সামো ট্যাগের শিল্পী জিন-মিশেল বাস্কুয়েট

পপস্টার, কবি, শিল্পী একসঙ্গে মেশানোর পর আমরা পাই জিন মিশেল বাস্কুয়েট। কিংবদন্তি এই শিল্পী বেঁচেছিলেন মাত্র ২৭ বছর। বাস্কুয়েটের মতো বড় মাপের একজন শিল্পীকে নিয়ে সবারই কৌতূহল থাকে। সেই কৌতূহল থেকে প্রতিভাবান এই শিল্পীকে নিয়ে তৈরি হলো এ রচনা।

জিন-মিশেল বাস্কুয়েটের জন্ম হয়েছিল ১৯৬০ সালের ২২ ডিসেম্বর নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে। তার বাবা, জেরাড, হাইতির পোর্ট অব প্রিন্সে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আর তার মা মাতিল্ডে ছিলেন নিউইয়র্ক-বংশোদ্ভূত পুয়ের্তো রিকান। বহুসংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠায় শৈশবেই স্প্যানিশ, ফরাসি এবং ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে পারতেন বাস্কুয়েট। মাত্র ছয় বছর বয়সে তার প্রিয় ব্রুকলিন জাদুঘরের জুনিয়র সদস্য হন। আর ২০১৮-এর বসন্তে এসে সেই জাদুঘরেই ‘ওয়ান বাস্কুয়েট’ নামে একক প্রদর্শনীর আয়োজন হয়, যা কেবল শিল্পীর রেকর্ড- ব্রেকিং শিরোনামহীন (১৯৮২) সিরিজ নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। জাপানিজ কালেক্টর ইউসাকু মাইজাওয়া ১১০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কিনে নেন তার কাজ। আমেরিকান শিল্পীদের ক্ষেত্রে এটাই এখন পর্যন্ত সর্ব্বোচ মূল্যে বিক্রি হওয়া পেইনটিং। আট বছর বয়সে, রাস্তায় খেলতে গিয়ে একটা গাড়িতে ধাক্কা খেয়ে একটা হাত ভেঙে যায় বাস্কুয়েটের এবং তিনি গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন শরীরে। তিনি যখন সুস্থ হয়ে উঠছিলেন, তার মা তাকে ফাউন্ডেশনাল মেডিকেলের পাঠ্যপুস্তক ‘গ্রে’স অ্যানাটমি’র একটি অনুলিপি উপহার দেন। ফিগারেটিভ যে ড্রয়িংগুলো ছিল তা এই তরুণ শিল্পীর খুব ভালো লেগে যায়। বহু বছর পরে, এই প্রভাবের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বাস্কুয়েট তার ব্যান্ডের নাম গ্রে (যা অভিনেতা ভিনসেন্ট গ্যালোকে সদস্য হিসাবে গণ্য করেছিলেন) রেখেছিলেন। ১৫ বছর বয়সে তিনি ঘর ছেড়ে দেন বাইরে থাকার নিয়তে। ১ সপ্তাহ পার্কেও থেকেছেন। সপ্তাহ শেষে অবশ্য পুলিশ তাকে বাড়িতে ফেরত দিয়ে আসেন। সতের বছর বয়সে যখন তিনি ড্রপ আউট হন, স্কুলের পাশাপাশি তার বাবাও তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। তখন তরুণ বাস্কুয়েটের জীবিকা চলত- টিশার্ট এবং পোস্টকার্ডে ছবি এঁকে বিক্রি করে। এ সময়ে তিনি বন্ধুদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ঘুমোতেন। এ সময় খাবার হিসেবে বাস্কুয়েট সস্তা রেড ওয়াইন আর মাত্র ১৫ সেন্ট দামের চিপস খেতেন।

বাস্কুয়েটের গ্রাফিতি ট্যাগ ছিল ‘সামো’ ইংরেজিতে SAMO, যার অর্থ ছিল ‘সেম ওল্ড শিট’। স্কুলের বন্ধু আল দিয়াজকে সঙ্গে নিয়ে বাস্কুয়েট নিউইয়র্কের দালান, সাবওয়ে এবং টানেলে এই ট্যাগ এঁকে বেড়াতেন। ১৯৭৭-১৯৮০-তে প্রচণ্ড জনপ্রিয় ছিল ‘সামো’। লেখক অনথ্যনি হ্যাডেন গেস্টের সঙ্গে কথোপকথনে বাস্কুয়েট বলেছিলেন, এটা পেপসির মতোই একটা বিখ্যাত লোগো হওয়ার কথা ছিল। তবে ১৯৮০-তে শহরে অনেক ‘সামো ইজ ডেড’ গ্রাফিতি এঁকে এটার ইতি টানেন তিনি।

ক্রাউন, বাংলায় মুকুটকে বাস্কুয়েটের খুব কমন মোটিফ হিসাবে ধরা যায়। কমন মোটিফ বলতে সব কাজে এটা প্রায় থাকত। এ মোটিফ পশ্চিমা শিল্প ইতিহাসকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। তারাও বাধ্য হয়েছে স্বীকৃতি দিতে। অ্যাথলেট, সংগীতশিল্পী এবং লেখকসহ কালো পুরুষ ব্যক্তিত্বকে মুকুট দিয়ে শোভিত করে, বাস্কুয়েট এই ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চিত শিল্পীদের রাজকীয়, এমনকি মর্যাদার উচ্চতায় উন্নীত করেছিলেন। তার বন্ধু শিল্পী ফ্রান্সেস্কো ক্লিমেন্ট জানান- ‘জিন-মিশেলের মুকুটটিতে তার জন্য তিনটি শৃঙ্গ রয়েছে- কবি, সংগীতশিল্পী, দুর্দান্ত বক্সিং চ্যাম্পিয়ন।’

আর্ট রাইটার গ্লেন ও’ব্রায়নের টেলিভিশন প্রোগ্রাম ‘টিভি পার্টি’তে নিয়মিত উপস্থিত হতেন- সর্বপ্রথম ১৯৭৯ সালে লাইভ শোতে হাজির হন দুই দিকে চুল আর মাঝে মাথা শেভ করে। দু’বছর পরে তিনি ও’ব্রায়নের চলচ্চিত্র ‘ডাউনটাউন-৮১’-এ আত্মজীবনীমূলক চরিত্রেও অভিনয় করেছিলেন। রেমলজি আর কে রব’কে সঙ্গে নিয়ে র‌্যাপ গানের অ্যালবাম ‘বিট পপ’ বের করেন। অ্যালবামের কভার ডিজাইনও নিজেই করেন। আলোচনায় থাকাটা বাস্কুয়েটের জন্য চমৎকার উপযোগী হয়ে ওঠে। তিনি ‘রাপচার’ গানের মিউজিক ভিডিওতে অভিনয় করেন। এই গানের গায়িকা ডেব্বি হ্যারি আর ক্রিস স্টেইন মিলে বাস্কুয়েটের একটা পেইন্টিং কেনেন মাত্র ২০০ ডলারে, যা ছিল বাস্কুয়েটের বিক্রি করা প্রথম কোনো পেইন্টিং। আর্ট এক্সিবিশন তার কাছে সবসময়ই ছিল একটা খেলা। ১৯৮০ সালে তিনি প্রথম এক্সিবিশন করেন একটা পরিত্যক্ত ম্যাসাজ পার্লারে। এখানে অংশগ্রহণ করেছিলেন কিথ হ্যারিং, কিকি স্মিথ, জেনি হোলজারের মতো আরও অনেক শিল্পী।

জুলিয়ান স্নেবেল, কেনি স্কার্ফ, ফ্রান্সেসকো ক্লিমেন্ট এবং বাস্কুয়েটকে নিও- এক্সপ্রেসশনিজম নামের আর্ট মুভমেন্টের প্রথম সারির নেতা হিসেবে গণ্য করা হয়। এই আন্দোলনের মুখ্য বিষয় ছিল মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে আদি বৈশিষ্ট্যগুলো পুনরুদ্ধার করা। ১৯৯৬ সালে জুলিয়ান স্নেবেল বাস্কুয়েটের অশান্ত জীবনের ওপর একটা বায়োপিক পরিচালনা করেন যেখানে তিনি জেফরি রাইটকে নিয়েছিলেন বাস্কুয়েট হিসেবে এবং ডেভিড বোয়িকে অ্যান্ডি ওয়ারহল হিসেবে। আর ব্যাংক জিনিসটাকে কখনোই পছন্দ করতেন না বাস্কুয়েট। অ্যাকাউন্টও খোলেননি এই কারণে। কখনো সোফায়, কখনো কার্পেটের নিচে আবার কখনো বাথরুমে টাকা লুকিয়ে রাখতেন। ১৯৮২ সালে, মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি জার্মানির ক্যাসেল শহরে ডকুমেন্টায় প্রদর্শিত সর্বকনিষ্ঠ শিল্পী হয়েছিলেন। যেখানে তার প্রায় ৬০টি চিত্রকর্ম বিশেষ মর্যাদাময় প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছিল। তিনি ১৯৮২ সালে ‘অ্যানিনা নসেই’ গ্যালারিতে যোগদান করেছিলেন এবং একই বছর বসন্তে তার প্রথম আমেরিকান একক শো করেছিলেন। ১৯৮৪ সালের মধ্যে বাস্কুয়েট অ্যানিনা নসেইকে ছেড়ে ১৯৮০-এর দশকের আর্ট ওয়ার্ল্ডের অন্যতম শক্তিশালী গ্যালারি ‘মেরি বুনে’-তে যোগ দিয়েছিলেন।

বাস্কুয়েট তার আজীবনের বন্ধু এবং পরামর্শদাতা অ্যান্ডি ওয়ারহোলের সঙ্গে ১৯৮১ সালে গভীর রাতে মি. চৌয়ের বাড়িতে প্রথম দেখা করেছিলেন। সুইস ডিলার ব্রুনো বিছোফবার্গার বলেন- ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫-তে এই জুটি কয়েকটা সিরিজ একসঙ্গে কাজ করেন। সেই কাজগুলোতে বাস্কুয়েটের শিল্পজ্ঞানের সঙ্গে যোগ হয়েছে ওয়ারহোলের উজ্জ্বল পপ সংস্কৃতি।

ম্যাডোনা এবং বাস্কুয়েট ১৯৮২ সালে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান, যখন দু’জনের তারকাখ্যাতি ছিল সর্বোচ্চ চূড়ায়। এই বছরেই বাস্কুয়েট লস অ্যাঞ্জেলসে যান। সেখানে তিনি গ্যালারিস্ট ল্যারি গাগোসিয়ানের সঙ্গে থাকতেন আর গ্যালারির ওয়েস্ট কোস্টে আসন্ন একক শো-এর জন্য প্রস্তুত ছিলেন। এমনকি ম্যাডোনা কয়েক মাস তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। যতই বিখ্যাত হতে থাকেন, বাস্কুয়েট ততই ইচ্ছামতো খরচ করা শুরু করেন। দামি মদ আর দামি দামি স্যুটের পেছনে খরচ করতে থাকেন। দামি স্যুটের ওপর অনেক সময় ড্রয়িংও করতেন। যাকে-তাকে টাকা ধার দিতেন। হিসাব রাখতেন না কোনো। এমন কি সাংবাদিকদের তাক করে গাড়ি থেকে ১০০ ডলারের নোট ছুড়ে মারার মতো ঘটনাও রয়েছে। একসময় মিউজিয়াম অব মর্ডান আর্ট এবং হুইটনি মিউজিয়াম অব আমেরিকান আর্ট উভয়ই তার কাজ প্রত্যাখ্যান করেছিল।

১৯৮৮ সালের ১২ আগস্ট গ্রেট জোনস স্ট্রিট স্টুডিওতে হিরোইন ওভারডোজের কারণে বাস্কুয়েট মারা যান। তার বয়স ছিল তখন ২৭ বছর। মৃত্যুর আগের মাসগুলোতে অস্থিরতার তাড়নায় দিনে একশ’ ব্যাগ হেরোইনও ব্যবহার করেছেন বলে ব্রুকলিনের গ্রিন-উড সেমেট্রিতে দাফনকালে কিউরেটর ও গ্যালারিস্ট জেফ্রি ডেইচ দাবি করেছিলেন। ‘আই অ্যাম নট অ্যা অর্ডিনারি ম্যান, আই অ্যাম অ্যা লিজেন্ড।’ একবার বাস্কুয়েট দাবিও করেছিলেন। তার নাম এবং অনন্য স্টাইল জনপ্রিয় পপ সংস্কৃতির একটা রেফারেন্স পয়েন্ট হয়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ সহযোগী ব্রুকলিন-স্থানীয় জে-জেড (Jay-z) তার ২০১৩ সালের ‘পিকাসো বেবি’ গানে শিল্পীর সঙ্গে নিজেকে সমান্তরাল করে বলেছেন- ‘ইটস নট হার্ড টু টেল, আই অ্যাম দ্য নিউ জিন মিশেল।’

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh