চীনের ‘নেকড়ে ফাইটার ডিপ্লোমেসি’ ত্যাগ

চীন আমেরিকান জনমত জয় করতে ‘উলফ ওয়ারিয়র’ বা ‘নেকড়ে ফাইটার ডিপ্লোমেসি’ ত্যাগ করল। গত দুই মাস ধরে চীনকে পশ্চিমা বিশ্ব কঠোর সমালোচনা করছে। বিশেষ করে ‘পাগলা ট্রাম্পে’র করোনার ‘উৎপত্তি’ তর্ক আর আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের রেষারেষি প্রসঙ্গে নানা সমালোচনার ঝড় সহ্য করতে হয়েছে চীনকে। যদিও সমালোচনাগুলোর মূল কারণ- আসন্ন আমেরিকান নির্বাচন। 

কথা হলো, চীনা গ্লোবাল অর্থনৈতিক উত্থানে আমেরিকার ছোট-বড় কিছু কোম্পানি ক্রমে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। এ কারণে সমাজের কোনো কোনো অংশের কাজ হারানো, কোম্পানির কাজের অর্ডার কমে যাওয়া বা বাতিল হয়ে যাওয়া এবং কোনো পণ্য বাজার হারানোর ভয় বেড়ে চলছে। ফলে পাবলিকের এক অংশের মধ্যে চীনবিরোধী সেন্টিমেন্ট দানা বাঁধছে। সমাজের এ অংশের বিক্ষুব্ধ অংশের ভোট কে পাবে- এর কাড়াকাড়ি নিয়ে এসব সমালোচনা জোরদার করা আসলে মূল প্রণোদনা। 

কারণ সেই ১৯৬৮ সালে, চীন যে আমেরিকার বিনিয়োগ পেলে উলটা আমেরিকার জন্যই এক বড় থ্রেট হয়ে উঠবে- এটা জেনেশুনেই তো সেই থেকে আইয়ুব খানের মধ্যস্থতায় চীন-আমেরিকা সম্পর্কের দুয়ার খোলার পর্ব শুরু হয়েছিল। 

চীন-আমেরিকার সম্পর্কের গ্রাফকে মোটা দাগে বুঝতে হবে এভাবে যে, মূলত বিনিয়োগ পেতে চীনের প্রবল চাহিদা এবং ঘাটতির মুখে আমেরিকান বিনিয়োগ একেবারে ঢলে পড়া আর সস্তা চীনা পণ্য দিয়ে আমেরিকান বাজার ঢেকে ফেলার সম্পর্ক; কিন্তু পুরা ঘটনাটা ঘটানো হয়েছিল কেবল ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগের স্বার্থে- এই পেট কামড়ানির একটা সমাধান করতে। আর সময়কাল হিসাবে এটা ঘটেছিল ১৯৭৮-১৯৯০ সালের দিকে। আর এর পরের কালটা রকেট উত্থানে ডাবল ডিজিট বৃদ্ধির ১৯৯০-২০১০ এই সময়কালে। যদিও এর শেষ তিন বছর এটার গতি কমে গিয়েছিল।

আর তখন থেকে আমেরিকান সমাজে ও বাজারে চাকরি হারানো, কাজের অর্ডার হারানো, পণ্যের বাজার হারানোর সংকট ক্রমেই প্রবল হয়ে দেখা দিতে শুরু করেছিল। তাই ওবামার দুই টার্মই ছিল দু’ভাবে জিতবার পরে প্রথমেই চীন সফরে গিয়ে আমেরিকার জন্য কিছু পণ্যের বাজার, অর্থনৈতিক সুবিধা বা ছাড় নিয়ে আসা। অর্থাৎ আমেরিকার বেড়ে চলা বাজার সংকট চীনের সঙ্গে আপসে ছাড় দেয়া-নেয়ার মাধ্যমে সমাধান করে আরো খাপ খাওয়ানোর পথে ‘আপাত দিন পার’ করা ধরনের পথে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্পের চলতি চার বছরকে বলা যায়, বেড়ে চলা পাবলিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে প্রথম টার্মের মতো ভোট জিতে ক্ষমতায় আবার ফিরে আসতে- একে ব্যবহার করা যায় কি না!

প্রথমবারের মতো জয়ী হয়ে গ্লোবাল সিস্টেমের নেতা ট্রাম্প এবার ‘ন্যাশনালিস্ট’ হবার ভান করবে, চীনকে হুমকি-ধমকি দেবে এবং পরেরবারও এভাবে ভোটে জেতা যায় কি না, সেই চেষ্টা করবে।

কিন্তু আগে যাদের জানা থাকার কথা তারা সবাই জানেন, এতে আমেরিকা নাই হয়ে যাবে না হয়তো; কিন্তু প্রভাবে ছোট হয়ে যাবে। কারণ আমেরিকার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে আছে সেই সত্তরের দশকেই। আমেরিকা হারিয়ে যাবে না, তবে সাইজে ছোট হয়ে যাবে। ‘ব্রিটিশ কলোনি সাম্রাজ্যের সূর্য নাকি কোনো দিন ডুববে না’- এমন গর্ব করা আর মনে করা ব্রিটেন আজ হেরে গেছে, যদিও হারিয়ে যায়নি। অতএব, আমাদের প্রাসঙ্গিক সময়কালে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় টার্মের নির্বাচনে যখন আসন্ন, তখন এমন চীনবিরোধী উত্তেজনার আয়ুষ্কাল আপাতত পরের নভেম্বর মাসের তিন তারিখ, আমেরিকান নির্বাচন পর্যন্ত থাকবে। যেটা আবার উঠবে আগামী বছরের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে, তবে নতুন সাজে।
কিন্তু আমেরিকাতে এই যে এখন চীনা-ব্যাসিং বা পিটানি চলছে এই প্রভাব-প্রতিক্রিয়ায় চীনা কূটনীতিক পাড়ার তোলপাড়ের খবরে যাব এখন আমরা। চীনা কূটনীতিকদের সিদ্ধান্ত আমেরিকাকে ‘কড়া জবাব’, ‘পালটা বয়ানের মার’ দিতে হবে, ‘মুখ চালাতে’ হবে। যদিও এমন পদক্ষেপ চীনের এর আগে দরকার হয়নি, কারণ ওবামা আমল পর্যন্ত সংকট পরস্পরকে জায়গা করে দিয়ে সামলানো হয়েছিল। 

সিনেমা ব্যবসায় একই সঙ্গে কিছু পয়সা ঢেলে কাহিনিতে ঠান্ডা যুদ্ধের টাচ ও টুইস্ট দিয়ে দিলে হলিউডের সিনেমা সেকালে আমেরিকান প্রপাগান্ডা করার একটা ভালো ক্ষেত্র হয়ে উঠত। সোভিয়েত-আমেরিকা ঠান্ডা যুদ্ধের যুগে সেটাই ঘটত। তাই হলিউডি সিনেমা হলো সেসব আরেক প্রামাণ্য আকর। হলিউডি গোয়েন্দা-এজেন্ট কাহিনি থেকে স্টার-ওয়ারস মুভি পর্যন্ত এটা বিস্তৃত। ফলে সেই একই ফর্মুলায় এবার চীনা সিনেমা সিরিজ এসেছে ২০১৫ সাল থেকে। এর নাম হল ‘উলফ ওয়ারিয়ার’ বা নেকড়ে ফাইটার। মানে নেকড়ের মতো ধরলে ছাড়ে না এমন লড়াকু ‘আগ্রাসী’ যোদ্ধা। স্পেশাল অপারেশনাল বাহিনী, প্রতিশোধ, চীনা সম্মান রক্ষা, চীনাস্বার্থ, নেকড়ের মতো প্রবল আগ্রাসী যোদ্ধা- এই শব্দ কয়টা পড়ার পর আপনাদের মনে যে কমন ইমেজ দাঁড়াল, এ নিয়ে এসব চীনা সিনেমা। বলাই বাহুল্য এগুলো শুধু আগ্রাসী নয়, সেকালের হলিউড থেকে এ কালের চীনা সিনেমা পর্যন্ত এগুলোকে উগ্র জাতীয়তাবাদীও হতে হয়েছে, হয়ে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও হবে।

ভয়েজ অব আমেরিকার ওয়েব মিডিয়ায় এমন মুখে মুখে শোনা কথার এক রিপোর্ট হলো, ব্যাপারটা নাকি শুরু করেছিল এখনকার চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ঈ। তিনি তার জুনিয়রদের তাতিয়ে জোশ দিতে এক আসরে নাকি বলেছিলেন- চীনের ওপর আমেরিকান বা পশ্চিমা কূটনৈতিক আক্রমণের বিরুদ্ধে এমন আগ্রাসী জবাব দেবার মতো নিজেদের উপযুক্ত করে তুলতে। আর সেখানে চীনা নেকড়ে ফাইটার সিনেমাটার কথা খেয়াল রেখে তার মতো ‘উলফ ওয়ারিয়ার’ হতে বলেছিলেন। আর সেই থেকে চীনা বা পশ্চিমা কূটনৈতিক মহলে চালু হয়ে যায় নতুন শব্দ ‘উলফ ওয়ারিয়ার ডিপ্লোমেসি’।

হংকংয়ের ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’, আলিবাবার জ্যাক মা ২০১৬ সালে কিনে নেবার পর এশিয়ায় এটি সম্ভবত সবচেয়ে প্রভাবশালী পত্রিকা হয়েছে। চীনা সরকারের ভেতরের খবর ও ব্যাখ্যা বা কারণের পেছনের মনোভাব জানবার ক্ষেত্রে সবচেয়ে নির্ভরশীল মানা হয় এই পত্রিকাকে। অথচ চীনা সরকারের বিরুদ্ধে যায় এমন রিপোর্টও এখানে পাওয়া যাবে। এ ‘পোস্টে’ সম্প্রতি ‘উলফ ওয়ারিয়ার ডিপ্লোমেসি’ নিয়ে রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, এই খবরে লিড নিয়েছে ‘পার্টি’ বা সরকারের কেউ না। চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসর। 

পোস্ট লিখছে, চীনের নামকরা একাডেমিক ও পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক পরামর্শকেরা মনে করেন ‘উলফ ওয়ারিয়ার ডিপ্লোমেসি’ ধরনের চীনা সরকারি অবস্থান চীনের ইমেজের জন্য খারাপ ও বদনাম হয়েছে। আমেরিকায় পিউ রিসার্চ গ্রুপ আছে যারা কোনো ইস্যুতে জনমত জানতে প্রায়ই সার্ভে করে থাকে। গত ২১ এপ্রিলে প্রকাশিত তাদের এমন এক রিপোর্ট বলছে, সাড়া দেয়া ৬৬ শতাংশ আমেরিকান চীন বা প্রেসিডেন্ট শি সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। এটা ২০০৫ সালের পর থেকে এই প্রথম দেয়া সবচেয়ে খারাপ রেটিং। অনুমান করা যায় উপরের প্রফেসরদের বক্তব্যে এমন রিপোর্টের প্রভাব আছে। প্রফেসররা বলছেন, চীনা ইমেজ রক্ষার নামে এক উগ্র জাতীয়তাবাদ ধারণা কূটনীতিক ও রাষ্ট্রীয় মিডিয়ায় বাসা বেঁধেছে। চীনের পররাষ্ট্রবিষয়ক কিছু পরামর্শকও মনে করেন, এই আগ্রাসী জাতীয়তাবাদ আসলে উলটা চীনকেই বিশ্বজগৎ থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। 

এ দিকে, চীনের রেনমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রফেসর শি ইনহোং এর আরেক পরিচয়, তিনি ২০১১ সাল থেকে চীনা মন্ত্রিসভার পররাষ্ট্রবিষয়ক পরামর্শক। তিনি এক অনলাইন সেমিনারে কড়া কথা বলেছেন। চীনা রাজনৈতিক ব্যবস্থা শ্রেষ্ঠ অথবা গ্লোবাল স্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলায় চীনই গ্লোবাল নেতা বলে যে বক্তব্য- এসব খুবই খারাপ কাজ হয়েছে। তিনি বলেছেন, এমন কথাবার্তা আসলে করোনা মহামারি যে গ্লোবাল অবস্থায় আছে, তা সামলানো যে কত কঠিন, তা অনুভব করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কাজের জটিলতা বুঝতে আমাদের ব্যর্থ করেছে। তারা এটা এত দ্রুত, এত হুড়োহুড়িতে উচ্চস্বরে করেছে যে, এতে যা তাদের ইচ্ছা আর যা অর্জন এ দুইয়ের গ্যাপের সমান বড় খামতিটাই প্রকাশ করেছে।

তিনি দাবি করেছেন, চীনের যত দ্রুত সম্ভব নিজের অবস্থান বদল করা উচিত- যাতে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মাঝে চীনবিরোধী মনোভাবের প্রতি আমাদের সহনশীল মনোভাবে দেখানো বোঝায়। আমাদের সরকারি-বেসরকারি মিডিয়া অবস্থান যখন আগ্রাসী স্বরে আমেরিকার বিরুদ্ধে, তখন এটা আমেরিকার জনমত ইতিবাচক করার পক্ষে সহায়ক হবে না। এ ছাড়া প্রফেসর শি ‘ভাইরাসের অরিজিন’ কোথায় কে এনেছে- এ বিষয়ের চীনাদের তর্কাতর্কি বাদ দিতে বলেছেন, কারণ এই ব্লেমগেম থেকে কিছু বের হবে না। 

তবে সবচেয়ে বড় ব্যাপারটা হলো- তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে এই বক্তৃতাটা প্রকাশিত হয়েছে। এর সোজা মানে হলো, আমেরিকান জনমতকে আমল করতে চীনা প্রশাসনের সব অংশকে তিনি হুশে আনতে বাধ্য করতে চাচ্ছেন। আর পার্টির এতে সমর্থন আছে। প্রফেসর শি ইনহোং-এর মূল সতর্কবার্তাটা হলো, দুনিয়ায় গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে চাইলে এবং আগামী পৃথিবীর এম্পায়ার হতে চাইলে- যা কখনো করা যাবে না, তা আগেই শিখে রাখ!


গৌতম দাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh