মৃত্যুদণ্ডই যথেষ্ট নয়

সম্প্রতি নোয়াখালীতে সংঘটিত একটি ঘটনা সোশ্যাল মিড়িয়ায় ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় সারাদেশের মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ঘটনাটি প্রায় মাস খানেক আগের। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানেও ঘটনাটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরব ভূমিকা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ঘটনাটির প্রতিবাদ জানাতে যখন মানুষ সংগঠিত হয়েছে। রাজপথে নেমেছে, প্রশাসনের উচ্চ-পদাধিকারীদের টনক নড়েছে। নোয়াখালীর এই নারীর সম্ভ্রমহানির ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সামাজিক প্রভাবশালীদের দায় অস্বীকার করা যায় না।

ধর্ষকদের দুঃসাহস, দম্ভ এবং আস্ফালন বিস্ময়ের উদ্রেক করে। এদের শক্তির উৎস কোথায়? কোন সাহসে তারা তাদের অপকর্ম সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের ধৃষ্টতা দেখায়? এ ঘটনার জের, আবারো প্রমাণ করল ধর্ষণ কিংবা নারীর প্রতি সম্ভ্রমহানির ঘটনা কেবল মনোজাগতিক অপরাধ নয়।

ধর্ষণের মতো মনোজাগতিক অপরাধ, নারীর প্রতি বল প্রয়োগ, কর্তৃত্ব প্রদর্শন এবং জবরদস্তি ছাড়া সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতির উদ্ভূত হওয়ার পেছনে রয়েছে ক্ষমতা কাঠামো। রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির সমর্থন না থাকলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্ষণের মতো অপরাধ সম্ভব নয়।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ৯৭৫ নারীকে ধর্ষণ, ৪৩ নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং ১৯৯২ নারীকে ধর্ষণচেষ্টা করা হয়েছে। এরা বিচার চায়; কিন্তু এদের বিচার চাইবার সামর্থ্য ও সক্ষমতার অভাব রয়েছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবাদের মুখে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। নোয়াখালীর ঘটনায় সারাদেশে ধর্ষণবিরোধী প্রতিবাদ সামলাতে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।
ধর্ষণ প্রতিরোধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান কতটা কার্যকর, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। ধর্ষণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে ক্ষমতা ও আধিপত্যের। নারীর সামাজিক অবস্থান, আর্থিক অবস্থা, আইনের প্রতি দ্বারস্থ হওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, একজন নারীর ন্যায় বিচার পাওয়ার বাস্তবতা।  

নারীর জন্য ধর্ষণের বিচারিক বাস্তবতা অত্যন্ত করুণ, বেদনাদায়ক ও অবমাননাকর। ভুক্তভোগী নারীকে যে শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আদালতে বিব্রতকর প্রশ্ন, মামলার দীর্ঘসূত্রতা, সামাজিক অবমাননা পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। তার বদল ছাড়া কেবল মৃত্যুদণ্ডের বিধান ধর্ষণের বিরুদ্ধে খুববেশি কার্যকর সমাধান হবে না।

সংবিধান ও আইন অনুযায়ী সরকারের অন্যতম দায়িত্ব হলো, সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অধিকার সংরক্ষণ করা, অপরাধ সংঘটিত হলে বিচারের ব্যবস্থা করা। নাগরিক হিসেবে নারীরাও এর সমান দাবিদার। তাই সরকারকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছাড়াও নারীর প্রতি সকল প্রকার সম্ভ্রমহানির বিরুদ্ধে নিরাপত্তা দিতে হবে। সর্বোপরি সিডো সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।
-সম্পাদকীয়, সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল (১৫ অক্টোবর, ২০২০)।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh