আয় বাড়াতে রিকশা নিবন্ধন: আরো বাড়বে যানজট

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

রাজধানীতে যানজটের বড় কারণ হিসেবে রিকশা-ভ্যানকে দায়ী করে দীর্ঘদিন ধরে বাহনটির নতুন লাইসেন্স দেয়া বন্ধ রেখেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। 

কিন্তু এবার রাজস্ব বাড়ানোর কথা চিন্তা করে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। তবে নতুন করে রিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করলেও ভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি)। 

লাইসেন্স দেয়ার এ সিদ্ধান্তে রাজধানীতে যানজট আরো বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর যানজট নিরসনের জন্য নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবসম্মত নয়, প্রকল্পসর্বস্ব। এ কারণেই যানজট নিরসনে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ থেকে সফলতা আসছে না। রিকশার কারণে ঢাকার রাস্তায় যানবাহনের গতি আসছে না। চলতে গিয়ে রিকশার ভিড়ে আটকে যায় গাড়ি। 

বিশ্ব ব্যাংকের তথ্যও বলছে, এক দশকে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে নেমে এসেছে মাত্র সাত কিলোমিটারে। কয়েক বছরের মধ্যে তা ঘণ্টায় চার কিলোমিটারে চলে আসবে, যা হাঁটার চেয়েও মন্থর। এর মধ্যে নতুন করে রিকশা-ভ্যান নিবন্ধন হলে রাজধানীতে যানজট আরো তীব্র হবে।

ডিএনসিসি বলছে, নগরীতে যে পরিমাণ রিকশা রয়েছে, তা অনেক বেশি। যানজট সৃষ্টিতে এই রিকশার ভূমিকা রয়েছে। তাই পুরাতন এলাকায় কোনো রিকশার লাইসেন্স দেয়া হবে না। তবে সংস্থাটিতে ব্যাটারি বা যন্ত্রচালিত অযান্ত্রিক বাহনগুলো নিষিদ্ধ করায় নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডগুলোতে কিছু নিবন্ধন দেয়া হবে। 

ডিএনসিসি মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডিএনসিসির নতুন এলাকায় কোনো রিকশা নিবন্ধন দেয়া হবে না। তবে বর্তমানে যন্ত্রচালিত রিকশা নিষিদ্ধ করায় ডিএনসিসিতে নতুন যুক্ত হওয়া এলাকাগুলোতে মানুষের চলাচলে কষ্ট হবে। সেই চিন্তা থেকেই সেখানে কিছু লাইসেন্স দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের পুরনো ওয়ার্ডগুলোতে কোনো রিকশার লাইসেন্স আমরা দেবো না।’

তবে ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, “ঢাকা শহরকে অনেক কবি-সাহিত্যিক ‘সিটি অফ রিকশা বা রিকশার নগরী’ বলে চিত্রিত করেছেন। এটা আমাদের ঐতিহ্য। রিকশাসহ আমাদের যে ধীরগতির অযান্ত্রিক যানবাহনগুলো রয়েছে, সেগুলোকে নতুন করে আমরা নিবন্ধন ও নবায়নের আওতায় আনছি। এর মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা আনাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।” 

তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহারে সচল ঢাকা গড়ার যে রূপরেখা দিয়েছি, সে পরিকল্পনায় যেমন দ্রুতগতির যানবাহন থাকবে, তেমনি ধীরগতির অযান্ত্রিক যানবাহনও থাকবে। ঢাকা শহরের দীর্ঘ তিন দশকেরও অধিক সময় রিকশা ও অযান্ত্রিক যানবাহনের কোনো নিবন্ধন প্রদান করা হয়নি। কিন্তু তাই বলে কি ঢাকায় রিকশা চলে না? বাস্তবতা হলো- ঢাকায় রিকশা চলে ও সেগুলো সবই অবৈধভাবে চলে। নিবন্ধনের আওতায় আনা মানে অযান্ত্রিক যানবাহনকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা। আমরা এই কার্যক্রমের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টসংখ্যক রিকশা-ভ্যান তথা অযান্ত্রিক যানবাহনকে নিবন্ধন প্রদান করব। এতে রাজস্ব আয়ও বাড়বে।’

এদিকে ডিএসসিসি বলছে, লাইসেন্স না থাকলেও অযান্ত্রিক অবৈধ এসব বাহন বন্ধ হচ্ছে না। চলতি অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় ধরা হয়েছে ২৪ কোটি টাকা। তাই এগুলোকে নিবন্ধন দেয়ার পাশাপাশি শৃঙ্খলার মধ্যে এনে পরিচালনা করা হবে। তবে কী পরিমাণ নিবন্ধন দেয়া হবে, তা এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। 

দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য মতে, রাজধানীতে লাইসেন্সধারী রিকশা ও রিকশা-ভ্যানের সংখ্যা মোট ৭৯ হাজার ৫৫৪টি। যদিও বাস্তবে এর সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ। বলা হয়, ১৯৮৬ সাল থেকে গত ৩৪ বছর ধরে এসব অযান্ত্রিক বাহনের (রিকশা ও ভ্যান) নতুন লাইসেন্স দেয়া বন্ধ রাখে সিটি করপোরেশন। যদিও এ সময়ে প্রতিদিনই রাস্তায় নেমেছে নতুন নতুন বাহন। এ অবস্থায় ‘অবৈধ’ এসব বাহনের নিবন্ধন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘এখন আমরা এখানে অনিয়মটিকেই নিয়ম করে ফেলেছি। যেখানে নগরায়ণই অপরিকল্পিত হয়েছে, সেখানে নগরের মানুষের অভ্যাসগুলোও অপরিণতভাবে হয়েছে। অবশ্য ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করার জন্য শাস্তি যা, তাও দেখা যাচ্ছে খুব সামান্যই। বর্তমান আইনে, উল্টোপথে গাড়ি চালানোর শাস্তি মোটে ২০০ টাকা জরিমানা। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য অনেকেই নিশ্চয় এই টাকা খোয়ানোর ঝুঁকি নিতে রাজি থাকবেন।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘রিকশা-ভ্যান নতুন রেজিস্ট্রেশন করার আগে ভাবতে হবে রাজধানীতে সে পরিমাণ চলাচলের রাস্তা আছে কি-না?’

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘রিকশার কারণে ঢাকার রাস্তায় যানবাহনের গতি আসছে না। চলতে গিয়ে রিকশার ভিড়ে আটকে যায় গাড়ি। এর মধ্যে নতুন রিকশা-ভ্যান নিবন্ধন হলে ঢাকার যানজট আরো বাড়বে।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘আজ যে নাগরিকরা সড়কের নিয়ম-কানুন মানছেন না, তার গোড়াপত্তন করে দিয়েছেন নগরের পরিকল্পনা যারা করেছেন তারা, অর্থাৎ কর্তৃপক্ষ। রাস্তাঘাটের ধারণক্ষমতা আর নেই, পথচারীদের জন্য যথেষ্ট পারাপার ব্যবস্থাও নেই। সুতরাং এই অবস্থায় তাদের কাছে ভদ্র ব্যবহার পেতে চাওয়াটা অন্যায় আবদার হবে। আগে আসবেন, আগে যাবেন- এটি বিজ্ঞান। এটি বাস্তবায়ন করার জন্য চাহিদা ও জোগানের মধ্যে একটি সমন্বয় থাকতে হয়। আমাদের দুর্ভাগ্য- এই ঢাকা শহরে কেউ চাহিদা ও জোগান নিয়ে চিন্তা করেনি।’

উল্লেখ্য, ডিএসসিসির আওতাধীন এলাকায় অযান্ত্রিক যানবাহন নিবন্ধন/নবায়ন/মালিকানা পরিবর্তনের জন্য করপোরেশন ইতিমধ্যে এক গণবিজ্ঞপ্তি প্রচার করেছে। আগ্রহী ব্যক্তিবর্গ/প্রতিষ্ঠান আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নগর ভবনের ভাণ্ডার ও ক্রয় বিভাগ এবং আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোর দফতর থেকে অফিস চলাকালে নিবন্ধন/নবায়ন/মালিকানা পরিবর্তনের জন্য ১০০ টাকার (অফেরতযোগ্য) বিনিময়ে আবেদনপত্র সংগ্রহ ও জমা দিতে পারবেন। গৃহীত আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে যোগ্য বিবেচিত হওয়া আবেদনগুলোর অনুকূলে নির্ধারিত ফি জমাদান সাপেক্ষে নিবন্ধন দেয়া হবে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh