রোববার,  ১৮ আগস্ট ২০১৯  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৯, ১৬:৫৮:১৮

ব্যক্তিজীবনে কতটা ভদ্র, মার্জিত ছিলেন হাশিম আমলা?

স্পোর্টস ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে গুডবাই জানিয়ে দিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার তারকা ব্যাটসম্যান হাশিম আমলা। বিশ্ব ক্রিকেট থেকে আরও এক নক্ষত্রের পতন হলো। ক্রিকেট মাঠে ভদ্র মার্জিত আচরণের জন্য ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ছিলেন এই ক্রিকেটার। শুধু মাঠের খেলায় নয়; ব্যক্তিগত জীবনেও আমলা একইরকম চরিত্রের। 'রংধনু তার রং হারাল' শিরোনামে আমলার চারিত্রিক দিক ফুটিয়ে তুলেছেন প্রোটিয়া দলের পারফরম্যান্স বিশ্লেষক প্রসন্ন আগোরাম।
তিনি লিখেছেন, 'বুঝতে পারছি না, কীভাবে আমার দেখা সেরা মানুষটির গল্প শুরু করব। গোটা দুনিয়া তাকে সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে জানে। কিন্তু আমার কাছে সে মানুষ হিসেবে আরও সেরা। তার বাসায় রাতের খাবারের সেই ঘটনাটা দিয়ে শুরু করতে পারি। সেদিন খাওয়া শেষ করে ভাবছিলাম প্লেটটা কোথায় রাখব। হাশিম আমলা হঠাৎ আমার হাত থেকে প্লেটটা নিয়ে নিল, খাবারের উচ্ছিষ্ট ময়লা রাখার ঝুড়িতে ফেলে প্লেটটা রাখল বেসিনে। ঘটনার আকস্মিকতায় অস্ফুট স্বরে প্রতিবাদ জানিয়ে কিছু বলতে যাব, তার আগেই সে বলল, 'আরে ভাই, আপনি আমার ঘরে এসেছেন। আপনি আমার ভাই। কিছু ক্ষেত্রে আমার ওস্তাদও। আপনাকে সম্মান করার সুযোগটুকু দিন।'
'পাঠকদের জন্য আরেকটি খাওয়ার ঘটনা বলতে পারি। বলা বাহুল্য যে, আমি ততটা পেটুক প্রকৃতির নই। সেদিন ওর বাড়িতে খেতে গিয়ে প্লেটের খাবার শেষ করতে পারছিলাম না। প্লেট ফেলে উঠে দাঁড়াব, এমন সময় হাশিম বলল, 'ভাই, খাবার নষ্ট করবেন না।' এরপর সে আমার প্লেটে খাবারের অবশিষ্ট অংশ নিজের প্লেটে নিয়ে খেতে শুরু করল। আমি আবারও হতবাক, সেদিন বুঝেছি ভালো মানুষ হয়ে উঠতে জীবনে কী কী পরিবর্তন দরকার। হাশিম এ ব্যাপারে আমার ওস্তাদ।'
'এবার একটি ক্রিকেটের গল্প বলা যাক। ২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ নির্ধারণী টেস্ট। আর আমাদের সামনে ছিল জিতলেই টেস্ট র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষে ওঠার সুযোগ। দিনের খেলার আরও ৩৮ ওভার বাকি ছিল। এর মধ্যে ১৪০ রানের মতো তুলতে পারলে লিড ২০০ হয়ে যাবে। জয়ের সুযোগও বাড়বে। সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, 'ভাই কী করব'? আমি বললাম, 'পাল্টা আক্রমণ কর'। কিন্তু মুখে বলা যত সহজ মাঠে করা তত সহজ নয়। মিচেল স্টার্কের নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়ার আক্রমণভাগ ছিল দুর্দান্ত। কিন্তু আমলা এত বেশি আক্রমণাত্মক ছিল যে একপর্যায়ে কোচ গ্যারি কারস্টেন (কোচ) এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল তাকে কী বলেছি!
আমি বললাম, 'কিছুই বলি নি'। কিন্তু গ্যারি আমার কথা বিশ্বাস করলে তো! গ্যারি একটু হেসে সত্যটা বলতে বলল। এরপর আর গোপন রাখিনি। গ্যারি আবারও হেসে বলল, 'হাশিম আজ অপরাজিত থাকলে তাকে বলবে কাল ধীরে খেলতে—ম্যাচে এখনো তিন দিন আছে। খেলা এত দ্রুত শেষ করার প্রয়োজন নেই।' দিনের খেলা শেষে হাশিম আমাকে বলল, 'ভাইজান, আপনি খুশি তো?' আমরা ওই ৩৮ ওভারে ২৩২ রান তুলেছি আর দ্বিতীয় দিন শেষে এগিয়ে ছিলাম ৩০০ রানে। আমি একটু মজা করেই বললাম, 'আপনার একটা ডাবল সেঞ্চুরি পাওনা আছে।' জানেন আমি এ কথা বলার পর সে কী বলেছে?
আমলা আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, 'একটা কথা মনে রাখবেন, জীবনে কখনো কিছু পাওনা থাকে না। পুরোটাই সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ। আমি ৪ রানে থাকতে একটি ডেলিভারি ব্যাটের কানায় লেগে স্টাম্পের খুব কাছ ঘেঁষে চলে যায়। দারুণ বল ছিল। আমি বোল্ড হতে পারতাম। অস্ট্রেলিয়ানদের উইকেটটা পাওনা ছিল। ওরা হয়তো ড্রেসিংরুমে আমার ভাগ্য নিয়ে আলোচনা করছে। আমি ১৯২ রান করেছি, যা পাওনা ছিল এটা তার চেয়েও বেশি। এ কারণে আমি যে রান করেছি তা নিয়েই কৃতজ্ঞ। সব সময় সন্তুষ্ট থাকুন।’
আমি যেমন কখনো তাকে রাগতে দেখিনি, তেমনি গর্ব করতেও দেখিনি। এমনকি খুব ব্যক্তিগত পরিবেশেও নয়। কারণ সে অভিনেতা নয়; সে এমনই। ২০১২ সালে তার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়। প্রথম দেখাতেই আমাকে বলে, 'একটু সাহায্য করবেন?' আমি বললাম, 'আপনি জীবনের সেরা ফর্মে, কী আর সাহায্য করতে পারি?' সে বলে, 'না, না, আমি সিরিয়াস। কেউই নিখুঁত নয়। সবশেষ সিরিজে আপনার বিশ্লেষণ আমার ভালো লেগেছে। আমি আরও শিখতে চাই। পেসারদের ভালো খেলছি কিন্তু হরভজন সিংকে সামলাব কীভাবে? সে এ উইকেটে বাউন্স পাবে।'
'এভাবে সময় গড়িয়ে আমরা ঘনিষ্ঠ হয়েছি। প্রায় প্রতি রাতেই সে আমার কামরায় এসে চা খেত, ক্রিকেট কিংবা যা ভাবছে তা নিয়ে আলাপ করত। পছন্দের ভাত ও রুটি খেতে পারছি না বুঝতে পারলে আমাকে সে তার বন্ধুর বাসায় নিয়ে গিয়ে খাওয়ার ব্যবস্থা করত। আমি এসব কিছুই মিস করব। খাওয়া-দাওয়ার আরেকটি গল্প আছে যা সবার সঙ্গে ভাগ করতে চাই। এটা ছিল ২০১৫ সাল, বেঙ্গালুরুতে ঝুম বৃষ্টিতে ভেসে গেছে টেস্টের চার দিন। আমি সব সময় টিম হোটেলেই থাকি। এমনকি আইপিএলেও বাড়িতে যাই না। কিন্তু আবহাওয়া এমন ছিল যে টিম ম্যানেজমেন্ট থেকেই বাসায় যেতে বলা হলো।'
'হাশিমসহ আরও কয়েকজনকে বাসায় নিয়ে যেতে চাইলাম, কিন্তু আমি যে ফ্ল্যাটে থাকি সেখানকার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন নিরাপত্তাকর্মীরা। তাই আমি একাই যাই। সেদিন বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ইমরান তাহির ও এক নিরাপত্তাকর্মী নিয়ে দরজায় হাজির হাশিম। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। ঘরে চারজন মানুষের বসার মতো ব্যবস্থাও ছিল না। শুধু একটাই সোফা। হাশিম ভেতরে ঢুকে মেঝেতে বসে পড়ল। তাকে মানা করতেই বলল, 'আপনার ঘরের মাপ নিতে এখানে আসিনি। ভালোবাসা থেকে এসেছি। আপনি আমার ভাই। দয়া করে এক পেয়ালা মসলা চা দিন।'
 
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com