নির্বাসিত সুবচন ও ছাত্র রাজনীতির একাল-সেকাল

আবুল খায়ের, অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম পরিচালক, পিএমও।

আবুল খায়ের, অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম পরিচালক, পিএমও।

‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’- কবিতার সেই ছেলেটি বড় হওয়ার মত পরিবেশ কি আমরা সৃষ্টি করতে পেরেছি? আজকের শিশুদের উদ্দাম শৈশব আমরা কিনে নিয়েছি প্রযুক্তি আর বিদেশি চটকদার খাবারের বিনিময়ে। ঘরে বসেই আঙুলে চাপ দিয়ে বিশ্বকে হাতের মুঠোয় আনা আজকের শিশুদের এখন উচ্চৈঃস্বরে সীতানাথ বসাক লিখিত আদর্শ লিপির ‘সদা সত্য কথা বলিবে, গুরুজনদের ভক্তি করিবে, ওষুধি ফল পাকিলে মরে’ ইত্যাদি মুখস্ত করার প্রয়োজন পড়ে না। মাটির তৈরি হাতি-ঘোড়া বা হাঁড়ি পাতিল, লুডু, বাগাডুলী, ডাংগুলি, সাতচারা, মার্বেল, লাটিম বা চোর-পুলিশ খেলার পরিবর্তে প্রযুক্তি নির্ভর আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে শত্রু শিবিরে প্রবেশ করে কাল্পনিক হত্যা করে বিজয়ের আনন্দে মেতে ওঠে আজকের শৈশব। হারানো দিন তথা এনালগ যুগের খেলাধুলায় সঙ্গী-সাথীর প্রয়োজন ছিল বলেই, পারস্পরিক নির্ভরতা ও আন্তরিকতা সহজেই গড়ে উঠত। এখনকার শৈশব বদ্ধ ঘরে বন্দি। কোনো সাথী ছাড়াই আঙ্গুল চেপে তারা অদ্ভূত ধরনের মারণাস্ত্র দিয়ে শত্রু নিধন করে, শৈশবের আসল স্বরূপ এরা জানতে বা বুঝতে পারবে না, সেটাই স্বাভাবিক। একা একা বড় হয়ে ওঠা এই প্রজন্ম তাই কোনো রকম শেয়ারিং জানে না, সম্পর্ককে যত্ন করতে শেখে না, আর এভাবেই তারা হয়ে উঠছে অমানবিক। ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’ কথাগুলো এখন তাই কেবলই কাগুজে হয়ে রয়েছে, বাস্তবতা বড়ই করুণ।

গত ৬ অক্টোবর গভীর রাতে বুয়েটের মেধাবি ছাত্র আবরার ফরহাদকে ছাত্র রাজনীতির লেবাস পরে কিছু মেধাবী-সন্ত্রাসী পিটিয়ে হত্যা করে, যা কেবল এদেশেই নয়, বিশ্ব বিবেককেও নাড়া দিয়েছে। ছাত্র রাজনীতির অতীত ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, স্বাধীনতা-পূর্ব মুসলিম লীগের হয়ে তৎকালীন বটতলার উকিলখ্যাত গভর্নর মোনায়েম খাঁ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরোধী ছাত্র রাজনীতির চর্চা বন্ধে এনএসএফ-এর মাধ্যমে ত্রাসের রাজনীতি সৃষ্টি করেছিলেন। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন আর ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ছিল এনএসএফ এর মূল টার্গেট। এই সময় তৈরি হয় এনএসএফ এর মূল সন্ত্রাসী সাইদুর রহমান ওরফে পাঁচ পাত্তুর মতো দলীয় মাস্তান। প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো পাঁচ পাত্তুর অমানবিক আগ্রাসী ভূমিকায় ত্রস্ত ছিল। ১৯৬৮ সালে বকশীবাজারের অছাত্র মাস্তান মজনু স্টেডিয়ামের গেটে চাকু দিয়ে পাঁচ পাত্তুকে হত্যার পর অন্য প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো হাঁফ ছেড়ে বেঁচে আইয়ূববিরোধী আন্দোলন শুরু করে। এর আগে আরেকটি হত্যাকা- ঘটে ১৯৪২ সালে। ওই সময় এক সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা নাজির আহমদ নিহত হন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মাসলম্যান হিসেবে খসরু-মন্টু আর সেলিম এগিয়ে আসে এবং ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) এর হয়ে আজিমপুরের সেবক-সজীব ভ্রাতৃদ্বয় ছাত্র রাজনীতির ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়। ছাত্রলীগের হাত ধরে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হলেও কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি ছিল না। ফলে কাউকে খুশি করা বা উচ্চ পদে আসীন হওয়ার প্রতিযোগিতা না থাকায় ভিন্ন মতকে দমিয়ে রাখতে কাউকে নির্যাতন করতে দেখা যায়নি। ১৯৭৩ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২ বছরের ইতিহাসে দুটি খুনের ঘটনা প্রমাণ করে, এদেশের  শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল।

কিন্তু ১৯৭৩ সালের পর দৃশ্যপট পাল্টে যেতে থাকে।  মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী সংগঠন ছাত্রলীগ যুদ্ধ-পরবর্তী আদর্শ ও স্বার্থ-দ্বন্দ্বে জড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পরে। ফলে ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে সংঘটিত হয় সাত ছাত্রহত্যার মতো নারকীয় ঘটনা। স্বাধীনতা-উত্তর তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি মুসলিম লীগ নেতা ও সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার মরহুম গমিরউদ্দিন প্রধানের ছেলে সদ্য প্রয়াত শফিউল আলম প্রধান নিজস্ব বলয়কে শক্তিশালী করার জন্য ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সাত জনকে খুন করিয়ে অমানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন  করেছিল। এরপর থেকে শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতার রাজনীতি চলতে থাকে অবাধ গতিতে। জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নেয়। ১৯৯৩ সালে নিউইয়র্ক টাইমস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘বিশ্বের সর্বাধিক সংঘাতপূর্ণ  শিক্ষাঙ্গন’ বলে চিহ্নিত করে। বিগত ১৯৭৮ সালে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অংগ সংগঠন হিসেবে ছাত্র সংগঠন রাখার বাধ্যবাধকতার আইন করায় ছাত্র সংগঠনগুলো লেজুড়বৃত্তিতে জড়িয়ে পড়ে, যা আজ পর্যন্ত বিদ্যমান। নেতা বা নেত্রীকে খুশি করে উচ্চতরপদে আসীন হয়ে অর্থবিত্ত করায়ত্ত করার আদর্শহীন ছাত্র রাজনীতিই এখন চলছে। সময়ের পরিক্রমায় প্রতিনিয়ত নিজস্ব ইমেজ হারাচ্ছে ছাত্র রাজনীতি। স্বাধীনতা-উত্তর ‘ব্রিফ কেস’ ব্যবসায়ীদের মতো স্বল্প পরিশ্রমে অগাধ সম্পদের মালিক হতে নীতি নৈতিকতার পিঠে ছুরিকাঘাত করে চলছে। বিশেষ করে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের আশীর্বাদ থাকায় ধরাকে সরা জ্ঞান করে বলেই সম্প্রতি দু’জন শীর্ষস্থানীয় ছাত্র নেতা পদ হারিয়েছেন। রাজনীতিতে অছাত্র বা অসৎ চরিত্রের ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আনা বা ষাটোর্ধ ব্যক্তিকে যুব সংগঠনের নেতৃত্বে রাখার ফল ইতিমধ্যে দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র অসন্তোষ ও প্রশাসনের অপরিকল্পিত কৌশলহীন নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত সিদ্ধান্ত এবং অদক্ষ ও অভদ্র আচরণের ভিসি নিয়োগ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। একদিকে ছাত্র নেতৃবৃন্দ চাঁদা-টেন্ডারবাজিতে জড়িয়ে অবৈধ অর্থ আয়ের সুযোগ করে নিচ্ছে। অন্যদিকে ধর্ষণের সেঞ্চুরি করে বুক ফুলিয়ে ঘোষণার মতো চরম অনৈতিক ধৃষ্টতা প্রদর্শন করছে, যা চলমান রাজনীতির দৈন্যতার বহিঃপ্রকাশও বটে। অগ্রজ নেতাদের সম্পদের পাহাড় দেখে ক্ষমতাবানদের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে বিত্তশালী হবার মানসিকতায় নেতা-নেত্রীকে খুশি করে উপরে উঠবার চেষ্টায় ভিন্ন মত দমনে বুয়েটের নির্মম ঘটনাটি ঘটেছে বলে বিশ্বাস করার যথেষ্ট উপাত্ত রয়েছে। কারণ, নিহত আবরারের স্ট্যাটাসটির কোথাও বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীবিরোধী কোনো শব্দ পাইনি। বরং অনুযোগ ছিল দেশ বিভাগের পর (১৯৪৭) ভারত কর্তৃক তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের অনুরোধে কলকাতা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি প্রদান না করায় তড়িঘড়ি করে মোংলাবন্দর চালু করতে হয়েছিল। নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার্থে ভারত তাদের দেশের উত্তর থেকে বাংলাদেশে কয়লা রপ্তানি বন্ধ করেছে। এ ছাড়া স্বীয় দু’রাজ্যের অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনে ভারতের ব্যর্থতার উল্লেখও করেছে সে। পক্ষান্তরে ত্রিপুরার সাবরুম মহকুমায় পানের জন্য ফেনী নদী থেকে ১.৮৬ কিউসেক পানি প্রত্যাহারের অধিকার ভারতকে দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে আমাদের তিস্তা নদীর পানি বণ্টনে ভারতের মানবিকতার অনুপস্থিতির ইঙ্গিত করেছে। কিন্তু এই মত প্রকাশ করায় আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করার কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। 

নিয়মানুযায়ী দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিটি ছাত্রাবাসে বা হলে সিট বণ্টনের একক দায়িত্ব প্রশাসনের পালন করার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না বলেই, সিটকে কেন্দ্র করে হলগুলোতে নানা রকম সুবিধার রাজনীতি হয়। গড়ে ওঠে ‘টর্চার সেল’। ছাত্রাবাসগুলোতে কার স্বার্থে, কেনো ‘টর্চার সেল’ গড়ে উঠেছে, এর জবাব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনকে দিতে হবে। দলীয় বিবেচনায় অযোগ্য আর অপরিণামদর্শী উপাচার্যের হাতে দায়িত্ব অর্পণ করা হলে গোপালগঞ্জের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ছাত্র অসন্তোষ নৈমিত্তিক ঘটনা হতে বাধ্য। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকে এযাবত বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ে মোট ১৫১ জন শিক্ষার্থী হত্যার বিচার ও শাস্তি না হওয়াও আবরারের নিহত হওয়ার অন্যতম একটি কারণ। আইন করে এতদঞ্চলে ছাত্র রাজনীতির যাত্রা হয়নি, তাই আইন করে তা বন্ধ করার দাবিটি হাস্যকর। বরং ছাত্র রাজনীতিকে কলুষমুক্ত ও দুর্বৃত্তায়ন থেকে মুক্ত করে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। জাতীয় নেতা তৈরির কারখানাকে এখনই প্রস্তুত করা দরকার, যাতে মেধাবি আগামী প্রজন্ম সন্ত্রাসী বা হন্তারক হয়ে বেরিয়ে না আসে।

লেখক: আবুল খায়ের 
অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম পরিচালক, পিএমও।


মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh