শীতে ত্বকের যত্নে করণীয়-বর্জনীয়

শীত এলেই বদলে যায় প্রকৃতি। বদলে যায় আবহাওয়া, পরিচিত দৃশ্যগুলো। আগের মতো থাকে না কিছুই। প্রকৃতির সেই প্রভাব পড়ে মানুষের ওপরও। 

ত্বক হয়ে ওঠে রুক্ষ, খসখসে। ঠোঁট ফেটে যায়। পায়ের গোড়ালি থেকে চামড়া উঠতে থাকে। চুল ভরে ওঠে খুশকিতে। 

আরো নানা সমস্যা দেখা দেয় শীতে। প্রকৃতি স্বাভাবিকভাবেই শীতের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিতে পারে না- তাই বসন্তকাল পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হয় নবযৌবন লাভের জন্য। যদি ঠিকঠাক মতো নিয়ম মেনে চলা যায়, তাহলে শীতে ত্বকের সৌন্দর্যহানি হয় না, বিঘ্নিত হয় না ত্বকের নিরাপত্তা। 

শীতে ত্বকের কীভাবে যত্ন নেবেন? কীভাবে বজায় রাখবেন স্বাভাবিক সৌন্দর্য? কীভাবে কাটিয়ে উঠবেন যাবতীয় সমস্যা? কীভাবে কোমল, স্নিগ্ধ রাখবেন শরীর ও মন? শীত যতই ঘন হয়ে আসুক, আপনার সৌন্দর্যে  কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলতে পারবে না। 

আসুন জেনে নেই শীতে ত্বকের যত্নে করণীয়-বর্জনীয়। 

খুশকি সমস্যা

খুশকি মাথার ত্বকের অন্যতম প্রধান সমস্যা। চিকিৎসা পরিভাষায় একে বলে পিটিরিয়াসিস। মূলত কোষগুলোর মৃত্যু হয়ে সেগুলো ঝরে পড়ে। এই ঝরেপড়া ত্বক বা আঁশকে বলে খুশকি। মনে রাখবেন, দীর্ঘদিন খুশকির চিকিৎসা না করা হলে কিংবা খুশকিকে অবহেলা করলে চুল উঠে যায়। 

খুশকির একটি সরাসরি কারণ হলো অতিরিক্ত আঁশ ঝরে পড়া। আঁশগুলো ঝরে পড়ার বদলে মাথার ত্বকে জমা হতে থাকে। খুশকির কিছু কারণের মধ্যে রয়েছে দুর্বল রক্ত সঞ্চালন, পরিচ্ছন্নতার অভাব ও খাবার- যেগুলো মাথার ত্বকে খুসকি তৈরিতে সহায়তা করে। 

খুশকি দুই ধরনের- একটি শুকনো খুশকি, অন্যটি তেলতেলে খুশকি। শুকনো খুশকিকে চিকিৎসা পরিভাষায় বলে পিটিরিয়াসিস ক্যাপিটিস সিমপ্লেক্স ও তেলতেলে খুশকিকে বলে পিটিরিয়াসিস স্টিটয়েডস।

খুশকিকে প্রায় ক্ষেত্রেই সংক্রামক বলে বিশ্বাস করা হয়। কসমেটিক বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে খুশকির উভয় ধরনই ছোঁয়াচে ও একাধিক ব্যক্তি দ্বারা ব্যবহৃত ব্রাশ, চিরুনি, তোয়ালে, সাবান ও অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহারের ফলে খুশকি ছড়াতে পারে। চুলের সংস্পর্শে আসা যেকোনো বস্তু পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা নিতে হবে। 

খুশকি নিয়ন্ত্রণে ২ টেবিল চামচ কসমেটিক ভিনেগারের সঙ্গে ৬ টেবিল চামচ গরম পানি মেশান। তুলার সাহায্যে এটি মাথার ত্বকে আলতো করে ঘষতে থাকুন। চিরুনি দিয়ে চুল আচড়ান। শোবার সময় এটা মাখলে সবচেয়ে ভালো হয়। বিছানার চাদরে যাতে দাগ না লাগে সে জন্য একটা স্কার্ফ দিয়ে মাথা পেঁচিয়ে রাখবেন। পরদিন সকালে শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলবেন। চুল খুব ভালোভাবে ধুতে হবে যেন চুলে শ্যাম্পু লেগে না থাকে। পরে ৩ টেবিল চামচ কসমেটিক ভিনেগার ও এক কাপ গরম পানির মিশ্রণ দিয়ে চুল ধুতে হবে। সপ্তাহে দুবার এটা করবেন।

খুশকি দূর করার আরেকটি পদ্ধতি হলো হট অয়েল থেরাপি। শোবার সময় মাথার ত্বকে গরম তেল ম্যাসাজ করবেন। পরদিন সকালে গোসল করার এক ঘণ্টা আগে কসমেটিক ভিনেগারের সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে কটন উল সহকারে মাথার ত্বকে আলতো করে ঘষবেন। এরপর এগ শ্যাম্পু দিয়ে ভালো করে চুল ধুয়ে ফেলবেন। শেষ ধোয়া হিসেবে এককাপ গরম পানিতে একটা লেবুর রস ব্যবহার করবেন। সপ্তাহে একবার বা দু’বার এ চিকিৎসা চালিয়ে যাবেন তিন মাসের জন্য।

মাথায় তেল ও ঘাম জমতে দেয়া উচিত নয়। এতে খুশকির প্রকোপ বেড়ে যাবে। মাথায় তেল যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করবেন আর নিয়মিত মাথার ত্বক ও চুল পরিষ্কার রাখবেন। মাথার ত্বক ও চুল পরিষ্কার রাখতে নিয়মিত শ্যাম্পু ব্যবহার করতে পারেন।

ঠোঁট ফাটা

শীতের শুষ্ক ও ঠাণ্ডা আবহাওয়ার প্রভাব শুধু শরীরের ওপরই পড়ে না, ঠোঁটের ওপরও পড়ে ভীষণভাবে। ফলে এ সময়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবারই ঠোঁট শুষ্ক থাকে ও ঠোঁট ফাটতে দেখা যায়। অনেকের আবার শুধু শীতকালই নয়, সারাবছরে ঠোঁট শুষ্ক থাকে ও ঠোঁট ফাটে। এটা খুবই এক বিরক্তিকর সমস্যা।

ঠোঁটের শুষ্কতা ও ঠোঁট ফাটা মোকাবিলা করার জন্য ঠোঁটে গ্লিসারিন মেখে হালকা ম্যাসাজ করতে হবে, এতে রক্তসঞ্চালন বাড়বে ও মৃতকোষগুলো উঠে যেতে সাহায্য করবে। অতিরিক্ত গ্লিসারিন ভেজা কটন দিয়ে মুছে ফেলবেন। এবার দুই ঠোঁটে ময়েশ্চারাইজার যেমন ভ্যাসলিন খুব গাঢ় করে মাখবেন এবং দুই ঠোঁটে আগাগোড়া খুব দ্রুত আলতো করে আঙুল বুলাবেন। ঠোঁটের কোণা থেকে মাঝ পর্যন্ত দ্রুত এটা করবেন। এতে ঠোঁট কোমল থাকবে ও ঠোঁট ফাটার সমস্যা দেখা দেবে না। 

একটা কথা মনে রাখতে হবে, তা হলো ঠোঁট কখনোই শুকনো রাখা যাবে না। ঠোঁট আবারো শুকিয়ে যাওয়ার আগেই গ্লিসারিন কিংবা ভ্যাসলিন মাখতে হবে। আর ঠোঁটের চামড়া কখনোই টেনে তুলবেন না।

শীতের মধ্যে বাইরে বেরোলে কিংবা রোদে বাইরে গেলে অবশ্যই ফাটা ঠোঁটে লিপ ব্যারিয়ার ক্রিম মেখে বেরোতে হবে। সূর্যরশ্মির কারণে ঠোঁট ফুলে যায়, ব্যথা হয় কিংবা ঠোঁটে জ্বালাপোড়া অবস্থার সৃষ্টি হয়।

ত্বক ফাটা

শীতকালে অনেকেরই শরীর ও মুখের ত্বক ফেটে যায়। দেখতে খুবই বিশ্রী লাগে। 

ফাটা ত্বকের জন্য বেশ কিছু সহজ ঘরোয়া চিকিৎসা-

১. ত্বক ভালো করে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করতে হবে। এরপর ত্বক শুকাবেন। ত্বক শুকিয়ে গেলে সেখানে ঘি কিংবা সর্ষের তেল মাখবেন।

২. সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ত্বকে দুধের সর মাখা। এটা ত্বকে মালিশ করতে হবে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময়। ফাটা ঠোঁটেও আপনি রাতে এই ক্রিম মাখতে পারেন, এতে ঠোঁট নরম ও মসৃণ হবে।

৩. শীতের সময় ত্বকে সাবান যত কম মাখা যায় তত ভালো, কারণ এতে ত্বক আরো খসখসে হয়ে পড়ে। সাবানের পরিবর্তে ত্বকে ক্লিনজিং ক্রিম লাগিয়ে ত্বক পরিষ্কার করতে পারেন। 

৪. রাতে নিয়মিত শরীরে ক্রিম লাগানোর অভ্যাস করবেন। এতে ত্বকের শুষ্কতা রোধ হবে।

৫. শীতের শুষ্কতা থেকে ত্বককে রক্ষা করার জন্য অলিভ অয়েল একটি চমৎকার দ্রব্য। শীতে নিয়মিত এটা ত্বকে মালিশ করুন।

৬. শীতে অনেকে গরম পানিতে গোসল করেন। কিন্তু খুব গরম পানিতে নিয়মিত গোসল করলে ত্বক আরো শুষ্ক হয়ে পড়ে। গরম পানিতে গোসল করতে চাইলে হালকা গরম পানিতে গোসল করুন এবং গোসলের পরে শরীর মুছে ময়েশ্চারাইজার মাখুন।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh