মহালছড়ির নিংপ্রু চাই মারমার জীবন সংগ্রাম

ক্যানসারের সাথে বসবাস: তবুও থেমে নেই ‘স্বপ্নের পাঠশালা’

খাগড়াছড়ির মহালছড়ির নিভৃত মারমা পল্লী সিঙ্গিনালা। গ্রামীণ সড়ক ধরে চলে মহালছড়ি উপজেলা সদর থেকে অন্তত তিন কিলোমিটার দূরে মুবাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের উল্টোদিকে  নিংপ্রু চাই মারমার বসত বাড়ি। বাড়ির চারপাশে সবুজের সমারোহ। বসতবাড়ি ঘেষে  টিনের চালার নীচে ‘স্বপ্নের পাঠশালা’য় বই পড়ছে কয়েকজন কিশোর কিশোরী।

সিঙ্গিনালা উচ্চ বিদ্যালয়ের মাধ্যমিকের পাঠ চুকিয়ে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে এই তরুণ। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৪-০৫ সেশনে ভর্তি হয় অর্থনীতি বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ¯œাতকত্তোর শেষ করে যোগ দেন শিক্ষকতায়।

বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যায়নকালে গ্রামে আসলেই শিক্ষাথীদের পড়াতেন নিংপ্রু চাই। সবকিছুই ঠিক মতো চলছিলো, হঠাৎ ২০১৮ সালে ফেব্রুয়ারিতে শারীরিক দুর্বলতাসহ নানা উপর্সগের কারণে চিকিৎসকেরর শরনাপন্ন হন নিংপ্রু। স্পাইনাল কর্ডের অভ্যন্তরের বাড়তে টিউমার থেকে ছড়িয়েছে ক্যানসার ‘ধহধঢ়ষংঃরপ ধংঃৎড়পুঃড়সধ’  ।

ক্যানসার সনাক্তের পর ভারতের চেন্নাহের ‘শ্রী নায়ারনি হসপিটাল এবং রিসার্চ সেন্টার’য়ে অপরাশেনও অসফল হয়। এতে নিংপ্রুচাই মারমার কোমর থেকে পা অব্দি প্যারালাইজড হয়ে যায়। ভারত থেকে হুইল চেয়ায়ে করে মহালছড়ির নিভৃতপল্লীর বাড়িতে ফেরেন তিনি।

তবে, জীবন যুদ্ধে থেকে জাননি নিংপ্রু। জ্ঞানের আলো ও মানবিক মানুষ গড়ার লক্ষ্যে নিজের বাড়িতেই গড়ে তোলো ‘ স্বপ্নের পাঠশালা। ২০১৯ সালে অক্টোবর মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় পাঠাগারটি।

সরেজমিনে দেখা যায়, বর্তমানে ৮০ জন কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী এখানে নিয়মিত বই পড়ে। বইয়ের সংখ্যা সাতশ। বই পড়ার পাশাপাশি ভোর ৫ টা থেকে শুরু হয়  শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কোচিং। সর্ম্পূণ বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। নিংপ্রুচাই মারমার ‘স্বপ্নের পাঠশালা’য় পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থী মানসিক ও শারীরিক বিকাশে বিভিন্ন খেলাধুলারও আয়োজন করা হয়। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মংশি মারমা পাঠশালায় শিক্ষার্থী এখানে পাঠদান করান। তিনি বলেন, “শৈশব- কৈশোরে নিংপ্রুচাই দাদা আমাদের পাঠদান করিয়েছেন। আজকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। বর্তমানে তিনি দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আজকের ‘স্বপ্নের পাঠশালা’। এখানে গ্রামের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে।  আলোকিত মানুষ হচ্ছে।”

হঠাৎ করে থমকে যাওয়া জীবনের হিসাব মেলাতে না পারা নিংপ্রুচাই মারমা ক্যানসারের সাথে বসবাস করেও শোনালেন জীবন জয়ের কথা। তিনি বলেন,‘ আমি উপলদ্ধি করেছি একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন আকস্মিক ‘ঝড়ে’ কীভাবে ‘অস্বাভাবিক’ হয়ে যায়।  ক্যানসারের পর থেকে আমরা শরীর অক্ষম। এখন শুধু মাথা ও হাত সক্রিয়। বুক থেকে পা অব্দি প্যারালাইজড। পরিবার এবং পাঠশালার শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায় এখনো ঠিকে আছি। আমি স্বপ্নকে আকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছি। সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে এখানে একটি কম্পিউটার ল্যাব গড়ার প্রচেষ্টা করছেন তিনি।

এ বিষয়ে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস জানান, আমি নিংপ্রুচাই মারমা ‘স্বপ্নের পাঠশালা’র কথা শুনেছি। আমরা তার এই উদ্যোগের পাশে দাঁড়াতে চাই। শিগগিরই সরেজমিনে পরিদর্শণ করে তাকে সহযোগিতা ব্যবস্থা করারও আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক।


মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh