | প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

অনলাইন সম্পাদক: আরশাদ সিদ্দিকী | ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh