‘ছাগল নাচে খুঁটির জোরে’

খন্দকার মুনতাসীর মামুন, সাংবাদিক।

খন্দকার মুনতাসীর মামুন, সাংবাদিক।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতা একটি বহুল চর্চিত বিষয়। ঘরে, বাইরে, সংসদে, রাজপথে, থানা-আদালতে সর্বত্রই এর চর্চা চলে। দেশে যে দলই রাষ্ট্রক্ষমতায় যায়- তারা মনে করেন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী হয়ে গেছে। ভাবতে থাকেন, আর কোনোদিন ক্ষমতা ছেড়ে যেতে হবে না। কেন্দ্রে যারা থাকেন তারা যেমন যাচ্ছেতাই করতে পারেন, তেমনি একেবারে প্রান্তে যারা থাকেন- তারাও মনে করেন, ক্ষমতা যখন হাতে এসেছে, তখন এর দাপট দেখিয়ে কিছুদিন লুটেপুটে খাওয়া যায়। যারা ক্ষমতায় থাকেন, তারাই দাপট দেখান, আস্ফালন করেন। যত ক্ষুদ্র কিংবা বৃহৎ পরিসর হোক, স্থান কাল পাত্র ভেদে দাপট ও মোহ একই। যার যেমন ক্ষমতা, দাপট দেখানোর অভিলাস তার তত বেশি। মানুষ ক্রমেই বুঝতে পারে, ক্ষমতার চাকা ঘুরছে এবং তাদের এখন কাকে সমীহ করে চলতে হবে। যাদের ক্ষমতা নেই তাদের সামনে সবকিছুই ফাঁকা, রাষ্ট্রের কাছে প্রাপ্য অধিকারটুকু চেয়ে নেওয়ার ন্যূনতম সাহসও নেই। যদি কেউ মাথাটা একটু উপরে তুলতে চেষ্টা করে, উঁচু মাথাটা নিচে নামিয়ে দেওয়া সময়ের ব্যাপার। 

ক্ষমতা এবং দম্ভের কথাগুলো সবাই জানে। তবু লেখার শুরুতেই প্রসঙ্গটি কেন এলো তার জোরালো কারণ নিশ্চয়ই আছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা থেকে সহজেই আঁচ করা যায় সমাজের অভ্যন্তরে কিছু বিশেষ শ্রেণির মানুষের দাপট কতটা বেড়েছে এবং অযাচিত শক্তির দম্ভে ধরাকে সরা জ্ঞান করার প্রবণতা কোন মাত্রায় পৌঁছেছে। পরিস্থিতি এমন যে, যেখানেই একটু ক্ষমতা সঞ্চিত, পুঞ্জীভূত হচ্ছে, সেখানেই গণঅধিকার লোপ পাচ্ছে, সীমিত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যদিও ক্ষমতা কাঠামোর দায়িত্ব থাকে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে চালিয়ে নেওয়া ও উন্নত করা, পাশাপাশি দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, বিদ্যমান ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে অনুগতদের, স্বজনদের, তোষামোদকারীদের লালন করাটাই ক্ষমতা কাঠামোর দায়িত্ব হয়ে উঠেছে। লেখার এ পর্বে এমনই কিছু চিত্র তুলে ধরা হলো। 

প্রথম ঘটনায় একজন অতিরিক্ত সচিবের গাড়ির অপেক্ষায় ফেরি পার হতে তিন ঘণ্টা দেরি হওয়ায় অ্যাম্বুলেন্সে মৃত্যু হয় স্কুলছাত্র তিতাসের (১১)। স্বজনদের অভিযোগ, ঘাটের বিআইডব্লিউটিসি কর্মকর্তা, পুলিশ সবার কাছে অনুরোধ করার পরও ওই কর্মকর্তা না আসা পর্যন্ত কাঁঠালবাড়ী ঘাট থেকে ফেরি ছাড়েনি। মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী ১ নম্বর ফেরিঘাটে গত ২৫ জুলাই রাতে এ ঘটনা ঘটে। ওইদিন রাতে অনেক অনুরোধের পরও কাঁঠালবাড়ী ঘাট থেকে ফেরি ছাড়া হয়নি। এমনকি জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেও প্রতিকার মেলেনি। 

দ্বিতীয় ঘটনায় এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে ট্রেনের টিকিট কাটার পরও কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করতে হয়েছে। কারণ রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজি মো. শামসুদ্দিন শামস ওই নারীর আসনে বসে ভ্রমণ করেছিলেন। গত ২০ জুলাই ঢাকা থেকে খুলনা রুটের চিত্রা এক্সপ্রেস ট্রেনে এ ঘটনা ঘটে। বিমানবন্দর স্টেশনে ডিআইজি শামসুদ্দিন নেমে গেলে কেবিনের নির্ধারিত আসনে বসতে দেওয়া হয় টিকিটধারী অন্তঃসত্ত্বা সেই নারীকে। ডিআইজির প্রটোকল কর্মকর্তা কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি রুশো বণিক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ওই নারীকে অন্য আসনে বসতে বলা হয়েছিল। তিনি বসেননি। তিনি পরে এসেছেন। তাই ডিআইজি স্যার আগে বসেছিলেন। ওই যাত্রীর সঙ্গে কোনো বিরূপ আচরণ করা হয়নি।’ ডিআইজি শামসুদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিমানবন্দরে গিয়ে আমি নেমে পড়েছি।’ 

দৃষ্টি ফেরানো যাক তৃতীয় ঘটনায়। প্রতিবেশী এক পুলিশ পরিবারের সদস্যদের মিথ্যা মামলায় বাংলাদেশ জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের উইকেটকিপার কাম ব্যাটসম্যান শামীমা সুলতানার বাবা মুক্তিযোদ্ধা সলেমান শেখ (৭৪) এখন বিনা দোষে জেলের ঘানি টানছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শামীমা তখন জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের হয়ে খেলতে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করছিলেন। বৃদ্ধ বাবার জেলে যাওয়ার খবরে তিনি সেখান থেকে উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করে নিজের ফেসবুক পেজে পোস্টও দিয়েছিলেন। ‘কী হবে দেশের জন্য ক্রিকেট খেলে? যদি আমার মুক্তিযোদ্ধা বৃদ্ধ বাবাকে মিথ্যা মামলায় জেল খাটতে হয়?’ এ ধরনের পোস্ট দেওয়ার পর বিষয়টির তথ্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চমকপ্রদ সব তথ্য। ৭৪ বছরের বৃদ্ধ সলেমান শেখকে মামলায় ৫৮ বছর বয়স দেখিয়ে তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন মামলা সাজিয়ে তাকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়েছে মাগুরার শ্রীপুর থানা পুলিশ।

ঘটনাগুলো ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে আলোড়িত হলেও এর প্রেক্ষাপট এক; আর তা হলো ‘ক্ষমতার দাপট’। গোটা সমাজের জন্য এসব ঘটনা নিশ্চিতভাবেই অশনিসংকেত। ক্ষমতার দাপট যে শুধুই বৈষম্য-বঞ্চনার কারণ হচ্ছে, তা নয়। সমাজের অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের জাল বিস্তার করছে, জবাবদিহির সংকট তৈরি করছে, বিচারহীনতা বৃদ্ধি করছে, সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা বিনষ্ট করছে। 

দেশে উন্নয়নের কথা জোর গলায় বলা হচ্ছে। কিন্তু শুধু ধনিক শ্রেণির উন্নয়ন যে সামগ্রিক উন্নয়ন নয় এটা হয়ত কারও চোখে পড়ছে না। প্রভাবশালীদের ক্ষমতায়ন হয়েছে; জনতার হলো না। গণতন্ত্রে বা প্রজাতন্ত্রে জনগণ এখনও রয়ে গেছে ‘পাবলিক’। যেভাবে রাখা হবে, সেভাবেই থাকতে বাধ্য। কি শহর, কি গ্রাম, সর্বত্র অবহেলিত জনতা। কৃষক, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, স্কুলগামী কিশোরী, কর্মজীবী নারী, গৃহকর্মী, পোশাক-শ্রমিক, রাস্তায় আহাজারিরত শিক্ষক, পৌরসভার কর্মী, বাস ভাড়া-গ্যাস ও বিদ্যুৎ মূল্যবৃদ্ধিতে ন্যূব্জ নাগরিক, বিপর্যস্ত সহস্র বেকার চলছে অবহেলায়, নিরাপত্তাহীনতায়, ভবিষ্যতের সম্ভাবনাহীনতায়। সর্বত্র অবহেলা। অনাদর। সর্বত্র শক্তির দম্ভ। আক্রান্ত অসহায়জন। যেন কোথাও কোন সুষ্ঠু নীতি ও নিয়ম নেই। দুর্নীতিই নীতি। শহরের রাজপথে যান চলাচলে অরাজক বিশৃঙ্খলা। দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনা। ধর্ষণ। দখল। আক্রমণ। ফিটনেসবিহীন যানবাহন। দূষিত পানি। লোডশেডিং। কৃষক ও উৎপাদকের সামনে রক্তচোষা মধ্যস্বত্বভোগী-সিন্ডিকেট। সবাই জনতার ওপরে দেখাচ্ছে ক্ষমতার রক্তচক্ষু। শক্তির দাপট। লুণ্ঠনের কসরৎ। 

অথচ এই জনতার নামেই তো সব কিছু। গণতন্ত্র। ক্ষমতা। সরকার। শাসন। প্রশাসন। কিন্তু এই জনতাই যে আজ অসহায়। সে খেয়াল কেউ রাখছে কী! আয়-বৈষম্য, আইনের শাসনের অভাব, টাকাওয়ালাদের দখলে রাজনীতি চলে যাওয়া- এ সব কিছুর পরিণতি হলো এক উৎকট কালচারের জন্ম নেওয়া, যেখানে ক্ষমতা ও অর্থের দাপটের কাছে আইন, ন্যায়নীতি, মানবিকতা পরাভূত। দামি গাড়ি হাঁকিয়ে মানুষ চাপা দেওয়া অথবা কৌতূহল বশে গুলি করে মানুষ মারা-সেই মধ্যযুগীয় সামন্ত শ্রেণির ঘৃণিত সময়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়। আমরা কি তবে বর্বর যুগে ফিরে যাচ্ছি? 

কিছু বিশেষ শ্রেণির মানুষের ক্ষমতার দাপট দেশ ও দশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। ক্ষমতা কোনো উপভোগ্য বিষয় নয় বরং এটি একটি দায়িত্বের নাম। ফলবান বৃক্ষের ডালপালা, পত্র-পল্লব ঊর্ধ্বমুখী হয় না বরং ফল-ফুলের ভারে ন্যূব্জ হয়ে আসে, তেমনি ক্ষমতা মানুষকে বিনয়ী ও দায়িত্বশীল করবে, এটাই কাম্য। 

প্রজাতন্ত্রের সর্বস্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হোক। জনগণের সরকার হোক জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য। সরকারের কোনো বিশেষ অংশও যদি এর বাইরে থাকে, তবে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জনগণের মালিকানা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যারা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চলে, তাদের অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করতে হবে। সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে, মত প্রকাশের প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করতে হবে, বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের পথ পরিত্যাগ করতে হবে। ক্ষমতায় যারা আছেন, তারা তাদের গোষ্ঠীস্বার্থের বদলে মানুষের ‘ভালো থাকার কাজে’ সঠিকভাবে ব্যবহার করলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। 

ছাগলকে যখন দড়ির সাহায্যে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়, ছাগল দড়ির শেষ সীমা পর্যন্ত গিয়ে আর না যেতে পেরে লাফাতে থাকে। খুঁটিটি শক্ত করে মাটির গভীরে প্রোথিত থাকলে ছাগলটি জোরে লাফাতে পারে। অর্থাৎ বোকা ছাগলের খুঁটির জোর আলগা হলেই ছাগল লম্ফঝম্ফ ছেড়ে দেবে। রাখাল যদি ছাগলকে খুঁটিতে বেঁধে হাওয়া না খায়, নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে তবেই প্রাণীটি ঘাস-পাতা খাবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতা একটি বহুল চর্চিত বিষয়। ঘরে, বাইরে, সংসদে, রাজপথে, থানা-আদালতে সর্বত্রই এর চর্চা চলে। দেশে যে দলই রাষ্ট্রক্ষমতায় যায়- তারা মনে করেন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী হয়ে গেছে। ভাবতে থাকেন, আর কোনোদিন ক্ষমতা ছেড়ে যেতে হবে না। কেন্দ্রে যারা থাকেন তারা যেমন যাচ্ছেতাই করতে পারেন, তেমনি একেবারে প্রান্তে যারা থাকেন- তারাও মনে করেন, ক্ষমতা যখন হাতে এসেছে, তখন এর দাপট দেখিয়ে কিছুদিন লুটেপুটে খাওয়া যায়। যারা ক্ষমতায় থাকেন, তারাই দাপট দেখান, আস্ফালন করেন। যত ক্ষুদ্র কিংবা বৃহৎ পরিসর হোক, স্থান কাল পাত্র ভেদে দাপট ও মোহ একই। যার যেমন ক্ষমতা, দাপট দেখানোর অভিলাস তার তত বেশি। মানুষ ক্রমেই বুঝতে পারে, ক্ষমতার চাকা ঘুরছে এবং তাদের এখন কাকে সমীহ করে চলতে হবে। যাদের ক্ষমতা নেই তাদের সামনে সবকিছুই ফাঁকা, রাষ্ট্রের কাছে প্রাপ্য অধিকারটুকু চেয়ে নেওয়ার ন্যূনতম সাহসও নেই। যদি কেউ মাথাটা একটু উপরে তুলতে চেষ্টা করে, উঁচু মাথাটা নিচে নামিয়ে দেওয়া সময়ের ব্যাপার। 

ক্ষমতা এবং দম্ভের কথাগুলো সবাই জানে। তবু লেখার শুরুতেই প্রসঙ্গটি কেন এলো তার জোরালো কারণ নিশ্চয়ই আছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা থেকে সহজেই আঁচ করা যায় সমাজের অভ্যন্তরে কিছু বিশেষ শ্রেণির মানুষের দাপট কতটা বেড়েছে এবং অযাচিত শক্তির দম্ভে ধরাকে সরা জ্ঞান করার প্রবণতা কোন মাত্রায় পৌঁছেছে। পরিস্থিতি এমন যে, যেখানেই একটু ক্ষমতা সঞ্চিত, পুঞ্জীভূত হচ্ছে, সেখানেই গণঅধিকার লোপ পাচ্ছে, সীমিত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যদিও ক্ষমতা কাঠামোর দায়িত্ব থাকে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে চালিয়ে নেওয়া ও উন্নত করা, পাশাপাশি দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, বিদ্যমান ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে অনুগতদের, স্বজনদের, তোষামোদকারীদের লালন করাটাই ক্ষমতা কাঠামোর দায়িত্ব হয়ে উঠেছে। লেখার এ পর্বে এমনই কিছু চিত্র তুলে ধরা হলো। 

প্রথম ঘটনায় একজন অতিরিক্ত সচিবের গাড়ির অপেক্ষায় ফেরি পার হতে তিন ঘণ্টা দেরি হওয়ায় অ্যাম্বুলেন্সে মৃত্যু হয় স্কুলছাত্র তিতাসের (১১)। স্বজনদের অভিযোগ, ঘাটের বিআইডব্লিউটিসি কর্মকর্তা, পুলিশ সবার কাছে অনুরোধ করার পরও ওই কর্মকর্তা না আসা পর্যন্ত কাঁঠালবাড়ী ঘাট থেকে ফেরি ছাড়েনি। মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী ১ নম্বর ফেরিঘাটে গত ২৫ জুলাই রাতে এ ঘটনা ঘটে। ওইদিন রাতে অনেক অনুরোধের পরও কাঁঠালবাড়ী ঘাট থেকে ফেরি ছাড়া হয়নি। এমনকি জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেও প্রতিকার মেলেনি। 

দ্বিতীয় ঘটনায় এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে ট্রেনের টিকিট কাটার পরও কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করতে হয়েছে। কারণ রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজি মো. শামসুদ্দিন শামস ওই নারীর আসনে বসে ভ্রমণ করেছিলেন। গত ২০ জুলাই ঢাকা থেকে খুলনা রুটের চিত্রা এক্সপ্রেস ট্রেনে এ ঘটনা ঘটে। বিমানবন্দর স্টেশনে ডিআইজি শামসুদ্দিন নেমে গেলে কেবিনের নির্ধারিত আসনে বসতে দেওয়া হয় টিকিটধারী অন্তঃসত্ত্বা সেই নারীকে। ডিআইজির প্রটোকল কর্মকর্তা কমলাপুর রেলওয়ে থানার ওসি রুশো বণিক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ওই নারীকে অন্য আসনে বসতে বলা হয়েছিল। তিনি বসেননি। তিনি পরে এসেছেন। তাই ডিআইজি স্যার আগে বসেছিলেন। ওই যাত্রীর সঙ্গে কোনো বিরূপ আচরণ করা হয়নি।’ ডিআইজি শামসুদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিমানবন্দরে গিয়ে আমি নেমে পড়েছি।’ 

দৃষ্টি ফেরানো যাক তৃতীয় ঘটনায়। প্রতিবেশী এক পুলিশ পরিবারের সদস্যদের মিথ্যা মামলায় বাংলাদেশ জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের উইকেটকিপার কাম ব্যাটসম্যান শামীমা সুলতানার বাবা মুক্তিযোদ্ধা সলেমান শেখ (৭৪) এখন বিনা দোষে জেলের ঘানি টানছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শামীমা তখন জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের হয়ে খেলতে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করছিলেন। বৃদ্ধ বাবার জেলে যাওয়ার খবরে তিনি সেখান থেকে উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করে নিজের ফেসবুক পেজে পোস্টও দিয়েছিলেন। ‘কী হবে দেশের জন্য ক্রিকেট খেলে? যদি আমার মুক্তিযোদ্ধা বৃদ্ধ বাবাকে মিথ্যা মামলায় জেল খাটতে হয়?’ এ ধরনের পোস্ট দেওয়ার পর বিষয়টির তথ্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চমকপ্রদ সব তথ্য। ৭৪ বছরের বৃদ্ধ সলেমান শেখকে মামলায় ৫৮ বছর বয়স দেখিয়ে তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন মামলা সাজিয়ে তাকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়েছে মাগুরার শ্রীপুর থানা পুলিশ।

ঘটনাগুলো ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে আলোড়িত হলেও এর প্রেক্ষাপট এক; আর তা হলো ‘ক্ষমতার দাপট’। গোটা সমাজের জন্য এসব ঘটনা নিশ্চিতভাবেই অশনিসংকেত। ক্ষমতার দাপট যে শুধুই বৈষম্য-বঞ্চনার কারণ হচ্ছে, তা নয়। সমাজের অভ্যন্তরে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের জাল বিস্তার করছে, জবাবদিহির সংকট তৈরি করছে, বিচারহীনতা বৃদ্ধি করছে, সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা বিনষ্ট করছে। 

দেশে উন্নয়নের কথা জোর গলায় বলা হচ্ছে। কিন্তু শুধু ধনিক শ্রেণির উন্নয়ন যে সামগ্রিক উন্নয়ন নয় এটা হয়ত কারও চোখে পড়ছে না। প্রভাবশালীদের ক্ষমতায়ন হয়েছে; জনতার হলো না। গণতন্ত্রে বা প্রজাতন্ত্রে জনগণ এখনও রয়ে গেছে ‘পাবলিক’। যেভাবে রাখা হবে, সেভাবেই থাকতে বাধ্য। কি শহর, কি গ্রাম, সর্বত্র অবহেলিত জনতা। কৃষক, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, স্কুলগামী কিশোরী, কর্মজীবী নারী, গৃহকর্মী, পোশাক-শ্রমিক, রাস্তায় আহাজারিরত শিক্ষক, পৌরসভার কর্মী, বাস ভাড়া-গ্যাস ও বিদ্যুৎ মূল্যবৃদ্ধিতে ন্যূব্জ নাগরিক, বিপর্যস্ত সহস্র বেকার চলছে অবহেলায়, নিরাপত্তাহীনতায়, ভবিষ্যতের সম্ভাবনাহীনতায়। সর্বত্র অবহেলা। অনাদর। সর্বত্র শক্তির দম্ভ। আক্রান্ত অসহায়জন। যেন কোথাও কোন সুষ্ঠু নীতি ও নিয়ম নেই। দুর্নীতিই নীতি। শহরের রাজপথে যান চলাচলে অরাজক বিশৃঙ্খলা। দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনা। ধর্ষণ। দখল। আক্রমণ। ফিটনেসবিহীন যানবাহন। দূষিত পানি। লোডশেডিং। কৃষক ও উৎপাদকের সামনে রক্তচোষা মধ্যস্বত্বভোগী-সিন্ডিকেট। সবাই জনতার ওপরে দেখাচ্ছে ক্ষমতার রক্তচক্ষু। শক্তির দাপট। লুণ্ঠনের কসরৎ। 

অথচ এই জনতার নামেই তো সব কিছু। গণতন্ত্র। ক্ষমতা। সরকার। শাসন। প্রশাসন। কিন্তু এই জনতাই যে আজ অসহায়। সে খেয়াল কেউ রাখছে কী! আয়-বৈষম্য, আইনের শাসনের অভাব, টাকাওয়ালাদের দখলে রাজনীতি চলে যাওয়া- এ সব কিছুর পরিণতি হলো এক উৎকট কালচারের জন্ম নেওয়া, যেখানে ক্ষমতা ও অর্থের দাপটের কাছে আইন, ন্যায়নীতি, মানবিকতা পরাভূত। দামি গাড়ি হাঁকিয়ে মানুষ চাপা দেওয়া অথবা কৌতূহল বশে গুলি করে মানুষ মারা-সেই মধ্যযুগীয় সামন্ত শ্রেণির ঘৃণিত সময়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়। আমরা কি তবে বর্বর যুগে ফিরে যাচ্ছি? 

কিছু বিশেষ শ্রেণির মানুষের ক্ষমতার দাপট দেশ ও দশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। ক্ষমতা কোনো উপভোগ্য বিষয় নয় বরং এটি একটি দায়িত্বের নাম। ফলবান বৃক্ষের ডালপালা, পত্র-পল্লব ঊর্ধ্বমুখী হয় না বরং ফল-ফুলের ভারে ন্যূব্জ হয়ে আসে, তেমনি ক্ষমতা মানুষকে বিনয়ী ও দায়িত্বশীল করবে, এটাই কাম্য। 

প্রজাতন্ত্রের সর্বস্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হোক। জনগণের সরকার হোক জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য। সরকারের কোনো বিশেষ অংশও যদি এর বাইরে থাকে, তবে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় জনগণের মালিকানা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যারা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চলে, তাদের অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করতে হবে। সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে, মত প্রকাশের প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করতে হবে, বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের পথ পরিত্যাগ করতে হবে। ক্ষমতায় যারা আছেন, তারা তাদের গোষ্ঠীস্বার্থের বদলে মানুষের ‘ভালো থাকার কাজে’ সঠিকভাবে ব্যবহার করলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। 

ছাগলকে যখন দড়ির সাহায্যে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়, ছাগল দড়ির শেষ সীমা পর্যন্ত গিয়ে আর না যেতে পেরে লাফাতে থাকে। খুঁটিটি শক্ত করে মাটির গভীরে প্রোথিত থাকলে ছাগলটি জোরে লাফাতে পারে। অর্থাৎ বোকা ছাগলের খুঁটির জোর আলগা হলেই ছাগল লম্ফঝম্ফ ছেড়ে দেবে। রাখাল যদি ছাগলকে খুঁটিতে বেঁধে হাওয়া না খায়, নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে তবেই প্রাণীটি ঘাস-পাতা খাবে।

লেখক: খন্দকার মুনতাসীর মামুন, সাংবাদিক।

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh