করোনাকালেও শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পান অব্যাহত রাখতে হবে

এম হাফিজুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২০, ০৫:৪১ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

মাতৃদুগ্ধের গুরুত্ব ও প্রচারের লক্ষ্যে প্রতি বছরের ন্যায় এবারো বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০২০ পালিত হচ্ছে। প্রতিবছর ১-৭ আগস্ট বিশ্ব জুড়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে পালিত হয় সপ্তাহটি। ওয়ার্ল্ড এলায়েন্স ফর ব্রেস্টফিডিং অ্যাকশন বিশ্বব্যাপী এই ক্যাম্পেইন ও প্রচারণার সমন্বয় করে থাকে। এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে– “Supporting Breastfeeding for Healthier Planet” যার বাংলা করা হয়েছে ”মাতৃদুগ্ধ দানে সহায়তা করুন-স্বাস্থ্যকর পৃথিবী গড়ুন”। বিশ্ব বর্তমানে এক দীর্ঘ মহামারি মোকাবেলা করছে, যার নামকরণ করা হয়েছে করোনাভাইরাস (কভিড-১৯)। ডিসেম্বরে চীনের উহানে সূত্রপাত হওয়া এই সংক্রমণ বর্তমান বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। যার প্রভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাংলাদেশে গ্রামীণ স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবায় তার প্রভাব সুস্পষ্ট। যার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে মাতৃদুগ্ধ দান সংক্রান্ত চর্চায়ও। শিশুর পুষ্টি ও বৃদ্ধির জন্য মাতৃদুগ্ধ অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে।

ওয়ার্ল্ড এলায়েন্স ফর ব্রেস্টফিডিং অ্যাকশনের তথ্যমতে, প্রতিবছর সঠিকভাবে মাতৃদুগ্ধ পান সংক্রান্ত জটিলতায় বা অবহেলার কারণে প্রায় ৮ লাখ ২৩ হাজার শিশু এবং ২০ হাজার মায়ের মৃত্যু ঘটে। যে মা শিশুকে নিয়মিত মায়ের দুধ পান করায় তার জরায়ু ও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক কমে। তাছাড়াও এই শুভ চর্চা মায়ের উচ্চ রক্তচাপও কমায় এবং শিশু মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত হলে প্রতিবছর বিশ্ব প্রায় ৩০২ বিলিয়ন ইউএস ডলারের আর্থিক ক্ষতির স্বীকার হয়। মায়ের দুধের বিকল্প গুড়া দুধ শিশুর স্বাস্থ্য, স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশে নানান প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। যেমন- শিশুর ডায়রিয়ায় আক্রান্তের হার বেড়ে যায়, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও কানের প্রদাহের কারণ হয়, দাঁতের ক্ষয়বৃদ্ধি এবং শিশুর বুদ্ধিমত্তা বিকাশে বাঁধা ইত্যাদি। পরবর্তীতে যা শিশুকে তার শারিরীক ও মানসিক সক্ষমতার ঘাটতি তৈরি করে এবং যার প্রভাব তাকে আজীবন বহন করতে হয় এবং ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যয় অনেক বাড়িয়ে দেয়।

এটা আমাদের জোর দিয়ে বলতে হবে যে, মায়ের দুধের বিকল্প কিছু নেই। অথচ মায়ের দুধের বিকল্প গুড়া দুধ এই শ্লোগান দিয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থে একটি মহল গুড়া দুধের বাজারজাতকরণ ও প্রমোশনে তাদের সমস্ত সামর্থ্য কাজে লাগাচ্ছে। এবং এক ধরনের মিডিয়া মুনাফার ভগ্নাংশের লোভে তার প্রচারণায় সহায়তা করছে। স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী কর্মীদের মধ্যেও একটি গোষ্ঠী তা প্রকাশ্যে বিশেষ পণ্যের জন্য শিশুর পিতা-মাতাকে উদ্ধুদ্ধ করছে। যা জন্মের এক ঘন্টার মধ্যে শিশুকে শালদুধ প্রদান এবং শিশুকে মায়ের দুধের সাথে পরিচিত করানো এবং ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধুমাত্র মায়ের দুধ প্রদান, এক ফোঁটা পানিও নয় এবং শিশুর ৬ মাস পূর্ণ হলে মায়ের দুধের পাশাপাশি পরিবারে তৈরি বাড়তি খাবার পরিচিত করানোর প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে দেশে এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং এর হার একটা জায়গায় এসে থেমে গেছে। অথচ ব্রেস্ট মিল্ক সাবস্টিটিউটস অ্যাক্ট-২০১৩ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে এই অসাধু প্রচেষ্টাগুলোকে অনেকটা প্রতিরোধ করা যেত। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের অনেক কিছুই করার আছে।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এক মিলিয়ন শিশুকে ২ বছর ধরে কৃত্রিমভাবে প্রস্তুতকৃত মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য খাওয়ানোর জন্য গড়ে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন কৌটাজাত গুঁড়াদুধ প্রয়োজন হয়। ধাতব কৌটাগুলো যদি পুনরায় ব্যবহৃত না হয়, তবে আবর্জনা ফেলার নির্ধারিত স্থানেও এদের জায়গা সঙ্কুলান হবে না। এমনকি প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম এবং কাগজের বর্জ্য শেষ পর্যন্ত মহাসাগরগুলোতে স্থান পায়; যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ। পাশাপাশি অধিকাংশ মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্যের প্রদান উপাদান হলো গরুর দুধ। গবাদি পশু পালনে সাধারণত প্রচুর পরিমাণে মিথেন ও অন্যান্য গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গত হয়। তাছাড়াও গবাদি পশুর প্রয়োজনীয় খাদ্য জোগান ও গো-চারণের জন্য বনভূমি কাটা হয়। ফলে গাছপালা কমে এবং বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ে। ফলে সৃষ্ট কার্বন ফাঁদ জলবায়ুর পরিবর্তনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। গবাদি পশুর খাদ্য শস্য দানা ও সয়াবিন থেকে তৈরি করা হয়, যা উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় সার ও কীটনাশক ইকোলজিক্যাল ফুট প্রিন্টের প্রধান কারণ। আবার বিকল্প শিশুখাদ্য উৎপাদন ও প্রস্তুতিতে পানি প্রয়োজন। মিঠা পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। দুগ্ধজাত পণ্যগুলোর ওয়াটার ফুট প্রিণ্ট গণনা করা জটিল, কারণ এটি ভৌগলিক অবস্থান, দুগ্ধ খামারকরণ পদ্ধতি এবং অন্যান্য নিয়ামকগুলোর উপর নির্ভর করে। যাই হোক না কেন, আমাদের পানির উৎসসমূহকে সংরক্ষণ করা, পানিকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলা এবং অপচয় রোধ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরি। 

চলমান কভিড-১৯ সংক্রমণের কারণে ফলে বিশ্বের প্রায় সব দেশে তা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে, যা বিশ্বের কোটি কোটি দুগ্ধদানকারী মা ও শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করছে। ভালো খবর হলো গবেষকরা জানিয়েছেন, কভিড-১৯ সংক্রমণে সম্ভাব্য/শনাক্তকৃত মায়েরা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল মেনে শিশুকে দুধ খাওয়াতে পারবেন। জন্মের ১ ঘন্টার মধ্যে মায়ের দুধ দেয়া শুরু করা এবং জন্মের ৬ মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ানো এবং করোনা সংক্রমণ চলাকালে কীভাবে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো অব্যাহত রাখবেন সেই বিষয়ে কিছু জরুরি নির্দেশিকা আমাদের অনুসরণ করতে হবে। 

১। মাকে অবশ্যই ফেসমাস্ক ও গাউন ব্যবহার করতে হবে এবং শিশুকে দুধ খাওয়ানোর আগে ও পরে এবং শিশুকে স্পর্শ করার আগে হাত ভালো করে সাবান ও পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে ধুয়ে ফেলুন অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করে নিন।

২। যেসব স্থান কভিড-১৯ এ আক্রান্ত মায়ের সংস্পর্শে এসেছে সেসব জায়গা বা ব্যবহৃত আসবাবপত্রের উপরিভাগ নিয়মিতভাবে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখুন।

৩। জন্মের ১ ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের শালদুধ খাওয়ালে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও অ্যান্টিবডি পাবে, যা শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

৪। গুরুতর অসুস্থতার কারণে মায়ের দুধ পান করানো, গালানো বা বের করা সম্ভব না হলে দাইমা বা কোনো স্তন্যদানকারী নারীকে খুঁজে বের করে দুধ পান করাতে উৎসাহিত করুন। এগুলোর কোনোটাই সম্ভব না হলে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মায়ের দুধের যথাযথ কোনো বিকল্প ব্যবহারের সম্ভাব্যতা খুঁজে বের করুন এবং পরবর্তীতে মা সুস্থ হলে শিশুকে পুনরায় মায়ের দুধ খাওয়ানো শুরু করুন ।

৫। শিশু যদি কভিড-১৯ আক্রান্ত হয় এবং মায়ের দুধ পানে সমর্থ হয়, তবে শিশুকে তার চাহিদা অনুযায়ী বারবার মায়ের দুধ দিতে হবে। এক্ষেত্রে সংক্রমণরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন, প্রয়োজনে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন কিন্তু মায়ের দুধের বিকল্পকে উৎসাহিত করবেন না। 

৬। গুঁড়া দুধ বা প্যাকেটজাত শিশুর খাবার খাওয়ালে মায়ের দুধ খাওয়ানোর তুলনায় শিশুর ডায়রিয়ায় ১০ গুণ এবং নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৫ গুণ পর্যন্ত মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। এছাড়াও শিশুর কানপাঁকা, চর্মরোগ হয়। ফলে শিশু পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

৭। কভিড-১৯ সংক্রমিত গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারী এবং ছোট শিশু রয়েছে এমন মায়েদের স্তনদান বিষয়ক পরামর্শ সেবা, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়তা করুন ও স্তনদান বিষয়ক ব্যবহারিক সহায়তা দিন ।

৮। মা অথবা তার শিশু কভিড-১৯ সংক্রমণে সম্ভাব্য বা শনাক্তকৃত যে অবস্থাতেই থাকুক, প্রসবের পর থেকে স্তনদানের অভ্যাস গড়ে তোলা ও শিশুকে দিন-রাত ত্বকের সাথে নিবিড় সংস্পর্শে রাখতে হবে।

এছাড়াও মায়ের মায়ের শারীরিক পুষ্টির জন্য যা করতে হবে

মাকে পর্যাপ্ত পরিমানে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন: পেয়ারা, আমলকি, লেবু, জাম্বুরা, টমেটোসহ অন্যান্য মৌসুমি ফলমূল ও শাকসবজি খেতে হবে এবং প্রতিদিন জিংকসমৃদ্ধ খাবার, যেমন- মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, বাদাম, ডাল এবং ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার পালংশাক, টক দই ইত্যাদি খেতে হবে এবং প্রতিদিন কমপক্ষে ৮-১০ গ্লাস পানি পান করতে হবে।


এম হাফিজুল ইসলাম

পুষ্টি উন্নয়ন কর্মী

প্রধান সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ | প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

অনলাইন সম্পাদক: আরশাদ সিদ্দিকী | ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh