রোববার,  ২৫ আগস্ট ২০১৯  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৯, ১৯:১৪:৫৭

কিভাবে কোরবানির পশু জবাই ও গোশত বণ্টন করবেন?

মুফতি কাসেম শরীফ
কোরবানির পশু আগে থেকে নির্ধারিত হোক বা কোরবানির দিনগুলোতে কেনা হোক—উভয় পদ্ধতি বৈধ। যদি কোরবানির নিয়তে পশু ক্রয়কারী নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হয়, তাহলে ক্রয়ের মাধ্যমে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়ে যায়।
কোরবানির জন্য যদি কেউ বড় একটি পশু ক্রয় করে এবং সে নিয়ত করে যে অন্য কেউ আগ্রহী হলে তাকেও কোরবানিতে অংশীদার করে নেবে—এমন ব্যক্তির জন্য আগ্রহী ব্যক্তি পেলে শরিকানায় কোরবানি করা বৈধ হবে। আর যদি কেনার সময় কাউকে শরিক করার নিয়ত না থাকে, তবে পরবর্তী সময়ে কাউকে অংশীদার না করাই উত্তম। তার পরও যদি কাউকে অংশীদার করতে হয়, তবে অংশীদারের নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হতে হবে। অংশীদার নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হলে তাকে অংশীদার করা বৈধ হবে না। একইভাবে গরিব ব্যক্তি (যার নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই) কোনো পশু ক্রয় করলে তাতে অন্যকে অংশীদার করা বৈধ নয়। যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই—এমন ব্যক্তি কোরবানির জন্য কোনো পশু ক্রয় করে এবং পরবর্তী সময়ে কাউকে শরিক করে, তবে পরবর্তী সময়ে উপযুক্ত ব্যক্তির কোরবানি শুদ্ধ হয়ে যাবে। কোরবানিতে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। তবে যে পরিমাণ অংশ গরিব ব্যক্তি অন্যের জন্য ছেড়ে দিয়েছে, তা পরিমাপ করে আরেকটি কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব হবে। আর যদি কোরবানির দিন শেষ হয়ে যায়, তাহলে এই পরিমাণ অর্থ গরিব অসহায় ব্যক্তিদের মাঝে বিতরণ করে দেবে। কারণ গরিব ব্যক্তি কোরবানির নিয়তে পশু কেনায় তার ওপর পুরো পশুটাই কোরবানি করা ওয়াজিব হয়ে গেছে। (কিফায়াতুল মুফতি : ৮/১৯৫, বেহেশতি জেওয়ার : ৩/৩৯)
 
অংশীদার যদি ওলিমা ও আকিকা করতে চায়?
বড় পশুতে (যাতে শরিকে কোরবানি করা বৈধ) কোরবানি ও আকিকার নিয়তে অংশীদার হওয়া বৈধ। শর্ত হলো, শরিকরা কোরবানি বা আকিকার বাইরে অন্য কোনো নিয়ত করবে না। দ্বিতীয় শর্ত হলো, কারো অংশ এক-সপ্তমাংশের চেয়ে কম হবে না। একইভাবে কোনো অংশীদার যদি কোরবানির নিয়ত করে এবং কোনো অংশীদার যদি ওলিমার নিয়ত করে, তবে তাদের একত্রে কোরবানি করা বৈধ। (আজিজুল ফাতাওয়া : ১/৭১৮, ফাতাওয়ায়ে শামি : ৬/৩২৬)
 
জবাই করার পর অংশীদার হওয়া যাবে?
কোরবানির পশু জবাই হওয়ার পর তাতে অংশের কোনো পরিবর্তন বৈধ নয়। জবাইয়ের পর অংশীদার হওয়ার জন্য কেউ অর্থ দিলে তা ফেরত দেওয়া আবশ্যক। (আজিজুল ফাতাওয়া : ১/৭১৯)
 
শরিকানার অর্থে কমবেশি করায় কোরবানি হবে?
যদি একাধিক ব্যক্তি অংশীদারির ভিত্তিতে কোরবানি করতে চায়, তাহলে তারা সমানভাবে পশুর মূল্য ও অন্যান্য খরচ পরিশোধ করবে। তবে যদি স্বেচ্ছায় কোনো অংশীদার অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে, তাহলে তা অবৈধ নয়। (আজিজুল ফাতাওয়া : ১/৭২৪)
 
স্ত্রী ও সন্তানের পক্ষে স্বামী ও পিতার কোরবানি
যদি কোনো অঞ্চলের প্রচলন এমন হয় যে সেখানে স্বামী তাঁর স্ত্রীর পক্ষ থেকে এবং পিতা তাঁর বালেগ সন্তানের পক্ষ থেকে কোরবানি করেন। আর স্ত্রী ও সন্তান এই প্রচলনের কথা সম্পর্কে অবগত থাকেন। তবে পিতা ও স্বামীর কোরবানি তাদের পক্ষে যথেষ্ট হবে। সন্তান ও স্ত্রীর স্পষ্ট অনুমতির প্রয়োজন হবে না। আর প্রচলন ব্যাপক না হলে সেখানে স্ত্রী ও সন্তানের ওয়াজিব কোরবানি আদায়ের জন্য স্পষ্ট অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। নফল কোরবানির জন্য অনুমতির কোনো প্রয়োজন নেই। (ফাতাওয়ায়ে শামি : ৫/২০৭)
 
কোরবানির পশু জবাই করে অর্থ নেওয়া যাবে?
অনেকের ধারণা, কোরবানির পশু জবাই করে অর্থ গ্রহণ করা যাবে না। এটা ভুল। কোরবানির পশু জবাই করে পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ। এটি জবাইকারীর অধিকার। শর্ত হলো, কাজ ও পারিশ্রমিক উভয়টি নির্ধারিত হতে হবে। কোনো ইমাম যদি পশু জবাই করে নিয়মিত অর্থ গ্রহণ করেন, তাঁর পেছনে নামাজ আদায়ে কোনো সমস্যা নেই। (কিফায়াতুল মুফতি : ৮/২৪৫)
 
নারীদের পশু জবাই
সমাজের একটি ভুল ধারণা হলো, নারীদের জবাই করার অবকাশ নেই। এটি ভুল। নারীরাও কোরবানির পশু জবাই করতে পারবে। এমনকি জারজ সন্তানও কোরবানির পশু জবাই করতে পারবে। নাবালেগ শিশুও কোরবানি করতে পারবে। শর্ত হলো, পশু কোরবানির নিয়ম সম্পর্কে অবগত হওয়া, ঠিকভাবে জবাই করা এবং বিসমিল্লাহ পাঠ করা। (এমদাদুল ফতোয়া : ৩/৫৪৮)
কোনো ব্যক্তি অবৈধ মনে করে নারীকে পশু জবাই করতে বাধা দিলে সে গুনাহগার হবে। (ইমদাদুল মুফতিন : ২/৯৫৭)
 
পশু জবাইয়ে অমুসলিমদের সহযোগিতা গ্রহণ করা যাবে?
পশু জবাইকারী যদি মুসলিম হয়, পশু যারা ধরেছে তারা অমুসলিম হলেও কোনো সমস্যা নেই। কারণ যারা পশু ধরে তাদের ওপর ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করা ওয়াজিব নয় এবং তাদের পাঠ করা বা না করায় জবাইয়ের কোনো ক্ষতিও হয় না। তবে কেউ জবাইয়ের কাজে অংশীদার হলে তার ওপর ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করা ওয়াজিব। যেমন—কেউ শক্তি জোগানোর জন্য যদি জবাইকারীর হাতের ওপর হাত রাখে, একজন জবাই করার পর অন্যজন আবারও ছুরি চালায়, তখন তার ওপর ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করা ওয়াজিব। শুধু পশু ধরার মাধ্যমে ব্যক্তিকে জবাইয়ের কাজে অংশীদার বলা যাবে না। (ইমদাদুল ফাতাওয়া : ৩/৫৪৯)
 
জবাই শুদ্ধ হওয়ার শর্তসমূহ
কোরআন ও সুন্নাহর বিধান অনুযায়ী জবাই শুদ্ধ তথা জবাইকৃত পশুর গোশত বৈধ হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত পালন আবশ্যক। এক. জবাইকারী মুসলিম হবে। দুই. জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা। তিন. শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে পশু জবাই করা। তা হলো, পশুর খাদ্যনালি, দুটি শ্বাসনালি ও রক্তনালি কাটা।
 
জবাইয়ের সময় পশুকে কষ্ট দেওয়া বৈধ নয়
শাদ্দাদ বিন আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কাজে সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন আবশ্যক করেছেন। সুতরাং যখন তোমরা হত্যা করবে সুন্দরভাবে হত্যা করবে। যখন তোমরা জবাই করবে, সুন্দরভাবে জবাই করবে। তোমাদের প্রত্যেকে যেন (পূর্ব থেকে) ছুরি ধার দিয়ে নেয় এবং প্রাণীকে শান্তি দেয় (দ্রুত কষ্টমুক্ত করে)।’ (বুখারি)
উল্লিখিত হাদিসের দাবি হলো, প্রাণী হত্যায় মানুষ সর্বোচ্চ সুপন্থা অনুসরণ করবে, যেন প্রাণীর অতিরিক্ত কষ্ট না হয়। জবাইয়ের সময় প্রাণীর কষ্ট শতভাগ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তবে ছুরি ধারালো হলে তার মৃত্যু সহজ হয়। তাই হাদিসে পশু জবাইয়ের আগে ছুরি ধারালো করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জবাইয়ের আগে প্রাণীকে পানি পান করানো এবং ছুরি ধারালো করা মুস্তাহাব। শাস্তি দেওয়ার অর্থ হলো, জবাইয়ের অনেক আগে তাকে বেঁধে না রাখা এবং জবাইয়ের পর প্রাণত্যাগের সময় দেওয়া। অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) জবাইয়ের আগে ছুরি প্রাণীর সামনে আনতে, তার সামনে ছুরি ধার দিতে নিষেধ করেছেন এবং দ্রুত জবাইয়ের কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
পশু হত্যার সময় তার সঙ্গে নির্দয় আচরণ করা উচিত নয়। সম্ভব হলে একটি প্রাণীর সামনে অন্য প্রাণী জবাই দেওয়া থেকে বিরত থাকবে, যেন সে মৃত্যুর আগেই মৃত্যুর ভয়ে ভীত না হয়। অনেক সময় মৃত্যুভয়ে প্রাণী ছোটাছুটি করে। তখন পশুর সঙ্গে নির্দয় আচরণ করা অনুচিত। জবাইয়ের পর প্রাণীর প্রাণ বের হয়ে যাওয়ার পর তার চামড়া ছাড়াবে। প্রাণ বের হওয়ার আগে বা পশু পুরোপুরি শান্ত হওয়ার আগে চামড়া ছাড়ানো হারাম। তবে কেউ পশু পুরোপুরি শান্ত হওয়ার আগে চামড়া ছিললে গোশত হারাম হবে না, যদিও সে পশুকে কষ্ট দেওয়ার কারণে গুনাহগার হবে। চামড়া একসঙ্গে পুরোটা ছিলাও বৈধ আবার টুকরা টুকরা করে ছিলাও বৈধ। (কিফায়াতুল মুফতি : ৮/২৫৭, আগলাতুল আওয়াম, পৃষ্ঠা ১৩৪)
জবাইয়ের স্থানে পশুকে টেনেহিঁছড়ে নিয়ে যাওয়া, শোয়ানোর পর জবাই করতে দেরি করা, পশুর সামনে ছুরি ধারানো মাকরুহ। (ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি : ৪/৮১)
 
কোরবানির পশু জবাইয়ের সময় যেসব নিয়ম মানতে হবে
১. জবাইয়ের আগে প্রাণীকে দানা-পানি খাওয়ানো মুস্তাহাব। পশুকে ক্ষুধার্ত রেখে জবাই দেওয়া মাকরুহ।
২. নির্দয়ভাবে জবাইয়ের স্থানে নেবে না।
৩. যতটা সম্ভব সহজে শোয়ানোর চেষ্টা করবে। অতিরিক্ত কষ্ট হয়—এমন পদ্ধতি পরিহার করবে।
৪. কিবলামুখী ও বাঁ পাশে শোয়াবে, যেন সহজে প্রাণ নাশ হয়। বিপরীত করা মাকরুহ।
৫. চার পায়ের তিন পা বাঁধবে।
৬. ছুরি ধারালো করবে। ভোঁতা ছুরি দিয়ে জবাই করা মাকরুহ।
৭.  পশুর সামনে ছুরি ধার দেবে না। এটি মাকরুহ।
৮. শোয়ানোর পর জবাই করতে দেরি করা মাকরুহ।
৯.  এক পশুর সামনে অন্য পশু জবাই করা মাকরুহ।
১০. জবাইয়ের সময় মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা বা কাটতে কাটতে গলার হাড়ের সাদা মগজ পর্যন্ত চলে যাওয়া মাকরুহ।
১১. ঘাড়ের ওপরের দিক থেকে জবাই করা নিষিদ্ধ। কারণ এতে পশুর বেশি কষ্ট হয়।
১২. জবাইয়ের পর পশু পুরোপুরি স্থির হওয়ার আগে ঘাড় আলাদা করা এবং চামড়া ছাড়ানো মাকরুহ। উল্লিখিত বিষয়গুলো কোরবানির সঙ্গে বিশেষায়িত নয়, বরং যেকোনো সময় পশু কোরবানির ক্ষেত্রে তা বিবেচ্য। (ফাতাওয়ায়ে রহিমিয়া : ১/৯৮)
 
কোরবানির গোশত জমিয়ে রাখা যাবে কি?
কোরবানির গোশত তিন দিনেরও অধিক জমিয়ে রেখে খাওয়া জায়েজ। (বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২২৪, মুসলিম ২/১৫৯, মুয়াত্তা মালেক : ১/৩১৮)
শরিকে কোরবানি করলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েজ নয়। (আদ্দুররুল মুখতার : ৬/৩১৭, কাজিখান : ৩/৩৫১)
কোরবানির গোশতের এক-তৃতীয়াংশ গরিব-মিসকিনকে এবং এক-তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয়, তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। (বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২২৪, আলমগিরি : ৫/৩০০)
 
মহানবী (সা.)-এর পক্ষ থেকে কোরবানি করা যাবে কি?
সামর্থ্যবান ব্যক্তির রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে কোরবানি করা উত্তম। এটি বড় সৌভাগ্যের বিষয়ও বটে। রাসুলুল্লাহ (সা.) আলী (রা.)-কে তাঁর পক্ষ থেকে কোরবানি করার অসিয়ত করেছিলেন। তাই তিনি প্রতিবছর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকেও কোরবানি দিতেন। (আবু দাউদ : ২/২৯, তিরমিজি : ১/২৭৫)
 
কাজের লোককে কোরবানির গোশত দেওয়া যাবে কি?
কোরবানির পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েজ নয়। গোশতও পারিশ্রমিক হিসেবে কাজের লোককে দেওয়া যাবে না। অবশ্য এ সময় ঘরের অন্যান্য সদস্যের মতো কাজের লোকদেরও গোশত খাওয়ানো যাবে। (আহকামুল কোরআন জাসসাস : ৩/২৩৭, বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২২৪)
 
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com