রোববার,  ২৫ আগস্ট ২০১৯  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০১৯, ১৯:২৪:৫৭

কবিধর্ম এবং অনুপ্রেরণায় পাবলো নেরুদার অনুস্মৃতি

সাবিদিন ইব্রাহিম
পাবলো নেরুদার জীবন পাঠ করে মনে হলো যেন এক মহাসমুদ্রের মত জীবন। জীবনের অভিজ্ঞতার ঘাত-প্রতিঘাতরূপে অসংখ্য নদীর সম্মিলন তার বিশাল সমুদ্রস্বরূপ জীবনে। কত তীরে তরী ভিড়িয়েছেন এই কবি।
একজন কবি বড় হয়ে উঠেন তার বড় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, তার বিচিত্র অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। কবিদের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা থাকতে হয় ঈগলের মত। অনেক দূর থেকে অতি সূক্ষèাতিসুক্ষè জিনিস দেখার ক্ষমতা আছে ঈগলের। কবিদেরকে মানব জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার জন্য  প্রস্তুতি রাখতে হয়।
কবিরা কেমন এ নিয়ে শার্ল বোদলেয়ার (যাকে আর্তোর র্যাঁবো ‘কবি সম্রাট’ অভিধায় ভূষিত করেছিলেন) একটি মজার কথা বলেছেন। কথাটা সরলভাবে বললে এমন দাঁড়ায়- কবিদের ডানা এত বিস্তৃত যে তারা মাটিতে পা রাখতে পারেন না। অসীম আকাশেই কবিদের বসবাস!
কবিদেরকে বুঝাতে গ্রীক শব্দ Vates (ভাতেস) ব্যবহৃত হয়। খুব মজার ব্যাপার হলো প্রফেট এবং পোয়েট এ দুটো বুঝাতেই গ্রীকে এই একটি শব্দই ব্যবহৃত হতো। মানে পরিষ্কার, কবি ও নবীকে তারা একই গোত্রের মনে করতো।
পাবলো নেরুদার স্মৃতিকথা পড়ে মনে হচ্ছিল তিনি যেন শার্ল বোদলেয়ারের সেই ঈগল পাখির মতো বিশাল ডানা মেলে সাগর মহাসাগর পাড়ি দিয়েছেন আর জীবন থেকে দুহাত শুধু নয় চারহাত ভরে অভিজ্ঞতা নিয়েছেন। এই বিশাল ভবঘুরে সারা বিশ্বকে নিজের ঘর আর আসমানকে শামিয়ানা করে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। একজীবনে এত দেশ, এত মানুষের সঙ্গ, এত মানুষের সাথে বন্ধুতা, শত্রুতা, এত শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, ঘৃণা, অবহেলা পাওয়া কিভাবে একজনের পক্ষে সম্ভব হয়?
আমার পড়াশুনার অনেকগুলো কারণের মধ্যে যে কারণগুলোকে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে রাখি সেটা হলো: প্রথমত, আমি নিজকে গড়ার জন্য পড়ি। দ্বিতীয়ত, চলমান সংকটে পথ বা জীবনের রথ চালানোর জন্য অনুপ্রেরণা খুঁজি।
জানার জন্য, বুঝার জন্য, আশ্রয়ের জন্য, বিনোদনের জন্য, সময়ের প্রয়োজনে পড়া তো আছেই। তবে আমাকে কেউ প্রশ্ন করলে আমি সাধারণত প্রথমে এই উত্তরটিই দেই যে আমি পড়ি ‘টু শেইপ মাইসেল্ফ আপ’। দ্বিতীয়ত খুব আনন্দের মুহূর্তে বা কষ্টের মুহূর্তেও বই আমার খুব কাছের বন্ধু। গত সপ্তাহে আমি অনুপ্রেরণা খুঁজছিলাম। পাবলো নেরুদার ‘অনুস্মৃতি’ থেকে বেশ অনুপ্রেরণা পেলাম।
মোবাইলে কথা বলার জন্য যেভাবে রিচার্জ করতে হয় তেমনি জীবনকে সামনে নিয়ে যেতে হলে ভালো অনুপ্রেরণা লাগে। এ অনুপ্রেরণা পেতে হলে আমাদেরকে কিছু মহান জীবনের কাছে যেতে হয়। বই হচ্ছে তাদের কাছে পৌছাঁর সবচেয়ে ভালো দরজা আর সেটা যদি হয় ওই মহামানবের নিজের লেখা তাহলে তো কথাই নেই। পাবলো নেরুদার ‘অনুস্মৃতি’ পড়ে রিচার্জ হয়েছি এটা বলতে পারি নির্দ্বিধায়।
এবার আসুন বইটি নিয়ে কিছু তথ্য দেই। বইটি মূলত স্প্যানিশ ভাষায় লিখিত আর পাবলো নেরুদার জন্মস্থান চিলি। স্প্যানিশ ভাষায় বইটির নাম ‘Confiesco que he vivido: Memories’ এর বাংলা ‘মর্মানুবাদ’ করেছেন ভবানীপ্রসাদ দত্ত। ‘অনুস্মৃতি’ নামে বইটি কলকাতায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮১ সালে। বাংলাদেশে একুশে পাবলিকেশন্স এটা পুন:প্রকাশ করে ২০০৪ সালে। আমার হাতে বর্তমানে এই কপিটিই আছে।
নেরুদা ল্যাটিন আমেরিকার দেশ চিলিতে জন্মগ্রহণ করলেও সারা বিশ্বে রয়েছে তার অধিকার এবং তার উপরেও রয়েছে বিশ্ববাসীর অধিকার। এজন্য আমরা দেখতে পাই তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় কয়েকটি দেশ তাকে নাগরিকত্ব দিয়েছিল। তবে এর বিপরীত অভিজ্ঞতাটাই বেশি। জীবনের বেশিরভাগ সময়ই ক্ষমতাসীনদের দাবড়ানির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছি তাকে। তার মাথা ও জীবনের মূল্য ধরে রেখেছিল চিলির স্বৈরশাসকেরা। দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য স্বৈরশাসকেরাও তাকে আশ্রয় দেয়নি। এজন্য কখনো প্যারিসে, কখনো ইতালি বা স্পেনে কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের অনেক সময়। সারা বিশ্বের শ্রমজীবি মানুষের ছিলেন তিনি আত্মার আত্মীয়। এজন্য খুব সহজেই তাদের সাথে মিশে যেতে পারতেন এবং তাদের একজন হয়ে যেতেন। বিশ্বখ্যাত সাময়িকী প্যারিস রিভিয়্যুতে এক দীর্ঘ সাক্ষাতকারে নেরুদা বলেছিলেন,  “আমি একজন চিলিয়ান। দশকের পর দশক আমি দেখেছি কিভাবে এ দেশের মানুষগুলো দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। আমিও দেশের অংশ হিসেবে তাদের কষ্ট-সুখের ভাগিদার হয়েছি। আমি তাদের কাছে অতিথি নই। আমি এই জনগণ থেকেই উঠে এসেছি এবং আমি তাদেরই অংশ। আমি একটি শ্রমজীবি পরিবার থেকে উঠে এসেছি...আমি ক্ষমতাসীনদের মতন নই। আমার পেশা এবং কর্তব্য হচ্ছে চিলিয়ান জনগণকে সেবা করা। এবং আমি আমার কাজ এবং কবিতার মাধ্যমে সেটা দেয়ার চেষ্টা করেছি। আমি তাদের গান গেয়ে, তাদের পক্ষ হয়েই বেঁচেছি।”
সত্যিই তিনি ছিলেন শ্রমজীবি, কৃষক, মুটের অতি আপনজন। তাদের জীবন সংগ্রামের কথা তার লেখাতে উঠে এসেছে একেবারে নিঁখুতভাবে। সাধারণ মানুষও তাকে ভালোবেসেছে কাছের বন্ধু হিসেবে, আত্মার আত্মীয় হিসেবে। তবে তিনি শাসকগোষ্ঠির কাছে বিশেষ করে স্বৈরশাসকদের কাছে ছিলেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক। তার কবিতা, তার শব্দঝঙ্কার স্বৈরশাসকের তখত নাড়িয়ে দিতো। এজন্য তাকে আটক বা হত্যা করার জন্য মরিয়া হয়ে থাকতো স্বৈরশাসকদের নিরাপত্তা বাহিনী। এজন্য বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধরে সাধারণ মানুষদের ভীড়ে হারিয়ে গিয়েই নিজেকে রক্ষা করতেন নেরুদা।
প্রথম জীবনে অবশ্য চিলির বাণিজ্যদূত হিসেবে কাজ করেছেন সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার ও মোহিকার মত দেশগুলোতে। ১৯২৮ এর দিকে এই ভারতবর্ষেও বেশ কিছুদিন ছিলেন এবং গান্ধী, নেহরুসহ অনেকের সাথেই পরিচিত হয়েছিলেন। ব্রিটিশ ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতাতেও অবস্থান করেছিলেন নেরুদা। এ সব মিলিয়ে আমরা বলতেই পারি নেরুদা আমাদেরও আত্মীয় এবং তার গড়ে উঠার পেছনে এই ভারতীয় উপমহাদেশও ভূমিকা রেখেছে।
 
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com