হজ ও কোরবানি : আল্লাহর প্রেমে ত্যাগের মহিমা

মাওলানা লিয়াকত আলী

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২০, ০৫:৩১ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

সারাবিশ্বে করোনাভাইরাসজনিত মহামারি ও দুর্যোগের মাঝে এ বছর মুসলিম উম্মাহ উদযাপন করছে পবিত্র হজ ও ঈদুল আজহা। চান্দ্র মাসের হিসাব অনুযায়ী প্রণীত হিজরি বর্ষপঞ্জির শেষ মাস জিলহজ। জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের মধ্যে রয়েছে হজ ও কোরবানির দিন। এ মাসের ৯ তারিখ পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হয় এবং পরদিন ১০ তারিখ ঈদুল আজহা। সারাবিশ্বের মুসলমানদের কাছে এ দুটি দিন আসে গভীর তাৎপর্য ও সুদূরপ্রসারী বার্তা নিয়ে।

মহান রাব্বুল আলামিনের প্রতি বাধ্যতা ও অধীনতার স্তর থেকে অনেক অগ্রসর হয়ে, তার প্রতি প্রেম ও অনুরাগের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের উপলক্ষ্য হয়ে হাজির হয় জিলহজ মাসের ৯ তারিখ, যা আরাফাত দিবস নামেও পরিচিত। এ দিনে পালিত হয় হজের সবচেয়ে দৃশ্যমান রোকন উকুফে আরাফাত বা আরাফাত ময়দানে উপস্থিতি। আরাফাতে অবস্থানকালে হাজিরা অধিক হারে জিকির ও দোয়াসহ অন্যান্য নেক আমলে তৎপর থাকেন। এ দিন আল্লাহ তায়ালা তাঁর অধিকসংখ্যক বান্দাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, যা অন্য দিনে দেন না। তিনি এ দিনে বান্দাদের নিকটবর্তী হন এবং তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করে বলেন, ‘আমার এই বান্দাদের দিকে চেয়ে দেখ! তারা এলোমেলো কেশ ও ধুলোয় ধূসরিত হয়ে আমার কাছে এসেছে’ (সহীহ মুসলিম : ১১৬৩, ১৩৪৮)। এ জন্য যারা হজে না গিয়ে বাড়িতে অবস্থান করছে, তাদের জন্য বিশেষ ফজিলত রয়েছে এ দিনে নফল রোজা রাখার। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আরাফাহ দিবসের রোজা দু’বছরের (বিগত ও অনাগত) গোনাহের কাফফারা হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

হজ আল্লাহ প্রেমে ব্যাকুল বান্দাদের আকুল অভিব্যক্তির ইবাদত। খোদায়ী সান্নিধ্যে উপনীত হওয়ার মহড়া চলে সজ্জা ও শোভার সব ভূষণ ত্যাগের মাধ্যমে। নওয়াব-নফর, বাদশাহ-ফকির একই সাদাসিধে পোশাক পরে আল্লাহর ঘরের চারপাশে অস্থিরভাবে পরিভ্রমণ করে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করে। একই আদম-হাওয়ার সন্তান একই পরিবারের সদস্য হিসেবে তারা সাম্য ও মৈত্রীর যে নমুনা পেশ করেন, তার তুলনা পৃথিবীর অন্য কোনো সমাবেশের সঙ্গে হতে পারে না। এ জন্য বায়তুল্লাহর হজ একদিকে যেমন ইবাদত ও আধ্যাত্মিক সাধনার উচ্চ মাকাম, তেমনি মানব সাম্য ও সৌভ্রাতৃত্বের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত।

উকুফে আরাফায়ে মানবসাম্য ও মৈত্রীর প্রকাশ ঘটে সবচেয়ে জ্বলন্তভাবে। তপ্ত মরুর বিস্তীর্ণ ময়দানে সারাপৃথিবী থেকে আগত মানুষ বর্ণ গোত্র ও আঞ্চলিক সীমারেখা ঘুঁচিয়ে একই সুরে একই বেশে আরাধনা জানাতে থাকে পরম করুণাময়ের দরবারে। লাব্বাইক ধ্বনি তুলে নিজের উপস্থিতির ঘোষণাই তারা দেয় না, বরং দুনিয়াবি জিন্দেগির প্রতি নির্মোহ মনোভাব ও আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের ব্যাকুলতাও প্রকাশ করে। তেমনি বিশ্ববাসীর সামনে প্রমাণ করে ভৌগোলিক সীমারেখা ও ভাষা-বর্ণের ব্যবধান থাকলেও, অভিন্ন বিশ্বাস ও ভাবধারায় তারা গ্রথিত। জাতীয়তাবাদের আপাত মধুর স্লোগানে মানুষে মানুষে যে বিভেদরেখা অঙ্কিত হয়েছে, তার অবসানের প্রয়োজন যদি কখনো অনুভূত হয়, তাহলে তা বাস্তবায়নের একমাত্র উপায় হবে আদর্শিক অভিন্নতা। আর সে আদর্শ হতে হবে স্বার্থান্ধতা ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কুপ্রবৃত্তি থেকে মুক্ত। ইসলাম নামের আসমানি জীবনাদর্শ ছাড়া এমন কোনো সার্বজনীন দর্শন কি এ পর্যন্ত উদ্ভাবিত হতে পেরেছে, যা বিশ্বের সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে সাম্য ও সমানাধিকারের ভিত্তিতে সহাবস্থানের ব্যবস্থাপত্র দেয়?

জিলহজ মাসে রয়েছে আরেক ইবাদত। তা হলো ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জিলহজ মাসের ১০, ১১, ১২ এ তিনটি দিনে আল্লাহর নামে নির্দিষ্ট নিয়মে হালাল পশু জবেহ করাই হলো কোরবানি। রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রতি বছর কোরবানি করেছেন এবং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি বর্জনকারী ব্যক্তির প্রতি সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’

ঈদুল আজহার যে কোরবানি দেয়া হয় তার মাধ্যমে মানুষের মনের পরীক্ষা হয়, কোরবানির রক্ত-মাংস কখনই আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, শুধু দেখা হয় মানুষের হৃদয়কে। ঈদের মধ্যে আছে সাম্যের বাণী, সহানুভূতিশীল হৃদয়ের পরিচয়। পরোপকার ও ত্যাগের মহান আদর্শে অনুপ্রাণিত হয় মানুষের মন।

কোরবানির তাৎপর্য প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, এটি তোমাদের পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)- এর সুন্নত। প্রতিদান সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি। ভেড়ার পশমের কথা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ভেড়ার প্রতিটি পশমের বিনিময়েও একটি নেকি দেয়া হবে। রাসূল পাক (সা.) আরও ইরশাদ করেন, কোরবানির দিনে আল্লাহ তায়ালার নিকট কোরবানির চেয়ে বেশি প্রিয় কোনো নেক কাজ নেই। কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে যায়। কেয়ামতের দিন উক্ত পশু তার খুর, পশম সবকিছু নিয়ে উপস্থিত হবে। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কোরবানি করবে।

খাঁটি নিয়ত সহকারে কোরবানি করা এবং নিজেদের আনন্দে অন্যদের শরিক করা ঈদুল আজহার শিক্ষা। কোরবানিকৃত পশুর গোশত তিন অংশে ভাগ করে এক অংশ নিজের জন্য সংরক্ষণ, দ্বিতীয় অংশ আত্মীয়স্বজনকে প্রদান এবং তৃতীয় অংশ সমাজের অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্র মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেয়া ইসলামের পছন্দনীয় নিয়ম। কোরবানিকৃত পশুর চামড়া অনাথ আশ্রম, এতিমখানা ও মাদ্রাসায় পড়ুয়া দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ভরণপোষণের জন্য প্রদান করলে দ্বিবিধ সওয়াব হাসিল হয়। এক দুঃখী মানুষের সাহায্য এবং দ্বিতীয় দ্বীনি শিক্ষার বিকাশ।

প্রকৃতপক্ষে কোরবানিদাতা কেবল পশুর গলায় ছুরি চালায় না বরং সে তো ছুরি চালায় সব প্রবৃত্তির গলায় আল্লাহর প্রেমে পাগলপারা হয়ে। এটিই কোরবানির মূল নিয়ামক ও প্রাণশক্তি। এ অনুভূতি ব্যতিরেকে যে কোরবানি করা হয়, তা হজরত ইবরাহিম ও ইসমাঈল (আ.)-এর সুন্নাত নয়, এটা এক রকম প্রথা মাত্র। এতে গোশতের ছড়াছড়ি হয় বটে; কিন্তু সেই তাকওয়া হাসিল হয় না- যা কোরবানির প্রাণশক্তি। পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে মানুষের মধ্যে বিরাজমান পশু শক্তি, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি রিপুগুলোকেই কোরবানি দিতে হয়। আর হালাল অর্থে অর্জিত পশু কোরবানির মাধ্যমে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়।


মাওলানা লিয়াকত আলী
লেখক, ইসলামিক চিন্তাবিদ

প্রধান সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ | প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

অনলাইন সম্পাদক: আরশাদ সিদ্দিকী | ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Design & Developed By Root Soft Bangladesh