ক্যাসিনোর গডফাদাররা কে কোথায়?

সরকারদলীয় মন্ত্রী, নেতাকর্মী ও সমর্থকরা দাবি করছেন, দেশকে তারা উন্নয়নের মহাসড়কে তুলেছেন। দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হতে চলেছে। প্রায় এক যুগের মতো সময় ধরে সরকারি দল ক্ষমতায় রয়েছে। এ সময় তারা মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে। তাদের মতে, চারদিকে এখন উন্নয়ন দৃশ্যমান। পদ্মা সেতুতে একেকটি পিলার বসালেই সেটা বড় করে গণমাধ্যমে নিউজ করা হচ্ছে।

বলা হচ্ছে ফ্লাইওভার, ফোরলেন সড়ক এবং মেট্রোরেলের কথা। হয়তো এক সময় এসব কাজও দুর্নীতির মধ্য দিয়ে অধিকতর গতি পাবে। তারা আরও বলছেন, উন্নয়নের কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। সেজন্য জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন না। মানুষ শান্তিতে আছেন। রাজপথে আন্দোলন নেই। কোলাহল নেই সংসদে, শিক্ষাঙ্গনে ও রাজনীতিতে। আমার মন বলছে, রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হলে সুন্দরবনের পশু পাখিও আর কলরব করবে না। সেখানেও নেমে আসবে নীরবতার শান্তি।

আমি উন্নয়ন দেখছি না। সে কারণে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত হতে পারছি না। ফোরলেন সড়ক আর ফ্লাইওভারকে আমি উন্নয়নের পরিমাপক মানতে রাজি নই। আমার চোখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজ বিপন্ন। গণতন্ত্র আজ সংকটাপন্ন। মানবতা বিপন্ন। নৈতিকতা বিধ্বস্ত। সততা কবরস্থ। নিরাপত্তা হুমকিযুক্ত। স্বাভাবিকতা অদৃশ্য। শিক্ষাঙ্গন প্রকট দলীয় রাজনীতিচর্চায় বেপথু। স্বাস্থ্য খাতে নৈরাজ্য। আদালতের বারান্দায় গরিব বিচারপ্রার্থীর চাপা কান্নার হাহাকার। নাগরিক সমাজে চলাফেরা করে মনে হয়, তাদের মনে চাপা ক্ষোভ আছে; কিন্তু অনেকেই ভয়ে সে ক্ষোভ প্রকাশ করেন না। তাদের মধ্যে কাজ করে মামলার ভয়। হামলার ভয়। সরকারি আমলার ভয়। সরকারি নেতাকর্মীদের রোষানলে পড়ার ভয়। গ্রেফতারের ভয়। রিমান্ডের ভয়। ক্রসফায়ারের ভয়। সম্ভ্রম রক্ষার ভয়। রাজনীতির বড় ভাইদের প্রশ্রয়ে লালিত গ্যাং গ্রুপ সদস্যদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক ধসের সংবাদ গণমাধ্যমে আসে না। এলেও কম আসে। গণমাধ্যমগুলোর পরিবেশনা জরিপ করে বলা যায়, এরা স্বাধীনভাবে সংবাদ পরিবেশন করতে পারছে না। গণমাধ্যমের ওপর অদৃশ্য চাপ আছে বলে প্রতীয়মান হয়। তবে সরকারি ক্লিয়ারেন্স পেলে তারা কোনো বিষয় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে পারে। উল্লেখ্য, এ মাসেই কয়েকদিন আগে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ‘রাজনীতির সংস্কার’ বিষয়ে গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে। বিষয়টি সমসাময়িক। আমি নিজে ওই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপাঁচেক শিক্ষকসহ আরও অনেকে আমরা ওই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও পেশাজীবীরাও বক্তব্য রাখেন। প্রেস ক্লাবের মতো জায়গায় অনুষ্ঠিত এমন গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক একটি আলোচনা অনুষ্ঠানের খবর পরদিন দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দৈনিকগুলোতে পাওয়া যায়নি। কারণ কী? ওই অনুষ্ঠানের অধিকাংশ বক্তার আলোচনায় সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা ছিল। এজন্য পত্রিকাগুলোর ওপর হয়তো পরোক্ষ নির্দেশনা ছিল। যে কারণে তৃতীয় সারির দু-একটি পত্রিকা বাদ দিলে বড় পত্রিকাগুলো ওই অনুষ্ঠানের সংবাদ পরিবেশন করেনি।

গণমাধ্যমের সংবাদ পরিবেশনায় নীতি-নৈতিকতা আছে কি? গণমাধ্যম কেবল অনুমতিপ্রাপ্ত হলেই কিছু ধস তুলে ধরে। যেমন- শিক্ষাঙ্গনে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন এবং শিক্ষাঙ্গনের বাইরে সরকারদলীয় যুব সংগঠনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড চলছে অনেক বছর ধরে। কিন্তু তাদের ওপর গণমাধ্যমে সেভাবে সংবাদ পরিবেশিত হয়নি। সরকারি দলসমর্থিত ছাত্র সংগঠনের নেতাদের চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির খবর মাঝে-মধ্যে প্রকাশিত হলেও স্বাধীনভাবে তা সব পত্রিকা প্রকাশ করতে পারেনি। ইলেকট্রনিক মিডিয়াও সে সাহস দেখায়নি। এখন প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে পদত্যাগ করেছেন। পত্রিকাগুলো হয়তো অঘোষিত ক্লিয়ারেন্স পেয়ে পদত্যাগী ছাত্রনেতাদের সম্পর্কে নেতিবাচক খবর পরিবেশন করছে। যুগান্তরের মতো পত্রিকা ‘জাবিতে কোটি কোটি টাকা ভাগাভাগি’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেছে। এমনকি একই পত্রিকায় ‘পতনের মুখে যুবলীগের ক্যাসিনো সাম্রাজ্য’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তাছাড়া পদত্যাগী দুই নেতার বিলাসী জীবনযাপনের ওপরও সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

আমরা এখন জানতে পারলাম, বাংলাদেশে কেবল রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার, বা ফোরলেন সড়কেরই উন্নয়ন হয়নি; হামলা, মামলা, রাজনৈতিক নিপীড়ন, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও জুয়া সংস্কৃতিতেও ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। যে দেশের সংবিধান ‘বিসমিল্লাহ’ দিয়ে শুরু, আর রাষ্ট্রধর্ম হল ইসলাম, সে দেশে যে সরকারি দলের যুব সংগঠনের নেতারা লাইসেন্সবিহীন ক্যাসিনো সাম্রাজ্য গড়ে তুলে শত শত কোটি টাকা বাণিজ্য করেছেন তা এখন জনগণ জানতে পেরেছেন। পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী কেবল রাজধানীতেই নাকি রয়েছে ডজন দেড়েক, বা তারও বেশি ক্যাসিনো। এগুলোয় দিনরাত চলে জুয়া আর মদের আসর। এখন প্রশ্ন হল, এই জুয়ার সাম্রাজ্য তো রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। জুয়া সংস্কৃতির এ উন্নয়ন ঘটতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। কোনো কোনো ক্যাসিনো ৩-৪ বছর, বা আরও বেশি সময় ধরে এ ব্যবসা করছে। এখন এতদিন পর র‌্যাব কর্মকর্তারা অভিযান পরিচালনা করে ক্যাসিনো থেকে জুয়াড়িদের গ্রেফতার করছেন; রিমান্ডে নিচ্ছেন। শাস্তি দিচ্ছেন। ক্যাসিনো থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তুলে নিচ্ছেন। ছাত্রলীগ নেতাদের কোটি কোটি টাকার টেন্ডার বাণিজ্যের খবর চাউর হওয়ার পরপরই এ অভিযান পরিচালনার পেছনে অন্য কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কিনা তা সমাজবিজ্ঞানীদের ভেবে দেখতে হবে।

প্রশ্ন হল, এতদিন র‌্যাব কোথায় ছিল? কোথায় ছিল পুলিশ? কোথায় ছিল গোয়েন্দা সংস্থার সুযোগ্য ও পেশাদার কর্মকর্তারা? কেন তারা এতদিন যুবলীগ নেতাদের চুটিয়ে জুয়া ও মদের আসর পরিচালনা করতে দিয়েছেন? জনগণকে আজ তাদের এ প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। এখন ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, ‘রাজধানীতে অবৈধ জুয়ার আড্ডা বা কোনো ধরনের ক্যাসিনো পরিচালনা করতে দেয়া হবে না। এসবের নেপথ্যে যত প্রভাবশালীই জড়িত থাকুক না কেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ কঠোর হবে। র‌্যাব অভিযান শুরু করেছে, পুলিশও অভিযান শুরু করবে’ (যুগান্তর, ২০-০৯-২০১৯)। পুলিশের এ কথা বিশ্বাস না করে তাদের বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করা যায়, এতদিন কি পুলিশের ওপর এসব অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা চলতে দেয়ার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের অঘোষিত নির্দেশনা ছিল? নাকি তারা ক্যাসিনো ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোনো রকম অবৈধ সুবিধা পেয়ে চুপ ছিলেন। জনগণের আস্থা পেতে চাইলে তাদের এ বিষয়টি আগে পরিষ্কার করতে হবে।

আমাদের পোশাকধারী বাহিনীর সম্মানিত সদস্যরা সুদক্ষ ও পেশাদার। তারা যে এসব জানতেন না সে কথা বললে কেউ বিশ্বাস করবেন না। আজ তারা ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়ে জুয়াড়িদের পাকড়াও করছেন। শাস্তি দিচ্ছেন। কিন্তু এ ক্যাসিনো সাম্রাজ্য যারা গড়ে তুলেছেন এবং এর পেছনে যেসব গডফাদার মদদ দিয়েছিল তাদের কতজনকে তারা গ্রেফতার করতে পেরেছেন? যদি না পারেন, যদি কেবল জুয়াড়িদের গ্রেফতার করেন, তাহলে সে কাজটি হবে ব্রেনস্ট্রোকের চিকিৎসা উপেক্ষা করে হাতের আঙুলের চুলকানির চিকিৎসাকে বেশি প্রাধান্য দেয়ার মতো আহাম্মকি। তাছাড়া একটি-দুটি ক্যাসিনোতে পরিচালিত অভিযান গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারের রহস্য কি অন্য ক্যাসিনোগুলোতে জড়িতদের পালিয়ে যেতে সতর্কবার্তা পাঠানো? উচিত ছিল এদের সবাইকে পাকড়াও করতে প্রয়োজনীয় জনবল সংগ্রহ করে একসঙ্গে সব ক্যাসিনোতে হঠাৎ করে একইদিনে অভিযান পরিচালনা করা। সে লোকবল তো আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আছে। আর না থাকলে প্রতিবেশী জেলাগুলো থেকে লোকবল সংগ্রহ করা যেত। প্রয়োজনে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী সদস্যদের সহায়তা নিয়েও এ কাজ করা যেত।

আশ্চর্য! যে দেশের সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, সে দেশে লাইসেন্স না নিয়ে মদ-জুয়া ব্যবসার বিরুদ্ধে ধার্মিক জনগণ নীরব! কোথায় আজ ইসলামী তাহজীব তমদ্দুন রক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ দাবিদার হজরত মাওলানা আহমেদ শফী হুজুর? কোথায় বঙ্গভবনে দাওয়াত খেয়ে নিজেদের মাদ্রাসার ডিগ্রিকে এমএ সমমানের স্বীকৃতি নেয়া সে আলেম সম্প্রদায়, যারা নিজেদের দাবি করেন ইসলামী সংস্কৃতি রক্ষার অভিভাবক? হয়তো তারা এ ব্যাপারে একটি দায়সারা প্রকৃতির বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করবেন। সরকার প্রদত্ত সুবিধা নিয়ে যদি আলেম ওলামারাও অনৈসলামিক কাজের বিরুদ্ধে কথা না বলেন, তাহলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলনবিমুখ হওয়ার জন্য জনগণকে দোষ দেয়া যায় না। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সম্মানিত আলেম ওলামা, মাদ্রাসা শিক্ষক ও ওয়ায়েজদের মধ্যে নামের শেষে মাদ্রাসার নাম বা জন্মস্থানের নাম জুড়ে দেয়ার রীতি প্রচলিত আছে। যেমন- হযরত মাওলানা অমুক নারায়ণগঞ্জী, বা হজরত মাওলানা ওমুক নানুপুরি, ইত্যাদি। এখন এসব সম্মানিত আলেম ওলামার কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে মনে হয়, নামের সঙ্গে প্রতিষ্ঠান বা জন্মস্থানের নাম জুড়ে দেয়ার পরিবর্তে তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন ঘটে এমন বিশেষণ জুড়ে দেয়া প্রাসঙ্গিক। সে ক্ষেত্রে তাদের সম্ভাব্য নাম হতে পারে : হজরত মাওলানা অমুক সুবিধাবাদী, অথবা হজরত মাওলানা অমুক সুবিধাভোগী, ইত্যাদি।

সম্প্রতি সাধারণ মানুষের মধ্যে অন্যায়-অত্যাচার নীরবে সহ্য করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক। যে দেশে নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, বেড়েছে বিরোধী দলের প্রতি হয়রানি, মামলা হামলা, নির্যাতন, সে দেশে জনগণ যে রাতারাতি গণতান্ত্রিক আচরণ করবেন তা প্রত্যাশিত নয়। নাগরিক সমাজের সচেতন অংশের একজন হয়ে আমি জানতাম, দেশে দুর্নীতি বাড়লেও অবকাঠামোগত কিছু উন্নয়ন হয়েছে। উন্নয়ন হয়েছে খেলাধুলার। এর মধ্যে ক্রিকেট, হকি, ফুটবল, গলফ, দাবা, শুটিং ইত্যাদি খেলায় আমাদের খেলোয়াড়রা ভালো করছেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এসব খেলার চেয়ে জুয়া খেলায় যে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে আমি সে সম্পর্কে অবহিত ছিলাম না। রাজধানীতে যে ক্যাসিনো আছে আমি তা জানতামই না। কয়েকজন যুবলীগ নেতা এবং কিছুসংখ্যক জুয়াড়িকে পাকড়াও করে এটা বন্ধ করা যাবে না। এ কাজ বন্ধ করতে চাইলে ক্যাসিনো সাম্রাজ্য যেসব গডফাদারের মদদে গড়ে উঠেছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

লেখক: ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার।
 অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
akhtermy@gmail.com

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh