আইয়ুব বাচ্চুর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী

তুমি নেই, তুমি আছো

আইয়ুব বাচ্চু গায়ক নন গিটারিস্ট হিসেবে বাজাতেন সোলসে। সোলসের ভোকাল ছিলেন তখন বাংলাদেশের আরেক কিংবদন্তি গায়ক তপন চৌধুরী। সফট রোমান্টিক গানভিত্তিক ব্যান্ড সোলস জুড়ে তখন গায়ক হিসেবে শুধুই ছিলেন তপন চৌধুরী। কিন্তু তাই বলে তিনি থেমে থাকেননি। নিজের মতো সুর করে যাচ্ছিলেন, গান তৈরি করছিলেন। 

সোলসে থাকা অবস্থাতেই আইয়ুব বাচ্চু রক্তগোলাপ ও ময়না শিরোনামের দুটি একক অ্যালবাম বাজারে আনেন। তবে তার সেই গানগুলো সোলসের মতো ছিল না। অনবরত এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে যাচ্ছিলেন বাচ্চু। এই এক্সপেরিমেন্টটা ছিল গতানুগতিক থেকে বেরিয়ে নতুন কিছু করে দেখানোর এক্সপেরিমেন্ট। ঠিক সেসময় একদিন ভাগ্য দেবতা যেন বর নিয়ে আসেন তার জন্য। সে সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে একটি ব্যান্ড সংগীতের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। সেখানে গান করবে দেশের বড় বড় সব ব্যান্ড। সোলসও ডাক পেয়েছে সেখানে। আর এখানেই বাঁধে বিপত্তি। সোলসের সবাই আছেন কিন্তু ভোকাল তপন চৌধুরী তখন অনুপস্থিত।

আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা হয় বিটিভিতে সোলসের ভোকাল হিসেবে গান করবেন আইয়ুব বাচ্চু। কিন্তু বাচ্চুতো রকার, আর সোলসের গানগুলো সফট রোমান্টিক। শহীদ মাহমুদ জংগীর ভাষ্যমতে, তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আইয়ুব বাচ্চুর জন্য নতুন গান তৈরি করা হবে। সময় মাত্র একদিন। শহীদ মাহমুদ তার বেশ কবছর আগে কয়েকটি লাইন লিখেছিলেন। লাইনগুলো হলো, একদিন ঘুম ভাঙা শহরে, মায়াবী সন্ধ্যা, চাঁদ জাগা একরাতে, একটি কিশোর ছেলে, একাকী স্বপ্ন দেখে হাসি আর গানে।

লাইনগুলো মনে ছিল আইয়ুব বাচ্চুর। সেদিন বিটিভির অনুষ্ঠানে যোগদানের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসার পথে গাড়িতেই গানটি শহীদ মাহমুদ জংগীকে লিখে দিতে বলেন আইয়ুব বাচ্চু। জংগী লিখতে থাকেন আর বাচ্চু সুর করতে থাকেন। এভাবেই তৈরী হয়ে যায় নতুন গান একদিন ঘুম ভাঙা শহরে। পরদিন বিটিভিতে সোলসের হয়ে এই গানটি পরিবেশন করেন আইয়ুব বাচ্চু। এই গানটিই প্রথম বড় ফ্রেমে আইয়ুব বাচ্চুকে পরিচিতি এনে দেয় গায়ক হিসেবে।

বাংলা ব্যান্ডের অন্যতম কিংবদন্তি গায়ক আইয়ূব বাচ্চুর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ। দু’টি বছর চোখের পলকে চলে গেলো। ২০১৮ সালে ১৮ অক্টোবর একটি বেসরকারি হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে চলে যান তিনি। সত্যি কি তিনি চলে গেছেন? তিনি আছেন বাংলা গানে। তিনি আছেন আমাদের সকলের মনে। 

আজকের তার প্রয়াণ দিবসে একটি কথাই তার সম্মরণে বলতে চাই, ‘তুমি নেই, তুমি আছো’। যাদের হাত ধরে দেশীয় ব্যান্ড সংগীত দাড়িয়েছে, তাদের একজন ছিলেন তিনি। আশির দশক থেকে গানে, সুরে ও কথায় তিনি মন জয় করে নিয়েছিলেন বাঙালি হৃদয়। তার মৃত্যুতে শুধু গানের জগতে কিংবা গায়কের শূণ্যতা সৃষ্টি হয়নি। গিটারিস্টদের জগতেও বিশাল একটি শূণ্যতা তৈরি হয়েছে। ১৬ ই আগস্ট ১৯৬২ সালে তিনি চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। 

আইয়ুব বাচ্চু একসময় সান্নিধ্য পেলেন রক গুরু আজম খানের। বাচ্চুর প্রথম ব্যান্ড ‘ফিলিংস’, সঙ্গে ছিলেন আরেক মহারথী জেমস। ১৯৭৮ সালের কথা। কয়েক বছর থাকলেন সেখানে। পরবর্তী ব্যান্ড ‘সোলস’। বাচ্চু কিন্তু তখন গান গাইতেন না, গিটার বাজাতেন। সোলস এর সঙ্গে বিচ্ছেদ ১৯৯২ সালে। এবার সময় এলো নিজের জাত চেনানোর। ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’- সংক্ষেপে এলআরবি। এটাই তার শেষ এবং প্রধান ব্যান্ড, আসল পরিচয়। মজার ব্যাপার হলো, ব্যান্ডের নাম এলআরবি হলেও এর পূর্ণরূপ পাল্টে হয়ে যায় ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড’।

ব্যান্ড তৈরি করেই গড়লেন ইতিহাস। দেশের ইতিহাসে প্রথম ডাবল অ্যালবাম বের করলেন, নাম ছিলো - এলআরবি ১ ও ২।  আবার চমক দেখালেন ১৯৯৪ সালে তবুও অ্যালবামে। তখন প্রতিটি এ্যালবামের এপিঠ আর ওপিঠে গানের তালিকা যেভাবে দেওয়া থাকতো, সে নিয়ম ভেঙে তিনি অন্যভাবে লেখেন গানগুলির নাম। পুরো একটি বাক্যে ছিলো সবগুলো গানের নাম।

“একজন জারজ সন্তানের বহুদুরে হারিয়ে যাওয়া মাকে বলিস, তার ক্ষণিকের সুখ নষ্ট করেছে আমাদের মূল্যবোধ। উনিশ কিংবা কুড়ির উর্মিলা চৌধুরীকে আমি চাই আবারও এলোমেলো একটি রাত জাগা পাখির জ্ঞানের আঁচলে। ও দুখিনী আমার বাংলাদেশ, এই নিখাঁদ কৃষ্ণ রাতের নগরে অনেকটা অন্ধ মেয়ের দৃষ্টিপাতের মত তোমাকে চেয়েছি তবুও...” - এই বাক্যেই ছিলো অ্যালবামের সব গানের টাইটেল।

আবারো তার যাদু ১৯৯৬ তে। দর্শকদের সামনে দেশের ইতিহাসের প্রথম ও সম্ভবত এখন পর্যন্ত একমাত্র লাইভ অ্যালবাম ‘ফেরারি মন’ নিয়ে হাজির হলেন। ‘চলো বদলে যাই’, ‘ঘুম ভাঙা শহর’, ‘ফেরারি এই মনটা আমার’, ‘হকার’, ‘সুখ’, ‘তারা ভরা রাতে’, ‘হাসতে দেখো, গাইতে দেখো’ সহ অসংখ্য অমর গান দিয়ে মৃত্যুঞ্জয়ী গল্পটা লিখে ফেলেছিলেন নব্বইয়ের পুরো দশকজুড়েই। ভালোবাসা নাকি মানুষকে অন্ধ করে। বাচ্চুর গানের কাছে তাইতো প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রেমে সাফল্য বা ব্যর্থতা, দুই ক্ষেত্রেই হাত পেতে থেকেছে বাংলা গানের শ্রোতারা।

ব্যান্ডের মানুষজন চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করতে চাই তো না, এমন ধারণা ছিল বাংলা সিনেমায়। কাজী হায়াতের ছবি ‘লুটতরাজ’ এর একটি গানে কন্ঠ দেবার জন্য চিত্রনায়ক মান্না আইয়ুব বাচ্চুকে অনুরোধ করেন। মান্নার অনুরোধে সেবার প্রথম সিনেমায় শোনা গেল আইয়ুব বাচ্চুর গান ‘অনন্ত প্রেম’, সঙ্গে ছিলেন সহশিল্পী কনক চাঁপা। পরবর্তীতে সাগরিকা, আম্মাজান সহ বেশ কিছু সিনেমায় শোনা গেছে তাঁর গায়কী। সিনেমার গান তাঁকে পৌঁছে দিলো বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের দরোজায়। ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন ওপার বাংলাতেও। দুই বাংলার ভক্তরা পাল্লা দিয়ে ভালোবেসেছে তার গান। প্রথম বাংলা ব্যান্ড হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে এলআরবি’র সাথে আইয়ুব বাচ্চু পরিবেশন করেছেন তাঁর কালজয়ী সমস্ত গান, নিঃসন্দেহে এটি বাংলা ব্যান্ড ইতিহাসের স্মরণীয় এক মাইলফলক।

শুধু গায়কী দিয়ে আর গিটার বাজিয়ে তিনি শ্রোতদের মন জয় করেননি। তিনি সফল সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। অডিওশিল্পে গান গাওয়ার আগে আইয়ুব বাচ্চু সুরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। তপন চৌধুরীসহ বাংলাদেশের অনেক শিল্পী আছেন, যাদের প্রথম দিকের সফল গানগুলোর সুরকার, সংগীত পরিচালক ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। তপন চৌধুরীর গাওয়া ‘আমার গল্প শুনে কারও চোখে’, ‘আলো ভেবে যারে আমি’, ‘পলাশ ফুটেছে শিমুল ফুটেছে’, ‘আমি কি বেঁচে আছি’ সহ অসংখ্য গানে সুর দিয়েছেন। বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল করেছেন। অনেক টেলিভিশন অনুষ্ঠানের শিরোনাম সংগীত করেছেন। মেরিল প্রথম আলো পুরস্কারসহ বাংলাদেশের অনেক বড় বিনোদনমূলক আয়োজনের শিরোনাম সংগীত আইয়ুব বাচ্চুর করা।

সঙ্গীতের ভুবনে একা পথ চলেন নি তিনি। সংগীতাঙ্গনে নিজে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পাশাপাশি অন্যদেরও এগিয়ে নিয়েছেন। বিশেষ করে তরুণদের নিয়ে বারবার নানা রকমের উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। সংগীত প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতা স্টারসার্চের শুরু থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। অনেক সংগীতশিল্পী আছেন, যাদের কে আইয়ুব বাচ্চুর সহযোগিতা করেছেন নানাভাবে। নিজে র্পষ্ঠপোষকতা করেছেন। পরামর্শ দিয়েছেন। অনুশীলন, ষ্টুডিওতে রেকর্ডিং, এমনকি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ করে নতুন শিল্পীর অ্যালবাম প্রকাশে ভূমিকা পালন করেছেন।  

মানুষের বিপদে আপদে সব সময় ছুটে যেতেন আইয়ুব বাচ্চু। নীরবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, এমন অনেক উদাহরণ আছে। অনেক অসুস্থ বা দুর্ঘটনায় আহত মানুষের জন্য কনসার্টসহ নানা আয়োজন করে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বারবার। মাদকবিরোধী কর্মসূচি, অ্যাসিড–সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সচেতনতাসহ বিভিন্ন উদ্যোগে তাকে দেখা গেছে।

তার গাওয়া জনপ্রিয় গানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। এর মধ্যে ‘চলো বদলে যাই’, ‘রুপালি গিটার’, ‘ফেরারি মন’, ‘বাংলাদেশ’, ‘উড়াল দেব আকাশে’, ‘ঘুমভাঙা শহর’, ‘আসলে কেউ সুখী নয়’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘হাসতে দেখো’, ‘নীল বেদনা’, ‘মাধবী’, ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি’, ‘এক আকাশের তারা তুই’, ‘মন চাইলে মন পাবে’ অন্যতম। 

আইয়ুব বাচ্চু তার যেকোনো কনসার্ট শেষ করতেন গিটারে জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ সুর তুলে। সেই রুপালি গিটারের সুর ও তার গান দীর্ঘদিন মানুষের মুখে মুখে ফিরবে।


মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh