ঢাকা মসজিদের শহর, মদ-জুয়ার শহর নয়

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

শুরু করা যাক পাঠকদের জন্য একটা এমসিকিউ (মাল্টিপল চয়েস কোশ্চেন) দিয়ে। প্রশ্নটা হলো, ঢাকা শহরকে কী বলা হয় : (ক) ভেজালের শহর, (খ) মসজিদের শহর, (গ) ক্যাসিনোর শহর। এর উত্তরে আমার মত সিনিয়র সিটিজেন পাঠকেরা প্রায় সবাই বোধ করি নির্দ্বিধায় বলবেন ঢাকা মসজিদের শহর। কারণ তাঁরা সেই ব্রিটিশ আমল থেকে এই শহরের এই পরিচিতির কথাই শুনে আসছেন। শুধু তাই না, এ নিয়ে তাঁরা এক ধরনের গর্বও অনুভব করেন। সারা বিশ্বের মুসলিম অধ্যুষিত অন্য কোনো দেশ বা শহর নয়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই দেশের রাজধানী শহরটির গৌরবময় পরিচিতি : এটি মসজিদের শহর।

এর পরেই বোধ হয় বলতে হয় এই শহর, তথা এই দেশের সব কিছুতে ভেজালের কথা। শুধু খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য পণ্যসামগ্রীই নয়, ভেজাল এই শহর ও এই দেশের সব কিছুতেই। শাসনব্যবস্থা, রাজনীতি, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য, এমনকি ধর্মকর্ম চর্চায়ও ভেজাল। মানুষগুলোও হয়ে গেছে ভেজাল মানুষ। ফলে ইদানীং যে শব্দটি উঠতে বসতে প্রায়শই উচ্চারিত হয় তা হচ্ছে ‘দুই নম্বরি’। সেই কারণে পাঠকদের অনেকেই হয়তো ঢাকাকে ভেজালের শহর আখ্যায়িত করতে পারেন।

কিন্তু আরেক দল যাঁরা মনেপ্রাণে অতি আধুনিক, এবং সব সময় আক্ষেপ করেন, ঢাকা শহরটাতে এখনো এটা হলো না, ওটা হলো না, শহরটা এখনো ‘ক্ষ্যাত’ হয়ে পড়ে রইল, তাঁরা, আমি নিশ্চিত, এম সি কিউ-র তালিকায় ক্যাসিনো শব্দটি দেখে দারুণভাবে পুলকিত হবেন। যাক বাবা, এই হিন্দু বিধবাদের মত এটা খাই না, ওটা খেতে মানা, বেঁচে থাকতে হবে কেবল হবিষ্যি ভক্ষণ করে, চলতে হবে শুধু কওমি মাদরাসার তালবে ইলিমের মত— এতদিনে তা হলে এরূপ একটা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে বাঁচা গেল। কাঁহাতক আর তিন পাত্তি, হাইড্রোজেন, কাচ্চু, গেইম ইত্যাদির ছুঁচো মেরে মেরে হাত নোংরা করা, আর রাত্রিশেষে দশ হাজার টাকা আউতি আর না হয় বিশ হাজার টাকা যাউতি নিয়ে ‘কায়ক্লেশে’ দিন গুজরান করে চলা যায়। আর মান-ইজ্জতের একটা ব্যাপার আছে না? বিদেশীরা যখন শোনে এই রাজধানী শহরে একটা ক্যাসিনো নেই, ‘পাব’ (পানশালা) নেই, তখন লজ্জায় মাথা কাটা যায়! যাক, এতদিনে একটা বড় চাহিদা পূরণ হলো এই জাতির! এখন আমরা অবশ্যই বলতে পারব, আমাদের পাড়ায় পাড়ায় ক্যাসিনো হয়েছে। শিগগিরই সময়ে-অসময়ে গলা ভেজানোর জন্য মহল্লায় মহল্লায় পাবও হবে। আর হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং অভিজাত এলাকার ভদ্রাসনে ডিসেকা-ড্যান্স ট্যান্স তো বহু আগে থেকেই হালাল হয়ে আছে। আমাদের ছেলেপুলেরা এবার সত্যিকার অর্থে স্মার্ট হয়ে উঠবে। দেশের চোখ ধাঁধানো অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতির পাশাপাশি অবশেষে গল্প করে বলার মত আরো কিছু প্রসঙ্গ পাওয়া গেল।

দুই.
জানি, এতক্ষণ যা বললাম তাতে অনেকেই ভাবছেন আমি একজন চরম হতাশাবাদী (এক্সট্রিমলি সিনিক্যাল) মানুষের মত কথা বলছি। হয়তো তাই। তবে এর একটা কারণ আছে। বিষয়টি একটু খুলে বললেই বুঝতে সুবিধা হবে।

ঢাকা শহর ও পরবর্তী পর্যায়ে চট্টগ্রাম ও আরো দু-একটি মফস্বল শহরে সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেভাবে কয়েকটি জুয়ার আখড়ায় গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে চমক সৃষ্টি করেছে, তা আপামর জনসাধারণের অকুণ্ঠ প্রশংসা ও সমর্থন লাভ করেছে, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি যে তারই বাড়ির পাশে বা এক ঢিলের দূরত্বে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, রোজ রাতে কোটি কোটি টাকার ‘বাণিজ্য’ হয়েছে, অথচ কাকপক্ষীও তা টের পায়নি। দরিদ্র রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নিম্ন পর্যায়ের সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত সব মানুষ—যাদের সংখ্যাই বাংলাদেশের ছোট-বড় সব শহরে বেশি—জুয়াখেলা বলতে বোঝে কোথাও কারো বাড়িতে বা কোনো নিরিবিলি স্থানে বড়জোর ৫/৭ জন বসে ছোট ছোট বাজিতে তাস বা অন্য কিছু খেলা, যাতে হার-জিতের পরিমাণ খুব একটা বেশি হয় না। রাত্রিশেষে এক শ টাকা জিতে খুশি হয়ে পোলাপানের জন্য সামান্য একটু মিষ্টি নিয়ে বাড়ি ফেরা, আর না হয় এক শ টাকা হেরে স্কুল পালানো ছাত্রের হেডমাস্টারের সামনে পড়ে যাওয়ার মত মুখ কালো করে বৌয়ের সামনে হাজির হওয়া। ব্যাপারটা যেহেতু কোনোদিন মিষ্টির হাঁড়ি, আবার কোনোদিন হাঁড়িপানা মুখ তাই এতে সংসারে খুব একটা ঝড়তুফান হয় না।

আর এই প্রসঙ্গে সেই গল্পটা আপনাদের শোনানোর জন্য জিহ্বাটা চুলবুল করছে। ওই যে এক লোক রোজ রাতে জুয়া খেলতে যায়, আর এদিকে তার পাড়াগেঁয়ে আনপড় বৌ রাত জেগে বসে থাকে তার অপেক্ষায়। ঘরে ফেরে স্বামী কোনোদিন একটা টাকাও তার হাতে তুলে দেয় না দেখে সে ভাবে, স্বামী বেচারা বুঝি রোজই হারে। একদিন সে স্বামীকে জিজ্ঞেস করেই বসল, হ্যাঁগো, তুমি কি রোজই হারো নাকি? স্বামী জবাব দিল, না, তা কেন হবে। রোজই হারি না। এই ধরো একদিন জিতি একদিন হারি, এই রকম আর কি। ‘তা হলে যেদিন জিতো সেদিনই তো শুধু খেলতে যেতে পারো, রোজ যাওয়ার দরকার কী?’ বৌয়ের ঝটপট মন্তব্য।

এসবই হচ্ছে চুনোপুঁটি, গামছা পার্টি খেলুড়েদের গল্প। এরা উঠতি যৌবনে গ্রামের আমতলা বটতলায় গামছা বিছিয়ে সেই আমলের বিনি পয়সার তাসের খেলা টুয়েনটি নাইন দিয়ে খেলতে শুরু করে তাস চিনত। তাদের মায়েরা বলতেন, ‘বাবা, জীবনে কোনোদিন তাস ছুঁবি না। তাসে নাশ।’ জানি না এখনো সেই টুয়েনটি নাইন আছে কি না, তবে এখনকার ঢাকার জুয়া সাম্রাজ্যের মুঘলদের অনেকেরই হাতেখড়ি যে হয়েছিল গ্রামের গামছা বিছানো টুয়েনটি নাইনে এবং অনেকের জীবনেই যে মায়ের মুখের সেই প্রবচন ‘তাসে নাশ’ এখন পরিণত বয়সে সত্যি হয়েছে, তা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। এখন রোজ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় যাদের সচিত্র সংবাদ ছাপা হচ্ছে, যারা এতদিন সিনেমার ডাকাত সর্দারদের মত ৪০ জনের বাহিনী পরিবেষ্টিত হয়ে চলাফেরা করতেন, তারা এখনো শ্রীঘরে যাচ্ছেন বাহিনী পরিবেষ্টিত হয়ে, তফাৎ শুধু এখনকার বাহিনী তাদের নিজস্ব অনুগত বাহিনী নয়, এরা র‌্যাব না হয় পুলিশ। এদের প্রায় সবাই ছিলেন কড়ে আঙ্গুল, ক্যাসিনো আর অবিশ্বাস্য রকমের হাই স্টেকের জুয়ার বোর্ডের কল্যাণে হয়েছেন বিশালাঙ্গ বুড়ো বটগাছ, বাদশাহ নামদার।

তিন.
এতদিন পর্যন্ত ঢাকা শহরে সবার চোখের সামনে হাজার হাজার কোটি টাকার এই অবৈধ ক্যাসিনো বাণিজ্য কীভাবে নির্বিবাদে চলে আসছে সেই প্রশ্ন তুলে সরকারের এক সিনিয়র মন্ত্রী বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাঁর এই প্রতিক্রিয়ার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ। কিন্তু সাধারণ মানুষ যদি বলে, স্যার, বাড়ির নিরাপত্তার জন্য আমরা কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা-পয়সা আপনাদের দিলাম, আর আপনারা এত এত আমলা-কামলা নফর-পেয়াদা চৌকিদার-দফাদার রাখলেন, তারা কি সবাই নাকে তেল দিয়ে দিনরাত ঘুমায়? তা হলে দুষ্ট লোকে যে বলে রোজ রাতে তাদের হাতের তালু পিছলা করে তাদেরকে ‘ম্যানেজ’ করেই কায়-কারবার চালিয়েছে এই মহা শক্তিধররা, সেটাই সত্যি? শোনা যায়—শুধু শোনা যায় কেন, দেখাও যায়—রোজ রাতে বড় সাহেবদের অনেকেরই পাদুকাধূলিতে ধন্য হয় কোনো কোনো ক্লাবে তাদের জন্য বিশেষভাবে সজ্জিত দেওয়ান-ই-খাসসদৃশ ভিআইপি এনক্লোজারগুলো, যেখানে স্বল্পবসনা সুন্দরী দেশী-বিদেশী সেবিকা ও সাকী বিবিধ রকমের দুষ্প্রাপ্য পানীয় ও আহার্য বস্তু পরিবেশন ও অন্যান্য ‘সেবা’ প্রদান করে থাকেন। উল্লেখ্য, এই ভিআইপি খেলুড়েরা ক্যাসিনোতে কখনো হারেন না। কারণ রাত্রিশেষে ঢুলুঢুলু নেত্রে স্খলিত চরণে এঁরা যখন গৃহাভিমুখী হন তখন তাঁদের অত্যন্ত বিচক্ষণ হোস্টরা একটি স্ফীতকায় খাম অথবা টাকার থলে নিজের তরফ থেকে তোফা হিসেবে তাঁদের ধরিয়ে দেন। আর মাসভিত্তিক মোটা অঙ্কের মাসোহারা এবং বেগম সাহেবাদের ফুটফরমাশ তো আছেই। বিস্ময় প্রকাশকারী মাননীয় মন্ত্রী বা ওই পর্যায়ের অন্যান্য মাননীয়রা যদি ব্যাপারটি সম্বন্ধে না জানেন, তবে সেটাই বিস্ময়ের ব্যাপার। আর আমজনতা তো এসব বা এ ধরনের আরো সব অপকর্মের শুধু নীরব দর্শক। তাদের ঘাড়ের ওপর দুটো কল্লা নেই যে তারা টুঁ শব্দটি করবে। তবে তারা মুখে সিলগালা লাগিয়ে রাখলেও তাদের ছানাপোনারা মনে মনে স্বপ্নের জাল বুনে, একদিন অমুক ভাই বা তমুক চাচার মত একটা ক্যাসিনোর মালিক হবে, নাম উঠবে দেশের শীর্ষ ধনীদের তালিকায়।

চার.
আমার প্রথম প্রশ্ন, আমরা সব কিছু জেনেশুনেও কেন এই বিষবৃক্ষকে বড় হতে দিলাম। আমার পকেটে বা আমার সংগঠনে নদীর স্রোতের মত টাকা আসবে, তাতে ওই ক্যাসিনোওয়ালার মত না হলেও আমিও ফুলেফেঁপে বটগাছ না হই অন্তত কলাগাছ হব, আমার সংগঠন টাকার জোরে দিনকে রাত রাতকে দিন করতে পারবে, এটাই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হলো? একটা জাতি যে ধ্বংসের পথে পা বাড়াল, একটা প্রজন্ম যে সততা, ন্যায়নীতি ও মেধাচর্চাকে বিসর্জন দিয়ে সব ধরনের দুর্নীতি ও অপকর্মের মাধ্যমে এক লাফে সমাজের মগডালে উঠে পড়াটাকেই জীবনের মোক্ষ বলে গ্রহণ করল, এর পরিণতি কী হতে পারে তা একবারও আমি ভেবে দেখব না? সব ব্যাপারের মত সমাজবিধ্বংসী ক্যাসিনোর বিকাশ ও উৎকর্ষের ব্যাপারেও আমরা ‘কেষ্টা ব্যাটাই চোর’ এবং ‘ব্লেইম গেইম’ নিয়ে মেতে উঠব? গত এক দশক ধরে নাকি এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চলে আসছে। (হবেই তো। তা না হলে একেকজনের বাক্সপেটরা—লকার থেকে নগদে-ডলারে-এফ ডি আর-এ হাজার হাজার কোটি টাকা, আর শত শত ভরি স্বর্ণালঙ্কার বের হয় কী করে?) তা হলে আমরা কি এতদিন জেনেশুনেই এই ক্যাসিনোবিষ পান করে এসেছি? নাকি আমাদের ‘ট্যাসিট অ্যাপ্রুভাল’ (নীরব সমর্থন) ছিল এই অপকর্মে। কেইসটা কী?!

কেউ কেউ আবার ক্যাসিনো দমন অভিযানের শুরুতেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এটাকে তাদের রাজনৈতিক সংগঠনের বিরুদ্ধে চক্রান্ত বলতে চেয়েছেন। (অবশ্য অতি দ্রুত আবার উল্টো বক্তব্য দিয়ে এই প্রচেষ্টাকে সমর্থনও জানিয়েছেন। হয়তো বার্তা পেয়েছেন, এ ব্যাপারে উচ্চবাচ্য করলে খবর হয়ে যেতে পারেন।) চট্টগ্রামের জনৈক মাননীয় সংসদ সদস্য ক্লাবগুলোর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য জুয়ার আসর চালু রাখার পক্ষে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন। তিনিও বোধ হয় ভুলে গেছেন, যাঁর নির্দেশে হঠাৎ করে কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গের মত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জেগে উঠেছে, তাঁর সেই ‘বস্’, যিনি দেশেরও ‘বস্’, এসব দম্ভোক্তি ভালো নজরে নাও দেখতে পারেন। সে যাই হোক, তাঁদের মতান্তর-মনান্তরের ফয়সালা তাঁরাই করবেন। আমাদের প্রত্যাশা, কুম্ভকর্ণ যেন আবার ঘুমিয়ে না পড়ে। ফুটপাত ও নদীতীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের মত আবার যেন স্ফিংসের মত ক্যাসিনো শিল্পের পুনরুত্থান না হয়। সেই সঙ্গে শুধু ছোট মিয়া মাইজ্যা মিয়া নয়, বড্ডা মিয়াদেরও ধরুন, এবং ধরে ধরে দ্রুত বিচারের আওতায় আনুন, তা হলেই কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার প্রমাণ পাওয়া যাবে। আর যাদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে এই বিষবৃক্ষ পত্রপুষ্পপল্লবে আজ বিরাট মহীরুহে পরিণত হয়েছে, তাদের কী ব্যবস্থা হবে? এরা এতদিন মাসোহারাটা, ভেটটা নিয়মিত পেয়ে এসেছে, এদের ছাতার নিচে বেড়ে উঠেছে এই অপকর্মকারীরা, এটা জানার পরও কি কর্তৃপক্ষ ছেড়ে দেবেন এদেরকে? জনগণকে চুনোপুঁটির ঝোল অনেক খাইয়েছেন, এবার না হয় মুখ বদলাতে হলেও রুই-কাতলার পেটিভাজা, মুড়িঘণ্ট খাইয়ে দেখিয়ে দিন আপনারা সব ধরনের পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে, আপনারা আসলেই বিশ্বমানের রন্ধনশিল্পী।

ভালো কথা। শুধু যে একজন রাজনৈতিক নেতা বর্তমান অ্যাকশনে ফুঁসে উঠেছিলেন, আর আরেক সংসদ সদস্য ক্যাসিনো চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন তা নয়; সর্বশেষ দেখলাম সরকারের একজন সচিবও ক্যাসিনো বৈধকরণের সুপারিশ করেছেন। তাঁর যুক্তি, এতে নাকি বিদেশী পর্যটকেরা ঝাঁকে ঝাঁকে বাংলাদেশ সফরে আসবে। বলিহারি ভদ্রলোকের যুক্তি। দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ভেজালের ছড়াছড়ি, আবাসন সমস্যা, যানজট এগুলো কিছুই নয়, ক্যাসিনোর অভাবে নাকি দেশে ট্যুরিস্ট আসে না! হায়, এও শুনতে হলো। তাও একজন সচিব পর্যায়ের নীতিনির্ধারকের মুখে। বলতে ইচ্ছে করছে, ধরণী দ্বিধা হও।...আচ্ছা, এই রকম একটি স্পর্শকাতর নীতিনির্ধারণী বিষয়ে সচিব মহোদয় পাবলিকলি তাঁর মত প্রকাশ করার এখতিয়ার পেলেন কোথায়? তিনি কি একজন রাজনীতিবিদ? হতে পারেন সরকারের খুব আস্থাভাজন পেয়ারা একজন আমলা, তবুও তিনি তো আর চট্টগ্রামের সংসদ সদস্যের মত জনপ্রতিনিধি নন। আবার জানতে ইচ্ছে করে, কেইসটা কী?!!

যাই হোক, মোদ্দা কথা হচ্ছে, আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিবিরোধী কোনো কিছুকেই এদেশে লালন করা যাবে না, তা আপাতদৃষ্টিতে যতই লাভজনক হোক। আর যারা ক্যাসিনো বা এ ধরনের সব দৈত্য-দানোর স্রষ্টা তাদের বিনীতভাবে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, গল্পের ফ্রাংকেনস্টাইনকে কিন্তু শেষটায় তার নিজের সৃষ্ট দানবই হত্যা করে।

পাঁচ.
কথাবার্তাগুলো তেতো হতে শুরু করেছে। শেষ করি ক্লাব অঙ্গনের পুরনো একটি আপ্তবাক্য দিয়ে, যা সত্তরের দশকে আমার এক প্রিয় সহকর্মী আমি কুষ্টিয়া থাকতে শুনিয়েছিলেন। যাঁরা চাকরিতে নতুন প্রবেশ করেছেন, ক্লাব জীবনে অভ্যস্ত হব হব করছেন, তাঁরা কথাটি মনে রাখলে উপকৃত হবেন আশা করি। কথাটি হচ্ছে : ক্লাব থেকে রাতে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরলে বিবি ঠাণ্ডা, ভাত গরম। আর দেরিতে ফিরলে ভাত ঠাণ্ডা, বিবি গরম। এখন বিবেচনা করে দেখুন কোন পথে যাবেন। চয়েস ইজ ইয়োরস্।

আর যাঁরা বাংলাদেশে টাকার ওপর শুয়ে ঘুম যান, অর্থসম্পদ ছাড়া কোনো চিন্তাই যাঁদের মাথায় নেই, তাঁদের উদ্দেশে প্রায় ৬০ বছর আগে শোনা (এবং এখনো যা সব সময় গুনগুন করি) প্রখ্যাত গায়ক মুহম্মদ রফির একটি গজল গানের প্রথম কলিটি নিবেদন করতে চাই : যায়েঙ্গে যব ইহাঁসে কুচ ভি না পাস হোগা, দু’গজ কাফন কা টুকরা তেরা লেবাস হোগা। (যাবে যখন এখান থেকে কিছুই যাবে না সঙ্গে, দু’গজ কাফন শুধু থাকবে তোমার অঙ্গে।)

লেখক : সাবেক সচিব, কবি
tsrahmanbd@yahoo.com

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh