সরাইলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অতিমাত্রার ধর্মান্ধতা

নাসির উদ্দীন।

নাসির উদ্দীন।

এ কোন সরাইল? 

সরাইল নিয়ে আমি এখনো ধন্দে আছি। ঘটনার পর থেকে কিছু লেখার তাগিদ পাচ্ছিলাম ভেতর থেকেই। কিন্তু কি লিখবো? যে সরাইল আমার আত্মার অংশ, তার রক্তক্ষরণ যে মেনে নিতে পারছিনা।

পূর্ববঙ্গের বৌদ্ধধর্মের সূতিকাগার, বারো ভূঁইয়া নেতা ঈশা খাঁ, বৃটিশ বিরোধী নেতা বিপ্লবী উল্লাস কর দত্তসহ অসংখ্য মহাপ্রাণের জন্মদায়িনী এই সরাইল। ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অঞ্চলের নাম সরাইল। গর্বের এ অঞ্চলটির বর্তমান পরিচয় আমাকে মর্মাহত করেছে।

প্রাচীন তথ্য উপাত্ত থেকে আমার যেটুকু জানা, বৌদ্ধ ধর্মই ছিল পূর্ববঙ্গ বা এতদঞ্চলে বসবাসকারীদের প্রথম ধর্ম। আর সরাইল ছিলো বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের প্রধান কেন্দ্র। সেটির বয়সও আড়াইহাজারের বেশি। সে বিচারে সরাইল অবশ্যই একটি প্রাচীন জনপদ।

সরাইলে আর্যদের আগমন ঘটেনি বলে শুরুতে এখানে বৈদিক সনাতন ধর্ম ভিত্তি পায়নি। তবে ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধরা যখন হিন্দুদের দ্বারা বিতাড়িত হয়েছিল, তখন সরাইলের বৌদ্ধরাও বিতাড়িত হয়। এরপর থেকে এ অঞ্চলের মানুষ (সনাতন) হিন্দু ধর্মাবলম্বী হয়ে উঠে। ৮শ থেকে ১২শ সাল পর্যন্ত সরাইল হয়ে উঠে একচ্ছত্র হিন্দু অঞ্চল। সমতট, হরিকেল এবং ত্রিপুরার প্রাথমিক ফাঐ বংশের পর সরাইলসহ পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকা সেন রাজত্বের অধীনস্ত হয়। 

কর্ণাটক থেকে আসা সেন বংশের শাসকরা বাংলা দখলের সময়কালে সরাইলসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকা তাদের দখলে চলে যায়। সেন রাজত্বকালেই সরাইল এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের নৈতিক পতন হয় সবচেয়ে বেশি। সেন শাসকরা মনে করতো এতদঞ্চলের মানুষ মূর্খ। এরা হিন্দু ধর্মের অনিষ্ট করছে। এদেরকে ব্রাহ্মণ্যবিদ্যায় শিক্ষিত করতে হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কান্যকুজ্ব থেকে একদল ব্রাহ্মণকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এনে বসতি করে দেয়া হয়। সেই ব্রাহ্মণদের বাড়ি থেকে এই অঞ্চলের নাম হয়ে যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

সেন বংশের শাসকরাই স্থানীয় হিন্দুদের নানা জাতপাতে বিভক্ত করে দেয়। স্থানীয়দের মধ্য থেকে তৈরি করা হয় উঁচু জাতের ব্রাহ্মণ। এরপর থেকেই শুরু হয় উঁচুনিচু ও নানান অছ্যুৎ সব ধারণার। সরাইল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্বজাতির হিন্দুরা উচু বংশের উপাধি পেয়ে কথিত নিম্নবর্ণের উপর কতৃত্ব শুরু করলে শুরু হয় বিপত্তি। স্থানীয়রা চাপিয়ে দেয়া এই ব্রাহ্মণদের মেনে নিতে চায়নি। কিন্তু ততোদিনে পুরো সরাইল ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে গড়ে উঠে একদল শক্তিশালী শিক্ষিত জমিদার শ্রেণি।

ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির হাতে লক্ষ্মণ সেনের পতনের পর বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের মতো সরাইল অঞ্চলের সাধারণ হিন্দুরা প্রতিশোধ প্রবণ হয়ে অধিক সংখ্যায় ধর্মান্তরিত হতে থাকে। এ ধারা চলে মোগল, বৃটিশ ও পাকিস্তান আমল পর্যন্ত। একইসাথে তখন থেকেই এই এলাকায় ইসলামিক আধ্যাত্মিক চিন্তাধারারও ব্যাপক বিকাশ ঘটে।

এ সময়কালেই ইয়েমেন ও আরব অঞ্চল থেকে অনেক বহিরাগত মুসলমান সরাইল অঞ্চলে বসতি গড়ে তুলে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। এজন্য রুকনউদ্দিন আনসারী (রঃ), আয়েৎউল্লাহ শাহ (রঃ), আবদুল গফুর শাহ (রঃ), আল্লামা মোহাম্মদ আলী (দাঃ), মাওলানা এরশাদুল ইসলাম (রঃ), আযুদুদ্দীন মুহম্মদ আযুদসহ অনেক ইসলামি চিন্তাবিদকে আমরা দেখতে পাই সরাইলে বসবাস করে বিখ্যাত হয়েছেন। বাংলার বারো ভুঁইয়াদের নেতা ঈশা খাঁর জন্মও হয়েছিল এই সরাইলের মাটিতেই।

বৃটিশ শাসনামলে ১৮৩১ সালে সরাইল পরগণা ত্রিপুরা জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। তখন থেকেই এতদঞ্চলে বিশেষ করে হিন্দুদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষাদীক্ষার প্রসার ঘটে। ইংরেজি শিক্ষায় সরাইল অঞ্চল এতটাই সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল যে সরাইলের বিখ্যাত গ্রাম কালিকচ্ছতেই তখন একইসময়ে দুই শতাধিক গ্রাজুয়েটের বসবাস পাওয়া যেতো। শিক্ষার পাশাপাশি গড়ে উঠেছিল শিল্পকারখানাও। কালিকচ্ছ গ্রামে ঢাকার মসলিনের সমতুল্য ‘তনজেব’ নামের কাপড় তৈরি হতো। দেয়াশলাই কারখানা ও কাপড়ের কল স্থাপন করে ইতিহাস বিখ্যাত হয়ে রয়েছেন মহির্ষী মহেন্দ্র নন্দী। কালিকচ্ছ গ্রামে সেসময় সিনেমা হলও ছিলো।

‘কালিকচ্ছ’ ভারতবর্ষের ইতিহাসেই এক স্বর্নোজ্জল নাম। বহু জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি জন্মেছেন এ গ্রামে। বৃটিশবিরোধী বিপ্লবী ক্ষুদিরামের প্রধান সহচর হ্যান্ড গ্রেনেডের উদ্ভাবক এবং এ অপরাধে আন্দামানে নির্বাসিত হওয়া উল্লাসকর দত্তের জন্মভূমি কালিকচ্ছ। তাঁর পিতা পন্ডিত দ্বিজদাস দত্ত ছিলেন কৃষিবিদ্যায় ডিগ্রিধারী ভারতের প্রথম বিলেতফেরত বিশেষজ্ঞ। ব্রিটিশ সরকারের ম্যাজিস্ট্রেট এবং শিক্ষক হিসেবে ইতিহাসপ্রসিদ্ধ ছিলেন তিনি। ইতিহাসখ্যাত নন্দী পরিবারের অবদান তো বিশ্বমাপের। বিশেষ করে ব্রাহ্মধর্মজাত ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’ সস্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজ আনন্দ (নন্দী) স্বামীর অবদান ছিলো যুগান্তকারী। যদিও এই স্বতন্ত্র শান্তিবাদী ধর্ম সম্পর্কে প্রচারণা খুবই সামান্য। এই নন্দী পরিবারের আরেক সন্তান বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্পের দিকপাল কথাশিল্পী জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী।

সরাইলে জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত ব্যক্তিদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। ইতিহাসবিদ কৈলাশ সিংহ, পন্ডিত শ্রীশচন্দ্র রায় বেদান্তভূষণ, বিজয়কৃষ্ণ সেন, কৃষ্ণানন্দ সেন আইসিএস, অঘোর সেন আইসিএস, কবি সুধীর দাস, অনন্দাচরণ গুপ্ত আইসিএস, সাহিত্যিক প্রফুল্ল রায়, সাংবাদিক বিধূভূষণ সেনগুপ্ত, বিপ্লবী ড. অবিনাশ ভট্টাচার্য, চুন্টা প্রকাশ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক অপূর্ব ভট্টাচার্য, ধনী ব্যাংকার মুত্তালাল সেন শর্মা, বহুভাষাবিদ ড. সমর সেন, বামপন্থী রাজনীতিবিদ দেওয়ান মাহবুব আলী, দানবীর ড. অবিনাশ চন্দ্র সেন, ইঞ্জিনিয়ার প্যারিমোহন গুপ্ত, চুন্টা বিদূষী কন্যা প্রতিভা সেন, সমাজসেবী ও রাজনীতিবিদ নমিতা সেন গুপ্তা, ছন্দবিশারদ প্রবোধচন্দ্র সেন, ফুটবলার ও মল্লযোদ্ধা গোবিন্দমোহন নাগ, অধ্যাপক আ.ম.ম.শহিদুল্লাহ, লেখক ও শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রাক্তন পরিচালক ড.শাহজাহান ঠাকুর, রাজনীতিবিদ আবদুস সামাদ এডভোকেট, অধ্যক্ষ শেখ মোঃ আবু হামেদ, রাজনীতিবিদ সাংসদ জিয়াউল হক মৃধা, কবি রবীন্দ্র গোপ, শিশুসাহিত্যিক হিমাদ্রিশেখর সরকার, সংগীতজ্ঞ ও সাধক দেওয়ান রামদুলাল নন্দী, সংগীতজ্ঞ সুকুমার রায়, চিত্রাভিনেতা মুরাদ, নাট্যাভিনেতা আল আমীন শাহীন, গিরিশৃঙ্গ বিজয়ী স্বপ্না নন্দী, রাজনীতিবিদ, লেখক ও সাংবাদিক তাহের উদ্দিন ঠাকুর, ব্যাংকার নরেন্দ্রচন্দ্র দত্ত, আইস স্কার্ভিং ডিজাইনার মোঃ সফরউদ্দিন সোহেল, শিশুচিকিৎসক ডা: অভিজিৎ সিংহ রায়, সাংবাদিক, প্রেসমালিক ও ত্রিপুরা হিতৈষী পত্রিকার প্রকাশক গুরুদয়াল সিংহ, সাংবাদিক আহমেদুর রহমান, সাংবাদিক ও আমোদ সম্পাদক ফজলে রাব্বী প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

সরাইলের চুন্টা গ্রাম থেকে প্রকাশিত হতো ‘চুন্টা প্রকাশ’। এছাড়া সরাইল থেকে একাধিক সংবাদপত্র প্রকাশের ঘটনা তৎকালীন ভারতবর্ষের আর কোথাও দেখা যাবে না। সরাইলের ‘গ্রে হাউন্ড’ কুকুরের সুনাম ছিলো বিশ্বব্যাপী। দর্শনীয় স্থান হিসেবে প্রাচীন মসজিদ, মন্দির, সেতু, দিঘি, সমাধি, নারায়ণ মূর্তি সরাইলের সুবর্ণ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।

এদিকে ১৮৩১ সালে সংঘটিত বালাকোট যুদ্ধে শিখদের হাতে মুসলমাদের পরাজয়ের পর ১৮৫৭ সালে দিল্লিতে সিপাহী বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। এ বিদ্রোহের ঘটনায়ও মুসলমানদের পরাজয় এবং ব্যাপকহারে মুসলিম হত্যার ঘটনায় গোটা ভারতবর্ষের মতো সরাইলের মুসলমানদের মধ্যেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদের ঘটনা ঘটে। সিপাহী বিদ্রোহের ১০ বছর পর দিল্লির মুসলমানরা আবুল কাসেম নানুতুবির নেতৃত্বে ১৮৬৭ সালে উত্তর প্রদেশের দেওবন্দে গড়ে তুলেন জামিয়া ইসলামী কওমি মাদ্রাসা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুসলমান নেতৃত্বও তখন এই কওমি ধারাকে সমর্থন করে। 

সেই থেকে সরাইল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুসলমানদের মধ্যে কওমী ধারার জিহাদি মনোভাব প্রকটভাবে ক্রিয়াশীল। যদিও দেশের প্রায় ১৪ হাজার কওমী মাদ্রাসায় একই মনোভাবে শিক্ষিত হয়েছে ৪০ লক্ষ মুফতি, আলেম ও হাফেজ। এরমধ্যে ঢাকা চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগেই কওমী মাদ্রাসার সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি।

এতোকিছুর পরও আজকের সরাইলের চেহারা ইতিহাসের সেই সরাইলকে প্রতিনিধিত্ব করে না। এর অন্যতম কারণ হিন্দু মুসলমান অতি বিরোধের সূত্র ধরে সরাইলের সেইসব বিখ্যাত ব্যক্তিদের দেশত্যাগ। এতে এলাকায় ইংরেজি ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং অতিমাত্রায় ধর্মীয় শিক্ষা প্রাধান্য পায়। এতে স্থানীয় মুসলমান নেতৃত্ব ভারতের দেওবন্দী ধারার চিন্তার আরও ব্যাপক বিকাশ ঘটাতে সমর্থ হয়। সেই ধারা এখন সমাজ, পরিবার, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে আরও বেশি প্রভাবক এবং নিয়ামক। ফলে সংঘাত, সংঘর্ষ, হানাহানি ধর্মীয় উগ্রতা এই অঞ্চলটিকে গ্রাস করে ফেলেছে।

লেখাটি নাসির উদ্দীনের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে নেয়া হয়েছে।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh