মোদি শাসনে ভারতের ‘নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতন্ত্র’

নরেন্দ্র মোদি

নরেন্দ্র মোদি

বর্তমান বাজার অর্থনীতির যুগে পুঁজির বিশ্বব্যাপী মন্দায় বিভিন্ন দেশে উগ্র-ডানপন্থার উত্থান ঘটতে দেখা যাচ্ছে। এর মাঝেও উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটে জয়ী নেতাদের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা সীমিত থাকতে বাধ্য হয় সাংবিধানিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কারণে কার্যকর সংসদ, মুক্ত গণমাধ্যম, স্বাধীন কর্ম কমিশন ও স্বাধীন বিচার বিভাগ। 

তবে ভারতে নরেন্দ্র মোদি শাসনের ছয় বছরে এর পুরোপুরি বিপরীত এক চিত্র উঠে আসে। সেখানে গণতন্ত্রের মানে দাঁড়াচ্ছে- পাঁচ বছরের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। ভোটে নির্বাচিত নেতা যেন সব বিচারের ঊর্ধ্বে- যা চান, তা-ই করতে পারেন! 

সীমিত পরিসরে হলেও যেটুকু দায়বদ্ধতা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো তুলে ধরতো, সেটুকুও এখন আর কার্যকর থাকছে না। ফলে ভারত ক্রমেই ‘নির্বাচন সর্বস্ব গণতন্ত্রে’ পতিত হচ্ছে।

ভারতীয় ইউনিয়ন গঠনের শুরু থেকেই বহু মত, বহু পথের কথা বলা হয়। জওহরলাল নেহরু, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, এমনকি ইন্দিরা গান্ধীও প্রথমদিকে লোকসভা বা রাজ্যসভায় নিয়মিত বিতর্কের মধ্যে পড়তেন। বেসামরিক নিয়োগ ও বিচার বিভাগ অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা সম্ভব হয়। মিডিয়ায় ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতাও ছিল। 

তবে ১৯৬৯ সালে কংগ্রেসে ভাঙনের পর তৎকালীন ইন্দিরা গান্ধী সরকার বিচার বিভাগ ও আমলাতন্ত্রের আনুগত্য নিশ্চিত করতে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ  করেন। এ সময়ে পার্লামেন্টের গুরুত্ব কমতে শুরু করে, পত্রিকার মালিক ও সম্পাদকদের প্রতি হুমকি আসতে শুরু করে। ইন্দিরা গান্ধী একইসঙ্গে পার্টির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকেও নস্যাৎ করেন। কংগ্রেস পরিণত হয় এক ব্যক্তির, অথবা এক পরিবারের দলে।

১৯৭৫ সালের জুন থেকে ১৯৭৭ সালের মার্চ পর্যন্ত ভারতজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। তবে ১৯৭৭-পরবর্তী সময়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বহু সাহসী পদক্ষেপ দেখা যায়, যা গবেষক রবিন জাফরির ‘ইন্ডিয়াস নিউজপেপার রেভলিউশন’ বইয়ে লিপিবদ্ধ আছে। তখন দল নির্বিশেষে রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতি ও অপরাধ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতে শুরু করে বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিন। 

পার্লামেন্টেও বিতর্ক শুরু হয়; বিচার বিভাগও সরকারি দলের অধীনস্ততা কাটিয়ে উঠে অনেকাংশেই; কিন্তু আমলাতন্ত্র সে অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বেসামরিক চাকরিতে নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়া দক্ষতার ভিত্তিতে নয়, ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আনুগত্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে থাকে। 

তবে ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচন ছিল ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য এক মাইলফলক। এনডিটিভি অনলাইনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ভারতীয় ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ প্রধানমন্ত্রী মোদির ক্ষমতা চর্চাকে তুলনা করেছেন ইন্দিরা গান্ধীর সবচেয়ে নির্মম জরুরি অবস্থার সঙ্গে। এর আগে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়েই মোদি এর এক ঝলক দেখিয়েছেন। কাঠামোগত প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধীনস্ত রাখতে ইন্দিরা গান্ধীর চেয়েও বেশি মরিয়া তিনি। ইন্দিরার মতো মোদিও চান মিডিয়া দিনভর শুধু তারই গুণকীর্তন গাইবে, আর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিষোদ্গার ও তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করবে। 

একইভাবে তিনি বিচার বিভাগকেও নিয়ন্ত্রণে এনেছেন; পার্লামেন্টে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংবিধান সংশোধন করেছেন এবং বিভিন্ন বিতর্কিত আইন প্রবর্তন ও পরিবর্তন করেছেন; গবেষণার বিষয়ে পরিবর্তন এনেছেন; স্কুল-কলেজের সিলেবাস পরিবর্তন করেছেন। 

শুধু তা-ই নয়, এতদিন যেসব প্রতিষ্ঠান অনেকাংশেই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ছিল, সেগুলোও তিনি ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে- সেনাবাহিনী, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও নির্বাচন কমিশন। 

পার্টি, সরকার ও রাষ্ট্রে নিজের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য মোদির পাশে রয়েছেন তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোগী, গুজরাটের অমিত শাহ, যিনি এখন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পার্টি ও সরকারকে অবিচ্ছেদ্য করে ফেলা এবং সরকারের ভেতরে ও বাইরে যত বিরোধী মত আছে, তার সবকিছু খারিজ করতে অমিত শাহ বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন; যেখানে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাই সরকারের ইচ্ছা, সরকারের ইচ্ছাই পার্টির এবং পার্টির ইচ্ছাই রাষ্ট্রীয় আকাক্ষায় পরিণত হয়। 

এছাড়াও বিভিন্ন বিধানসভার বিধায়কদের (এমএলএ) কিনে নিয়ে বিরোধী দলের সরকার পতন ঘটানোর অভিযোগও রয়েছে মোদি-শাহ জুটির বিরুদ্ধে। এর আগে গোয়া, মণিপুর, কর্নাটক, মধ্যপ্রদেশসহ বিধানসভা ও লোকসভায় বিরোধী নির্বাচিতদের মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে দলে ভেড়ানোর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এবার একই সংকটে পড়েছে রাজস্থান বিধানসভা। এসব জায়গায় নেতারা  মোদি বা তার ধারণ করা হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শকে ভালোবেসে বিজেপিতে যুক্ত হচ্ছেন না। এখানে অর্থের পরিমাণটাই শেষ কথা যা সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারণাকেই ব্যর্থ করে দেয়। 

রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী আশোক গেহলট অভিযোগ করেন, কংগ্রেসের একেকজন এমএলএ’র জন্য বিজেপির বরাদ্দ ২৫ কোটি রুপি। মধ্যপ্রদেশ ও কর্ণাটকেও প্রায় একই পর্যায়ের লেনদেন হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এখন প্রশ্ন হলো- এত অর্থ এলো কোথা থেকে? যে নির্বাচিত বিধায়করা এখনো বিরোধী শিবিরে রয়েছেন, তারাও কি যেকোনো সময়ে বিক্রি হয়ে যেতে পারেন? তাহলে কথিত অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের মানেটা কি দাঁড়াচ্ছে? ভোটারদের ভোটের মূল্যায়নটাই বা কোথায় হলো? এসবের মধ্য দিয়ে কার্যত ভারতের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর, অথবা দলীয়করণের মাধ্যমে ‘এক ব্যক্তি, এক পার্টি, এক দেশ, এক নীতি’র ধারণাই প্রবর্তন করা হচ্ছে বলে মত বিশ্লেষকদের। 

এ প্রসঙ্গে ভারতীয় ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ বলেন, ভারত ক্রমেই ‘নির্বাচন সর্বস্ব গণতন্ত্রে’ পতিত হচ্ছে। মোদিকে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে মেলানো যায়। তবে তাদের মধ্যকার পার্থক্যগুলো আমলে নেয়াও জরুরি। ইন্দিরা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আহত করেছেন; কিন্তু মোদি সেগুলোকে তরবারি দিকে খণ্ডিত করেছেন। জরুরি অবস্থার সময়েও ইন্দিরার কর্মকাণ্ড নিয়ে দ্বিতীয়বাদ ভাববার অবকাশ ছিল; কিন্তু মোদির ক্ষেত্রে কোনো ভিন্ন চিন্তাই প্রায় অসম্ভব। ইন্দিরা ধর্মীয় বহুত্বের পক্ষে ছিলেন; অপরদিকে মোদি যেমন কর্তৃত্ববাদী, তেমনি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী।

মোদি শাসন প্রসঙ্গে রামচন্দ্র গুহ আরো বলেন, ভারতীয় গণতন্ত্রের নৈতিকতা ও প্রতিষ্ঠানগুলো ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতাসীন থাকার সময়ে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর ধীরে ধীরে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সে ক্ষত সেরেছে। ভারতীয় সংবিধান নির্মাতাদের চিন্তার মতো না হলেও ১৯৮৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়কালকেও মোটা দাগে গণতান্ত্রিকই বলা যায়। যদিও এটি ত্রুটিপূর্ণ ও প্রকৃত গণতন্ত্র নয়। তবে  মোদির শাসনামলে ভারতীয় গণতন্ত্রের নৈতিকতা ও প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে আক্রান্ত হয়েছে, সে ক্ষত আদৌ সারানো সম্ভব কি না, এটি এক খোলা প্রশ্ন হিসেবেই থাকছে।’

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh