গ্লোবাল ভিলেজ ও গ্লোবাল ইকোনমি

শাহ্জাহান সরকার। ছবি: সাম্প্রতিক দেশকাল

শাহ্জাহান সরকার। ছবি: সাম্প্রতিক দেশকাল

আজকাল ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ ও ‘গ্লোবাল ইকোনমি’ কথা দুটির ব্যবহার ব্যাপকহারে বেড়েছে। এ দুটি বিষয়ের প্রবর্তক ছিলেন দুজন ভিন্ন ব্যক্তি। প্রথম মতের প্রবর্তক হার্বাট মার্শাল ম্যাকলুহানের প্রচার মাধ্যমের দ্বারা সমাজের ওপর প্রভাব বিস্তারে প্রবল আগ্রহ ও গবেষণা রয়েছে। তাঁকে গ্লোবাল ভিলেজ (বিশ^গ্রাম) আইডিয়ার জনকও বলা হয়। তাঁর অন্যতম সেরা গ্রন্থের নাম : ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া : দি এক্সটেনশন অব মেন।’

অপরজন অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসন ছিলেন ম্যাকলুহানের প্রায় পনেরো বছরের ছোট- ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ। এই ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ কাজ করেছিলেন আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ইতিহাস বিশেষজ্ঞ হিসেবে, যা গ্লোবাল ইকোনমি নামে পরিচিত। 

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক একচেটে পুঁজির লুণ্ঠনকে আড়াল করার কৌশল হিসেবে স্বার্থান্বেষী-রাজনৈতিক মহল এসব তত্ত্বের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। তবে বিশ্বগ্রাম ও বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে উপরে উল্লিখিত লেখকদ্বয় যে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করেছেন, তাঁদের নিজস্ব যে তুলনামূলক পর্যালোচনা রয়েছে, সেটার প্রতি কোনোরূপ দ্বিধা-সংশয় পোষণ না-করে, আমাদের কিছু রাজনীতিক ও অর্থনীতিবিদ যে ধরনের স্বদেশ ও বিশ্ব অর্থনীতির ব্যাখ্যা টানছেন, তা প্রকৃতপক্ষে আন্তর্জাতিক একচেটে পুঁজি ও ব্যাংক নোটের একচ্ছত্র অধিপতির পক্ষে সাফাই গাওয়া ছাড়া অন্য কিছু নয়। যার সঙ্গে গ্লোবাল ভিলেজ ও গ্লোবাল ইকোনমির যুৎসই ব্যবহার একটা বিষয়ও বটে। আর এটা হয়ে আসছে দেশের তথাকথিত উন্নয়ন তরিকার স্বপ্নবিলাসকে ফাঁপিয়ে তোলার জন্য এবং তাঁদের আষাঢ়ে গল্পকে ভিত্তি দানের জন্য। 

গ্লোবাল ভিলেজের জনক ম্যাকলুহান তাঁর ধারণাকে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতি-রাজনীতি-অর্থনীতির একটি একক কাঠামোর মধ্যে রেখে চিন্তাগঠনে সক্রিয় থেকেছিলেন। যদিও তিনি প্রচলিত বিশ্বব্যবস্থার সমালোচনা থেকে তাঁর গবেষণার দ্বার দূরপ্রান্ত থেকে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। এবং এমনটিও নয় যে, তিনি গ্লোবাল মনোপলি ক্যাপিটালিজম বা আন্তর্জাতিক একচেটে পুঁজির শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন- তাঁর মিডিয়া আদর্শ প্রচারের স্বার্থে। বরং প্রচলিত বিশ^ব্যবস্থার অনুকূলে দাঁড়িয়ে থেকেই প্রচার ব্যবস্থার প্রসার করার চেষ্টা করেছিলেন এবং তাঁর গবেষণার তত্ত্ব নির্মাণ করেছিলেন বিদ্যমান রাষ্ট্রের অনুকূলে দাঁড়িয়ে থেকে। 

যদিও তিনি ইন্টারনেট বা ডিজিটালনির্ভর বিশ্বগ্রামের কুপ্রভাব যুবসমাজের ওপর পড়ার আশঙ্কা করেছিলেন এবং তার তীব্র সমালোচনা ও সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তা-সত্ত্বেও ডিজিটাল প্রচার মাধ্যম দ্বারা তিনি যে সমাজকে প্রভাবিত করার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করেছিলেন, সেটা ছিল পুরনো অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থার অনুকূলে। ফলে দেশের উন্নয়নের নামে এখন যাঁরা গ্লোবাল ভিলেজের দোহাই দেন, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে ম্যাকলুহানের উদ্ভাবিত প্রচার প্রক্রিয়াকে বিশ্বব্যাপী ইলেক্ট্রনিক প্রচার মাধ্যমের দ্বারা মানুষের মনুষ্যগুণ বিবর্জিত শাসন ও যন্ত্রশাসিত এক-অভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও করপোরেট বিশ^ব্যবস্থাকেই আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন। অথচ এ জাতীয় প্রচারের প্রভাবকে ম্যাকলুহান তার সংশয়বাদ থেকে কখনই বিচ্ছিন্ন করেননি।

একই সঙ্গে ম্যাকলুহানের ইলেক্ট্রনিক বা ডিজিটাল যন্ত্রের প্রচার মাধ্যমের তত্ত্বকে বিকশিত করে বিশ্ব মানবজাতিকে ধরা হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত একক সম্প্রদায় বা কমিউনিটি। এমনকি এক বিশ্বগ্রামে বসবাসরত একক মানবগোষ্ঠীকে ধরা হচ্ছে- যন্ত্রনির্ভর এক নতুন মানবজাতি, যা কি-না ম্যাকলুহানের তত্ত্বের আংশিক বিকৃতিও বটে। আমাদের দেশের কতিপয় রাষ্ট্রনায়ক-রাজনীতিক-অর্থনীতির গবেষকের নিজ দেশকে ‘গ্লোবাল ভিলেজ’-এর অংশ হিসেবে দেখবার দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যাটা এখানেই। যা একেবারেই অযৌক্তিক ও প্রতিক্রিয়াশীল এবং সংবিধানে উল্লিখিত সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রচারের সঙ্গে বিরোধাত্মক বৈকি। সে-দিক থেকে ম্যাকলুহানের ‘গ্লোবাল ভিলেজ’-এর তাত্ত্বিক কাঠামোটি সমাজবিপ্লব বিমুখ বলতে হয়। এবং প্রকৃতপক্ষে সামাজিক বিপ্লবের বিরুদ্ধবাদীরাই এ-তত্ত্বের নব বিকশিত রূপের দ্বারা সিক্ত। এমনকি আমাদের প্রযুক্তি-সর্বস্ব বাংলাদেশের প্রেরণা তা থেকেই উদ্গত বলে তাঁরা প্রচারও করে থাকেন।   

অপরদিকে অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসনের গ্লোবাল ইকোনমির তত্ত্বও কোনো বিপ্লবাত্মক ছিল না। তাঁর তত্ত্বের মূল কথা হলো- বিশ্বব্যাপী এমন একটি আন্তঃনির্ভরশীলতা প্রতিষ্ঠা করা, যা বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক পরিবেশকে চালিত করে। এবং এটি বিশ্বের অপরাপর-পশ্চাৎপদ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উৎপাদন ও তার গতিকে প্রভাবিত করে এবং তাদের মধ্যকার ভারসাম্য রক্ষা করে। 

মজার বিষয় এই যে, ম্যাডিসনের থিয়োরিকে পর্যালোচনা করে মার্কিন লেখক, ডেভিড ডব্লিউ কোনি প্র্যাকটিসাল মনে করেন, ‘গ্লোবাল ইকোনমি’ বিশেষ করে ‘বিশ^ অর্থনীতি’, বিশ্বব্যাপী ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক করপোরেশনের ওপর সরকারের সম্পূর্ণ নির্ভরতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। কোনি আরও বলেন, ম্যাডিসনের তত্ত্বে বিশ্ব অর্থনীতিতে জাতীয় স্বার্থের কথা বলা হলেও, বাস্তবে ম্যাডিসনের বিশ্ব অর্থনীতির কোনো প্রকার জাতীয় আনুগত্য নেই। কারণ, ব্যাংকিং শিল্প ও বড় সংস্থাগুলোর বিস্তৃত হওয়া এবং সুদ লাভ করা ছাড়া অন্য কোনো লক্ষ তার নেই। তিনি আরও বলেন যে, গ্লোবাল ইকোনমির তত্ত্বে ব্যাংক সুদের হার কৃত্রিমভাবে কমানো থাকে না, যাতে লোকেরা ব্যাংক ঋণ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। বহুজাতিক করপোরেশনগুলো সম্পর্কে কোনি বলেন, দ্বৈত বহুজাতিক করপোরেশনগুলো জাতীয়তার দাবি করে থাকে। কিন্তু তাদের জাতীয় দাবির লক্ষ্য হচ্ছে, নিজ দেশে ওইসব করপোরেশনের বিপণন কৌশলের অংশ গঠন করা। মূলত তাদের লক্ষ বিশ্বব্যাপী, জাতীয় দাবিটা তাদের বাস্তবে ফাঁপা। 

কোনি আরও বলেন, ‘বহুজাতিক কোম্পানিগুলো টেক্সমুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ভালোবাসে। ভালোবাসার কারণ হচ্ছে, তখন তারা তাদের দেশের ব্যয়বহুল শ্রমিকদের উদ্দীপিত করতে পারে এবং তাদের অন্যত্র সস্তা শ্রমিকের জায়গায় প্রতিস্থাপন করতে পারে।’ আমাদের দেশ তার একটা ভালো উদাহরণ হতে পারে। এখানে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যৌথ বা একক ব্যবসার গার্মেন্ট শিল্পে ভারতীয় শ্রমিকদের তুলনামূলক উচ্চ পারিশ্রমিক দেওয়া হয়ে থাকে। অপরদিকে চীনের মালিক-কর্মচারী ও শ্রমিকসহ তাদের পুরাতন গার্মেন্ট শিল্প এ-দেশে স্থানান্তরিত করার প্রক্রিয়া চলছে। 

বস্তুত এই হচ্ছে, গ্লেবাল ভিলেজ ও গ্লোবাল ইকোনমির মিথ বা রহস্যের সারকথা। এগুলো বুঝে অথবা না-বুঝে পশ্চাৎপদ অর্থনৈতিক দেশের স্বার্থান্বেষী রাষ্ট্র পরিচালকরা স্বীয় স্বার্থে উক্ত শব্দদ্বয় বা ফ্রেজগুলোর ভাস্যরূপের সৌন্দর্য কলাকে ব্যবহার করে প্রচার করে থাকেন। অপরদিকে জাতীয় উন্নয়নের জৌলুস পরে বহুজাতিক করপোরেশনগুলোর শোষণমূলক অর্থনীতির গঠনমূলক সমালোচনাকে এড়িয়ে বিভ্রান্তির কথাজালে জনগণকে ধাঁধা লাগানোর অপচেষ্টা করে থাকেন। অধিকন্তু তথাকথিত জাতীয় উন্নয়নের নামে অপরদেশ ও সংস্থার অর্থের কাছে জাতীয় স্বার্থের জলাঞ্জলি গোপন করে বিভিন্ন কেটাগরির উন্নয়ন-থিয়োরির ঢেঁকি গেলানোর কর্মকা-ের চেষ্টা দ্বারা তাঁরা তাঁদের বালখিল্যতার পরিচয় তুলে ধরেন। এভাবে মনগড়া থিয়োরির বিশেষায়ণ থেকে ব্রিটেন-ইউরোপ-আমেরিকার ন্যায় পুরাতন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির পুঁজিবাদের ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বকে বৈধতা দিয়ে উগ্র ও বীভৎস পরিণতি নিজ রাষ্ট্রে ডেকে আনেন। তাঁরা বুঝতে চান-না যে আমাদের মতো সমাজে বা রাষ্ট্রে ঐ-সব রাষ্ট্রের অনুকরণ বৈজ্ঞানিকভাবে স্বাস্থ্যসম্মত নয়। 

বস্তুত আন্তর্জাতিক একচেটিয়া অর্থনীতির (গ্লোবাল মনোপলি ইকোনমি) যুগে, পশ্চাৎপদ-উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে, উন্নয়ন কাজের ধরন ও রাষ্ট্রের অর্থনীতি-রাজনীতি-সংস্কৃৃতি হবে পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রের বদলে নয়াগণতান্ত্রিক, যা আমলাতন্ত্রের বদলে জনগণের নিজস্ব শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। এটা না-হলে গ্লোবাল ইকোনমির বহুজাতিক করপোরেশনগুলো পুঁজিতন্ত্রের সর্বাত্মক রাষ্ট্র কায়েম করবে এবং গ্লোবাল ভিলেজ থিয়োরির নামে নিজেদের পক্ষেই ওকালতি করবে, যা দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়ক ও নাগরিকগদের কাম্য নয়। এবং তাই উন্নয়নের নামে গ্লোবাল ইকোনমির সাফাই গাওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। অনুরূপভাবে ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ কথাটিও ঢালাওভাবে এ-দেশের উন্নয়নের নামে প্রচার করা ঠিক নয়।

আবারও বলছি, মার্শাল ম্যাকলুয়ান ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি গ্লোবাল ভিলেজ কথাটি জনপ্রিয় করেছিলেন এবং বিশ^ব্যাপী একক প্রচার মাধ্যমের সামাজিক প্রভাবকেও বিবেচনায় নিয়েছিলেন। বর্তমানে ব্যাপক প্রচারিত সংখ্যাতত্ত্বের যুগে, ডিজিটালাইজড প্রচার মাধ্যম ও বিশ্ব অর্থনীতির উদ্যোক্তার ধরন ব্যক্তিমালিকের স্বার্থে হয়ে থাকলে- মানুষের ওপর যন্ত্রের শাসন কায়েম হবে এবং তখন ব্যাপক মানুষ গুটিকতক মানুষের শোষণযন্ত্রের শিকারে পরিণত হবে এবং হয়ে আসছেও। যে-কারণে মানুষের উপর বস্তু বা যন্ত্রের শাসন যাতে প্রতিষ্ঠিত না হতে পারে বা বজায় থাকতে না পারে; বরং উল্টোভাবে বস্তু বা যন্ত্রের ওপর মানুষের যৌথ শাসন-নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পায়, সে বিষয়ে রাজনীতিক ও রাষ্ট্র নায়কগণের সজাগ দৃষ্টি থাকা বাঞ্ছনীয়। অর্থাৎ বিশ্বগ্রাম (গ্লোবাল ভিলেজ) ও বিশ^ অর্থনীতি (গ্লোবাল ইকোনমি)- এ-জাতীয় কমার্শিয়াল ও ডিজিটাল তত্ত্বের অধীনে জনগণের উন্নয়ন নয়; বরং জণগণের অধীনে, জনগণের স্বার্থে, জনগণের উদ্যোগেই বাস্তবায়িত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

লেখক: শাহ্জাহান সরকার, কলামিস্ট।


মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh