আসাম নিয়ে বাংলাদেশের দরকার সতর্ক পর্যবেক্ষণ

আহমদ রফিক। ফাইল ছবি

আহমদ রফিক। ফাইল ছবি

বিজেপির শাসনামলে ব্যাপকভাবে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দেওয়া হচ্ছে—দেশের ভেতরে এর প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল আর ঘটনাকে তাদের অভ্যন্তরীণ চরিত্রের হিসেবে থাকতে দেবে না। কারণ প্রাক-দেশ ভাগ ও বিভাগোত্তর ‘বঙ্গাল খেদা’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী বিতাড়ন’ রাজনীতির উগ্র অহোমি জাতীয়তাবাদী ধারার সর্বশেষ পরিণাম সম্প্রতি আসামে নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ। এর লক্ষ্য, কারা আসামে থাকার যোগ্য নয়, তাদের চিহ্নিত করা।

কিন্তু এতে রয়েছে অহোমি জাতীয়তার নামে ব্যাপক রাজনৈতিক গোঁজামিল। শুরুতে অনাসামিদের আসাম থেকে বিতাড়নের যে স্লোগান তোলা হয়েছিল, তা এখন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী গেরুয়া আন্দোলনের কল্যাণে অহিন্দু, তথা মুসলমান বিতাড়নের সাম্প্রদায়িক নীতি ও সিদ্ধান্তে পরিণত। যদি আরো স্পষ্ট করে বলা যায়, তা হলো ১৯৫১ সালের পর যেসব দরিদ্র বাঙালি মুসলমান অর্থনৈতিক কারণে আসামে গিয়ে থিতু হয়েছিল, তাদের তাড়ানোই এ নাগরিকপঞ্জির লক্ষ্য।

লক্ষ করার বিষয়, সময়টা ভারত বিভাগ ও বাংলা বিভাগের সময় নয়। তবে শিলচর কাছাড় এলাকায় বাঙালি অধিবাসীদের ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত অধ্যায়ের কারণেই কি না বলা কঠিন, আসামের সমতল এলাকায় বিস্তর বাঙালি বিশেষত বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ অনাসামি হওয়া সত্ত্বেও এ অমানবিক পদক্ষেপের শিকার নয়।

এদেরও বড়সড় অংশ পূর্ববঙ্গ থেকেই গিয়েছিল জীবনে অধিকতর সুস্থিতির সন্ধানে। রাজনৈতিক নয়া মেরুকরণের টানে উগ্র অহোমি জাতীয়তাবাদ এখন উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদে রূপান্তরিত। বিজেপি যে নতুন রাজনৈতিক চেতনার পত্তন ঘটাতে চাচ্ছে, ভারতজুড়ে তার মর্মবস্তু হিন্দু ভারতীয় জাতীয়তাবাদ। এখানে অহিন্দুর স্থান নেই।

এ রাজনীতিতে ভারতের সেক্যুলার সংবিধান এদের চোখে যেমন অস্বীকৃত, তেমনি আদর্শগত বিচারে অস্বীকৃত রামমোহন-রবীন্দ্রনাথদের ভারতীয় বহুত্ববাদ। একের মধ্যে বহুর অবস্থান বহুমুখী ভিন্নতা নিয়ে। গণতন্ত্রী ভারতকে ধর্মীয় হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে চলেছে বিজেপি। তার একটি পার্শ্বমুখ আসামে নাগরিকপঞ্জির কৌশলে বাঙালি মুসলমান বিতাড়ন।

আমার মনে পড়ছে ১৯০৫ সালের একটি রাজনৈতিক কৌশলের ঘটনার ভিন্নধর্মী পরিণামের সম্ভাবনার কথা এবং ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় দুষ্টবুদ্ধি লর্ড কার্জনের বঙ্গ ভাগ করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নিয়ে একটি শাসনতান্ত্রিক অঞ্চল বঙ্গ-আসাম প্রদেশ গঠনের কথা (১৯০৫)। উদ্দেশ্য ব্রিটিশবিরোধী বঙ্গীয় বিপ্লবী আন্দোলন দমন ও দেশপ্রেমী বাঙালিকে শায়েস্তা করা।

প্রথম কথা, এ ভাঙা-গড়ায় আসামের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? এ প্রদেশ গঠনে পূর্ববঙ্গকে প্রাধান্য দেওয়া হয় একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের অধীনে শাসিত এ অঞ্চল তথা প্রদেশের মূল রাজধানী করা হয় ঢাকাকে। এতেই বা অহোমি প্রতিক্রিয়া কী ছিল? তারা কি নতুন ব্যবস্থায় শাসিত হতে বিরোধিতার প্রকাশ ঘটিয়েছিল? তৎকালীন সংবাদাদি তেমন পরিচয় দিয়েছিল বলে জানি না।

ধরা যাক ব্রিটিশ শাসনের যদি সুবুদ্ধির উদয় না হতো, বঙ্গভঙ্গ রদ না হয়ে পূর্ববঙ্গ-আসাম যৌথ অঞ্চল/প্রদেশ স্থায়িত্ব পেয়ে যেত, তাহলে বঙ্গীয় অহোমি সম্পর্কের পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াত? ভারতে ইংরেজ শাসনের অসচেতন ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গঠনের এ বিপরীত ব্যতিক্রম ব্যবস্থার পরিণাম কোথায় গিয়ে দাঁড়াত? ভাষিক জাতিসত্তা-ভিত্তিক সংঘাত, নাকি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, ভারতীয় বহুত্ববাদের প্রতীকী রূপে?

আমি ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা নই বিধায় এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারছি না। তবে মানবস্বভাবে সহাবস্থানের যে প্রকৃতিগত মানসিকতা আছে, তা প্রাধান্য পেলে সংঘাত বড় হয়ে উঠত না। অবশ্য জাতীয়তাবাদী উগ্রতা প্রধান হলে অনেক রক্ত ঝরত—যেমন ঝরেছে বিশ্বে ফ্যাসিস্ট শক্তির উগ্রতার কল্যাণে।

রবীন্দ্রনাথ ‘ন্যাশনালিজম’ প্রবন্ধাবলি লিখে বৃথা উগ্র জাতীয়তাবাদের তীব্র বিরোধিতা করেননি (১৯১৭)। অবশ্য তাতে শান্তিবাদী, উদার জাতি-চেতনার রবীন্দ্রনাথ যথেষ্ট সমালোচিত হন দেশে-বিদেশে (অবশ্য প্রশংসিত হন রঁলা প্রমুখ শান্তিবাদীর সুবচনে। তিনি স্বদেশি উগ্র জাতীয়তাবাদকেও ছাড় দেননি, যদিও সেটা ছিল দ্বিমাত্রিক—একই সঙ্গে ইতিবাচক ও নেতিবাচক। রবীন্দ্রনাথ নেতিবাচক দিকটিরই বিরোধিতা করেন, সে সূত্রে গান্ধী-রাজনীতির একপর্যায়ের বিরোধিতা। প্রচণ্ড তিক্ত সমালোচনার মুখেও নিজ অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াননি। যদি বলি সেই উগ্র হিন্দুপ্রধান জাতীয়তাবাদেরই বিসর্পিল ধারাবাহিক রাজনৈতিক প্রকাশ বিজেপির বর্তমান হিন্দু জাতীয়তাবাদ, তাহলে কি খুব ভুল বলা হবে?

নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ কি আসামের ছোটখাটো অথচ গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাসাদের ঘটনাটিকে রাজনৈতিক তাৎপর্যে ভবিষ্যতের জন্য অশুভ পরিণাম ডেকে আনছেন না! ভারতের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কিছুসংখ্যক মানুষ এ অশুভ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, লিখছেন কোনো কোনো বিচক্ষণ সাংবাদিক একই ধারায়।

আসাম সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের মদদে এ অশুভ পদক্ষেপের মাধ্যমে বহু লাখ আসামবাসীকে (মুসলমানদের) রাষ্ট্রহীন, নাগরিকত্বহীন, সর্বোপরি অস্তিত্বহীন করে তুলছে হিটলারি কায়দায়। যার কিছুটা প্রতিফলন কিছুদিন আগে দেখা গেছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বর্মী সামরিক জান্তার কল্যাণে। রোহিঙ্গারা বাস্তুচ্যুত, নাগরিকত্বচ্যুত এবং রাষ্ট্রহীন অবস্থায় এখন বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে।

তাই মানবিক চেতনার তাগিদে এ ক্ষেত্রে (আসাম) জাতিসংঘের আহ্বান : ‘কাউকে রাষ্ট্রহীন করবেন না।’ আসামে পূর্বোক্ত নাগরিকত্ব নিবন্ধনে ১৯ লাখ লোক বাদ পড়ায় উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে পূর্বোক্ত আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন। প্রক্রিয়ার অতিমাত্রিক কঠোরতার কারণে অথবা সেই সঙ্গে বিশেষ রাজনৈতিক কারণে বিজেপি এ তালিকা সঠিক বলে মনে করছে না।

বাংলাদেশের একটি দৈনিক পত্রিকায় এ সম্পর্কে একটি লক্ষণীয় শিরোনাম : ‘বিজেপি বলছে, ভুলে ভরা তালিকা মানি না’। বিজেপির এই পল্টি খাওয়া মুসলমানপ্রীতির জন্য নয়। এই ১৯ লাখের মধ্যে বহু হিন্দু নর-নারী রয়েছে, যারা পূর্বোক্ত সময়সীমার শিকার। স্বভাবতই বিজেপির এখন লেজে-গোবরে অবস্থা। হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মহাসংকটের সম্মুখীন বিজেপি তথা মোদি শাসনদণ্ড।

তাই রব উঠছে, ‘মানি না, মানি না’। আসাম সরকার বিজেপিপন্থী হলেও অহোমি জাতীয়তাবাদের উগ্রতায় সিক্ত। তাই এ বিপত্তি। বিজেপি এখন এ তালিকার সংশোধন চায়। সংশোধন হয়তো হবে, তাদের কেন্দ্রের ইচ্ছাপূরণ আংশিক হলেও হতে পারে। এরই মধ্যে অন্য ভ্রান্তির কারণে বহুসংখ্যক স্থানীয় উপজাতীয় জনসংখ্যা তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এ ছাড়া বাদ পড়ার বেশ কিছু চমকপ্রদ উদাহরণ তুলে ধরেছে একাধিক সংবাদ প্রতিবেদন।

প্রতিক্রিয়া ক্রমে ব্যাপক হতে শুরু করেছে রাজনৈতিক অঙ্গনে, যার যার স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে। এর মধ্যে একাধিক ঘটনাসহ বিস্ফোরক খবর—স্বনামখ্যাত উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়ার স্ত্রী-পুত্রসহ নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি ওই নাগরিকপঞ্জিতে। তাই চারদিক থেকে তোপ দাগা হচ্ছে নাগরিকপঞ্জিকে ঘিরে। বাদ যাননি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রান্তিক জেলার হিসেবে তার ভোট ব্যাংকে হাত পড়ার মতো অবস্থা। সেটা তিনি সহ্য করবেন কেন?

সব ঘটনা মিলে নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি দল একটু অস্বস্তিতে, ব্যক্তিবিশেষ ক্ষুব্ধ আসাম সরকারের নৈরাজ্যিক কর্মকাণ্ডে ওই নাগরিকপঞ্জিকে কেন্দ্র করে। ভারতের সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তাঁবুতে কিছুটা সুবাতাসের ক্ষণিক ঝলক। তারা চাইছে এ পরিস্থিতির যতটা সম্ভব সুযোগ নিতে।

কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সতর্ক পর্যবেক্ষণের পরিবর্তে এর বিপরীত পথে হাঁটছে। গুটিকয় বিবৃতির সংবাদ শিরোনাম তেমন কথাই বলছে। আসামের অর্থমন্ত্রীর মন্তব্- ‘তালিকাবহির্ভূতগণ বাংলাদেশের লোক’ সঠিক বলে মনে করেন না শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মতিন খসরু। তিনি একই কথা বলছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কেও।

কিন্তু ঘটনা এত সহজ-সরল নয়। অনেক জটিলতার কারণে এখন খোদ বিজেপির মধ্যেই ভিন্নমত, ক্ষোভ, সমালোচনা প্রকাশ পাচ্ছে। তাই আমরা বলছি ঘটনাক্রমের প্রতি সতর্ক পর্যবেক্ষণের কথা। কারণ প্রতিবেশী রাজ্যে যদি বিপুলসংখ্যক লোক নাগরিকত্বহীন, রাষ্ট্রহীন হিসেবে ঘোষিত হয়, তাহলে তারা কোথায় যাবে।

যেকোনোভাবে—বৈধ বা অবৈধভাবে তাদের লক্ষ্য হবে পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশী দেশ, যা আসলে বাংলাদেশ। ভুলে যাওয়া ঠিক নয় যে আসামি উগ্রপন্থী ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ‘অনুপ্রবেশ’ প্রশ্নে নিয়মিত বাংলাদেশবিরোধী প্রচার চালিয়ে স্থানীয় জনমত সংগঠিত করছে। সে সুযোগ নিয়েছে বিজেপি এবং নির্বাচনে জিতেছেও।

তাই আসামের নাগরিকপঞ্জির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশের ভীতির বা শঙ্কার কারণ নেই—এমন ভিত্তিহীন ভাবনা নিয়ে নিশ্চিন্ত বসে থাকাও বাংলাদেশের পক্ষে ঠিক হবে না। ঘটনার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখে নীতি ঠিক করতে হবে। ‘অনুপ্রবেশ’ প্রশ্নে মোদি সরকার যে অনড়, কিছুদিন আগে ঢাকায় ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের সময় তা বোঝা গেছে। এরপর আসাম প্রশ্নে বাংলাদেশ কিভাবে নিশ্চিন্ত থাকবে?

লেখক: কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী।

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh