অনলাইন ক্লাসের তৃপ্তি-অতৃপ্তি!

অনলাইন ক্লাস পদ্ধতি বাংলাদেশের শিক্ষা কার্যক্রমে এক নতুন সংযোজন। যদিও এ ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম উন্নত রাষ্ট্রে পরিচালিত হয়ে আসছে অনেক আগে থেকে। অনলাইন পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রমের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে অনেক আগে। এর ইতিবাচক দিকগুলোর পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক দিক সামনে চলে এসেছে। করোনাকালীন অনলাইন শিক্ষা অনেককে আশাবাদী করে তুলেছে। তবে অনেকে আবার সংশয়ও প্রকাশ করছেন। এ আলোচনা বর্তমান পরিস্থিতিতে অনলাইন শিক্ষা কীভাবে শিক্ষার উন্নতি করতে পারে, শিক্ষার্থীদের জন্য শেখার সুযোগ সরবরাহ করতে পারে এবং আমাদের মতো দেশে অনলাইন ক্লাসের সমস্যা তুলে ধরবার চেষ্টা করা হবে তা নিয়ে। 

প্রযুক্তিগত ন্যায্যতা এবং প্রযুক্তিতে অংশগ্রহণের যোগ্যতা ও সুযোগ যে কোনো অনলাইন প্রোগ্রাম সফল হওয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর আমাদের মতো দেশে এসবে রয়েছে ব্যাপক ঘাটতি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ একটি বড় ব্যাপার। উচ্চ মাধ্যমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, অনেক শিক্ষার্থী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থান করেও ক্লাসে উপস্থিত থাকতে নারাজ। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক চাপাচাপি করেও সব শিক্ষার্থীদের ক্লাসে হাজির করতে সক্ষম হয়নি। আর অনলাইন ক্লাসের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা আরও বেশি স্বাধীন এবং তারা নানা অজুহাত খোঁজার পরিবেশ তৈরি করবে অনলাইন ক্লাসে।

অনলাইন ক্লাসের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় ধরনের মতামতগুলো তুলে ধরা খুবই দরকার। যাতে করে আমরা অনলাইন ক্লাসের মতো নতুন পরিবেশে কাজ করার চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে এর যে নতুন সুযোগ রয়েছে তা গ্রহণ করার পক্ষে আরো ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারি। করোনাকালীন যেখানে সারাবিশ্বের শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, সেখানে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা হলো একমাত্র বিকল্প পদ্ধতি। আমাদের মতো দেশে আমরা এভাবে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইনের মাধ্যমে সমাপ্ত করব, তা কখনো কল্পনা করিনি। বাস্তবতার নিরিখে আজ অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষা দেয়া একটি জনপ্রিয় বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে পরিণত হওয়ার বেশ কারণ রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি একটি বিকল্প অভূতপূর্ব সুযোগ। তবে অনলাইন ক্লাসকে কখনো সরাসরি ক্লাসরুম শিক্ষা পদ্ধতির সঙ্গে পরিপূর্ণ তুলনা করা যাবে না। এটি একটি বিকল্প পদ্ধতি মাত্র। পরিস্থিতির কারণে স্বল্প সময়ের জন্য এ পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে। সব সীমাবদ্ধতাকে মাথায় রেখে এটিকে একটি বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে সর্বত্র। না হয় শিক্ষা কার্যক্রম একেবারেই থেমে থাকত। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের কতগুলো সুবিধার কথা তুলে ধরা যাক।

অনলাইন লার্নিংয়ের প্রধান সুবিধা হলো- যখন শিক্ষার্থীরা পরিস্থিতির কারণে ক্লাসে যেতে পারছেন না, ঘরে বা দূরবর্তী জায়গায় আবদ্ধ রয়েছেন, ক্লাস রুমে গিয়ে শিক্ষাগ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে, তখন  আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দিয়েছে। কম্পিউটার, স্মার্ট ফোন, ইন্টারনেট সংযোগ ও এ বিষয়ে জ্ঞান থাকলে শিক্ষার্থীরা বিশ্বের যে কোনো জায়গা থেকে ক্লাসে অংশ নিতে পারেন। শারীরিকভাবে ক্লাসে উপস্থিত হওয়ার পরিবর্তে তারা ডিভাইসের মাধ্যমে ভার্চুয়াল শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে পারেন। ভার্চুয়াল শ্রেণিকক্ষ যে কোনো সময় এবং চাইলে সপ্তাহে যে কোনো দিন অ্যাক্সেসযোগ্য। সময় বাঁচানো ও দক্ষতা অর্জন অনলাইন ক্লাসের অন্যতম সুবিধা। অনলাইন ক্লাসগুলো রেকর্ড করে শিক্ষার্থীদের কাছে তার লিঙ্ক থাকলে, তারা পরবর্তী সময়েও ক্লাস করতে পারবেন। শিক্ষার্থীরা দিন বা রাতের যে কোনো সময় তাদের সুবিধা মতো সময়ে কোর্সে পুনরায় অ্যাক্সেস করতে পারবেন। বিশেষ করে যাদের শিক্ষকের আলোচনা পুনরায় শোনার প্রয়োজন হতে পারে। অনেকের মতে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে এক ধরনের গতিশীলতা ও মিথস্ক্রিয়া তৈরি হয়। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সঠিকভাবে ব্যবহার করতে জানলে প্রত্যেকে তাদের ধারণাগুলো শেয়ার করতে পারে। ক্লাসরুমের বাইরে শিক্ষার যে আরেকটি প্রক্রিয়া রয়েছে এবং এর মাধ্যমেও যে শিক্ষা অর্জন করা যায়, সে বিষয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে। অবশ্য এগুলো নির্ভর করে প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষকের ওপর। শিক্ষক যদি অনলাইন ক্লাসটি শিক্ষার্থীদের কেন্দ্র করে থাকেন, তাহলে তাদের স্বাধীনভাবে মতামত দেয়ার সুযোগ থাকবে। এটি আবার ক্লাসরুম শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অনেক শিক্ষকই আছেন শিক্ষার্থীনির্ভর। অনেকে আবার শিক্ষার্থীর মতামত গ্রহণ করা পছন্দ করেন না। মতামত প্রদানে শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেন না। এ ধরনের সমস্যা আমাদের দেশের শিক্ষা পদ্ধতিতে মজ্জাগত। শিক্ষার্থীদের ক্লাসে আলোচনায় অংশগ্রহণের মাত্রা কম। আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি অনেকাংশে একতরফা। যে ক্লাসরুমে প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি করে না ও শিক্ষার্থীদের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা দেয় না, তাকে কোনোভাবেই ক্লাসরুম বলা চলে না। অনলাইন ক্লাসে মন্তব্যের কলামে শিক্ষার্থীরা নানান মন্তব্য প্রদান করতে পারে এবং প্রশ্নও করতে পারে। তবে তাও নির্ভর করে শিক্ষার্থীরা কতটুকু স্বাধীন তার ওপর। অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীরা পৃথকভাবে একটি নির্দিষ্ট বক্সে অন্যান্য শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া জানতে পারে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি সুষম প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

আবার শিক্ষার্থীদের পোশাক, শারীরিক উপস্থিতি, প্রতিবন্ধিতা, জাতি এবং লিঙ্গ হিসেবে বৈষম্যমূলক কারণগুলো মূলত অনুপস্থিত থাকে অনলাইন ক্লাসে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহিংসতা ও শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থী নির্যাতন, ইভ টিজিং, শিক্ষার্থীরা বখাটেদের সঙ্গে আড্ডা, কিশোর গ্যাং, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক ব্যবহার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতা কাটানো যায় ভার্চুয়াল ক্লাসের মাধ্যমে। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সংযুক্ত করে পারস্পরিক মেধার একচেঞ্জ করা যায়। বিভিন্ন আলোচনার বিষয়বস্তুতে মতামতের আদান-প্রদানের মাধ্যমে দূর থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে দক্ষতা অর্জন করা যায়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে গতিশীলতা তৈরির পাশাপাশি তারা সঞ্চয় করে এক নতুন অভিজ্ঞতা। আমাদের দেশে প্রযুক্তিকে অনেকে খারাপ কাজে ব্যবহার করে থাকেন। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারবে যে, তারা প্রযুক্তির কল্যাণে দূরবর্তী জায়গায় থেকেও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করার যে সুযোগ পাচ্ছে- এর মাধ্যমে তাদের মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রতি একটি ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে।

কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে অনলাইন ক্লাসের এ সব সুবিধা বিশ্বের সব দেশ সমভাবে গ্রহণ করতে পারে না। এটি নির্ভর করে একটি দেশের আর্থ-সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থার ওপর। সাংস্কৃতিক বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা গতানুগতিক শিক্ষা পদ্ধতি থেকে কোনো প্রকার প্রশিক্ষণ ছাড়া হঠাৎ করে অনলাইন পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করলে নানাবিধ সমস্যা দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার কারণে গ্রাম ও শহরের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রযুক্তিগত ও সুযোগ-সুবিধার ব্যাপক অসমতা পরিলক্ষিত হয়। এসব অসমতা কাটিয়ে না উঠে অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতি চালু করলে শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট অংশকে শিক্ষা দেয়া যাবে। তাদের একটি বৃহৎ অংশ এ শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ছিটকে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রযুক্তিগত ন্যায্যতা এবং প্রযুক্তিতে অংশগ্রহণের যোগ্যতা ও সুযোগ যে কোনো অনলাইন প্রোগ্রাম সফল হওয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর আমাদের মতো দেশে এসবে রয়েছে ব্যাপক ঘাটতি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ একটি বড় ব্যাপার। উচ্চ মাধ্যমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, অনেক শিক্ষার্থী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থান করেও ক্লাসে উপস্থিত থাকতে নারাজ। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক চাপাচাপি করেও সব শিক্ষার্থীদের ক্লাসে হাজির করতে সক্ষম হয়নি। আর অনলাইন ক্লাসের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা আরো বেশি স্বাধীন এবং তারা নানা অজুহাত খোঁজার পরিবেশ তৈরি করবে অনলাইন ক্লাসে। প্রযুক্তিগত সমস্যা ও ইন্টারনেট কানেকশনের দুর্বলতার দোহাই দিয়ে অনেকেই শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বাইরে থাকার চেষ্টা করবে।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট অ্যাক্সেসের সমস্যা, অভাব, যৌক্তিক অর্থনৈতিক অসুবিধার কারণে অনেক আগ্রহী ও যোগ্য শিক্ষার্থী ক্লাস থেকে ছিটকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। বাংলাদেশের মতো একটি গ্রামীণ সমাজ এবং নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থা অনলাইন ক্লাস এর ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশে ইন্টারনেট অ্যাক্সেসিবিলিটি এখনো সার্বজনীন বলা যাবে না। এটি ব্যয়বহুলও। সব শিক্ষার্থীর সমভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করার সামর্থ্য ও সুযোগ নেই। আর যাদের ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে তারা অনেক স্বাধীন, অনলাইনে যা চায় তা করতে পারে। এক্ষেত্রে সমস্যা হলো, দেশে স্বাধীন ও উন্মুক্ত অনলাইন সেবাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার মানসিকতা প্রাপ্তবয়স্কদেরও এখনো তৈরি হয়নি। আমরা এর অপব্যবহার করে আসছি অনেক দিন থেকে। সে ক্ষেত্রে কিশোর-কিশোরীদের অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে প্রযুক্তি ব্যবহার মারাত্মক আসক্তি তৈরি করতে পারে। আমাদের স্বাধীন অনলাইন সেবায় প্রযুক্তির খারাপ দিকগুলো গ্রহণ করার এবং তরুণরা নষ্ট হবার সব উপকরণ ও সুযোগ বিদ্যমান। পরিবারের পক্ষ থেকেও তাদের আর বাধা দিতে পারবে না। অনলাইন ক্লাসের অজুহাত দেখিয়ে তারা নিজেদের ক্ষতিকর অনলাইন সাইটে সংযুক্ত করবে, যা আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থার ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। পারস্পরিক যোগাযোগ, আলাপ-আলোচনা ও মিথষ্ক্রিয়ার ওপরও প্রভাব ফেলবে দীর্ঘমেয়াদে। শিক্ষার্থীরা ঘরে থেকেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বা কথা বলার সুযোগ হারাবে। আমার নিজের সন্তানরা অনলাইন ক্লাস ও টিউটরের কাছে পড়ার জন্য সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ব্যস্ত থাকে। রাতে হোমওয়ার্ক করে অনলাইনেই সাবমিট করে। আমি নিজে ব্যস্ত থাকি অনলাইন ক্লাস নেয়ার কাজে। প্রত্যেকের জন্য নতুন ডিভাইস ক্রয়ের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। ঘরে থেকেও আমরা প্রত্যেকে অনলাইন কাজ নিয়ে ব্যস্ত। আমরা মনে হয় হারিয়ে গেছি অন্য জগতে। আমাদের পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক বন্ধন এর ওপর এটি অন্য ধরনের চাপ। এ ধরনের অবস্থার সঙ্গে আমরা অভ্যস্ত তো নই। 

অনলাইন শিক্ষার জন্য সব শিক্ষার্থীর ন্যূনতম কম্পিউটার জ্ঞান থাকতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, তাদের অবশ্যই বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করতে সক্ষম হতে হবে। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবে নেভিগেট করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে হবে। পাশাপাশি ই-মেলের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। যদি তারা প্রযুক্তি সরঞ্জামগুলোতে অভ্যস্ত না হয় তবে হঠাৎ করে কোনো অনলাইন প্রোগ্রাম সফল হবে না। অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন এ বিষয়গুলো জানে না এমন মানুষের সংখ্যা এখন নেই। তবে আমি হলফ করে বলতে পারি এখনো অনেক শিক্ষিত মানুষও ভালোভাবে ই-মেইল ব্যবহার করতে অভ্যস্ত নয়। অনলাইনে এসাইনমেন্ট জমা দেয়া, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, এগুলো অনেক শিক্ষকও জানেন না। খুঁজলে বিশ্ববিদ্যালয়েও এ ধরনের অনেক শিক্ষক পাওয়া যাবে। কিছুসংখ্যক শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী যদি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করেন, তাহলে পুরো অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতিতে একটি বড় ধরনের অসমতা তৈরি হবে। সত্যিকার অর্থে আমাদের ক্লাসরুম টিচিংয়ের জন্য তৈরি করা হয়েছে। আমাদের দীর্ঘদিনের চর্চা ও মানসিকতায় ক্লাসরুম শিক্ষার বিকল্প ছিল না। শিক্ষার্থীরাও সেভাবে গড়ে উঠেছে। তাদের পরিবারের সদস্যদের মানসিকতাও সেরকম। হঠাৎ করে পরিপূর্ণ অনলাইন ক্লাসের সুবিধা গ্রহণ করা আমাদের মতো দেশে অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব হলেও এ মুহূর্তে সম্ভব হবে না। অনেকে দ্বিমত পোষণ করে বলতে পারেন যে বাংলাদেশে এখন এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যারা অনলাইন পদ্ধতি বা ইন্টারনেট প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত নন। কথাটি কিছুটা ঠিক হলেও সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের মানুষ শুধু জানেন কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতি সামাজিক যোগাযোগ ব্যবহার করা থেকে আরো গভীর ও প্র্যাকটিক্যাল। শুধু প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীসহ উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত। আমাদের শিশুরা সকল অনলাইন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত নয়। তাদের এগুলো সম্পর্কে জানার এখনো বয়স হয়নি। তাদের সহযোগিতা করার জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের পাশে থাকতে হবে। ফলে প্রাপ্তবয়স্কদেরও থাকতে হবে কম্পিউটার জ্ঞান; কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে প্রাপ্তবয়স্কদের কর্মের কারণে ঘরের বাইরে যেতে হচ্ছে এবং তাদের কম্পিউটারের স্বাভাবিক জ্ঞান না থাকার কারণে অনেক শিক্ষার্থীর অনলাইন ক্লাস ব্যাহত হচ্ছে। এর ওপর প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাতো রয়েছেই। ব্যবহারকারী বান্ধব এবং নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি একটি সফল অনলাইন প্রোগ্রামের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কী দাবি করতে পারি আমাদের দেশের প্রযুক্তি পরিপূর্ণভাবে শিক্ষার্থী বান্ধব এবং নির্ভরযোগ্য! কোনোভাবেই নয়। সর্বাধিক পরিশীলিত প্রযুক্তি হলেও তা ১০০% নির্ভরযোগ্য নয়। অনলাইন প্রোগ্রামে ব্যবহৃত সরঞ্জামগুলো ব্যর্থ হবে কিনা আমাদের প্রশ্ন শুধু তা নয়। সবকিছু ঠিক থাকলেও হঠাৎ করে হোস্ট থেকে শিক্ষার্থীরা ডিসকানেক্ট হয়ে যেতে পারে। বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে, সিস্টেম কাজ না করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি যে, করোনাকালীন আমি অনলাইনের মাধ্যমে কিছু সভা সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছি। ক্লাস নিয়েছি ও নিচ্ছি; কিন্তু একদিনও শান্তিপূর্ণভাবে আত্মতৃপ্তির সঙ্গে সমাপ্ত করতে পারিনি। শিক্ষার্থীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটেছে অনেক। আর আমার থেকে শিক্ষার্থীদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা তো হর হামেশা। শিক্ষার্থীরা ভার্চুয়াল ক্লাসের মধ্যে শুধু আসা-যাওয়া করতে থাকে। তাদের অভিযোগ ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত সমস্যা। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা পাঠ অনুশীলন তো গ্রহণ করতে পারেই না বরং চরম বিরক্তি ও মানসিক চাপে থাকে। শিক্ষকের মনোযোগ বিনষ্ট হয় চরমভাবে। শিক্ষার্থীরা যে সব পিসি বা ডিভাইস ব্যবহার করে তাতেও থাকে পৃথক অসংখ্য সমস্যা। এছাড়া সারাক্ষণ অনলাইনে ডিভাইসগুলো ব্যবহার করার কারণে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। 

যদিও অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতি সুশৃঙ্খল শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষার একটি অত্যন্ত কার্যকর বিকল্প মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে এটি সকল শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে উপযুক্ত নয়। এটি হচ্ছে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো। এই ধরনের ত্রুটি রেখে গুণগত শিক্ষা কোনোভাবে উপহার দেয়া যায় না। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর মারাত্মক বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ওপর। চাপ তৈরি হতে পারে তাদের পরিবারের ওপরও। বাংলাদেশের অধিকাংশ গ্রামীণ পরিবার এবং কিছু শহুরে পরিবারও শিক্ষার্থীদের জন্য ভার্চুয়াল ক্লাসের পরিবেশ দিতে পারবে না। অনলাইন শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অবশ্যই সুশৃঙ্খল, স্ব-অনুপ্রাণিত হয়ে ভার্চুয়াল ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে হবে ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। ফলে অল্প বয়স্ক শিক্ষার্থীদের জন্য, বিশেষ করে প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অন্যান্য নির্ভরশীল শিক্ষার্থী যারা তাদের অনলাইন ক্লাসের জন্য প্রয়োজনীয় দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে না তাদের জন্য অনলাইন শিক্ষা উপযুক্ত তো নয়ই বরং তা তাদের নিজের ও পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ।

আরেকটি বিষয় হলো অনলাইন ক্লাস পরিপূর্ণভাবে নির্ভর করে টেকনিক্যাল দক্ষতার ওপর। যদি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনলাইন পদ্ধতি সম্পর্কে সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ না দেয়া হয় তবে অনলাইন প্রোগ্রামের সফলতা আপোষ করা হবে। যদি শিক্ষকরা ভার্চুয়াল শ্রেণিকক্ষে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রস্তুত না থাকেন তাহলে তা কোনোভাবে সফল হবে না। একজন অনলাইন প্রশিক্ষককে অবশ্যই ভার্চুয়াল শ্রেণিকক্ষে এমন একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের শারীরিক উপস্থিতির অভাব বোধ না করে। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে সমস্ত শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। তবে যা-ই বলা হোক না কেন বাংলাদেশের বর্তমান পরিবেশে অনলাইন ক্লাস থেকে সামান্য সুবিধা হয়তো পাওয়া যাবে। উপকৃত হতে পারে কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী। তবে মোদ্দা কথা হলো অনলাইন ক্লাসের সকল সমস্যা সমাধান করার পর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যোগ্য করে তুলেও যদি অনলাইন ক্লাস পরিচালনা করা হয় তাহলেও তা কখনো শ্রেণিকক্ষে হাতে কলমে শিক্ষার মতো কার্যকর হবে না। শিক্ষক সরাসরি উপস্থিত থেকে ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে পড়ানোর অভাব কোনোভাবেই পূরণ হবে না। অন্তরে দারুণ অতৃপ্তি থেকে যাবে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার।

লেখক:
ড. মো. কামাল উদ্দিন
অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh