সোমবার,  ১৯ আগস্ট ২০১৯  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০১৯, ১৮:১৬:৩১

জমজমের পানির এত ব্যবহার তবুও ফুরোয় না কেন!

এম জে আকবর
আল্লাহর প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যের যে দৃষ্টান্ত গড়লেন নবী ইব্রাহিম, তারই স্মরণোৎসব পবিত্র হজ। এতে যে জনসমাবেশ হয় তা-ও আল্লাহর কুদরত। বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশ এই হজ।
জুদাইজম ও ক্রিশ্চিয়ানিটি নামের ধর্মাচরণেও আদি পিতা স্মরণে সমাবেশ করার চল আছে, কিন্তু ওগুলোর কোনোটিই ইসলাম ধর্মীয় হজের সমতুল্য নয়। জুদাইজম ও ইসলাম  ‘তওহিদ’-এর অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা একজনই ইব্রাহিমের এই বিশ্বাসের সঙ্গে সুদৃঢ়ভাবে সহমতের ধারক। ক্রিশ্চিয়ানিটি সেরকম নয়। সেখানেও এক ঈশ্বর আছে। তবে যিশু ও পবিত্র আত্মাকে সেই ঐশ্বরিকতার ভাগ দেওয়া হয়। ইব্রাহিমের জন্ম ইরাকের বেবিলন অঞ্চলে। কালক্রমে ঐশীবাণীতে পুষ্ট হন এবং ‘হানিফ’ (এক আল্লাহ বিশ্বাসে অবিচল সত্যাশ্রয়ী) হিসেবে সুখ্যাতি হয় তাঁর। অনুরাগীরা তাকে ডাকতেন ‘খলিলুল্লাহ’ মানে ‘আল্লাহর বন্ধু’। শত নিপীড়নের মুখেও এমনকি অগ্নিকুন্ডে  নিক্ষিপ্ত হয়েও তিনি বলতেন, আল্লাহ অদ্বিতীয়। আগুন থেকে আল্লাহই তাঁকে রক্ষা করেছেন। তাঁকে ও তার স্ত্রী সারাহকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল- প্রথমে ফিলিস্তিনে, পরে মিসরে। তার বিরাট একটা দুঃখ, তার সন্তান ছিল না। ‘দয়াময়! সত্যনিষ্ঠদের দেশে ভূমিষ্ঠ হয় এমন একটি পুত্র তুমি আমায় দাও!’ প্রার্থনা করতেন ইব্রাহিম। সারাহর যথেষ্ট বয়স হয়েছিল, সন্তান ধারণ করার মতো নয় সেই বয়স। ইব্রাহিমের প্রথম ছেলে ইসমাইল ছিলেন হাজেরার গর্ভজাত। আল্লাহর কুদরতে সারাহ-ও গর্ভধারণ করেছিলেন, তার গর্ভজাত ইব্রাহিমের দ্বিতীয় পুত্র ইসহাক। আরবরা নিজেদের ইসমাইলের বংশধারার অংশ বলে মনে করে। ইহুদিদের বিশ্বাস, ইসহাক হলেন তাদের নবী আইজ্যাক।
 
প্রচলিত কাহিনী আমাদের সামনে এক পর্যায়ে ঐশ্বরিক মহিমার চেয়ে বেশি ফুটিয়ে তোলে মানবিক আচরণ। ইসমাইলের জন্মের পর সারাহ এতটাই ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠলেন যে তিনি ইসমাইল ও হাজেরা, দুজনকেই বাড়ি থেকে বের করে দিতে স্বামীকে বাধ্য করলেন। ইব্রাহিম তাদের নিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে বহু দূরে বাক্কা (পরবর্তীকালের মক্কা নগরী) নামের বিরান উপত্যকায়। সামান্য কিছু খাবার দিয়ে তাদের সেখানে রেখে এলেন তিনি। খাবার আর পানি ফুরিয়ে গেলে হাজেরা বেঁচে থাকার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ‘উদ্ধার কর আল্লাহ’- বলে কাঁদতে থাকলেন তিনি। ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় কাতর শিশু ইসমাইল মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। পানির সন্ধানে হাজেরা একবার ছুটে যান সাফা পাহাড়ে, আবার ছুটে যান মারওয়া পাহাড়ে। এভাবে তিনি উন্মাদের মতো সাতবার এ পাহাড় ও পাহাড় করলেন। কিন্তু পানির দেখা নেই। ওদিকে মাটিতে শোয়া ইসমাইল কেঁদে চলেছেন পানির জন্য। ব্যর্থতায় ভেঙে পড়লেন হাজেরা।
ঠিক এ সময় হাজেরার কাছে এলেন ফেরেশতা জিব্রাইল। শিশুর কান্না আর মায়ের আকুলতা-বেদনা বয়ে আনলো আল্লাহর রহমত। ‘বাচ্চাকে তুলুন’ বললেন জিব্রাইল। সন্তানকে কোলে তুলে নেন হাজেরা। দেখেন, মাটিতে একটা ফাটল, তার নিচে পানির কূপ। কূপ থেকে উপরের দিকে ছুটছে পানির ফোয়ারা। ইসলামী পরিভাষায় এই ফোয়ারাই ‘জমজম’। পবিত্র জমজম কূপ। জমজমের পানি কখনই ফুরায় না।
 
মরুভূমিতে পানি কোথায় আছে তা দ্রুত টের পায় পাখিরা। জমজমের বেশ খানিকটা দূর দিয়েই বণিক দলের ‘কারওয়াঁ’ (ঘোড়ার গাড়িতে পণ্য সাজানো দোকানের সারি) যাচ্ছিল। একটা জায়গায় পাখি চক্কর দিচ্ছে দেখে তারা বুঝল, ওখানে পানি পাওয়া যাবে। কারওয়াঁ ওদিকে মুখ ঘোরায়। হাজেরা পানির বিনিময়ে দুধ আর খাবার সংগ্রহ করলেন। জমজমকে ঘিরে আস্তে আস্তে বসতি গড়ে ওঠে। বাক্কা উপত্যকা অবকাশ যাপনের জায়গা হয়ে উঠল দূরগামী মানুষের কাছে। মা আর সন্তান বেঁচে গেলেন। বাইবেলে আছে ইসমাইল তার যৌবনে হয়েছিলেন স্বনামধন্য দক্ষ তীরন্দাজ।
 
কয়েক মাস পর পর সন্তানকে দেখতে আসতেন ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ। একবার তিনি ইসমাইলকে জানান যে, একটা মসজিদ বানানোর জন্য আল্লাহ তাকে নির্দেশ দিয়েছেন। ইসমাইল পিতার সঙ্গে একমত হলেন। দুজনে মিলে নির্মাণ করলেন সেই মসজিদ যা সারা দুনিয়ায় ‘কাবা’ নামে সুখ্যাত। কাবা নির্মাণের শেষ পর্যায়ে এক ফেরেশতা নিয়ে এলেন প্রায় সাত ইঞ্চি ব্যাসের ডিম্বাকৃতির একটি পাথর। পাথরের নাম ‘হাজরে আসওয়াদ। চতুষ্কোণ কাবার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে পাথরটি বসানো হয়।
 
পরবর্তীকালে আল্লাহর কাছ থেকে ইব্রাহিম যে নির্দেশ পান তার মধ্যে সুপ্ত ছিল কঠিন এক পরীক্ষা। প্রিয় সন্তানকে কোরবানি দেওয়ার নির্দেশ পেয়ে তা জানালেন ইসমাইলকে। ইসমাইল বললেন, ‘আল্লাহ যা বলেছেন তা-ই করুন পিতা। আপনি আমায় ধৈর্যশীল পাবেন।’ ইব্রাহিম যখন ছুরিটা ইসমাইলের গলায় চালাতে উদ্যত, তখন আবারও আল্লাহ-ই তাকে রক্ষা করলেন। ইসমাইলের বদলে কোরবানি হয়ে গেল একটি ভেড়া। ভারতে এ জন্য কোরবানি ঈদকে বলা হয় ‘বকর ঈদ’।
 
কাবাকে পবিত্র আশ্রয় কেন্দ্রে পরিণত করার জন্য ইব্রাহিম যে প্রার্থনা করেছিলেন আল্লাহ তা মঞ্জুর করেছেন। তবে অনেক অপচর্চার কলুষ দূর করার পর। জিয়াউদ্দিন সরদার রচিত চমকপ্রদ গ্রন্থ ‘মক্কা : দ্য স্যাকরেড সিটি’তে আছে- পৌত্তলিক যুগের আরবরা কাবা ঘরে তাদের দেবতাদের মূর্তি বসিয়েছিল। এদের মধ্যে ছিল- সূর্য দেবতা ‘মানাফ’। রংধনু ধারক ‘কুজাহ’। ঈগলের রূপধারী ‘নাসর’। দেবী-মাতা ‘আল-লাত’। ভাগ্যদেবী ‘মানাত’। প্রেম ও সৌন্দর্যের দেবী ‘আল-উজ্জা’- এই দেবী বাস করত গাছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কাবা ঘরের সব মূর্তি সরিয়ে নেওয়ার পরও ‘মানাত’-এর অসীম ক্ষমতার কেচ্ছাকাহিনী প্রচারণা বন্ধ হতে অনেক সময় লেগেছিল।
 
সন্তানের জন্য মায়ের আকুলতা কী প্রবল তা অনুভবের সুযোগ এনে দেয় পবিত্র হজ। হাজেরার জীবনাবসানের হাজার হাজার বছর পরও ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা তার বেদনার শরিক হয়। সাফা-মারওয়ায় দৌড়াদৌড়ি করে। এ এক বিস্ময়কর ব্যাপার। আরও বিস্ময়কর হজ ও উমরাহ পালন করার জন্য লাখ লাখ নর-নারী যান মক্কায়। ২০১৮ সালে গিয়েছেন ২৪ লাখ। প্রায় সমসংখ্যক করেছেন উমরাহ। এরা সবাই জমজমের পবিত্র পানি খেয়ে থাকেন। শুধু খান না, স্বজনদের জন্য বোতল ও ক্যানভর্তি করে দেশেও নিয়ে আসেন। ইব্রাহিমের জমানা থেকে আজ অবধি এই ব্যবস্থা জারি আছে। তবু জমজমের পানি ফুরায় না। রহস্য কী? জবাবে বলা হয়, রাব্বুল আলামিনের মহান কুদরত।
 
এক দশকের বেশি সময় আগে জর্দানের রাজধানী আম্মানে পানি বিষয়ক এক সম্মেলনের আয়োজন করেন শাহজাদা হাসান। সেখানে মক্কা নগরীর অভিজাত পরিবারের সন্তান একজন প্রকৌশলীর সঙ্গে আমার আলাপ হয়। তাকে বলি, এর কী কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে? শাহজাদা জানান, একবার তো পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, জমজমের পানি সররবাহ সংকুচিত দশায় যাচ্ছিল। বিষয়টি তদন্তে সরকার বিশেষ টিম নিয়োগ করে। তদন্তে যা পাওয়া গেল তা চমকপ্রদ কিছুই নয়। বালির স্তর পুরো হয়ে যাওয়ার কারণেই জমজমের পানি উপর পানে জোরে আসতে পারছিল না। বিশেষ টিমটি খতিয়ে দেখতে গিয়ে দেখতে পায় যে, ভূগর্ভের একটি নদীর সঙ্গে জমজমের সংযোগ রয়েছে। অতএব, পানির ধারা কখনই শুকোবে না।
 
হাজেরা আর ইসমাইল যে অলৌকিকভাবে পানি পেয়ে গেলেন সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ওই প্রকৌশলী বলেন, বহুকাল আগে প্রবল ভূকম্পনের প্রভাবে মাটি ফেটে গেলে এই নদী থেকে জমজমের পানি ফোয়ারার রূপ ধরে উপরের দিকে উঠতে শুরু করে। এই ব্যাখ্যা কতটা যৌক্তিক তা যাচাই করতে যাইনি। শুধু তার মুখে যা শুনেছি তা-ই লিখে দিলাম।
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com