মঙ্গলবার,  ১৬ জুলাই ২০১৯  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০১৬, ১৫:০৫:৩৩

জাতীয় উদ্যান লাউয়াছড়ার পথে

আন্নিকা হুসাইন
পর্যটন নগরী ও চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত সবুজ শ্যামল মনোমুগ্ধকর পরিবেশের এক আকর্ষণীয় স্থান মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল। বিশ্বের অগণিত গবেষক ও পর্যটকের আকর্ষণ শ্রীমঙ্গল উপজেলার চা-বাগান এবং জীববৈচিত্র্য ও বন্য প্রাণীর নান্দনিক সৌন্দর্যের কেন্দ্র লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্ক। ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্ট খ্যাত এ পার্কটি এখন বিনোদনের অন্যতম স্পটে পরিণত হয়েছে।
 
১৯২৫ সালে ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা এখানকার বনরাজি এখন ঘন প্রাকৃতিক বনের আকার ধারণ করেছে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশে অবশিষ্ট চিরহরিৎ বনের একটি উল্লেখযোগ্য নমুনা। বিলপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য এ বন বিখ্যাত। উল্লুক ছাড়াও এখানে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ ও উদ্ভিদ।
 
প্রকৃতির এ অপার সৌন্দর্য যেখানে উদ্বেলিত, সেখানে না গিয়ে তো পারা যায় না। তাই সিলেটবাসী এক বন্ধুর আমন্ত্রণে সাড়া না দিয়ে পারলাম না।
 
শ্রীমঙ্গল শহরেই রিমার বাসা। গত শীতের ছুটিতে কোনো এক সোমবার রিমা, ইলমা আর আমি ভোর ছয়টায় রওনা দিলাম ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে। ৪০ মিনিট পর ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস আমাদের নিয়ে ছুটল শ্রীমঙ্গলের পথে। অনেক গল্প আর পথের সবুজের মায়া দেখতে দেখতে পাঁচ ঘণ্টা পর পৌঁছালাম শ্রীমঙ্গলে। সফিক আঙ্কেল (রিমার বাবা) আগে থেকে গাড়ি নিয়ে স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন। তাই বাকি পথের চিন্তা করতে হয়নি। যদিও স্টেশন থেকে রিমাদের বাড়ি খুব বেশি দূরে নয়। বাসায় ফিরে আমরা বিশ্রাম নিলাম। বেশ কিছুটা পথ আমরা ভ্রমণ করে এসেছি বলে খালা আমাদের সেদিন আর লাউয়াছড়ার পথে যেতে দিলেন না। তাই আশপাশের জায়গাগুলো ঘুরে আমরা আবার বাসায় ফিরলাম।
 
পরদিন সকালে নাশতাপর্ব সেরে আমরা লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের উদ্দেশে বের হলাম। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এটি। আমাদের জন্য একটি গাড়ি আগে থেকেই ভাড়া করেছিলেন আঙ্কেল। ওটাতে চড়েই রওনা হলাম। তবে এখান থেকে অটোরিকশায়ও যাওয়া যায়। অল্পক্ষণ পরই আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের সেই কাক্সিক্ষত গন্তব্যে।
 
উঁচুনিচু টিলাজুড়ে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের গঠন। পাহাড়ি টিলার মাঝে দিয়ে এ বনে চলার পথ। বনের ভেতর দিয়েই বয়ে গেছে বেশ কয়েকটি পাহাড়ি ছড়া। তবে এসব ছড়ার বেশির ভাগই বর্ষাকালে পানিতে পূর্ণ থাকে। সামান্য যে কটি ছড়ায় শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে, সেসব এলাকায় বন্য প্রাণীদের আনাগোনা বেশি। প্রধান সড়ক ফেলে কিছুদূর চলার পরে ভেতর দিয়েই চলে গেছে ঢাকা-সিলেট রেললাইন। এর পরেই মূলত জঙ্গলের শুরু। মূল সড়ক ছেড়ে জঙ্গলের ভেতরে প্রবেশ করলে সাইরেনের মতো একধরনের শব্দ কানে আসে। এটি মূলত এ বনে থাকা ঝিঁঝি পোকার ডাক। উদ্যানে বেড়ানোর তিনটি পথ দেখতে পেলাম আমরা। উদ্যানের ভেতরে একটি খাসিয়া পল্লীও আছে।
 
প্রথম পথটির শুরু রেললাইন পেরিয়ে হাতের বাঁ দিক থেকে। পথের শুরুতে উঁচু গাছগুলোতে দেখা মিলতে পারে কুলু বানরের। নানা রকম গাছগাছালির ভেতর দিয়ে তৈরি করা এ পথে চলতে চলতে জঙ্গলের নির্জনতায় শিহরিত হবেন যে-কেউ। নির্দেশনা অনুযায়ী চলতে চলতে এই পথ শেষ হবে ঠিক শুরুর স্থানে। আর এক ঘণ্টার পথ হেঁটে একটু ভেতরে গেলে শুরুতেই চোখে পড়বে বিশাল গন্ধরুই, ঝাওয়া, জগডুমুর, কাঁঠালিচাঁপা, লেহা প্রভৃতি গাছ। পথের পাশে থাকা ডুমুরগাছের ফল খেতে আসে উল্লুক, বানর ও হনুমান ছাড়াও বনের বাসিন্দা আরও অনেক বন্য প্রাণী। মায়া হরিণ আর বন মোরগেরও দেখা পেলাম আমরা।
 
ঘুরতে ঘুরতে আমরা একসময় পৌঁছে গেলাম খাসিয়াদের বসতি মাগুরছড়া পুঞ্জি। এ পুঞ্জির বাসিন্দারা মূলত পান চাষ করে থাকে। ১৯৫০ সালের দিকে বন বিভাগ এ পুঞ্জি তৈরি করে। এসব আমরা জানতে পারলাম পার্কের মধ্যে থাকা তথ্যকেন্দ্র থেকে। পথেই দেখা মিলল বিশাল বাঁশ-বাগান। এখানে নানা ধরনের বানরের খেলা দেখে মজা পাবে যেকোনো পর্যটক। পথের শেষে দেখতে পেলাম বনের অন্যতম আকর্ষণ উল্লুক পরিবারের। এরা বনের সবচেয়ে উঁচু গাছগুলোতে দলবদ্ধভাবে বাস করে।
 
তথ্যকেন্দ্র থেকে জানা যায়, লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্কে রয়েছে ১৬৭ প্রজাতির গাছপালা। এর মধ্যে আছে সেগুন, গর্জন, চাপালিশ, ম্যানজিয়াম, ডুমুর প্রভৃতি। রয়েছে ৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ৬ ধরনের সরীসৃপ, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ২৪৬ প্রজাতির পাখি। এদের মধ্যে ভালুক, বানর, লজ্জাবতী বানর, হনুমান, ধনেশ, শ্যামা, অজগর, মেছোবাঘ, হরিণ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এই বন এতই ঘন যে মাটিতে সূর্যের আলো পড়ে না বললেই চলে। প্রকৃতির সব সৌন্দর্য উপভোগ করে আমরা ফিরলাম আগের পথেই। এ যাত্রা বেশ আনন্দেরই ছিল।
 
এ সংক্রান্ত সকল খবর
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com