শুদ্ধি অভিযান সম্পর্কে কয়েক ছত্র

সাইফুল হক।

সাইফুল হক।

রাজনীতিতে এখন মুখরোচক আলোচনার বিষয় শুদ্ধি অভিযান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন যে, তিনি তার ঘর থেকেই এই শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। মানুষ যেন সমালোচনা করতে না পারে সেজন্য আগে নিজের ঘর পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ইতিমধ্যে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রধান নেতৃত্বকে অপসারণ করা হয়েছে; বলা হচ্ছে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে স্বচ্ছ ইমেজের সংগঠকদের দায়িত্বে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, মূল দল আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়েও শুদ্ধি অভিযান পরিচালিত হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে নানা লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, জবরদখল, ক্যাসিনো বাণিজ্যের প্রায় অবিশ^াস্য ঘটনাবলি এবং এসবের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা যেভাবে বেরিয়ে এসেছে, তা সরকারি দলের জন্য রীতিমতো লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে মুখ রক্ষার জন্য লজ্জা ঢাকার প্রকল্প হিসেবে এদের অপসারণ ও তাদের একাংশের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, গ্রেফতার প্রভৃতি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে আইন আবার সবার জন্য সমান নয়। এসব লীগের মধ্য পর্যায়ের কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হলেও বরখাস্ত হওয়া শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে এখনো গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়নি। তারা অধিকাংশই বহাল তবিয়তেই আছেন। 

কথিত শুদ্ধি অভিযানে আরও কিছু মাঝারি ও নিচের সারির চুনোপুঁটি হয়তো গ্রেফতার হবেন, শাস্তি পাবেন; কিন্তু গ্রেফতারকৃতদের আসল নেতারা, গডফাদারেরা যে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবেন, তা অনুমান করা কঠিন কোনো ব্যাপার নয়। কারণ গোড়া ধরে টান দিতে গেলে দুর্নীতি-লুণ্ঠন-চাঁদাবাজি-দুর্বৃত্তায়নের যে ভয়াবহ চেহারা বেরিয়ে আসবে, সরকারের পক্ষে তা সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। লোম বাছতে কম্বল উজাড়ের মতো পরিস্থিতি দেখা দেবার আশঙ্কা রয়েছে।

আগের সব সরকারের ধারাবাহিকতায় বর্তমানেও রাষ্ট্রের নানা প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, নানা সহযোগী সংগঠন ও নেতৃত্বের বড় অংশই দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। বস্তুত বিএনপি-জামায়াত সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চুরি, দুর্নীতি, লুণ্ঠন, চাঁদাবাজি ও জবরদখলকে তারা তাদের শাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত করেছে। দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান হয়তো এখন আর আগের মতো শীর্ষে নেই; বরং ১৩/১৪ নম্বরে। কিন্তু এর প্রবল ক্রমবিস্তার নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই তারকা দুর্নীতিবাজ ও তাদের সিন্ডিকেটসমূহ এত শক্তিমান যে, ক্ষেত্র বিশেষে তারা সরকারকেও জিম্মি করে ফেলে। রাজনৈতিক ও নৈতিক বৈধতার ক্ষেত্রে গুরুতর সংকট থাকায় সরকার এদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো ব্যবস্থাও নিতে পারছে না। প্রকৃতপ্রস্তাবে এদের এক বড় অংশ এখন সরকারেরই অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক যখন প্রশ্ন করলেন, ক্যাসিনো ও সিন্ডিকেটের হোতাদের পাশাপাশি যারা ব্যাংক ও শেয়ারমার্কেট লুট করেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা- এই প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী সুস্পষ্ট ঘোষণা দেবার পরিবর্তে দ্ব্যর্থবোধক উত্তর দিয়েছেন। সাংবাদিকদেরকে আরও দেখার ও অপেক্ষা করারই পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

এই সত্য সবার জানা যে, সরকারি ক্ষমতা এখন অনেকটা যা খুশি তা করার লাইসেন্সের মতো। ক্ষমতা- বাংলাদেশে দ্রুত/সীমাহীন অর্থ-বিত্ত গড়ে তোলার বড় মাধ্যম। এ দেশে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বলগাহীন অশুভ মিত্রতা এখন এক ভয়াবহ সামাজিক নৈরাজ্যের জন্ম দিয়েছে। এই অসীম স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতায় ভাগ বসানোর জন্য ব্যবসায়ীরাও দলে দলে রাজনীতিতে নেমে পড়েছে। টিআইবি প্রদত্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বর্তমান সংসদের ৬০ শতাংশের ওপরে রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি। রাজনৈতিক প্রশাসনিক ক্ষমতা যেন স্বর্গপ্রাপ্তির মতো। যা চাওয়া যায়, তাই পাওয়া যাবে; সবাই ক্ষমতাকেই কুর্নিশ করে। এ কারণে কেউ ক্ষমতার বাইরে থাকতে চায় না; নিদেনপক্ষে এই বলয়ের বারান্দা বা উঠানে ঘোরাফেরা করলেও অনেক লাভ। একই কারণে বিরোধী দলে বা বিরোধী শিবিরে পারতপক্ষে কেউ যেতে বা থাকতে চায় না। তাই হাল আমলে রাজনীতিতে প্রায়শই ডিগবাজির যে ঘটনা দেশবাসী প্রবল কৌতূহলের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে তারও উৎস এখানেই। আমরা সার্কাসের ভাড়দের ডিগবাজি দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম, এখন রাজনীতিবিদদেরটাও হজম করতে হচ্ছে।

গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নে আরেকটি বড়মাত্রা যুক্ত হয়েছে। শাসকশ্রেণির পক্ষভুক্ত বা তাদের আশপাশে থাকা রাজনৈতিক দলসমূহের প্রধান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বেশুমার অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। ২০০৭-এ ১/১১-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাদের অনেককেই শাস্তি পেতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনে পর আবার অধিকাংশের দায়মুক্তিও ঘটেছে। মজার ব্যাপার হলো দেখা যায়, একই অভিযোগে কেউ কেউ যখন শাস্তিভোগ করছে; তখন আরেকদিকে বড় অংশের একদল দুর্নীতিবাজ সরকারি ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে দুর্নীতির মামলা খারিজ করিয়ে নিজেদের সাফসুতরো করে নিয়েছে। আর এসব দলের প্রধান নেতারা যথেচ্ছাচার করার একধরনের ক্ষমতাও ভোগ করেন, তারা অনেকে ‘অটো দায়মুক্তি’ও নিয়ে নেন। দল চালাতে গেলে এসব করতে হয়, কর্মী-সমর্থকদের এরকম ধারণাই দেয়া হয়। এইসব মেনে নেবার জন্য তাদেরকে মনস্তাত্বিকভাবে গড়ে তোলা হয়। এটাই হয়তো প্রাগমেটিক রাজনীতি। এইভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঘিরে দলের অভ্যন্তরে নানাধরনের দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এসব তৎপরতার সঙ্গে বস্তুত জনকল্যাণ, দেশসেবা বা তাদের ঘোষিত নীতি আদর্শের বিশেষ কোনো সম্পর্ক নেই। চিহ্নিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তরা রাজনীতিতে ঢুকে এই পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটিয়ে চলেছে।

চলমান কথিত শুদ্ধি অভিযান এই অপরাজনীতির মূলোৎপাটনের কোনো ক্ষমতা রাখে না; সরিষার মধ্যেই যে ভূত! খুব আশাবাদী ও ইতিবাচকভাবে বলতে গেলে বিদ্যমান অভিযানকে বড়জোর দেখা যেতে পারে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নকে সহনীয় পর্যায়ে আনার হাতুড়ে প্রচেষ্টা হিসেবে। আশঙ্কা করা অমুলক নয় যে, এইসব তৎপরতাও অবিলম্বে হোচট খাবে, মুখ থুবড়ে পড়বে। কারণ বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার অনিবার্য অনুষঙ্গই হচ্ছে দুর্নীতি-লুণ্ঠন-আর জবরদখল, কার্যত এখানকার পুরো ব্যবস্থারই পচন ধরেছে; যে কারণে উপরে প্রলেপ দিয়ে এই রোগী বাঁচানো কঠিন। বিদ্যমান গোটা রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও সমাজের আমূল পরিবর্তন ছাড়া দুর্নীতি নামের এই দানবের থাবা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না।

লেখক: সাইফুল হক
সাধারণ সম্পাদক, 
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি।

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh