রোববার,  ২৫ আগস্ট ২০১৯  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০১৯, ১৭:৪০:৫৪

ন্যায় অন্যায়

সুমাইয়া সিকদার
আজমল হোসেন অফিসের সেমিনার হলে বসে আছেন। সম্পূর্ণ রুমে তিনি একা। পিনপতন নীরবতা। অনুষ্ঠান শুরু হবার কথা ১০টায়। এখন বাজে ১১টা ১৫।
 আজ তার রিটায়ারমেন্ট উপলক্ষে ছোটখাটো একটা অনুষ্ঠান হবার কথা। কাল জামিরুল সাহেব তাকে ডেকে বললেন,
"কাল চাকরি জীবনের শেষ দিন কি চান আপনি আমাদের কাছ থেকে?"
আজমল হোসেন বললেন, "কিছুই চাই না স্যার।"
"তুমি কিছু চাও না বললেই তো আর আমরা আমাদের দায়িত্ব থেকে হাত গুটিয়ে বসে থাকব না। কাল ১০টায় সেমিনার হলে তোমার রিটায়ার্ডের জন্য একটা কিছু করব।"
"জ্বি, আচ্ছা স্যার"
 
এতক্ষণ যাবত তিনি বসে আছেন। হল রুমে আসার কারোর কোনো নাম গন্ধই নেয়। তিনি বুঝতে পেরেছেন তার রিটায়ার্ড নিয়ে কারোর কিছু আসে যায় না। বরং সবাই হয়তো হাফ ছেড়ে বেঁচেছে তার রিটায়ার্ডের খবর শুনে। আয়কর অফিসের সবচেয়ে পু্রোনো কর্মচারী তিনি। প্রায় ৪৫ বছর এই অফিসে কাজ করেছেন। অফিসের প্রত্যেকটা কর্মকর্তা, কর্মচারী বছর দুয়েক পরপরই ট্রান্সফার হয়ে অন্যত্র চলে যায়। শুধু মাত্র তিনিই একজন কর্মচারী যার আজ পর্যন্ত ট্রান্সফার হয়নি এবং পদোন্নতিও হয়নি।
 
আজমল হোসেন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। ধীরে ধীরে চেয়ার ছেঁড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বড় অফিসারের রুমের দিকে যাচ্ছেন তিনি। করিডোরে জামিরুল সাহেবের সাথে দেখা। তিনি বললেন, "আরে আজমল সাহেব যে! কেমন আছেন?"
আজমল হোসেন মৃদু হেসে উত্তর দিলেন।
"আলহামদুল্লিল্লাহ, আপনি?"
"ভালো আর কিভাবে থাকি বলেন। স্যার এত এত কাজ ডেস্কে দিয়ে দারজ গলায় বলে,
কাজ গুলা আজই শেষ করে দিন। বলেন তো কেমনটা লাগে।"
"জ্বি স্যার"
"ওহ তা কোথায় যাচ্ছেন?"
"রিটায়ারমেন্টের লেটার আনতে।"
" ওহ আমি তো ভুলেই গেয়েছিলাম আজ আপনার ...। কিছু একটা করার কথা ছিল। কি করব বলুন, যে চাপ।
"জ্বি"
"কিছু মনে করবেন না। অন্য এক সময় আপনার রিটার্নিং নিয়ে বড় করে সেমিনার করব। তখন আমি নিজে গিয়ে আমন্ত্রণ জানাব।"
"জ্বি, আসি স্যার।"
 
জামিরুল  সাহেব হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। নিজ কক্ষে চলে গেলেন। আজমল হোসেন বড় অফিসারের রুমের সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। বড় অফিসারের রুমের সামনের জায়গাটা খালি। টেবিলটার ওপর একটা কালো বড় মাছি ভনভন করছে। এই টেবিলটাই তিনি ৪৫ বছর বসে কাটিয়ে দিয়েছেন। এক রকম মায়ায় পরে গেলেন টেবিলটার ওপর। হয়তো নতুন কেউ এসে টেবিলটাই পাল্টে ফেলবে। তার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল টেবিলটাই একদন্ড বসতে। ইচ্ছেটাকে অগ্রাহ্য করে বড় সাহেবের রুমে ঢুকে গেলেন।
আমাদের জীবনে অনেক কিছু করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু সব ইচ্ছেকে পূরণ করতে হয় না। এতে মায়া বেড়ে যায়। মায়া বড্ড খারাপ। একবার মায়ায় জড়িয়ে গেলে তা কাটানো বড় মুশকিল।
 
"স্যার আসব?"
হকচকিয়ে গেলেন বদিরুজ্জামান। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। এসি রুমে বসেও তিনি ঘামছেন। আজহার মৃদু হেসে বদিরুজ্জামানের পাশে দাঁড়ালেন।
"ভয় নেই স্যার। এই অফিসে আর একটি সৎ মানুষও নেই যে আপনার বিরুদ্ধে অন্যায়ের অভিযোগ করবে।"
থতমত খেয়ে বদিরুজ্জামান বললেন,
"কি বলতে চাও তুমি?"
"তেমন কিছু না স্যার, আপনি যা করছিলেন তা আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু এখন আমার কিছু করার নেই। কপালের ঘাম মুছে নেন। একজন কর্মচারীকে দেখে ঘেমে যাচ্ছেন, এটা আপনার জন্য খুবই লজ্জাজনক।"
"আজ তো তোমার রিটায়ার ডে। রিটায়ার লেটার নিতে এসেছো?"
"জ্বি"
"দেখেছো আজ তোমার রিটায়ার্ড ডে, অথচ একটা মানুষও তোমাকে বিদায় জানাতে আসেনি। আজ যদি তুমি."
"অসৎ কোনো কিছুই আমি গ্রাহ্য করি না। তা এই অফিসের প্রত্যেকটা মানুষ জানে। আপনি যেই টেবিলটায় বসে আসেন সেই টেবিলে কেউ এক বছরের বেশি স্থায়ী হয়ে বসতে পারেনি। কারণটা হয়তো আপনি জানেন।"
 
বদিরুজ্জামান টিস্যু দিয়ে কপালের ঘামটা মুছে নিলেন। ড্রয়ার থেকে রিটায়ারের লেটারটা বের করে আজহারের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
"অসৎ কিছুই না আজহার, যার টাকা বেশি তার সম্মান বেশি। দেখো পেনশনের টাকাটি পাও কি না।"
"কেনো পাবো না স্যার। ৪৫ বছর সততার সাথে কাজ করেছি. "
"আপনি এখন আসতে পারেন।"
আজহারের চোখে জল টলমল করছে। দ্রুত সে রুম থেকে বের হয়ে আসলেন
বের হবার সময় টেবিলটায় ধাক্কা খেলেন।
অদৃশ্য কিছু কথোপকথন হলো তার আর টেবিলটার মাঝে।
 
"ব্যাথা পেলে বুঝি?"
"নাহ, এই সামান্যতে আমার কিছু হবে না।"
"আর কেউ জানুক বা না জানুক আমি তো সব জানি কিভাবে তুমি প্রত্যেকটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছো। অফিসের প্রত্যেকটা জড় বস্তু জানে সেই গল্প। মানুষ নামের প্রাণীগুলো তোমায় ভুলে গেলেও আমরা ভুলব না।"
আজহার অট্টহাসি দিতে দিতে বের হয়ে আসল। আয়কর অফিসের প্রত্যেকটা ইটে সেই হাসির প্রতিধ্বনি বাজতে লাগল। কেউ কেউ অদ্ভুত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
 
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com