আনিসুজ্জামান আমাদের আলোকবর্তিকা

আনিসুজ্জামান চলে গেলেন পরিণত বয়সে (১৯৩৭-২০২০)। তবে এমন এক সংকটময় মুহূর্তে তিনি গেলেন, যখন আমাদের জাতীয় জীবন ও বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিত অন্য যে কোনো ঐতিহাসিক বাস্তবতা থেকে অনেক বেশি দুর্বিসহ ও বিপর্যস্ত। তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সেটাই তাঁর মৃত্যুর কারণ। সত্য যে, এমন পরিস্থিতির মধ্যে জাতীয় মনোভাব ব্যক্ত করা, অর্থাৎ তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশ করার সুযোগ আমাদের হলো না! তিনি যেন নিজের থেকেই আমাদের এই গভীর শোক-বিহ্বলতা থেকে মুক্তি দিয়ে গেলেন। আমাদের পক্ষে এটা তাঁর মৃত্যুর চেয়েও কম দুঃখের বিষয় নয়। করোনাভাইরাসের ভয়ে আমরা আজ নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছি নিজ নিজ ঘরে। আনিসুজ্জামানের চলে যাওয়াটা এমন অস্বাভাবিক, প্রতিকারহীন ও ঊষর শীতলতার মধ্যে ঘটে গেল।

‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চর্চা বাঙালি সংস্কৃতির মূলধারায় এখনো প্রবেশ করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। সেজন্যে বিজ্ঞানকে আমরা অনেকটা ইন্দ্রজালের মতো দেখি এবং বিজ্ঞানমনস্কতার তুলনায় অদৃষ্টবাদে আমাদের আস্থা বেশি।’ 


জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

আনিসুজ্জামান অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। অন্যদের সাথে এটাই তাঁর ব্যতিক্রম কিংবা প্রধান পার্থক্য নয়। অন্যদের থেকে তাঁর পার্থক্য খুবই মৌলিক। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই যেসব সাহিত্যিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পারিপার্শ্বিকতার সাথে যুক্ত থাকতে পেরেছিলেন, অন্য অনেকের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার সাথে সাথে তাঁর এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল। তাঁর সমকালীন এই পার্থক্যের স্বরূপ সম্পর্কে আমরা জানি, তিনি প্রচুর তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। পেয়েছিলেন অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির সাহচর্য। তাঁর জীবনের এই অভিজ্ঞতার কথা মনে রাখলে তাঁর স্বাতন্ত্র্য সহজেই চোখে পড়ে। এ দিক থেকে দেখলে বেশ বোঝা যায়, এক দুর্লভ জীবন বহন করেছিলেন তিনি। এমন ব্যতিক্রম ও অভিনবত্ব খুব কম মানুষের জীবনে আসে। তাঁর অধ্যয়ন, অধ্যাপনা এবং লেখালেখি ও গবেষণায় এই স্বাতন্ত্র্যের স্পর্শ উল্লেখযোগ্য। 

আনিসুজ্জামানের চিন্তা ও কর্মের প্রধান দুই ক্ষেত্র। তিনি ভাষা সাহিত্য শিক্ষা ইতিহাস প্রভৃতি নিয়ে লিখেছেন, গবেষণা করেছেন, নিজের মতামত প্রকাশ করেছেন। শিক্ষকতার সূত্রে তাঁর এই লেখালেখি তাঁকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। কিন্তু তিনি কেবল শিক্ষকতা আর পড়াশোনা নিয়ে গৃহকোণে পড়ে থাকেননি। সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে জনগণের সাথে সম্পৃক্ত হবেন, তারও উপায় ছিল না। তাঁর যৌবনে মার্কসীয় রাজনীতির প্রভাব ছিল প্রায় অপ্রতিহত। তাঁর সমবয়সী অনেকেই তাতে মানবমুক্তির চমৎকার আলো দেখতে পেয়েছিলেন। মুগ্ধতার আবেশে সেখানে প্রবেশ ঘটেছে তাঁদের অনেকেরই। আনিসুজ্জামান সেই রাজনীতির প্রচণ্ড আগুনে পোড়েননি, কিন্তু তার উত্তাপ উপভোগ করেছিলেন। এটা তাঁর এক অসামান্য বিচক্ষণতা। তবে তিনি একটি বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাস রক্ষা করে এবং সে বিশ্বাসে প্রায় স্থির থেকে পথ হেঁটেছেন আজীবন। এই হচ্ছে তাঁর কর্মের দ্বিতীয় ক্ষেত্র। তাঁর পুরো জীবনে এ দুই ধারার অনুসরণ চোখে পড়ে আমাদের। তাঁর প্রথম ধারাটি সম্পর্কে সংক্ষেপে দুকথা বলে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা বর্তমান রচনার উদ্দেশ্য।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণায় আনিসুজ্জামানের মনোযোগ ও তন্নিষ্ঠা সমকালীন বিদ্বজ্জনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই সূত্রে তাঁর বিষয় ছিল বাঙালির সংস্কৃতি ও বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয় অনুসন্ধান। তাঁর একটি বইয়ের নামই স্বরূপের সন্ধানে (১৯৭৬), অপর একটি বই ইহজাগতিকতা ও অন্যান্য (২০১২)। তার মানে, বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালির ইহজাগতিকতার স্বরূপ-সন্ধান তাঁর ছিল এক প্রধান জিজ্ঞাসা। আরো নানা লেখায় এর পরিচয় আছে। সাতচল্লিশে দেশ ভাগ হলেও পাকিস্তানে কেবল হিন্দু-মুসলমান ছিল না। আরো বিচিত্র সংস্কৃতি ও বহু ভাষার মানুষের বাস ছিল। পাকিস্তান থেকে একাত্তরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হলেও সেই বৈচিত্র্য কাটেনি। তাই আনিসুজ্জামান ‘সাংস্কৃতিক বহুত্ব’বাদে বিশ্বাস রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। ফরাসি বিজ্ঞানী ও দার্শনিক পাসকেলের মত উদ্ধৃত করে বলতে চেয়েছেন, বহুত্ব যদি আমাদের ঐক্য গড়ে না তোলে, তবে তা বিশৃঙ্খলা ডেকে আনবে। অপরদিকে এই ঐক্য যদি বহুত্বকে অস্বীকার করে তবে তা জুলুমে পরিণত হবে। বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হলো পশ্চিম পাকিস্তানের নিপীড়ন থেকে, তখন তিনি সাতচল্লিশের দেশভাগের ইতিহাস থেকে দুটো শিক্ষা নেবার কথা বলেছিলেন। এক. ‘জনসাধারণ যে-আন্দোলনের নায়ক নয়, তার সাফল্যের সীমাবদ্ধতা থাকে।’ দুই. ‘জনসাধারণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ বাধাহীন না হলে স্বাধীনতা অর্থপূর্ণ হয় না।’ পাকিস্তান আমলে এই সূত্রের মূল্য পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশপর্বে ধর্মনিরপেক্ষতার রূপ নিয়েছে, দেখা দিয়েছে এক জটিল দৃষ্টিভঙ্গি। আনিসুজ্জামান বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও সেই রাষ্ট্রের তাত্ত্বিক প্রভাব থেকে আমরা মুক্ত হতে পারি নি।’ অর্থাৎ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম এখানে জেঁকে বসেছে।

আনিসুজ্জামানের মতে, বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে আমরা রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পূর্ণ সংযোগহীনতা বুঝি না। বরঞ্চ ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ আমরা করেছিলাম সব ধর্মের সমান অধিকার অথবা দেশে প্রচলিত বিভিন্ন ধর্ম ও সেসব ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে পক্ষপাতহীনতা। [...] তাই বেতারে, টেলিভিশনে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে- সর্বত্র কুরআন শরীফ, গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক পাঠ হতে লাগলো একসাথে এবং ভঙ্গভবন বা গণভবনে মিলাদ-মাহফিলও আয়োজিত হলো। পাকিস্তান আমলে আমাদের চলতে হতো এক ধর্ম নিয়ে, বাংলাদেশে চলতে থাকলাম চার ধর্ম নিয়ে। কথায় কথায় রাষ্ট্রীয় পদাধিকারীরা ঘোষণা করলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়।

এই পরিণতির একটা প্রধান কারণ আনিসুজ্জামান দেখিয়েছেন আমাদের শিক্ষানীতির মধ্যে। শিক্ষার বৈষম্যের মধ্যে গলদ থাকলে নানা সুবিধাবাদ সমাজে ও রাষ্ট্রে বিদ্যমান থাকবে। এখন আমাদের শিক্ষা কেবল ইংলিশ মিডিয়াম-বাংলা মিডিয়ামের মধ্যে নেই। হরেক রকম শিক্ষানীতি আমাদের রাষ্ট্রে চালু আছে। আনিসুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা যেমন একটা আলাদা জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করছে, মাদ্রাসা শিক্ষা তেমনি আরো একটি জনগোষ্ঠী তৈরি করছে। স্বাধীনতা পরে আশা করা গিয়েছিল যে, একই মাধ্যমে একই প্রণালিতে সবাইকে শিক্ষা দেয়া হবে। সে আশা দূরাশা রয়ে গেল। মাদ্রাসা রেখেই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অভিন্ন পাঠ্যতালিকা অনুসরণের যে-সুপারিশ ছিল বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশনের, সে-সুপারিশ কার্যকর হয়নি। অধুনা বরঞ্চ সরকারিভাবে মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষার মানকে সমতুল্য বিবেচনা করা হচ্ছে, এমনকি, কওমি মাদ্রাসার সাথেও সাধারণ শিক্ষাকে সমতুল্য বিবেচনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সজ্ঞানে নিজেদের এমন ক্ষতি করার দৃষ্টান্ত খুব বেশি নেই।

বাংলা ভাষা প্রসঙ্গে তাঁর মত এই যে, যে কারণে বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল, আজ এক শ্রেণির লেখাপড়া জানা লোকের কাছে সেটা ‘রাগী নেটিভ তরুণদের কাণ্ড’ বলে মনে হচ্ছে! এঁরা চান ছেলেরা ইংরেজি পড়ুক। বিদেশে যাওয়ার রাস্তা তৈরি হোক। বাংলা এ পথে বড় রকমের অন্তরায়। আনিসুজ্জামান বলেন, উচ্চশিক্ষায় বাংলা ভাষার প্রয়োগ তো দূরের কথা আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন এমন একটা বড় অংশের শিক্ষকেরা আঞ্চলিক ভাষায় পাঠদান করছেন! প্রমিত বাংলা শেখানো যেখানে দুর্ঘট, সেখানে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি ভাষার ভিত পাকা হবে কিভাবে! শুধু তাই নয়, তিনি বলেন, বাংলাদেশের একদল তরুণ সাহিত্যিক আছেন, সাহিত্য রচনা যাঁরা করতে চাইছেন আঞ্চলিক ভাষায়। এদিকেই তাঁদের ঝোঁক প্রবল। এঁদের ধারণা এক সময় আঞ্চলিক ভাষাই বাংলাদেশের প্রমিত ভাষার রূপ নেবে! কলকাতাকেন্দ্রিক সৃষ্ট প্রমিত ভাষার ওপর এভাবেই তাঁরা প্রতিশোধ নিয়ে জয়ী হতে চাইছেন! আনিসুজ্জামান মনে করেন, এহেন প্রচেষ্টা বাংলা ভাষাকে খণ্ডিত করবে এবং ঐতিহ্যের সাথে আমাদের বিচ্ছেদ ঘটাবে।

ভাষা-আন্দোলনকে যাঁরা রাগী নেটিভ তরুণদের কাণ্ড বলে মনে করেন, তাঁরা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকেও ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের বিবাদ বলে দেখতে চান! আনিসুজ্জামান আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, পাকিস্তান কেবল উর্দুকে চাপিয়ে দিয়ে বাংলা ভাষাকে নির্মূল করতে চায়নি, বাঙালি জাতিকে পঙ্গু করতে চেয়েছিল। তার কারণ তাঁরা জানতেন, বাংলা ভাষা দিয়েই বাঙালি জাতির পরিচয়। কাজেই মূলে আঘাত করতে পারলে বাঙালির আত্মপরিচয়কে ভুলিয়ে দেয়া সহজ হবে। অপরদিকে লক্ষ্য করবার বিষয়, আমরা জেনেও ভুলে থাকতে চাই, একাত্তরে ভাই কেবল ভাইকে হত্যা করে নি, বোনকেও ধর্ষণ করেছিল। বাঙালির বৌদ্ধিক উৎসের প্রধান ভিত্তি যে তার বিদ্বৎসমাজ, সেটাকেও নির্মূল করবার উদ্যোগ নিয়েছিল পাকিস্তান সরকার! এইসব প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক ঘটনা যদি আমরা ভুলে যাই, সেই বেদনার ভার যদি আমরা বহন করতে না পারি, তবে স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের বিকাশ ব্যাহত হবে। আনিসুজ্জামান অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলেন, ‘ইতিহাসের কী কষ্টকর পথ বেয়ে আজ আমরা এখানে এসে পৌঁছেছি, তা স্মরণে রাখতে হবে। সেই স্মৃতি আমাদের জাতীয়তাবাদ, ঐক্যচেতনা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে ভিত্তি দেবে।’

আনিসুজ্জামান আমাদের ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতের বিশ্লেষণ করেছেন অনেক রচনায়। তাঁর লেখাপত্র যদি আমরা কিছু মনোযোগ দিয়ে পড়ি, তবে দেখব যে, তিনি মুদ্রিত রচনায় কোথাও ভুল তথ্য, অবাস্তব কথা, অতিরঞ্জিত বক্তব্য বলেন নি। তাঁর বাকসংযম ও পরিমিতিবোধ অসাধারণ। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন অবশ্য বিদ্রোহের নয়। তাঁর বাক্যে ও আচরণে তার প্রমাণ নেই। তিনি মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারে জন্মেছিলেন। অথচ জীবনে তিনি কী হতে চেয়েছিলেন এবং কী হয়েছেন, এই আত্মজিজ্ঞাসা তাঁকে বিব্রত করেনি। তিনি স্ত্রীকে লেখা এক চিঠিতে বলেন, ‘আমি যুক্তি মেনে চলার চেষ্টা করি কিন্তু সব সময়ে পারি না। [...] গড়পরতা লোকের তুলনায় আমি কম পক্ষপাতদুষ্ট, কম অযৌক্তিক।’ তাঁর এ কথা মিথ্যে নয়। কিন্তু তিনি কোনো অর্থেই সাহসী মানুষ ছিলেন না। তাঁর সুদীর্ঘকালের জীবন-অভিজ্ঞতা এবং অধিত বিদ্যা তাঁকে সমকালের পরিশীলিত মনীষার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। সাহিত্যের সাংগঠনিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একটা চমৎকর জায়গায় তাঁর অভিভাবকত্ব এ দেশের বিদ্বানসমাজ বিশেষ আনন্দের সাথে গ্রহণ করেছিল এবং তাঁকে সেইভাবে তাঁরা মান্যতা দিয়েছেন। আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সেই জায়গাটা তাঁর মৃত্যুতে, বলা চলে শূন্য হয়ে গেল।

এ দেশের বিদ্যাবত্তার উচ্চায়ত অঙ্গনে খুব বেশি মানুষের দেখা মেলে না। আনিসুজ্জামান সেই দুর্লভ জায়গাটি সুদীর্ঘকাল অলংকৃত করে গেলেন। বাংলাদেশের বিদ্যা ও জ্ঞানকাণ্ডের প্রতিনিধি হিসেবেও তাঁর গুরুত্ব বহির্দেশে প্রায় একক ছিল। তিনি আমাদের জাতীয় জীবনের যে কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারতেন। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের দিক থেকে সেই প্রতিনিধিত্বের শূন্যতা আজ যেন হঠাৎ আমাদের অন্তরে মোচড় দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিলো সেই কথা। বাংলাদেশের নানা সংকট ও প্রগতিশীল কর্মতৎপরতায় তাঁকে পাওয়া কঠিন ছিল না। তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে সে রকম ডাকে সাড়া দিয়েছেন সর্বাগ্রে। প্রগতিশীল কর্মতৎপরতা ও জাতীয় উদ্যোগের কথা যদি বাদ দিয়েও দেখা যায়, অন্য অনেক কল্যাণমুখী স্তরে তাঁর চলাচল সবার জন্য আগ্রহের বিষয় ছিল। এমন কি আমাদের বিপুল সংখ্যক মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেরও অভিভাবক ছিলেন তিনি। নানা বিপদ-আপদে তাঁর সুপরামর্শ আমাদের অনেকের জীবনে জীয়নকাঠির সমতুল্য ছিল। চাকরির সুপারিশ থেকে নিয়ে, চাকরির প্রমোশনের ব্যাপারেও অনেকের মাথার ছাতা হিসেবে তাঁর সুনাম উল্লেখযোগ্য। আজ এ কথা আমাদের না মেনে উপায় নেই যে, এমন হয়তো অনেক কিছুই পূরণ হবে অনেকের দ্বারা, কিন্তু বিদ্যা ও জ্ঞানের, জানাশোনা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারতেন যে-মানুষটি, তাঁকে আর পাওয়া যাবে না কোথাও। সেই জায়গাটি  হয়তো বহুদিন অপূর্ণ থেকে যাবে আমাদের সাংস্কৃতিক আবহে।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh