গার্মেন্টস শিল্পের কাছে জাতির দেনা-পাওনা

মনজুরুল হক।

মনজুরুল হক।

বাংলাদেশে গার্মেন্ট সেক্টর নিয়ে বলতে গেলেই প্রথমে আসে এরা জাতীয় আয়ের এত পার্সেন্ট যোগান দেয়। ব্যাস। এবার এদের জন্য সাত খুন মাফ! কারণ সহজ। দুধ দেয়া গরুর লাথিও ভালো। বাংলাদেশের সরকারী কোষাগারে গার্মেন্ট সেক্টর কত টাকা দেয়, কিভাবে দেয়, মালিকরা কত টাকা মুনাফা তুলে নেয় তার সবিস্তার বর্ণনা এই লেখাটিতে দেয়ার চেষ্টা করেছি।

বাংলাদেশে প্রথম গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি স্থাপিত হয় ১৯৬০ সালে ঢাকার র্উদুরোডে যার নাম রিয়াজ গার্মেন্ট। প্রাথমিকভাবে রিয়াজ গার্মেন্ট এর উৎপাদিত পোশাক স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হতো। ইংরেজি ১৯৬৭ সালে রিয়াজ গার্মেন্ট এর উৎপাদিত ১০,০০০ পিস র্শাট বাংলাদেশ থেকে র্সবপ্রথম বিদেশে (ইংল্যান্ডে) রপ্তানি করা হয়।

গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও গার্মেন্টস রপ্তানকিারক দেশ হিসাবে প্রকৃতপক্ষে ১৯৮১-৮২ সালে ০.১ বিলিয়ন টাকার রেডিমেড গার্মেন্টস রপ্তানি করে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের পদচারণা আরম্ভ হয়। উক্ত সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্টস শিল্পে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল না। অথচ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ১৯৯২-৯৩ সালে ১৪৪৫ মিলিয়ন ইউ.এস ডলারে উন্নীত হয়। এখনকার হিসাবটা এর চারগুন।

এরপর থেকে বাংলাদেশকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দিন দিন পোশাক রপ্তানির পরিমাণ বড়েইে চলেছে।

এখন প্রশ্ন হলো গার্মেন্ট সেক্টরের প্রতি সরকারের বিশেষ নজর কেন? লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি? কোটি কোটি বৈদেশিক মুদ্রায় আয়? এটা যদি সত্যি ধরে নিতে হয় তাহলে প্রশ্ন উঠবে- লক্ষ লক্ষ প্রবাসী শ্রমিকের পাঠানো রেমিটেন্স তাহলে কোনো অবদান রাখছে না? সারা দেশে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প তাহলে কোনোই অবদান রাখছে না? গার্মেন্ট শিল্প কী এবং কীভাবে কতটুকু অবদান রাখছে তা নিয়ে বিস্তর লেখার অবকাশ রয়েছে। নিশ্চই এই শিল্প দেশকে অনেক দিয়েছে। তাই বলে বাকিরা কিচ্ছু না?

গার্মেন্টকে নিয়ে দেশে কি পরিমাণ আদিখ্যেতা দেখানো হয় তার কিছু নমুনা দেখা যাক:

শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধের কারণে গার্মেন্ট সেক্টরে লগ্নি করা ফড়িয়া পুঁজি রাতারাতি শ্রীলঙ্কা থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে বাংলাদেশে ঘাঁটি গাড়ে আশির দশকে। সে সময় এই অ্যাসেমব্লিং ইন্ডাস্ট্রিকে  ‘কাঙালের চোদ্দ আনা’ মনে করে ধূপ-ধুনো দিয়ে পূজো করা হয়েছিল। রাতারাতি বড় রাস্তার পাশে ভাঙ্গাচোরা ভবনে জানলা-দরজা লাগিয়ে ‘ফ্যাক্টরি’ করা হয়েছিল। মাত্র কয়েক বছরেই সেই ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা গার্মেণ্ট ইন্ডাস্ট্রি এদেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মাধ্যম হয়ে ওঠে। কলাগাছের মতো বেড়ে ওঠে একটি লুম্পেন প্যারাসাইট শ্রেণি। তাদের দাপটে এরপর ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, চট্টগ্রামে বিশেষায়িত অঞ্চলে গার্মেন্ট শিল্প গড়ে ওঠে। ততদিনে স্টাবলিস্ট হয়ে গেছে যে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে এই শিল্পই সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে। এবার আর তাকে পায় কে? গার্মেন্ট মালিকরা কিছুদিনেই এদেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তার আসনে বসে পড়েন।

সরকারের প্রায় এক তৃতীয়াংশ সদস্য কোনো না কোনোভাবে গার্মেন্ট সেক্টরের সঙ্গে যুক্ত। বিরোধীদলেও আনুপাতিক হারে এই সেক্টরের লোকজন ছড়ি ঘোরান। অর্থনীতিতে ‘অবদান’ নিশ্চিত হবার পর মালিকরা সঙ্গত কারণেই কৃতিত্ব দাবী করেন। সরকারও দ্বিধাহীন তাদেরকে কৃতিত্ব প্রদান করেন। এবার তারা রাজনীতিকেই নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন, এবং নিশ্চিতভাবেই সফল হন। প্রতি বছর নিয়ম করে আগুনে পুড়িয়ে স্টকলট ধ্বংস করার ভেতর শত শত হতভাগা শ্রমিককেও আত্মাহুতি দিতে হয়। নিয়ম করে জরাজীর্ণ ভবনগুলো এক সময় ভাঙ্গতে শুরু করে। ভবনের নিচে চাপা পড়ে প্রতি বছরই শ্রমিকদের করুণ মৃত্যু ঘটতে থাকে। আগুনে পোড়া, ভবনধ্বসে মৃত্যু, আগুন গুজবে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে মৃত্যু, বেতন নিয়ে দেন-দরবারের সময় পিটিয়ে শ্রমিক হত্যা, নারী শ্রমিককে ধর্ষন করা, শিশু শ্রমিককে শোষণ করা, বয়ষ্ক শ্রমিককে দাসের মতো ব্যবহার করা নিত্য নৈমিত্যিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।

মালিকগণ দেখায় একটা গার্মেন্ট কারখানা করতে কোটি কোটি টাকা লাগে। ডজন ডজন সরকারী দপ্তরে ঘুরে ঘুরে হণ্যে হতে হয়। আসলে কী কী লাগে?

মোটের ওপর লাখ পঞ্চাশেক টাকা লাগে। সেই টাকা দিয়ে এক খণ্ড জমি কেনা হয়। এরপর সেই জমি ব্যাংকে মডগেজ রেখে টাকা নিয়ে ভবন বানানো হয়। এবার ২২ টি দপ্তর থেকে পারমিশন। এইসব খাতে যে সরকারী ইতরের বাচ্চারা বসে থাকে তাদের ঘুষের চাহিদা মেটাতে হয়। শেষে পারমিশন মেলে। 

এবার মেশিন সাপ্লাই আসে বাকিতে। ফার্নিচারও বাকিতে। ব্যাংক থেকে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয় বিনে পয়সায়। ইন্ডেন্টর বা সাপ্লায়ার এজেন্ট বাকিতে ইন্ডেন্ট দেয়। জাহাজ ভাড়াও ব্যাংক দেয়। পোর্টে মালামাল আসলে সিএন্ডএফ এজেন্ট বাকিতে ক্লিয়ার করে দেয়। বাকিতেই গোডাউনে পৌঁছে দেয় ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি। ঠিক একইভাবে প্রোডাকশন শুরু হয়। মাস পুরো হ্ওয়ার আগেই এক্সপোর্ট শেষ হলে সেই আগের বাকি পদ্ধতিতে) ডকুমেন্ট রেডি করে ব্যাংকে জমা দিলে ব্যাংক টু ব্যাংক টাকাটা চলে আসে। সংক্ষেপে এই হলো পদ্ধতি। এর মধ্যে মালিকের টাকা কোথায়? তার বাপের টাকাই বা কোথায়? ব্যাংক যে পুরো প্রক্রিয়ায় ইনভেস্ট করে সেটা কার টাকা? ব্যাংকের বাপের? না। পুরোটাই জনগণের টাকা। 

এবার ওদের লাভের হিসাবটা দেখা যাক।

ওই যে প্রথমে এলসি করে ইম্পোর্ট করেছিল, সেখানে ওভার ইনভয়েসিং করে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ফ্যারিক্স আনে কারণ ডিউটি বা শুল্ক তো লাগছে না! সেই অতিরিক্ত ফ্যাবরিক্স খোলা বাজারে বিক্রি থেকে লাভ।

ফ্যাবরিক্সের কার্টন বেচা লাভ। সূতো-বোতাম বেচা লাভ। কিউসিকে দিয়ে বায়িং হাউস বায়ার ম্যানেজ করে সিএম বাড়িয়ে নেওয়ার লাভ। বিদ্যুৎ চুরির লাভ। শ্রমিককে বছরে পর বছর মাস্টার রোলে কাজ করিয়ে নেয়ার লাভ। কাস্টমসের ঘুষখোরদের ঘুষ দিয়ে বন্ডেড ওয়্যারহাউস ক্যাপাসিটি বাড়িয়ে নেয়ার লাভ। এরকম প্রায় ২৩/২৪ টা খাত থেকে লাভ তোলার পর এই মালিক মাত্র এক বছরেই আরও একটা কারখানা দিতে পারে। বেশির ভাগ সময় এরা সেই অতিরিক্ত লাভের টাকা সরিয়ে অন্য ফ্যাক্টরি দেয়। মানি লন্ডারিং করে। ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ দেয়। অর্থাৎ কোনোভাবে একটা গার্মেন্ট কারখানা রান করাতে পারলে একজন মালিক পরের বছর আর একটা কারখানা দেয়ার টাকা মজুদ করতে পারে।

এর মধ্যে আবার তাকে খসাতেও হয়। সরকারের হরেক কিসিমের ইতর হারামজাদাদের খাই মেটাতে হয়। ট্রেড লাইসেন্স থেকে ফায়ার লাইসেন্স পর্যন্ত ২৭ টি দপ্তরে শুয়োরের বাচ্চাদের টাকা দিতে হয়।

এবার দেখা যাক জিডিপির চাপাবাজি!

বলা হয় জিডিপিতে এই শিল্পখাতের অবদান ৬২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এরই মধ্যে দেশে প্রায় ২০ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে উঠছে। এসব এসএমই শিল্প জিডিপিতে ৪৫ শতাংশ এবং মোট শিল্প কর্মসংস্থানে ৮০ শতাংশ অবদান রাখছ। শিল্পমন্ত্রীর ভাষ্য- গত তিন বছরে বাংলাদেশে ৭ শতাংশেরও বেশি জিডিপি অর্জন করেছে। একই সঙ্গে বদৈশেকি মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ইউএস ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

এর মধ্যে আবার শুভঙ্করের ফাঁকিও আছে!

অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্স ও বিভিন্ন বায়ারদের উচ্চমাত্রার চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে বাংলাদেশে গত চার বছরে প্রায় ১২০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরো অনেকগুলো কারখানা বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে। গত বছর পোশাক শিল্পের রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমেছে রেকর্ড পরিমাণে, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।

শ্রমিকের সংখ্যা নিয়েও তালগোল আছে। কেউ সঠিক হিসাব জানে না।

২০১৪ সালে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছিলেন গার্মেন্ট শিল্পে ৪৫ লাখেরও বেশি শ্রমিক কর্মরত। এদিকে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু সংসদকে জানিয়েছেন, এই সংখ্যা ৩৫ লক্ষাধিক! -এখন ঠিক কতো কেউ জানে না!

আসুন ’ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ তত্ত্ব-তালাশ করা যাক।

এই তত্ত্বটি এতটাই শক্তিশালী যে তা কোনো রকম ফুয়েল ছাড়াই ঘন্টায় ৩শ কিলোমিটার গতিতে ছুঁটতে পারে! গার্মেন্ট মালিকরা সারাক্ষণই ষড়যন্ত্রের আতঙ্কে ভুগতে থাকে।

খবরে বলা হচ্ছে গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংসের দেশি-বিদেশি চক্রান্ত অব্যাহত রয়েছে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অপপ্রচার চলে আসছে। ভারত, ভিয়েতনামসহ অন্যান্য দেশের কাছে এ শিল্পকে তুলে দিতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল দেশে-বিদেশে ষড়যন্ত্র করছে। দেশের শ্রমিকদের উস্কে দেয়া, ট্রেড ইউনিয়ন করার চাপসহ বিভিন্নভাবে গার্মেন্টসে অসন্তোষ তৈরি করে ভাবর্মযাদা ক্ষুণ্ণ করার চষ্টো চলছ। 

পাশাপাশি বিদেশি বায়ারদের কাছে জঙ্গি হামলা বা নিরাপত্তার অজুহাত, কর্ম-পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ক্রেতা প্রতিষ্ঠান অ্যার্কড ও অ্যালায়ন্সে ছড়ি ঘোরাচ্ছে বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানার ওপর। 

আর এ কারণে ব্যাপক সাফল্যরে রকর্ড থাকলেও দীর্ঘদিন থেকে চরম অনিশ্চয়তা-উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন এ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা। গত দুই বছরে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ১ হাজার ৬৯৩টি কারখানা বন্ধ হয়ে গছে। এর মধ্যে বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত কারখানার সংখ্যা পাঁচ শতাধিক।

অনেক দিন ধরে অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল, এক বা একাধিক বিদেশি রাষ্ট্রের স্বার্থে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পকে ধ্বংস করার চক্রান্ত চলছে। তুলনামূলকভাবে অনুন্নত দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক আজ ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে শুধু প্রবেশ করেনি বরং শক্তভাবে আসন গেড়েছে।

আমেরিকার ওয়ালমার্ট, জেসি পেনি প্রভৃতি বিশ্ববিখ্যাত স্টোরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক স্বমহিমায় অবস্থান করছে। এসব জায়গা থেকে বাংলাদেশের আসন টলানো এত সহজ নয়। কারণ, একদিকে বাংলাদেশের শ্রমিক ও কারিগররা যেমন দক্ষতা অর্জন করছেন, তেমনি তাদের মজুরিও তুলনামূলকভাবে কম। যতোই দিন যাবে, ততোই তাদের দক্ষতা বাড়বে বৈকি কমবে না। বিশ্ব পরিমণ্ডলে এই খাতে বাংলাদেশের যে আপেক্ষিক প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ বা সুবিধা রয়েছে, সেখান থেকে তাকে সরানো যাবে না। আন্তর্জাতিক মন্দা আজ আমেরিকা, ইউরোপ এবং জাপানের অর্থনীতিতে প্রবল আঘাত হেনেছে।বাংলাদেশও সেই মন্দার হাত থেকে রেহাই পায়নি। তবে সেই আপেক্ষিক প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা থাকায় বাংলাদেশের এই খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এখনও দাঁড়িয়ে আছে। ইতোমধ্যেই বায়িং হাউজ থেকে ক্রয়াদেশ ১৫ শতাংশ নেমে গেছে। আরও নামবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠার জন্য গার্মেন্টস খাতের তরফ থেকে সরকারের কাছে প্রণোদনা প্যাকেজ চাওয়া হলেও সরকার দিয়েছে ইনসেনটিভ প্যাকেজ। তবে তা গার্মেন্টস সেক্টর পর্যন্ত পৌছায়নি।

বিজিএমইএ’র সভাপতি বলেছিলেন, এই শিল্পে শ্রমিকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। যেকোনো মুহূর্তে তা বিস্ফোরিত হতে পারে। গতকাল বৃহস্পতিবার তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে এ আশঙ্কার কথা জানান তিনি। বিজিএমই, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফেকচারার এন্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল ম্যানুফেকচারার্স এসোসিয়েশন (বিটিএমএ) যৌথভাবে এই সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে।

পোশাক খাতকে নিয়ে নানা অপতত্পরতা চলছে- এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন বুঝতে পারছি না যে, বিশ্ব অর্থনীতির এই সংকট কতোটা প্রকট ও প্রলম্বিত হতে পারে এবং যে সময় আমাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে সেই সময় একটি স্বার্থান্বেষী মহল এ শিল্পের বিকাশ রুখতে তত্পর হয়ে উঠেছে।’ এ স্বার্থান্বেষী মহল কারা- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তর বিজিএমইএ সভাপতি পরিষ্কার না করলেও এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারের বিভিন্ন বিভাগের কার্যক্রমে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

আজকে যে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার কথা শুনি সেটাই প্রথম নয়। এর আগেও বহুবার তাদেরকে প্রণোদনা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।

আরে বাবা এতই যদি মুমূর্ষূ হবি তাহলে মরিস না কেন? কেন তোদের প্রণোদনা দিয়ে, কোরামিন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়? কেন?

এটা দেশের প্রধান রপ্তানি খাত। বিপুলসংখ্যক শ্রমিক বিশেষত নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র এ খাত। শুধু দেশের অর্থনীতিতে নয়, সামাজিক অগ্রগতিতেও রয়েছে এর বিরাট অবদান। এ খাতকে যেভাবেই হোক সচল ও উৎপাদনমুখী রাখতে হবে। বস্ত্র খাতের বর্তমান বাজার সঙ্কুচিত হয়ে পড়লে প্রয়োজনে নতুন বাজার খুঁজতে হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বও কম নয়। বড় সঙ্কটে রয়েছে বস্ত্র খাতের গুরুত্বপূর্ণ স্পিনিং উপখাত। ৪০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হলেও এ খাত সরকারের সুদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত। খাতটি একটি অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন।

এরই মধ্যে আবার আমাদের বাজার নিয়ে ইউরোপ, আমেরিকা, ভারত, পাকিস্তান, চীন সবারই বেজায় আগ্রহ!

বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে সস্তা শ্রম এবং ইউরোপের বাজারে শুল্ক সুবিধার সুযোগ নিতে ভারতের পর এ খাতে পাকিস্তানের গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরাও বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। তবে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগে আপত্তি রয়েছে এই খাতের দেশীয় মালিকদের।

খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী বলছেন, বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখানে কোনো বাধা নেই। বাংলাদেশের মতো এমন মুক্তনীতি পৃথিবীর আর কোনো দেশে নেই। কারণ কি? এখানকার মতো এত সস্তা শ্রম বিশেষ আর কোথাও নেই। এখানকার মতো এমন পশুর মত আর কোনো দেশ শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করাতে পারে না।

বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতে বিদেশি মালিকদের হাতে গোনা কয়েকটি কারখানা থাকলেও পাকিস্তান এবং ভারতের অনেক শিল্পপতি বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিনিয়োগ বোর্ডের দেয়া তথ্য মতে, ৩৫টি ফ্যাক্টরিতে ভারতীয় টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ করেছে প্রায় ৮ কোটি ডলার। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে বাংলাদেশ ইউরোপের বাজারগুলোতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়। যা গতবার বন্ধ মহয়ে গেছে। কিন্তু ভারতকে শতকরা ৯ দশমিক ৬ ভাগ শুল্ক গুনতে হয়। সস্তা শ্রম ও শুল্ক সুবিধার জন্য ভারতীয়সহ সারা বিশ্বের ব্যবসায়ীরা এখানে বিনিয়োগ করেছে।

রেমিটেন্স

৮ বছর আগের একটা হিসাব। অর্থবছর শেষ হওয়ার প্রায় এক মাস বাকি থাকতেই প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ এক হাজার ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। একটি অর্থবছরে আহরিত রেমিট্যান্সের সর্বোচ্চ পরিমাণ এটি।

কে কত আয় করে দেখায়?

বাংলাদেশে এককভাবে প্রবাসী শ্রমিকেরাই সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে তারা সরকারিভাবে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা (পাঁচ বিলিয়ন ডলার) পাঠিয়েছে, যা ওই সময়ের বিদেশি সাহায্যের তিন গুণ এবং জিডিপির ৭.৭৩ শতাংশ। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে এ অঙ্ক প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা (ছয় বিলিয়ন ডলার) ছাড়ায়। বেসরকারি পথে হুন্ডি ইত্যাদি দিয়ে আসা টাকা যোগ করলে অঙ্কটা আরও বাড়ে। এবার ১৫ বছর পরে এসে হিসাব কষলে দেখা যাবে গার্মেন্ট সেক্টর নয়, প্রবাসী শ্রমিকরাই দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রেখে চলেছে।

প্রবাসীদের পাঠানো আয় (রেমিট্যান্স) দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মধ্যে রেমিট্যান্সপ্রবাহে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। এ খাত থেকে অর্জিত এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মোট আয়ের প্রায় অর্ধেকই বাংলাদেশের।

জাতিসংঘের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আঙ্কটাডের দ্য লিস্ট ডেভেলপড কান্ট্রিজ রিপোর্ট ২০১২ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

কিন্তু এ তথ্য দাবিয়ে রেখে ফাটানো হয় যে গার্মেন্ট মালিকেরাই সবেচেয়ে বেশি ডলার আনেন। গত বছরে গার্মেন্টস থেকে রেমিট্যান্স এসেছে সাত বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। এই টাকার অর্ধেকই আবার ওই শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাবদ বিদেশেই ফেরত যায়। 

এ ছাড়া শৌখিন ভ্রমণ ও বিলাসী দ্রব্য ক্রয়সহ বহু পথে ওই খাতের আরও টাকা দেশছাড়া হয়। তা বাদ দিলেও এ খাতে আমরা পাচ্ছি ৩.৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে প্রবাসী শ্রমিকদের থেকে এসেছে ৬.৪ বিলিয়ন ডলার। এর পুরোটা থেকে যাচ্ছে, খাটছে ও অর্থনীতির আকার বাড়াচ্ছে। অথচ গার্মেন্ট মালিকদের সর্বোচ্চ সুবিধা দেয়া হয়, আয়কর মওকুফ করা হয়, তাদের কারখানা পাহারা দেয় র‍্যাব, বিডিআর। 

আর্থিক মন্দার অজুহাতে তাদের আবদার মেনে ৬০০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়, দেয়া হয় জমি-ঋণ কত কী! অথচ বিশ্বমন্দার দিনে ক্ষতিপুরণ পাওয়ার হক দেশের গার্মেন্ট শ্রমিক আর প্রবাসী শ্রমিকদেরই বেশি। গার্মেন্টস খাতের এহেন কদর বিজিএমইএর জন্য। তাদের নিজস্ব বাহিনী পর্যন্ত আছে, আছে এমপি-মন্ত্রী, সরকার। দরিদ্র কিছু গ্রামীণ আত্মীয়-পরিজন ছাড়া প্রবাসী শ্রমিকদের আর কেউ নাই। তাই রক্ত-ঘাম পানি করেও তাদের সেবায় বরাদ্দ কেবল কাঁচকলা!

গার্মেন্ট সেক্টরে শ্রমিকদের প্রতি মালিকদের আচরণ কেমন?

প্রকৃতিতে ‘ন্যাচারাল সিলেকশন’ বলে একটা কথা আছে। মানুষের মৃত্যু এখন আর আমাদের পীড়িত তো করেই না, সমান্যতম ভাবিতও করে না। ‘র্যাব’, ‘চিতা’, ‘কোবরা’র ‘ক্রসফায়ারে’ আঁকাবাঁকা, ভেঙেচুড়ে, দুমড়েমুচড়ে মানুষ মরে। আর তা দেখে হাজার হাজার মানুষ আনন্দ মিছিল করে, মিষ্টি বিলায়! কামেলরা বলেন, 'হারামির বাচ্চাগুলো এমন সন্ত্রাস করেছিল যে তাদের মৃত্যুতে মানুষ হাফ ছেড়ে বেঁচেছে, তাই আনন্দ মিছিল'! মারহাবা! গার্মেন্টস কারখানায় একশ ষোল জন পুড়ে মরা কী খুব বড়ো কিছু? গত চার দশকে এই ফ্যাক্টরিগুলোতে কতো মানুষ পুড়ে মরেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। অনুমান করা যায় ছয় হাজার মানুষ আগুনে পুড়ে মরেছে। ভুল বললাম, পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। অপ্রশস্ত সিঁড়ি, প্রধান গেটে তিন-চার ধাপে তালাবন্ধ, শেকল দিয়ে সেই তালাকে আরো নিরাপত্তা দেয়া। 

আর সাভারের রানা প্লাজার ১১ হাজার তো বিশ্বে রেকর্ড করে আছে! অধিকাংশ কারখানায় ফায়ার স্কেপ সিঁড়ি নেই, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নেই। কোথাও নামকাওয়াস্তে দুএকটা ফায়ার এস্টিংগুইশার থাকলেও তা অচল। পানি নেই। আগুন নেভানোর অন্য কোনো ব্যবস্থাও নেই। শুধু যদি গেটের তালাটা খোলা থাকে, অথবা গেটে তালা না দেয়া থাকে তাহলে এই হতভাগাদের মৃত্যুটা এড়ানো যায়। 

কেন তা হয় না? কেন ব্যাংকে ভল্টের মতো নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা দরকার? না, ভয় আছে। পাছে শ্রমিকরা সুতো-বোতাম, টুকরো টাকরা কাপড় নিয়ে যায়! এই সকল অব্যবস্থা নিয়ে কম লেখালেখি হয়নি। এক একটা অগ্নিকাণ্ডের পর এক-দেড়শো মানুষ মরার পর বিস্তর লেখালেখি, আলোচনা, সেমিনার হযেছে। রেজাল্ট শূন্য। সেমিনারকারীদের, অথবা সরকারের এসব দেখভাল করা লোকদের কাঁচকলা দেখিয়ে আবারো সেই পূর্বাবস্থা বহাল। আবারো আগুন। আবারো মৃত্যু। অনিবার্য মুত্যৃ।

ডেভেলপমেন্ট এবং ডিজাস্টার নাকি হাত ধরাধরি করে আসে। যে যে কাজে দেশ-জাতির ডেভেলপমেন্ট হয় সেই সেই ডেভেলপমেন্টের দায় মেটাতে ডিজাস্টারও হয়। এবং তার নিশ্চিত বলি সাধারণ শ্রমিক। বিশেষ করে নারী এবং শিশু শ্রমিক। কেন একজন মালিক মরবে না? আজ পর্যন্ত কী কোনো একজন এমডি, ডিরেক্টর, পিএস, কমার্শিয়াল অফিসার মরেছে? না। কেন তারা মরবে না? দুর্ঘটনা তো জাতপাত বিচার করে আসে না, গরিব-ধনী দেখে না। তাহলে আজ অবধি কেন কোনো মালিক মরলো না আগুনে পুড়ে? 

সহজ উত্তর, মালিকরা পুড়ে মরার মতো জায়গায় থাকে না। তাদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে আগুন প্রবেশ করে না। কেবল অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত হাভাতে শ্রমিকরাই (নারী এবং শিশু) আগুনে পুড়ে মরার জায়গাতে কাজ করে। তাদের পুড়ে মরাটাই যেন নিয়তি। গার্মেন্টস নামক এই দর্জির কারখানাগুলো কোনো শিল্প নয় তাই এর নিট ফলাফল ক্যাশ কারেন্সি। হয়তো এর সহায়ক হিসেবে অন্যান্য অনেক কারখানা গড়ে উঠেছে। কিন্তু সবই ভাড়া বাড়ির মতো। 

দুমাসের নোটিশে ভাড়াটের মতো বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে এই বিনিয়োগ। এই সেক্টর দেশের অর্থনীতিতে কী পরিমাণে সত্যিকার অবদান রেখেছে তা পরিসংখ্যান সাপেক্ষ। কিন্তু এই সেক্টরের কারণে এ দেশে একটা নব্য এলিট শ্রেণি পয়দা হয়েছে, এবং তারা প্রয়োজনে বেশ্যার দালালের মতো উভয়পক্ষের মুনাফা লুটতে কুণ্ঠাবোধ করে না, এটা পরিসংখ্যান ছাড়াই বলে দেয়া যায়। 

আসলেই কি গার্মেন্টস খাত প্রধান আয়ের উৎস? কত টাকা বা কত ডলায় রেমিট্যান্স আসে এই খাত থেকে? আর সেসব রেমিট্যান্স প্রাপ্তির জন্য দেশ-জাতিকে কী কী খেসারত দিতে হয়? কোন কোন ক্ষেত্রে মূল্য দিতে হয়?

২ হাজার বা ৩ হাজার কোটি ডলার রেমিটেন্স! এই পুরো টাকাটা এসেছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স হিসেবে। এর বিপরীতে গার্মেন্টস খাত থেকে কী এসেছে? গার্মেন্টস থেকে রেমিট্যান্স আসে ১০ মিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। এই টাকার অর্ধেকই আবার ওই শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাবদ বিদেশেই ফেরত যায়। 

এ ছাড়া শৌখিন ভ্রমণ ও বিলাসী দ্রব্য ক্রয়সহ বহু পথে ওই খাতের আরও টাকা দেশছাড়া হয়। তা বাদ দিলেও এ খাতে আমরা পাচ্ছি ৫/৬ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে প্রবাসী শ্রমিকদের থেকে এসেছে ১০.৫ বিলিয়ন ডলার। এর পুরোটা থেকে যাচ্ছে, খাটছে ও অর্থনীতির আকার বাড়াচ্ছে। অথচ গার্মেন্ট মালিকদের সর্বোচ্চ সুবিধা দেয়া হয়, আয়কর মওকুফ করা হয়, তাদের কারখানা পাহারা দেয় র‍্যাব, বিজিবি, শিল্প পুলিশ। আর্থিক মন্দার অজুহাতে তাদের আবদার মেনে ৬০০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়, দেয়া হয় জমি-ঋণ কত কী! অথচ বিশ্বমন্দার দিনে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার হক দেশের গার্মেন্ট শ্রমিক আর প্রবাসী শ্রমিকদেরই বেশি।

গার্মেন্টস খাতের এহেন কদর বিজিএমইএর জন্য। তাদের নিজস্ব বাহিনী পর্যন্ত আছে, আছে এমপি-মন্ত্রী, সরকার। দরিদ্র কিছু গ্রামীণ আত্মীয়-পরিজন ছাড়া প্রবাসী শ্রমিকদের আর কেউ নাই। যে দেশের নাগরিকেরা বিদেশ-বিভুঁইয়ে হাজারে হাজারে অপঘাতে মরে, যাদের জীবন কেবলই ‘দাসজীবনের’ করুণ আখ্যান, সেই দেশ ও সেই রাষ্ট্র সার্বভৌম ও কার্যকর হয় কী করে? নাগরিকদের সঙ্গে এই শর্তেই রাষ্ট্রের চুক্তিবদ্ধ সম্পর্ক যে রাষ্ট্র সব নাগরিককেই সমান চোখে দেখবে এবং সবারই জীবনের সুরক্ষা, স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা এবং সম্পদ অর্জন ও জীবিকার নিরাপত্তা ।

বিশ্বব্যাংকের অভিবাসন এবং উন্নয়নবিষয়ক সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদনে তথ্য প্রকাশ করা হয়। ব্যাংকটি জানায়, উন্নয়নশীল বিশ্বের রেমিট্যান্সপ্রবাহ প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বেড়েছে। চলতি বছরে মোট ৪০ হাজার ৬০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স অর্জিত হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।

২০১৩ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল দেশগুলোর রেমিট্যান্স বাড়বে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০১৪ সালে ১০ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০১৫ সালে ১০ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত হবে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। সে হিসাবে ২০১৫ নাগাদ রেমিট্যান্সের পরিমাণ হবে ৫৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। উচ্চ আয়ের দেশগুলোসহ বিশ্বব্যাপী রেমিট্যান্সপ্রবাহ চলতি বছরে মোট ৫৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার এবং ২০১৫ নাগাদ তা ৬৮ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানানো হয়।

এই হচ্ছে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো টাকা আর গার্মেন্টস খাতের আয়ের গড় খতিয়ান। এই পরিমাণ টাকা পাঠানোর পরও কোনো প্রবাসী শ্রমিক বা তাদের কোনো সংগঠন (আসলে তাদের কোনো সংগঠন নেই) তাদের এই রেমিট্যান্স এর জন্য বড় গলা করে ফলাও করেনি। বুকে আঙ্গুল ঠুকে বলেনি যে তারাই দেশটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তারা কেবল দেশে ফেরার সময় বা বিদেশে যাওয়ার সময় বিমান বন্দরে তাদের সঙ্গে যেন মানুষের মতো আচরণ করা হয়। বলা বাহুল্য যে কখনোই এই শ্রমিকদের সাথে মানবিক দূরে থাকুক গৃহপালিত পশুর সঙ্গে মানুষ যে আচরণ করে সেটুকুও করা হয় না। এ নিয়ে লেখালিখি কম হয়নি, ফলাফল শূণ্য।

অথচ গার্মেন্টস খাতের তাবড় তাবড় নেতাদের হম্বিতম্বি দেখুন: ‘দেশে তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেছেন, এই শিল্পে শ্রমিকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে, যেকোনো মুহূর্তে তা বিস্ফোরিত হতে পারে।

এখন গার্মেন্টস খাত রপ্তানি দেখিয়ে যে বিদেশি মুদ্রা আয়ের খতিয়ান দেখান তার ভেতর যে আরও অনেক জারিজুরি আছে তা কি প্রকাশ্যে আনা হয়? নাকি হয়েছে কখনো? শুল্কমুক্ত আমদানি থেকে শুরু করে সরকারের হরেক রকম ইনসেন্টিভ এবং ব্যাংক-বীমাসহ আরও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের রেয়াত এবং কর, শুল্ক, আবগারি, অক্টর, ভ্যাট মওকুফের পরিমান এক করে সেই টাকা রপ্তানি আয় থেকে বাদ দিয়ে যদি নিট আয় দেখানো যায় তাহলে দেখা যাবে সবই শুভঙ্করের ফাঁকি। 

এই ফাঁকি চলে আসছে গত দুই যুগ ধরে, এবং তা সরকার তথা জনসাধারণের চোখের সামনেই। এটা একারণে করা হয় যাতে করে গার্মেন্ট খাতের সকল প্রকার মামদোবাজীকে যেন সরকার প্রোটেকশন দেয়। সরকারকে এটা বেশ ভালোভাবেই বোঝানো হয়েছে যে ‘গার্মেন্ট না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না’। তাই সরকারও দেশ বাঁচনোর গুরু দায়িত্বটা গার্মেন্ট বাঁচানোর সঙ্গে এক করে দেখে। আর সে কারণেই এই খাতের সামন্ত মানসিকতার লম্পট তস্করদের পাহাড়প্রমাণ অপরাধকে লঘু করে দেখা হয়। এদের কথা মত দেশের অনেক আইন-কানুনও পরিবর্তীত হয়ে যায়। এদের চুরি-চামারি জায়েজ করার জন্য ডজন ডজন ভাড়াখাটা বুদ্ধিব্যাপারি কোশেশ করতে থাকে প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়। তারপরও সরকার নিশ্চিন্ত হতে না পেরে এদের রক্ষার জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ গঠন করে। অথচ কারখানায় আগুন লাগিয়ে কলাপসিবল গেট বন্ধ করে যে মালিক প্রায় দেড়শো শ্রমিককে হত্যা করলো, প্রায় আড়াইশ শ্রমিককে চিরতরে পঙ্গু করে দিলো তাকে গ্রেপ্তার করা হয়না। তার বা তাদের কোনো শাস্তি হয়না। শ্রমিকের ন্যুনতম দাবীও মানা হয়না। শুধু পুড়ে কয়লা হওয়া শ্রমিকদের জন্য কুম্ভিরাশ্রু বিসর্জন করে লাখ খানেক টাকার মূলো ঝুলিয়ে দেয়া হয়। আর সে কারণে ওই হত্যাকারী মালিকের সঙ্গে সরকার তথা তাবত সুশীল শ্রেণী একই রকম অপরাধের ভাগিদার হয়ে ওঠেন।

গার্মেন্ট সেক্টর কি রাষ্ট্রের প্রতিভূ হয়ে উঠেছে?

আগে এই শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ হলে মালিক পক্ষ সেটার মোকাবেলা করতো। কখনো মালিকের ‘নিজস্ব’ লোকজন, কখনো মালিকের পোষা গুণ্ডাপাণ্ডা, আবার কখনো শ্রমিকদের মধ্যে থেকে বাছাই করা ভাড়াটে লোকজন দিয়ে সাধারণ শ্রমিকদের ‘শায়েস্তা’ করা হতো। তার পরও সে সময় মন্দের ভালো হিসেবে সরাসরি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হতো না বলে ক্যাজ্যুয়ালিটি কম হতো (আমরা এখন এই শ্রমিকদের রেগুলেশন মৃত্যু বা মৃত্যু মুখে পতিত হওয়াকে এক কথায় ‘ক্যাজ্যুয়ালটি’ বলি!)। কিন্তু গত পনের-কুড়ি বছর ধরে এবং বিশেষ করে শিল্প পুলিশ গঠন হবার পর থেকে গত কয়েক মাস ধরে এখানকার শ্রমিক অসন্তোষের গন্ধ পাওয়া মাত্র রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনী, র‍্যাব, বিজিবি, আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনী অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ দমনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। স্বাভাবিক ভাবেই নিরস্ত্র শ্রমিকদের ইট-পাটকেল, অগ্নি সংযোগের জবাব আসে বন্দুক থেকে। এবং খুবই স্বাভাবিক ভাবে এক একটা অসন্তোষে একাধিক শ্রমিকের মৃত্যু ঘটছে। শত শত শ্রমিক টিয়ার গ্যাস, লাঠি এবং বুলেটে আহত হচ্ছে।

একেকজন শ্রমিক নিহত হচ্ছে আর অসন্তোষের আগুনে যেন ঘি পড়ছে! মুহূর্তে সেই আগুন দাবানলে পরিণত হচ্ছে। রাষ্ট্রের বেতনভূক কর্মচারি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘জনগণের’ জান মালের নিরাপত্তা বিধানের ‘মহান ব্রত’ নিয়ে শ্রমিকদের উপর হামলে পড়ছে। এবারও সেই একই ভাবে আশুলিয়ায় ঘটনা ঘটেছে এবং এখনো ঘটে চলেছে। রাষ্ট্র মালিক পক্ষের হয়ে তার সশস্ত্র শক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে। এবং এক পর্যায়ে গার্মেন্ট অসন্তোষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে শ্রমিক-পুলিশ মরণঘাতী দাঙ্গা। এ যেন শ্রমিক অসন্তোষ দমন নয়, রাষ্ট্রের ভেতরেই ‘রাষ্ট্র বিরোধীদের’ দমন করা।

আর কত অন্যায়ের খতিয়ান দেয়া যায়! এই সেক্টরের জন্ম লগ্ন থেকে আজ অবধি এই সেক্টরে যতো শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে ততো জন শ্রমিকের বা সাধারণ মানুষের মৃত্যু আর কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বা মহামারিতে ঘটেনি। এখানে শ্রমিকরা আগুন লেগে পুড়ে মরে। বলা ভালো স্টক লট ‘ক্লিয়ার’ করার জন্য কারখানায় ঠাণ্ডামাথায় আগুন দেয়া হয়। দমকল বাহিনী বা আগুন নেভানোর উপকরণ যেন সময় মতো অকুস্থলে না পৌঁছাতে পারে সেই ব্যবস্থাও নেয়া হয়। সেই আগুনে পুড়ে তো শ্রমিক মরেই, সেই সাথে মরে সিঁড়ি দিয়ে হুড়োহুড়ি করে নামার সময়। দরজা খুলে বাইরে বেরুনোর সময়। কম বেতনে বিনা চিকিৎসায় মরা, সুপারভাইজারের আঘাতে মরা, অগ্নিভীতিতে মরা, গণধর্ষনের কারণে মরা, বেয়াদবি করার কারণে পিটুনি খেয়ে মরা, কম পয়সায় ট্রাকে চেপে বাড়ি ফেরার সময় ট্রাক উল্টে মরা, অবাধ্য হওয়ায় ভাড়াতে মাস্তানের হাতে মরা তো প্রায় নিয়মিত ঘটনা। এর সাথে আরও একটি ‘রুটিন মাফিক’ মরা হচ্ছে পুলিশ- র‍্যাব-বিজিবি’র বন্দুকের গুলিতে, রাইফেলের বাঁটের আঘাতে মরা, এবং ইদানিং যোগ হওয়া গুম হয়ে মরা।

গার্মেন্ট শিল্পে এক লাখ কোটি টাকা শুল্ক ছাড়! বাকি শিল্প কি দোষ করলো?

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তৈরি পোশাক শিল্পে গত বছরগুলোতে শুল্ক সুবিধার যে তুলনামূলক পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরি করেছে তা থেকে ভয়াবহ এক পরিসংখ্যান বেরিয়ে এসেছে! যখন থেকে দেশে এই তথাকথিত শিল্পের বিকাশ, সেই ১৯৮০-৮২ সাল থেকে কোনো প্রতিবেদন নাই। শুধু মাত্র গত ছয় বছরে (২০১‌২ থেকে) এই গার্মেন্ট শিল্প সরকারের দেয়া শুল্ক ছাড় পেয়েছে এক লাখ কোটি টাকা! অর্থাৎ এই শিল্পের জন্য আমদানি করা কাঁচামালের ওপর সরকার নির্ধারিত শুল্ক আদায় হলে সরকার যেমন গত ছয় বছরেই রাজস্ব আদায় করতে পারত এক লাখ কোটি টাকা। তেমনই যদি সেই ১৯৮২ সাল থেকে শুল্ক আদায় হতো তাহলে সেই অংক কোথায় গিয়ে ঠেকতো? শুধু যে শুল্ক ছাড় তা তো নয়। এর সঙ্গে আছে আরো অনেক ছাড়। এ শিল্প শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে পাচ্ছে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা। আয়করের ক্ষেত্রে পাচ্ছে কর অবকাশ সুবিধা। পাচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম সুদে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার সুযোগ। অনেক বছর ধরে পেয়েছে এবং এখনো কেউ কেউ পাচ্ছে নগদ অর্থ সহায়তা। বিদ্যুৎ বিলে ভর্তুকি, ইপিজেডে কারখানা থাকলে গাড়ি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ঋণ সুবিধা, ভ্যাট সুবিধা, বাড়ি ভাড়ায় ভ্যাট ছাড়, কোনো কারখানা অলাভজনক দেখালে সেখানে মিলছে রেয়াতি সুবিধা, সেই রুগ্ন কারখানা চালু করার জন্য দেয়া হচ্ছে ইনসেনটিভ সুবিধা, সার্কভুক্ত দেশসমূহে এই শিল্পের মালিকদের বিনা ভিসায় যাতায়াতের সুবিধাসহ আরো নানা রকম সুবিধা পাচ্ছে এ শিল্প। পোশাক শিল্পের মতো এত সুবিধা দেশের আর কোনো শিল্প ভোগ করে না। নানা রকম সুবিধা পেলেও টাকার অঙ্কে এ খাত কত সুবিধা পাচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব বর্তমান সরকারের কাছে নেই। আগের কোনো সরকারের কাছেও ছিল না।

এই যে সরকারের প্রতি বছর হাজার হাজার লাখ লাখ কোটি টাকা কর রেয়াত দিতে হচ্ছে, তার বদলে সরকার বা দেশ তাদের কাছ থেকে কি পাচ্ছে? হ্যাঁ, তারা অবশ্য জোর দিয়ে বলছেন, তারাই নাকি ৪০/৪৫ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান করে দিয়েছেন! তা বেশ। সেই যে ৪০/৪৫ লাখ শ্রমিককে তারা কি দিচ্ছেন? সর্বনিম্ন সাড়ে চার হাজার টাকা বেতন। ৮ ঘন্টার বদলে ১২ ঘন্টা, এমনকি কোথাও কোথাও ১৪ থেকে ১৬ ঘন্টা পর্যন্ত শ্রম শুষে নেয়ার বিনিময়ে মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা! এই টাকার চেয়েও বেশি আয় করে যে মেয়েরা বাসা বাড়িতে কাজ করে। এর চেয়েও বেশি আয় একজন রিকশা চালকের, একজন দিনমজুরের। তাদের সেই টাকা আয় করতে কোনো লেখাপড়া জানার দরকার করে না। 

কিন্তু এই গার্মেন্ট শিল্পে কাজের আগে অনেক অনেক পথ পরিক্রমা করতে হয় একজন শিক্ষানবীশ শ্রমিককে। গার্মেন্ট শ্রমিকরা যে পরিমাণ শ্রম দেয় তাতে তাদের বেতন হওয়া উচিত কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা। এবং সেটা প্রাথমিক কাজে যোগদানের পর থেকেই। অথচ এই শ্রমিকদের বেতন কেন সরকার ৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করল তা নিয়ে এই শিল্প মালিকরা সরকারকে একপ্রকার জিম্মি করে বেতন কমিয়ে সাড়ে চার হাজার করিয়েছে। এ ধরণের জিম্মিকরণ তো বটেই, এর চেয়েও মারাত্মক সব হঠকারিতা আছে এই শিল্পের মালিক শ্রেণীর। সরকারি খাস জায়গায় অবৈধভাবে বিশাল অট্টালিকা তুলে সেটা এখনো বহাল তবিয়তে খাড়া করে রেখেছেন এরা। বার বার রাজউক নামক সরকারি প্রতিষ্ঠান আদালতের অনুমোদন নিয়েও তাদের ভবন ভাঙতে পারেননি। যদিও পরে আদালতের নির্দেশে ভাঙতে হচ্ছে।

ইপিজেড-বহির্ভূত কম্পানিগুলো কাস্টমস শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট, অগ্রিম আয়কর ও রেগুলেটরি শুল্কসহ পাঁচ ধরনের শুল্ককর ছাড় পায় কয়েক হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে রপ্তানিমুখী নয়, পোশাক খাতের এমন শিল্পকে উল্লিখিত পাঁচ ধরনের শুল্ককর পরিশোধ করে পণ্য ছাড় করতে হয়েছে।

এসব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। উঠেছেও, কিন্তু এ নিয়ে সরকারের তরফে জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেই। বরং এই শুল্ক ছাড় নিয়ে বিজিএমইএর প্রাক্তন সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী পোশাক শিল্পকে দেয়া সুবিধাকে সুবিধা বলতে নারাজ। 

তিনি বলেন, ‘'আমাদের বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আনতে না দিলে আমরা কি শিল্প স্থাপন করতাম? এটাকে সুবিধা বলা হচ্ছে কেন?' এ খাত দেশের অর্থনীতিকে নতুন জীবন দিয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে এ শিল্প। এর কারণে বাংলাদেশে পাঁচতারা হোটেল ব্যবসা করছে। ব্যাংক বাড়তি মুনাফা করছে। ইনস্যুরেন্স কম্পানি সম্প্রসারিত হচ্ছে। মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়িয়েছে পোশাক শিল্প। সরাসরি হয়তো এ খাত কর দেয় না, কিন্তু এর সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন শিল্প, ব্যাংক, ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতরা যে কর দেয়, তা অন্যদের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করেছে পোশাক খাত। বিশ্ব পরিচিতিও এনে দিয়েছে।

কি অদ্ভুত বিশেষণ! বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করেছে পোশাক খাত! তা তো বটেই! সেই সঙ্গে এটিও সত্যি যে পোশাক শিল্পে যে পরিমাণ শ্রম শোষণ করা হয় তার জুড়ি বিশ্বের আর কোথাও নেই। সে দিক দিয়েও সালাম মুর্শেদীরা ‘ব্র্যান্ডেড’। তার ভাষ্য মনে গার্মেন্ট কারখানা চালু হওয়ার আগে এদেশে কোনো পাঁচতারা হোটেল ছিল না!

এর পরও তাদের দাবির শেষ নেই!

ভবনমালিক, ইউএনও, ইউপি চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য, ব্যাংক কর্তাসহ অন্যান্য বেশ কিছু স্টেক হোল্ডার। এই ঘটনার পর পরই বিদেশি ক্রেতার ‘রুষ্ঠ’ হয়ে ‘কমপ্লায়েন্স’ কারখানা নামক কুমিরছানা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে। তারা র‍্যান্ডম কারখানাগুলো তদারকি করে নিরাপত্তাসহ অন্যান্য বিষয়াদি পরীক্ষ-নিরীক্ষা করে ‘সেইফ’ সার্টিফিকেট দেয়। দেয় ‘কমপ্লায়েন্স’ সার্টিফিকেটও। এর পর মালিকগণ এই সার্টিফিকেট বাঁধাই করে নতুন ফর্মেটে নির্যাতন শুরু করে।

সারা দেশের সকল সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বেড়ে দ্বিগুণ হলেও গার্মেন্ট শ্রমিকের বেতন বাড়ে না। তাদের বেতনের কথা উঠলেই সারা দেশের সকল মহল শেয়ালের মত একসঙ্গে হুক্কহুয়া ডেকে শ্রমিকের বেতন বাড়লে কারখানা কিভাবে লোকসানে পড়বে সেই ‘মহাভারত’ বয়ান করেন। প্রায় সকল মিডিয়া নির্লজ্জের মতো মালিকের পক্ষে গিয়ে শ্রমিকরে রক্ত শোষায় মদদ দেয়। বাংলাদেশের গার্মেন্ট শ্রমিকদের মত এমন হতভাগ্য শ্রমিক আর কেউ নেই। আর কোথাও নেই। সমাজের সঙ্গবদ্ধ একটি শেণিও শ্রমিকদের পক্ষে দাঁড়ায় না। না সরকার, না বিরোধিদল, নাম সুশীল সমাজ, না সচেতন জনসাধারণ, কেউ না। কেন? তারা কি ভিন গ্রহ থেকে এসেছে? নাকি অস্পৃশ্য? তারা কি এদেশের মাটিতে জন্ম নেননি? তারা কি আমাদের কারো ভাই, কারো বোন, কারো সন্তান, কারো বাবা-মা নন? সম্ভবত নন। আর সে কারণেই শহুরে উঠতি ধনিক শেণি থেকে শুরু করে একেবারে সাধারণ মানুষও এই গার্মেন্ট শ্রমিকদের বিরুদ্ধে। এ এক অদ্ভুত বৈপরিত্য!

মালিকরা শ্রমিকদের রক্ত নিংড়ে নিয়ে দেশের সকল সুযোগ-সুবিধা আদায় করে, সকল ধরনের ইনসেন্টিভ নিয়ে, বিরাট বিরাট আর্থিক সহায়তা নিয়ে, ব্যাংকে গচ্ছিত জনসাধারণের টাকা মেরে, বিদেশি প্রভুদের সস্তা শ্রমের বাজার দেখিয়ে, সরকারের দালালি করে অনেকেই এখন এমপি হয়েছেন, মন্ত্রি হয়েছেন, মেয়র হয়েছেন। তারা এখন সরকারকে তাদের দাবী-দাওয়া মানতে ‘বাধ্য’ করতে পারেন। তাদের কথা ভেবেই সরকারকে পলিসি নির্ধারণ করতে হয়। দেশে-বিদেশে সুনাম কামিয়ে সেই মালিকদের অনেকেই তাদের শ্রমিকদের জীবন-যাপন উন্নত হয়েছে বলে গলা ফাটিয়ে লেকচার ঝাড়েন। সেসব লেকচার শুনে কি করা উচিত তা ভাবাই সার, কেননা কোনো সরকারই গার্মেন্ট মালিকদের চটায় না। কেন সেটা খুলে বলার দরকার হয় না। তাদের এত কিছু হয়, শত শত কোটি টাকা হয়। তারা এখন হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরেও বিনিয়োগের অনুমতি চায়। অথচ তাদের কারখানায় কাজ করা শ্রমিকদের জন্য সামান্য খাবারের জায়গা দিতে পারেন না! 

কিছুদিন আগে সামাজিক মাধ্যমে কয়েকটি ছবি ব্যাপক প্রচার হয়েছিল। ছবিতে দেখা যাচ্ছে জনা কুড়ি গার্মেন্ট নারী শ্রমিক একটি কারখানার সিঁড়িতে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছেন! ওই কর্মীদের খাবারের কোনো জায়গা নেই! এবার যুক্তিটুক্তি দিয়ে যদি বলা হয় যারা শ্রমিকদের এই অমানবিক ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করাতে বাধ্য করে তাদের ইনসেন্টিভ দূরের কথা, কারখানাই বন্ধ করে দেয়া উচিত। বিদেশিরা কেন কারখানা তদারকি করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করে সেটা বোঝার জন্য এই ছবিগুলোই যথেষ্ট। মালিকরা শ্রমিকদের উন্নত ব্যবস্থা দূরের কথা, সামান্য ভাত খাওয়ার জায়গা দিতে পারেন না, তাদেরকে একটুখানি মানবিকতার চোখে দেখতে পারেন না, তারা কি করে চান্দে চান্দে দাবীনামা পেশ করে? তাদের কি লজ্জা শরমও নেই? 

পোশাক খাত সর্বোচ্চ কর সুবিধা ভোগ করে। রপ্তানির সময় উৎসে কর হিসেবে মাত্র দশমিক ৮০ শতাংশ (০.৮০%) দিলেই সব ধরনের কর থেকে দায়মুক্তি সুবিধা পাচ্ছে পোশাক খাত। গত ২০১১-১২ অর্থ বছরে পোশাক খাতে কর আদায় হয়েছে মাত্র ৮৮৬ কোটি টাকা কিন্তু এর বিপরীতে একই অর্থবছরে রাষ্ট্রের কাছ থেকে ‘নগদ সহায়তা’ নিয়েছে এক হাজার ৪১২ কোটি সাত লাখ ৬০ হাজার টাকা। অন্যান্য কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো যে পরিমাণ কর দেয়, পোশাক কারখানার মালিক তার দশ ভাগের এক ভাগ কর দেয় না। এছাড়া বন্ড সুবিধার আওতায় প্রয়োজনীয় সুতা, কাপড়,কাঁচামাল, কার্টুনিং, প্যাকেজিং, এক্সেসরিজ আনতে কোনো শুল্ক মালিককে দিতে হয় না। এনবিআরের তথ্যানুযায়ী, পোশাক কারখানার মালিকেরা ২০০৭-০৮ থেকে ২০১১-১২ অর্থবছরের মোট এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার বন্ড-সুবিধা নিয়েছে অথচ এই বন্ড-সুবিধা না থাকলে সমপরিমাণ অর্থ শুল্ক-কর হিসেবে দিতে হতো। ২০০৪-০৫ অর্থবছর থেকে পোশাক খাতকে কোনো ধরনের মূল্য সংযোজন কর দিতে হয় না।

চার দশক ধরে পোশাক খাতকে কর অবকাশ সুবিধা (ট্যাক্স হলিডে) দিয়ে এই শিল্পটিকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। পোশাক খাতের মূলধনী যন্ত্রপাতি আনতে মাত্র ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক দিতে হয় আর অন্য খাতের যন্ত্রপাতি আনতে ৩ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। মালিকেরা ৭ শতাংশ হারে রপ্তানি ঋণ হিসাবে ব্যাংকের অর্থায়ন পান। এমনকি ‘এক্সপোর্ট রিটেনশন কোটায়’ রপ্তানি করে যতো ডলার আয় করেন, তার ১০ শতাংশ নিজের ব্যাংক হিসাবে রাখতে পারেন এবং এই অর্থ বিদেশে নিয়ে গিয়ে ইচ্ছেমত খরচও করতে পারেন।

বিদেশ থেকে কাপড় বা সুতা ক্রয় অথবা দেশের মধ্য থেকে তা সংগ্রহ করতে ‘ব্যাক টু ব্যাক এলসি’র আর্থিক নিশ্চয়তা নিশ্চিত করে স্থানীয় ব্যাংক। ‘ব্যাক টু ব্যাক এলসির সুদ গুনতে হয় ১৩ %, যেখানে অন্যান্য শিল্প খাতকে ১৭%-১৮% সুদ দিতে হয়। গার্মেন্টস মালিক অন্যান্য আনুষঙ্গিক উপকরণ (এক্সেসরিজ) আনতে মাত্র ৭ শতাংশ সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন। আবার ইসিসি বা এক্সপোর্ট ক্যাশ ক্রেডিটের (রপ্তানির জন্য নগদ ঋণ) নামে শ্রমিকের মজুরির টাকাও তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন। 

ব্যাংক খাতে যেসব বড় বড় অনিয়ম-জালিয়াতি হয়েছে, তার বেশির ভাগ ঘটনার কারণ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা অপব্যবহার করে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার। পোশাক খাত-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোই এসব জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ছিল।

গার্মেন্টস মালিক (প্রাক্তন মেয়র) আনিসুল হক গার্মেন্টস পল্লীর জন্য রাষ্ট্রের কাছে হাজার হাজার কোটি টাকা দাবী করে বলেছিলেন- এতে এই সেক্টরের সমস্যা নাকি অনেকাংশে সমাধান হয়ে যাবে। এই দর্জি ব্যবসায়ীরা শুধু নিতে পারে, সর্বদাই এদের লকলকে লালায়িত জিহ্বা বের করা থাকে নেয়ার জন্য, কিন্তু শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি দিতে গেলে এরা প্রমাদ গুনে। এছাড়া ভিন্ন একটি সূত্রে জানা যায়, ১০% গার্মেন্টস মালিক কানাডিয়ান এবং ১০% অস্ট্রেলিয়ান।  এদের দ্বারা শ্রমিকের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার হয় না, তার কি গ্যারান্টি আছে?

গার্মেন্ট সেক্টরের কাসুন্দি ঘাটলে এদেশের অর্থনীতি কাদের কাঁধের উপর ভর করে এগিয়ে চলে তার হদিস মিলবে। সেটা নিশ্চই এই সেক্টরের বেনিফিশিয়ারিদের ভালো লাগবে না। তার পরও এসব বলতে হবে। কারণ অনেকটা সময় চলে গেছে ধাপ্পাবাজি আর মিথ্যাচারণে। সাভারের ঘটনার পর এখন দেশের মানুষের নিশ্চই জানার অধিকার আছে কেন বছরের পর বছর গার্মেন্ট কারখানায় শত সহস্য শ্রমিকের মৃত্যুর পরও এই কারখানাগুলোর প্রতি দেশের সাধারণ জনগণ বিক্ষুব্ধ হতে পারে না? কেন শ্রমিকদের ন্যায্য দাবী-দাওয়া আদায়ের চেষ্টা হলেই মালিক-পুলিশ ‘ভাই-ভাই’ হয়ে যায়? কেন গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন সরকারকেও হুমকি দেয়ার দুঃসাহস করে?

আগামীকালই সকল গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেলে দেশে কার কী ক্ষতি হবে দেখা যাক:

১. দেশের তিন ভাগের এক ভাগ বেসরকারি ব্যাংক বন্ধ হয়ে কয়েক হাজার চাকুরে বেকার হবে।

২. ইন্ডেন্টর বা প্রফরর্মা ইনভয়েস ব্যবসায়ীদের অর্ধেক বেকার হয়ে যাবে।

৩. ট্রান্সপোর্ট তিন ভাগের এক ভাগ বসে যাবে। কয়েক হাজার মানুষ বেকার হবে।

৪. সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কয়েক হাজার লোক ছাঁটাই করতে হবে। তারা সারপ্লাস হয়ে যাবে।

৫. সিএন্ডএফ এজেন্সি অর্ধেক বন্ধ হয়ে যাবে। কয়েক হাজার বেকার হয়ে যাবে।

৬. শিপিং এজেন্ট তিন ভাগের দুই ভাগই বন্ধ হয়ে যাবে।

৭. বায়িং হাউজগুলোর সব বন্ধ হয়ে যাবে।

৮. এক্সেসরিজ ম্যানুফ্যাকচার কারখানাগুলোর অধিকাংশ বন্ধ হয়ে যাবে।

৯. ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ কারখানার অধিকাংশ বন্ধ হয়ে যাবে।

১০. মেয়েদের সস্তা অর্নামেন্টস কারখানাগুলোর অর্ধেক বন্ধ হয়ে যাবে।

১১. অর্নামেন্টস এবং গার্মেন্ট শ্রমিকদের সাজ-সজ্জার পণ্য বিক্রেতারা বেকার হয়ে যাবে।

১২. প্রাইভেট বিমান কোম্পানির দুএকটা বন্ধ হয়ে যাবে।

১৩. গাড়ির বিক্রি তিন ভাগের এক ভাগ কমে যাবে।

১৪. ছোট ছোট বাড়িওয়ালাদের বাড়ি খালি পড়ে থাকবে। তাদের আয় কমে যাবে।

১৫. পরিবহন খাতে যাত্রী কমে যাবে। 

এই সমগ্র বিষয়টি একলাইনে বিচার করলে দেখা যাচ্ছে একটা বিশাল শহুরে শ্রেণি বেকার, আধা বেকার হয়ে যাবে। গার্মেন্ট শিল্পের সাথে যে পরগাছা প্যারাসাইট সোসাইটি গড়ে উঠেছে তারা বেশ বড়সড় একটা ঝাঁকি খাবে। দেশের অর্থনীতি বিরাট ঝাঁকি খাবে। শপিংমল, ক্লিনিক, গাড়ি-বাড়ি, আবাসন ব্যবসা থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা লাক্সারি বিজনেস জার্ক করবে। মোদ্দা কথা শহুরে প্যারাসাইট সোকল্ড এলিট সোসাইটির দাপট থেমে যাবে।

এর বিপরীতে ৪০ বা ৪৫ লক্ষ গার্মেন্ট শ্রমিকের কী হবে? তারা না খেয়ে মরবে? সুশীলদের অনেকেই একটু শালীনতা বজায় রেখে বলেন- গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রি উঠে গেলে এরা দেহ ব্যবসা করে খাবে! ওই বাঞ্চোতরা জানে না এই ৪৫ লক্ষ শ্রমিকের আদপে তেমন কোনো বড় ক্ষতিই হবে না। তারা বাড়ি ফিরে যাবে। কয়েক মাস বেকার থাকবে। তারপর ক্ষেতে-খামারে কাজ করবে। এখন একটা ক্ষেতমজুর যেমন ৫শ টাকা পায়, তখন হয়তো ৩শ টাকায় কাজ করবে। নিজেরা বাড়িতে বসে এটা-ওটা বানিয়ে তারা ঠিকই সার্ভাইভ করে যাবে। কারণ তাদের চাহিদা খুব সামান্য। মোটা চাল মোটা কাপড়েই তারা সন্তুষ্ট। সেটা একটু কষ্ট করেই তারা ম্যানেজ করতে পারবে, আগে যেমন পারতো। কিন্তু তোদের ফুটানি তো শেষ! আক্ষরিক অর্থেই শেষ। একটা প্যারাসাইট স্টুপিড ক্লাস পুরোটাই মুখ থুবড়ে পড়বে। পড়বেই।

লেখাটি মনজুরুল হকের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে নেয়া হয়েছে।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh