মে দিবসের আহ্বান

গতিময় এই বস্তু ও সমাজজীবনে কখনো আবর্তন, কখনো বিবর্তনের প্রক্রিয়া চলছে অবিরাম। গতিতে আছে বলে বস্তুজগৎ, মানবসমাজ ও চিন্তা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকছে না। ধীরে অথবা দ্রুতগতিতে যেভাবেই হোক না কেন পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। হেরাক্লিটাস বলেছিলেন, এক নদীতে দু’বার গোসল করা যায় না। ফলে কোনো বস্তু একই রকম দেখতে মনে হলেও সব এক রকম থাকে না। যেমন পৃথিবী তার আপন অক্ষের ওপর ঘুরে এলেও প্রতিদিনের সকাল এক নয়, তেমনি সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে এলেও প্রতি বছর এক রকম  হয় না। তাই মে দিবস প্রতি বছর এলেও একই তাৎপর্য নিয়ে আসে না; কিন্তু প্রতি বছর মে দিবসে আমরা পুরনো সেই সংগ্রামের ইতিহাস স্মরণ করি নতুন সমস্যা সমাধানে যুক্তি, প্রেরণা ও শক্তি পাওয়ার জন্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ বছর মে দিবস এসেছিল অতীতের সংগ্রাম, ভবিষ্যতের স্বপ্ন আর প্রবৃদ্ধি এবং বৈষম্যের এক জটিল পরিস্থিতি নিয়ে। বিশ্ব পরিস্থিতিতে মে দিবস এসেছিল চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের নামে শিল্পায়নের চ্যালেঞ্জ আর করোনার আক্রমণে পর্যুদস্ত হওয়ার পটভূমিতে। শ্রমজীবী মানুষ এখন মোকাবেলা করছে এক নতুন সমস্যা। উৎপাদন বৃদ্ধি আর কাজ হারানোর আশঙ্কা নতুন রূপে দেখা দিয়েছে বিশ্বব্যাপী।

শ্রমিকের জীবনের দুর্দশা কোনো অদৃষ্ট নিয়ন্ত্রিত ব্যাপার নয়। এর কারণ হলো শোষণ। তাদের আকাঙ্ক্ষার সেই শোষণমুক্ত সমাজ নির্মাণের লক্ষ্যে শ্রমের মর্যাদা, শ্রমিকের শ্রমের ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ-পুনর্বাসন আর সংগঠিত হওয়ার সংগ্রাম খুব গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাদের উচ্ছেদ ছাড়া এ আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। পুঁজিবাদ উচ্ছেদ আর সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে পথ দেখাতে মে দিবস আসে তাই প্রেরণার উৎস হিসেবে।

সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার স্লোগান তুলে ১৭৮৯ সালে যে ফরাসি বিপ্লব সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছিল, পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তারা তাদের অঙ্গীকার ভুলে গেল। মালিক শ্রমিকে বিভক্ত সমাজে শ্রমিকের অধিকার বলে কিছু থাকল না। সম্পদ তৈরি হয় শ্রমিকের শ্রমে, তাহলে শ্রমিকের জীবন কেন এত দুঃখময়? এ প্রশ্ন ভাবিয়েছে সব চিন্তাশীল মানুষকেই। অ্যাডাম স্মিথ দেখালেন মূল্য তত্ত্ব, ডেভিড রিকার্ডো দেখালেন শ্রমের মূল্য তত্ত্বের কথা। আর এর ফলে মানুষ বুঝলো শ্রমের ফলেই মূল্য তৈরি হয়। পরবর্তীতে কার্ল মার্কস দেখালেন উদ্বৃত্ত মূল্য কীভাবে সৃষ্টি হয় এবং মালিকরা কীভাবে তা আত্মসাৎ করে। শ্রম সময় বাড়ালে যে মুনাফা বাড়ে অর্থনীতির জটিল তত্ত্ব না বুঝলেও জীবনের অভিজ্ঞতায় শ্রমিকরা তা বুঝতে পেরেছিল। তাহলে এই মূল্যে শ্রমিকের অংশ কত এবং তার প্রাপ্য কতটুকু এ প্রশ্ন সঙ্গত কারণেই উত্থাপিত হতে থাকল। শ্রমিক কতক্ষণ কাজ করবে এবং বিনিময়ে কী পাবে তা আলোচনা এবং আন্দোলনের বিষয় হয়ে দাঁড়াল। নিজেদের সমস্যা উত্থাপন করা ও দাবি আদায়ের লক্ষ্যে শ্রমিকরা তাই সংগঠিত হতে শুরু করল। ১৮২৭ সালে প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন হিসেবে মেকানিক্স ইউনিয়ন অব ফিলাডেলফিয়া ১০ ঘণ্টা কর্ম দিবসের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে। দাবিটা যৌক্তিক হলেও কাজটা এত সহজ ছিল না। কর্মঘণ্টা কমানোর দাবি যে মালিকদের মুনাফার ওপর আঘাত হানবে সে সম্পর্কে মালিকরা সচেতন ছিল। ফলে ১০ ঘণ্টা কাজের দাবি আপাত অর্থে নিরীহ দাবি হলেও মালিকরা বুঝেছিল তাদের মুনাফার ওপর আঘাত আসছে। তাই তারা নির্মম হতে দ্বিধা করেননি; কিন্তু নিপীড়ন নির্যাতন সহ্য করেও শ্রমিকদের আন্দোলন দিন দিন দানা বেঁধে উঠতে থাকল। ১৮৩৪ সালে নিউ ইয়র্কের বেকারি শ্রমিকদের ধর্মঘট হয়। ১৮৩৭ সালে ১০ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবি একটি আন্দোলনের দাবি হিসেবে শ্রমিকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আমেরিকার বাইরেও এ দাবি উঠতে থাকে শুধু তাই নয়, কেউ কেউ আরো অগ্রসর দাবি তুলতে থাকে। ১৮৫৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার শ্রমিকরা ৮ দফা দাবি তোলে। ক্রমান্বয়ে এ দাবিতে শ্রমিকরা দেশে দেশে সোচ্চার হয়ে উঠতে থাকে। 

১৮৪৮ সালে মার্কস-এঙ্গেলস লিখিত- কমিউনিস্ট ইশতেহার, ১৮৬৪ সালে গঠিত কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল, ১৮৭১ সালের প্যারি কমিউন, ১৮৭৫ সালে আমেরিকার খনি শ্রমিকদের আন্দোলনে শ্রমিকরা দাবি আদায়ে সচেতন, সংঘবদ্ধ ও সাহসী হয়ে উঠতে থাকেন। ১৮৮৬ সালে শিকাগোর হে মার্কেটের যে রক্তাক্ত আন্দোলন মে দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেল তার ইতিহাস সবার জানা। শ্রমিক আন্দোলনকে দমন করতে পুলিশ এবং মালিকরা যে নৃশংসতার পরিচয় দিয়েছিল, প্রহসনমূলক বিচারে পার্সনস, স্পাইজ, এঙ্গেল, ফিশার এই চারজন শ্রমিক নেতাকে ফাঁসি দিয়েছিল তার ফলে বিশ্বের দেশে দেশে শ্রমিকদের সংহতি আরো বাড়িয়ে তুলেছিল। এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি শুধু কর্মঘণ্টা কমানোর দাবি নয়, এর অন্তরালে ছিল ন্যায্য মজুরি পাওয়া ও সম্মানজনক জীবনযাপনের আকুতি। ১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ২য় ইন্টারন্যাশনালে ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের প্রস্তাবনায় ১ মে-কে বিশ্বব্যাপী পালন করার আহ্বান জানিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, শিকাগো শহরকে মে দিবসের সংগ্রামের সূচনা ধরা হয় কিন্তু আমেরিকাতেই মে দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হয় না। 

আজ আমরা যদি ইতিহাসের সেই দিনগুলোর কথা আবার একটু মনে করি তাহলে দেখব শ্রমশোষণ ও অমানবিক কর্মপরিবেশের পরিবর্তে মানুষের জন্য উন্নততর সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন সেদিনের শ্রমিক নেতারা। ৭ আগস্ট ১৮৮৭ সালে আদালতে আগস্ট স্পাইজ আদালতকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘আপনারা প্রতিবাদীর বিচার চান, আমি প্রতিবাদী। বিচার করুন। সম্মানিত বিচারক, আপনার রায় ঘোষণা করুন। বিশ্ববাসী জানুক ১৮৮৬ সালে ৮ ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হলো, কারণ তারা স্বাধীনতা, ন্যায় বিচার, উন্নততর ভবিষ্যতের জন্য তাদের বিশ্বাস অটুট রেখেছিল। ... এবার আমার সঙ্গে চলুন! এ শহরে যারা সম্পদ সৃষ্টি করেছে তাদের দেখবেন। হকিং উপত্যকার আধাপেট খেয়ে কাজ করে যাওয়া শ্রমিকদের দেখবেন, চলুন। মঙ্গাহেলা উপত্যকাসহ দেশের আরো অনেক এলাকায় নিম্নবর্গের মানুষগুলোকে দেখবেন চলুন। রেলের রাস্তা ধরে একবার হাঁটবেন, চলুন। আর তারপর আমাকে বলুন, যে নির্দেশ আজ আপনি উচ্চারণ করেছেন, তা কার জন্য বা কিসের জন্য? এ নির্দেশ মানা হচ্ছে হাজার হাজার শিশু ও নারীকে কারখানার মধ্যে মেরে ফেলবার এক পদ্ধতিগত উদ্যোগ গ্রহণ। এর মানেই হচ্ছে অসহিষ্ণুতা বাড়িয়ে দেয়া, একটি গোষ্ঠীর লোভকে আরো উস্কে দেয়া, এর মানেই হচ্ছে এক হাতে দুঃখ-দুর্দশা অভাব ও অক্ষমতা এবং অন্য হাতে ধ্বংস, আলস্য, লোভ-লালসা এবং আগ্রাসন তুলে দেয়া।’

এ কথার প্রতিধ্বনি আজ সারা বিশ্বেই ঘটছে। সারা বিশ্বে এত প্রাচুর্য আর এত বৈষম্য আর কখনো দেখা যায়নি। প্রাকৃতিক সম্পদ ও বাজার দখলের জন্য দুটি বিশ্বযুদ্ধ, আঞ্চলিক যুদ্ধ এসব দৃশ্যমান কিন্তু এর অন্তর্নিহিত কারণ যে শোষণ এবং তার ফলে মালিকের সম্পদ বৃদ্ধি আর শ্রমিকের দারিদ্র্য সৃষ্টি তা চোখের আড়ালেই থেকে যায়। ৮ জন ধনীর কাছে বিশ্বের ৩৬৫ কোটি মানুষের সম্পদের সমপরিমাণ সম্পদ আজ জমা হয়ে পড়েছে। ৯৯ জন বনাম একজন- এভাবে বিভাজিত হয়ে পড়ছে মানুষ। 

বাংলাদেশের ৬ কোটি ৩৫ লাখ শ্রমজীবী মানুষ যারা দেশের রফতানি আয়কে ৪৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছেন, দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন, জিডিপি বাড়াচ্ছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্ফীত করছেন তাদের জীবন কীভাবে কাটছে? ৪০ লাখ পোশাক কারখানার শ্রমিক, ৩০ লাখ নির্মাণ শ্রমিক, ৫০ লাখ পরিবহন শ্রমিক, রি-রোলিং শ্রমিক, তাত, চা, মেকানিক্স, গৃহকর্মী, হোটেল রেস্টুরেন্ট, দোকান কর্মচারীসহ বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত শ্রমিক এবং ২ কোটি ৬০ লাখ কৃষি শ্রমিকদের জীবনে গণতন্ত্র সমমর্যাদা কথাগুলোর প্রয়োগ হচ্ছে কীভাবে? দেশে প্রাতিষ্ঠানিক খাত ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে পড়ছে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মাত্র ৭৩ লাখ শ্রমজীবী মানুষ অথচ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ৫ কোটি ৬২ লাখ, তাদের কাজের এবং মজুরির নিশ্চয়তা নেই। কারখানা শ্রমিকদের ইউনিয়ন অধিকার স্বীকৃত হলেও কার্যত ট্রেড ইউনিয়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মাত্র ২৪/২৫ লাখ শ্রমিক ইউনিয়নের আওতাভুক্ত। প্রশ্ন উঠছে, শ্রম আইন ২০০৬ এবং সংশোধিত শ্রম আইন ২০১৩ ও ২০১৮ এর পরও শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার বাড়ছে না কেন? তাই দুই লাখের বেশি শিল্প ইউনিট থাকলেও ইউনিয়ন আছে ৮ হাজারের সামান্য বেশি। সবচেয়ে আলোচিত পোশাক কারখানা সেক্টরে ৪ হাজারের মতো কারখানা থাকলেও ইউনিয়ন আছে মাত্র ৭০০। এসব ইউনিয়নের বেশিরভাগ যে কার্যকর কমিটি নয় তা বোঝা যায় এসব ইউনিয়নের পক্ষ থেকে কোনো আন্দোলন না করা দেখে। জীবিকার জন্য কাজ করতে এসে স্বল্প মজুরি আর কর্মক্ষেত্রে জীবন হারালে যৎসামান্য ক্ষতিপূরণের আইন দেখলে বুঝা যায় বাংলাদেশের শ্রমিকের অবস্থা। ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে ১৮৮৬ সালে জীবন দিয়েছে শ্রমজীবী মানুষ কিন্তু দেশে ও বিদেশে আজও তা সর্বক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হয়নি। বরং বিশেষ বিধানের নামে অতিরিক্ত সময় কাজ করানো আইন সঙ্গত করা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা আর পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকি শ্রমজীবী মানুষের জীবনে এক ভয়াবহ সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। 

শ্রমিকের জীবনের দুর্দশা কোনো অদৃষ্ট নিয়ন্ত্রিত ব্যাপার নয়। এর কারণ হলো শোষণ। তাদের আকাঙ্ক্ষার সেই শোষণমুক্ত সমাজ নির্মাণের লক্ষ্যে শ্রমের মর্যাদা, শ্রমিকের শ্রমের ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ-পুনর্বাসন আর সংগঠিত হওয়ার সংগ্রাম খুব গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাদের উচ্ছেদ ছাড়া এ আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। পুঁজিবাদ উচ্ছেদ আর সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে পথ দেখাতে মে দিবস আসে তাই প্রেরণার উৎস হিসেবে।


রাজেকুজ্জামান রতন, কেন্দ্রীয় সদস্য, বাসদ

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh