সবুজ পাসপোর্ট

সেলিম সোলায়মান, কবি ও লেখক।

সেলিম সোলায়মান, কবি ও লেখক।

শুরুতেই এমন একটা গল্পের অবতারণা করতে যাচ্ছি, যা শুনেছিলাম আমার সুদূর শৈশবে। গল্পটা এরকম- পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে, পরাধীন বাংলার গ্রামের এক হতদরিদ্র কৃষক জীবনে সুদিন আনার তাড়নায় তার ছেলেকে কায়ক্লেশে পড়াচ্ছিলেন। স্বপ্নবাজ কৃষক পিতা, ধারদেনা করে ছেলেকে শহরে পাঠান, উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার অভিলাষে। কৃতিত্বের সঙ্গেই ছেলে দিতে থাকে, পাসের পর পাস। একই সঙ্গে ক্রমেই হালকা হতে থাকে কৃষক পিতার সঙ্গে পুত্রের বন্ধনের রাশ। সফলতার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে আর বন্ধন ছিঁড়তে ছিঁড়তে, একসময় ছেলে হয়ে ওঠে ছোটখাটো আমলা। কিন্তু কামলা পিতা তার কিছুই জানতে পারেন না। তার কাছ থেকে, ছেলে হয়ে যায় একদম নিখোঁজ। 

তবু স্বপ্নবাজ পিতা আশা ছাড়েন না, তাই পুত্রকে খুঁজতে চলে আসেন শহরে। খুঁজে খুঁজে পেয়েও যান তার আমলা পুত্রের খোঁজ। কড়া নাড়েন এসে পুত্রের দরজায়। পুত্র তার ইয়ার বক্সিদের সঙ্গে হৈ হুল্লোড় করে সন্ধ্যার চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছেন, তখন পুত্রের ঝলমলে শহুরে বধূ, দরজা খুলে ধূলিধুসরিত বিধ্বস্ত কৃষককে দেখে ডাকেন তার কাবিল স্বামীকে। কীর্তিমান আর চৌকশ আমলা পুত্র মহোদয়, ঘটনা সামলান কৃষককে সার্ভেন্টস রুমে নিয়ে বসিয়ে। বন্ধুদের বলেন এক মহা যন্ত্রণায় পড়েছেন তিনি, প্রায়ই তার গ্রামের বাড়ির সার্ভেন্টদের কেউ না কেউ এসে হাজির হয়, হঠাৎ বেমক্কা সব আর্জি নিয়ে। এসেছেন তেমনি একজন এখন। 

এটা সত্য ঘটনা নাকি নিতান্তই গল্প, তা জানি না। তবে এটা জানি এটা অশ্রুতপূর্ব কোন গল্পও নয়। অনেকেই জানেন এটা। তারপরও পুনরাবৃত্তি করলাম, কারণ আজকাল ঘরের আড্ডায়, রাস্তার আলাপে, বিশেষ করে এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনের লাইনে, তুমূল খেদে একটা কথা উচ্চারিত হতে শুনি অহরহ, আর তা হলো- ‘সবুজ পাসপোর্ট’ থাকার বিড়ম্বনার কথা, ঘাটে ঘাটে হেনস্তা হওয়ার কেচ্ছা। আর সবাই এর জন্য দোষী সাব্যস্ত করে, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে জোর গলায় ওই ‘সবুজ পাসপোর্ট’ আর নিজের দেশকে। যেমন করেছিল আর কি, গল্পের আমলাপুত্র তার কামলা পিতাকে। 

মাত্র ক’দিন আগে দেশ নিম্নমধ্যবিত্তের তারকা খচিত খেতাব পেলেও, বাংলার বিত্তবানেরা বেশ কিছু কাল ধরেই ঈদ, পূজা বা বিয়ের কেনাকাটা, বিবাহবার্ষিকী উদযাপন এবং চিকিৎসার জন্য যে সকাল-বিকাল বিদেশ গমন করছেন, তা তো বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের জ্যামিতিক হারে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানো দেখেই আন্দাজ করতে পারে নিতান্ত স্থুলবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষও। অথচ হায় এক দশক আগেও, এদেশেরই ‘আদম’ পয়সার অভাবে, উড়োজাহাজের চাকার খোপে ঢুকে, বিনে পয়সায় কাজের খোঁজে মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রোডলার কুড়াতে গিয়ে অঘোরে প্রাণ হারিয়েছে। আর এখন কিনা সেই বাঙাল এমনি এমনিও বিদেশ যায়! এটা দেখে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা যে আসলেই মারাত্মক খারাপ, তা অনেকেই জলবৎতলরং বুঝলেও, বেকুব আমিই শুধু বুঝি না। 

এখন কথা হলো, বাঙালের বিদেশ গমনের এহেন ধুন্দুমার অবস্থার মধ্যে, তুমূল শাপশাপান্তে বেচারা সবুজ পাসপোর্টের অবস্থা হলো ত্রাহি মধুসূদন। ভাবি হায়, আপনারা বা আপনাদের সন্তানরা যে নাকে খত দিয়ে, সরস্বতীর নামে ভিসা ইস্যু করিয়ে ইউরোপ আমেরিকায় গিয়ে, সরস্বতীকে পিঠ দেখিয়ে, পড়িমরি হুটোপুটি করে যে কোনোভাবে লক্ষ্মীর পায়ে লুটোপুটি খায়, তাও কি পাসপোর্টের দোষ? নাকি দোষ এই পোড়া দেশের? নিজেরা হয়তো আঙ্গুল ফুলিয়েছেন বেশ, কিন্তু কতটুকু করেছেন পাসপোর্টের বা দেশের সম্মান বৃদ্ধি?

সে যাক, আজকাল অনেকেই গল্পের ওই আমলাপুত্রের মতো, জাতে ওঠার খায়েসে দ্বৈত, ত্রৈত নাগরিকত্ব কিনছেন সোৎসাহে। কারণ টাকায় কিনা হয়! কিনছেন, কিন্তু কিনেই থেমে থাকছেন না; সুযোগ পেলে, বা সুযোগ না পেলে সুযোগ বানিয়ে, তাদের মহামূল্য দ্বৈত নাগরিকত্বের বয়ান ফলাও করেন তারা, ঘাটে অঘাটে। এ ব্যাপারে আমার এক মুরুব্বি আত্মীয়ের কথা মনে পড়ল। আশির দশকে আমার ঐ মুরুব্বি আত্মীয়, ধনুর্ভংগ পণ ধরলেন তার কৈশোরোত্তীর্ণ পুত্রকে আমেরিকা পাঠাবার। আসলে আশির দশকে যারা আমার মতো কিশোর বা তরুণের পিতা ছিলেন, তাদের মোক্ষ লাভ হতো দু’ভাবে। প্রথমত, তাদের কিশোর/তরুণ পুত্রধনটি যদি কোনোক্রমে জলপাই রঙের উর্দি গলিয়ে ফেলতে পারত গায়ে, তবে তো তারা মনে মনে এক একজন হয়ে উঠতেন দেশের ভাবি প্রেসিডেন্টের পিতা! আর দ্বিতীয়ত, পুত্রটি যদি পেয়ে যেত ইউরোপ আমেরিকার ভিসা, তাতেও পিতা ও পুত্রের যুগপৎ মোক্ষ লাভ হয়ে যেত নিমিষেই। পাত্র আমেরিকা থাকে এরকম যোগ্যতার কারণে ডাকসাইটে সুন্দরীর পিতারা, অবলীলায় সম্প্রদান কারক হয়ে যেতে এক পায়ে থাকতেন খাড়া। এ ছিল তখনকার অবস্থা। 

ফিরে আসা যাক আমার মুরুব্বি আত্মীয়ের বয়ানে। তার পুত্রকে আমেরিকা পাঠানোর ধনুর্ভাংগা পণের কারণে, জীবনপণ চেষ্টায় কামিয়াব হলেন তিনি অচিরেই। কিন্তু মজা শুরু হলো এরপর থেকেই। পারিবারিক, সামাজিক যে কোন জমায়েতে হোক, আমার মুরুব্বি আত্মীয় ধাক্কাধাক্কি করে হলেও সুযোগ করে নিয়ে আসেন আমেরিকা প্রসঙ্গ। আর ওটা যখন এসেই যায়, তখনই শুরু হয়ে যায় তার আমেরিকাবাসী পুত্রের কৃতিত্বের বয়ান। আজকালকার অনেক দ্বৈত নাগরিকেরও একই প্রচেষ্টা চোখে পড়ে যখন, নিতান্তই অনায়াসে তখন চোখে ভেসে উঠে আমার সেই মুরুব্বির চেহারা মোবারক। কোন অসুবিধা নেই তাতে আমার, কারণ এ যার যার নিজস্ব রুচির ব্যাপার। মেজাজটা খিঁচড়ে যায়, যখন শুরু হয় পাশাপাশি ‘সবুজ পাসপোর্টে’র বদনাম।

নিতান্তই দাপ্তরিক প্রয়োজনে মাঝে মধ্যে আমাকেও যেতে হয় দেশের বাইরে, এমনকি থাকতেও হয়েছে বেশ কিছুকাল রক্তে কেনা এই বদ্বীপের বাইরে। হেনস্তাও হয়েছি ঘাটে ঘাটে বহুবার, অকারণে। তবে এ হেনস্তাটুকু পদে পদে, হাড়ে হাড়ে সবচেয়ে বেশি টের পেয়েছি ইসলামের দেশ; সৌদি আরবে। ওখানে আমার পৌণপুণিক দুরবস্থা দেখে একবার এক ভারতীয় সহকর্মী বলেছিল, ‘মিস্টার সেলিম, কিছু রিয়াল খরচ করে কিনে নাওনা একটা কানাডা, আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার পাসপোর্ট, দেখবে ভোজবাজির মতো সব কিছু কত সহজ হয়ে যাবে তোমার জন্য।’

উত্তরে বলেছিলাম, শোন মানুষ হিসেবে কেউ যদি আমাকে ন্যূনতম সম্মান না করতে পারে তবে সে ব্যর্থতা আমার পাসপোর্ট, গায়ের রং বা নাগরিকত্বের নয়। সে ব্যর্থতা ওই বর্বরের অজ্ঞানতার, অসভ্যতার। আমার সবুজ পাসপোর্টটি পেতে তিরিশ লাখ শহীদের রক্ত আর চার লাখ মা-বোনের ইজ্জতের দাম মেটাতে হয়েছিল। কোনো অপগণ্ড বর্বরের বর্বরতার মতো তুচ্ছ কারণে আমি, আমার অত দামি পাসপোর্টটি বদলাতে পারি না। বদলাবও না কখনো।

আসা যাক পাসপোর্টবিষয়ক ভিন্ন আরেকটি প্রসঙ্গে। বলছিলাম কানাডায় অবস্থানরত, সবুজ পাসপোর্টের রাহুমুক্ত হওয়া এদেশীয় রক্তের কানাডিয়ানদের কথা। কিছুদিন আগে ভোট হয়ে গেল কানাডায়। ওখানকার রক্ষণশীল দলের নেতা হার্পার, অভিবাসীদের, বিশেষত এশিয়ান আভিবাসীদের ব্যাপারে হয়তোবা বেশ বিতর্কিত কিছু সিদ্ধান্ত তার নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে রেখেছিল। সবুজ পাসপোর্টের রাহুমুক্ত হওয়া কানাডিয়ান পাসপোর্টধারীদের উৎকণ্ঠা ছিল ওটা ঘিরেই। তাদের উৎকন্ঠাটিকে অতি অবশ্যই অত্যন্ত যৌক্তিক মনে করি, কারণ ওর পেছনে তাদের অনেক ডলার, শ্রম আর মেধার খরচ হয়েছে। ওটাকে কেউ খন্ডিত করে ফেলবে হঠাৎ তা তো হওয়া একেবারেই অনুচিত, অন্তত আজকের দুনিয়ার সভ্যতার, গনতন্ত্রের মাপকাঠিতে। কথা তা নিয়ে নয়।

আমার এক প্রাক্তন সহকর্মী, এখন সবুজ পাসপোর্টের রাহুমুক্ত হয়ে, হয়েছেন ঘোরতর জাত কানাডিয়ান। বেশ আগেই তিনি ছেড়েছিলেন দেশ। তারপরও ফেসবুকের কল্যাণে তার ও তার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল আমার; এখনো আছে। তার ফেবুতে তার উপস্থিতি ছিল ছবি পোস্ট করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। একদিন হঠাৎ দেখলাম ব্যতিক্রম। সময়টা শাহবাগ আন্দোলনের সময় যখন দেশ বিদেশের বাঙালিরা একাত্মতা ঘোষণা করছেন শাহবাগ আন্দোলনের সঙ্গে। একদিন ফেবু খুলতেই একটা নোটিফিকেশন দেখলাম, যা বলছে আমার প্রাক্তন সহকর্মী, বর্তমানের পাড় কানাডিয়ান আমার একটি স্ট্যাটাসে মন্তব্য করেছেন। অসীম আগ্রহে সেটি পড়তে ক্লিক করলাম, তখুনি ওটা পড়ার জন্য। হতাশ হয়ে দেখলাম, কমেন্টে তিনি আমাকে নসিহত করেছেন, রাজনৈতিক পোস্ট না দেওয়ার জন্য।

উত্তরে আমি বললাম এটা আমার কাছে একটা অস্তিত্বনৈতিক ব্যাপার, ওতে যদি রাজনীতি চলেও আসে তাতে আমি করি থোড়াই কেয়ার। সবক পেলাম এবার তার কাছ থেকে ‘বৎস অতীত ভুলিয়া ভবিষ্যতের দিকে আগাইয়া যাও। অতীত অতীত করিয়া গতি কমাইও না’। উত্তরে যা বললাম, তা হলো এমন, যে আমি ঊর্ধ্বমুখী এমন বৃক্ষ হতে চাই না, যে আরও ঊর্ধ্বে গমন করার জন্য শিকড় কেটে, মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মায়া কাটিয়ে ঊর্ধ্বে গমনোদ্যোত। তাতে সে গাছ শেষ পর্যন্ত স্বর্গে গিয়ে পৌঁছলেও পৌঁছতে পারে, আর সেখানে গিয়ে, খুব বেশি হলে সে হতে পারে আসবাবের কাঠ। কারণ, ততক্ষণে জীবনতো তাকে ছেড়ে গেছে। ওখানেই আমাদের কথাবার্তার নটে গাছটি মুড়িয়ে গিয়েছিল সেদিন।

তারপর আবার সময় যায়, তার পোস্ট করা ছবি দেখে দেখে, কখনো কখনো লাইক দিয়ে যোগাযোগ রক্ষা করি। হালে কানাডার নির্বাচন-পূর্ববর্তী গরম হাওয়া পাচ্ছিলাম যখন ফেবুর মাধ্যমে, হঠাৎ দেখি ইংরেজিতে লেখা তার ইয়া লম্বা এক স্ট্যাটাস। যাতে তিনি হার্পারের অভিবাসন নীতির মু-ুপাত করছেন নানান নামে, সভ্যতার দোহাই দিয়ে, গণতন্ত্রের সাফাই গেয়ে, উন্নত বিশ্বের মানবতার ধর্না দিয়ে। তার মানে তিনি হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক। 

তাও ঠিক আছে, কিন্তু ধন্দ লাগল যখন দেখলাম তিনি হয়ে উঠেছেন অতীতচারী, এই অপগণ্ড বেকুবেরই মতো! কারণ তিনি বলছেন অতীতে কত অর্থ, শ্রম আর মেধা ব্যয় করেছিলেন আজকের পাড় কানাডিয়ানটি হওয়ার জন্য। হার্পার গংয়ের কোনোই অধিকার নেই তার সেই অর্থসাধ্য, শ্রমসাধ্য, মেধাসাধ্য অতীতটিকে কলমের এক খোঁচায় নাই করে দিতে!

কমেন্ট করি আমি, বাহ বেশতো, আপনি রাজনৈতিক হয়ে উঠছেন দেখছি।

সোৎসাহে তিনি উত্তর করলেন, হ্যাঁ, তিনি রাজনৈতিক হয়ে উঠেছেন এবং একটি ফেসবুক পেজও খুলেছেন, ওখানে যাতে আমি ঘুরে আসি একটু।

বললাম রাজনৈতিক হয়েছেন ভালো কথা, কিন্তু ভবিষ্যৎমুখী লোক আপনি হঠাৎ অতীতমুখী হলেন কেন আবার? ডলার শ্রম আর মেধায় কেনা পাসপোর্টের অমর্যাদা করার ইচ্ছা প্রকাশ করায় আপনি হার্পারের মুণ্ডুপাত করছেন, তা হলে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে আর চার লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে কেনা আমার সবুজ পাসপোর্টের মর্যাদা রক্ষার্থে, রাজাকারের বিরুদ্ধে কি করা উচিত আমাদের? এলো না উত্তর কোনোই তার কাছ থেকে। অর্থাৎ মুড়িয়ে গেল নটে গাছটি আবারও!

সেলিম সোলায়মান 
কবি ও লেখক


মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh