বৃহস্পতিবার,  ২২ আগস্ট ২০১৯  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৯, ১৭:২৭:৫৬

লেখকদের ব্যতিক্রমী জীবন

তাহা ইয়াসিন
বাংলাদেশের লেখক-সাহিত্যিকদের সাধারণ মানুষ তেমন চেনে না। পাঠ্যপুস্তকে যাদের গল্প-কবিতা থাকে শিক্ষার্থীরা তাদেরকে কিছুটা চেনে। পাঠ্যপুস্তকে প্রতিষ্ঠিত পুরনো  কবি-সাহত্যিদের কিছু লেখা এবং সাম্প্রতিক লেখক-সাহিত্যিকদের লেখা থাকে। যারা এসব লেখা বাছাই করে অনেকটা তাদের পছন্দ-অপছন্দ অনুযায়ী সেসব অন্তর্ভুক্ত হয়।
খোদ বড় শহরগুলোতেও শিক্ষিত শ্রেণির মাঝে এখনকার অনেক বিখ্যাত লেখক-সাহিত্যিক অপরিচিত। দু’চারজনের নাম সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞেস করলে যে কেউ তার প্রমাণ পেতে পারেন। আমি অনেককে এখনকার বিখ্যাতদের নাম ধরে জিজ্ঞেস করেছিলাম কেউই তাদের চেনে না। খুব অল্পসংখ্যক মানুষ তাদের চেনে। তারপরও সাহিত্য সৃষ্টিতে অনেকের অবদান টিকে থাকবে।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় লিখতেন জলচকিতে। ঘরের মেঝেতে বসে তার উপর কাগজ নিয়ে লিখতেন। জলচকির মধ্যে ড্রয়ার ছিল যেখানে কাগজ-কলম রাখতেন। এই অভ্যাস হুমায়ূন আহমেদেরও ছিল। হুমায়ূন আহমেদের কাছে চেয়ারে বসে লেখাটা অফিসের কর্মচারীর মতো মনে হতো। লেখার ফাঁকে ফাঁকে তিনি হাঁটতেন এজন্য তাঁর ছেলে নূহাশ বলতেন, সে লেখক হবে না। কারণ লেখক হলে বারান্দায় অনেক হাঁটাহাঁটি করতে হয়।
তারাশঙ্করের কথায় আসি, তিনি বেশ কয়েকটা উপন্যাস প্রকাশককে দিয়েছেন। প্রকাশকরা সেগুলো ছাপবেন পর্যায়ক্রমে। সেভাবে চুক্তি করা ছিল। এর মাঝে তাঁর স্ত্রীর সন্তান জন্মের দিন ঘনিয়ে আসে। তিনি ভাবলেন প্রকাশকদের কাছ থেকে কিছু অগ্রিম টাকা নেবেন। দুপুরে খাওয়ার জন্য সামান্য কিছু টাকা নিয়ে সকালে বের হন। প্রথম এক প্রকাশনায় গিয়ে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। প্রকাশনার মালিক আসলে তাকে তিনি তার টাকার কথাটা জানান। প্রকাশক বলেন, বই প্রকাশের আগে তিনি টাকা দিতে অপারগ।
সেখান থেকে বের হয়ে পকেটের পয়সা দিয়ে সামান্য জলপান করে অন্য দু’টি প্রকাশনায় যান। দ্বিতীয় প্রকাশকও টাকা না দেয়ার কথা জানান। তৃতীয় প্রকাশক সামান্য কিছু টাকা দিতে রাজি হন। অবশেষে সেই সামান্য টাকা হাতে নিয়ে পরিশ্রান্ত হয়ে ঘরে ফেরেন। পরবতর্তীতে তাঁর এরকম দিন আর থাকেনি। বাংলাদেশের অন্যতম চিন্তাবিদ ও লেখক আহমদ ছফাকে অনেকেই কাছ থেকে দেখেছেন। আমারও কিছুটা দেখার সুযোগ হয়েছিল। আহমদ শরীফকে তিনি খুব শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর শিক্ষকও ছিলেন। আহমদ ছফা কোনো এক কারণে আহমদ শরীফের উপর ভীষণ ক্ষেপেছেন। আহমদ শরীফের প্রায় সব বই তাঁর কাছে ছিল। বাসা থেকে বইগুলো রিকশায় নিয়ে টিএসসি’র ফুটপাতের কোনায় পালা করে রাখেন। এরপর জোরে জোরে আশপাশের সবাইকে ডাকেন। সবার উদ্দেশ্যে বলেন, আমার কাছে আহমদ শরীফের যত বই ছিল সব এখানে রাখলাম। আপনাদের যার যেটা ইচ্ছে নিয়ে যেতে পারেন। এ কথা বলে রিকশায় উঠে সোজা চলে যান। আহমদ শরীফ সে সময় জীবিত ছিলেন।
আহমদ শরীফের বাসায় একটি আড্ডার সংগঠন ছিল। সেখানে প্রতি শুক্রবার লেখক-সাহিত্যিকদের নিয়মিত আলোচনা বসে। বিভিন্ন বিষয়ের উপর সেখানে জ্ঞানগম্ভীর আলোচনা-সমালোচনা এবং আড্ডা হয়। এক শুক্রবার আহমদ ছফাকে ডাকা হয় লালনের উপর আলোচনার জন্য। আহমদ ছফা ঘরে ঢোকার পর আলোচনা অনুষ্ঠানের সভাপতিকে বললেন, ‘আমি যতক্ষণ এখানে থাকবো এবং আলোচনা করবো প্রয়োজনমতো সিগারেট খাবো। আপনাদের আপত্তি থাকলে বলেন, আমি চলে যাবো।’ সভাপতি তাঁকে বলেন কারো কোনো আপত্তি নেই। তারপর তিনি সিগারেট ধরিয়ে আলোচনা শুরু করেন। তারপর পুরো সময় ধরে সিগারেট টেনে আলোচনা করেন। সবার এটা জানা ছিল যে, তাঁর মতের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করামাত্রই তিনি সোজা চলে যাবেন।
আহমদ ছফাকে ক্ষেপানোর উপায় ছিল সহজ। কথাপ্রসঙ্গেও কেউ যদি তাঁর সামনে বাংলাদেশের অন্য কোনো লেখকের প্রসঙ্গ তুলে একটু ভালো কিছু বলতো সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গায়ে আগুন জ্বলে উঠতো। তিনি মনে করতেন তাঁর চেয়ে ভালো এবং বড় লেখক কেউ বাংলাদেশে নেই।
শুধু অন্য কেউ বললেই ক্ষেপে যেতেন তা নয়, তিনি নিজেও বলতেন অন্যেরা কেউ লেখকই না। তিনি একমাত্র এবং শক্তিশালী লেখক। বলে একটু বোকামি হাসি দিতেন।
প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক আহমদ ছফার বন্ধু। তাঁর ছেলে দীপন এবং মেয়ে সূচিতা শারমিন যখন ছোট ছিল সে সময় আহমদ ছফা নিয়মিতই তাদের বাসায় যেতেন। দীপন এবং সূচির সাথে আহমদ ছফা গল্প করতেন। একদিন প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক মাও সেতুং এর উপর এক অনুষ্ঠান থেকে ফেরার সময় হাতে একটা লিফলেট নিয়ে আসেন। বাসায় এনেছেন এজন্য যে ফ্রেস হয়ে পড়বেন। বাসায় ফিরে তিনি সেটা টেবিলের ওপর রাখেন।
দীপন দেখে কাগজটার উপর একটা লাল টুপি পরা ছোট ছবিও আছে। ছবিটা দেখিয়ে দীপন তার পিতার কাছে জানতে চায় এই ছবিটা কার? তিনি বলেন, এটা মাও সেতুং এর ছবি। মাও সেতুং চীন দেশের বড় নেতা ছিলেন। দীপন বলে, ‘আব্বু ইনি কি ছফা কাকুর চেয়েও বড় কেউ?’
আবুল কাসেম ফজলুল হক বিস্মিত হন এই ভেবে যে দীপনের মাঝে এই ধারণা আহমদ ছফা তৈরি করেছেন। আহমদ ছফা সবসময় এই ধারণাই অন্যদের দিতেন যে, তিনি অনেক বড়মাপের লেখক ও দার্শনিক।
আহমদ ছফা বড় মাপের মানুষ ছিলেন সন্দেহ নেই তবে তাঁর নিজে থেকে এটা বলাটা এবং জোর দিয়ে বলাটা পাগলামি ছিল। আমি দেখেছি এই পাগলামিটা সত্যি সত্যিই তাঁর মধ্যে ছিল। বড় মাপের মানুষ ছিলেন বলেই হয়তো।
কবি জসীমউদ্দীনের নাম অনেকে জানে তাঁর ‘কবর’ নামক কবিতাটির কারণে। আবার খুব বিখ্যাত না হলেও মোতাহের হোসেন চৌধুরীকে তাঁর ‘সংস্কৃতি কথা’ গ্রন্থটির কারণে অনেকে চেনেন। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামকে কম লেখাপড়া জানা মানুষ পর্যন্ত চেনে। বড় বৃক্ষের ছায়া যেমন অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয় রবীন্দ্রনাথ-নজরুল বাঙালি জীবনে তেমন। তবে এখন শিক্ষার নামে যেভাবে সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা যায়, বিন্দুমাত্র ত্যাগ-সাধনা না করে পাড়ায়-মহল্লায় বিখ্যাত লেখক-সাহিত্যিক-রাজনীতিবিদের বাগাড়ম্বরতায় যখন সবসময় ভয়ে থাকতে হয়, দু’পয়সার জন্য মানুষ হিংস্র প্রাণীর আচরণ করে যেভাবে দালালী করতে পারে, দেশ-জাতীর ধ্বংস করে হলেও যখন মানুষ  নিজস্বার্থ সিদ্ধির জন্য কূটকৌশলের আশ্রয়গ্রহণ করে, দলীয়-তল্পীবাহক-ভাঁড় শ্রেণির লেখক-সাহিত্যিকের ভিড় যেভাবে বেড়ে গেছে তাতে যে কেউ নিজেকে রবীন্দ্র-নজরুলের চেয়ে বড় ঘোষণা করলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। একটা জাতির ভেতর জবরদস্তির রাজনীতি শুরু হলে এবং অপ-সংস্কৃতি মাত্রাহীনতায় পৌঁছালে এমন ঘটনা ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। মানুষ সেটা মানতে না চাইলে এমন পরিস্থিতি  তৈরি করা হবে যাতে সবাই সেটাই মানতে বাধ্য হয়। 
সমুদ্রগুপ্ত আজ আমাদের মাঝে নেই। কবি সমুদ্রগুপ্ত নামে একজন কবিকে অনেকেই আজিজ মার্কেট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই দেখে থাকবেন।
দৃশ্যত আপাতমস্তক এবং অন্তর্গতভাবে তাঁর মাঝে পরিপূর্ণ কবিসত্তা বিরাজমান ছিল। তাঁর মাথাভর্তি ধবধবে সাদা চুল ছিল কাঁধ পর্যন্ত বিস্তৃত। মুখ ঢাকা থাকতো বকের পাখার ন্যায় সফেদ গোঁফে।  দুধে আলতা গাত্রবর্ণের এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো তিনি যেন প্রাচীন ভারতের কোনো ঋষি পুরুষ। 
তাঁর বাস্তব জীবন কেমন ছিল এটা কম লোকেই জানত। ২০০৮ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর অনেকেই তাঁকে নিয়ে লিখেছেন। আমার সামনে যতটা লেখা এসেছিল সেগুলো আমি পড়েছি। লেখাগুলো ওই সকল মানুষ কেন লিখেছিলেন আমি তা জানি না। ঘর থেকে বাইরের ঢাকা শহরে ভেসে বেড়ানো সমুদ্রগুপ্ত নামের যে মানুষটাকে আমি দেখেছি তাঁকে কোনো একটা লেখায়ও পাইনি।
আমার সাথে আজিজ মার্কেটে প্রায়ই দেখা হতো। আমি শুধু তাঁকে একটি বাক্য বলতাম, ‘দাদা আপনি ভালো আছেন?  তিনি সাদা কেশরাশিতে ঢাকা মুখে নিরস হাসি দিয়ে বলতেন ‘এই আছি।’ তারপর আমি আমার কাজে ছুটতাম। তাঁর কাছ থেকে আমার জানার কিছু ছিল না। অর্থাৎ ভালো আছেন? নাকি ভালো নেই? কারণ তাঁর জীবনটা আমার মুখস্ত ছিল।
২০০০ সালের আগে এমএ পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আমি ফ্রি। সাধারণত এমএ ক্লাসকে প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের শেষ ক্লাস মনে করে সবাই পরীক্ষা শেষ হলে হাঁপ ছাড়ে। আমি রেজাল্ট বেরোনো অবধি সময় পেয়েছিলাম। রেজাল্টের পর পিএইচডি শেষ করে হাঁপ ছাড়তে আমাকে আরও ছয় বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। ছাত্রই থেকেছি। যাক, সেটা আলাদা প্রসঙ্গ।
আমাদের এক সৌখিন বড় ভাই গোলাম মাহমুদ এমএ পরীক্ষার পর বললেন, এই সময়টা প্রিন্টিং প্রেসে কাজ করো। বেতন যা দেয় দিক সেটা নিয়ে চিন্তার দরকার নেই, তুমি প্রেসের সমস্ত কাজ শিখে ফেলো। আমাদের পার্টির একটা অত্যাধুনিক প্রেস করা হবে। সেটার মার্কেটিং দিকটা  তুমি দেখবে।’ 
কাঁটাবন ঢালে প্রেসপাড়ায় কত কিছু যে শেখা শুরু করলাম তার ইয়ত্তা নেই।  কাগজ কত প্রকার, বইয়ের বাঁধাই কত প্রকার এবং কী কী? কোন বাঁধাইয়ে কোন কোন জিনিস ব্যবহৃত হয়? কোন বাঁধাইয়ে পিটাতে হয়, কোনটাতে চাপ দিতে হয়, কোনটাতে পিন মারতে হয়? কার্ড কত প্রকার? লেমেনেটিং কি?  ফর্মা কি? বড় পেজ, ছোট পেজ কোনটার কতটায় এক ফর্মা, ছাপার কত রঙ, কত ধরন ইত্যাদি ডায়েরিতে লিখে মুখস্থ  এবং সব ধরনের নমুনার আলাদা ফাইল তৈরি করতে হলো। 
আমাকে প্রেস চালাতে হবে, বিরাট দায়িত্ব সামনে আসিতেছে! শিখতেই হবে এবং গোটা ঢাকা শহরের নানান জায়গা থেকে কাজ আনতে হবে। সব ধরনের অফিসে ভীষণ দৌড়াদৌড়ি শুরু হলো। প্রেসের সবাই চলে যাওয়ার পর আমি ফিরে আসি। দিনে শত শত টাকা রিকশাভাড়া দেই। রিকশায় বসে থাকতে থাকতে  চোখ বন্ধ হয়ে আসে, কোমর ব্যথা করে। 
যেখানেই যাই আমার ব্যাগে দু’চার প্রুফ কপি সবসময় থাকে, সমুদ্রগুপ্তের বাসায় দিয়ে আবার নিয়ে আসতে হয়। পশ্চিম ধানমন্ডিতে তাঁর দুই রুমের বাসা। দারিদ্র্যের সকল নমুনা সে বাসায় উপস্থিত। পরিবারের সদস্য বলতে সমুদ্রগুপ্তের স্ত্রী এবং এক মেয়ে। আমাকে প্রেসের মালিক পাঁচশ’ কিংবা একহাজার টাকা হাতে দিয়ে বলে দিতেন, এটা দেবেন আর বলবেন কাজ শেষে পুরো টাকা দিয়ে যাবো। বলতেন অভাবী লোক বেশি টাকা দিলে খেয়ে ফেলবে কাজ আটকে থাকবে। তখন মেজাজটা টনটনে ছিল, মনে হতো এতোবড় শয়তান লোক এটা।
টাকাটা হাতে দেয়ার পর সমুদ্রগুপ্তের শুকনো মুখোচ্ছবিটা কয়েকদিন মনে ভাসতো। খারাপ লাগায় মাঝে মাঝে ঘুমোতে পারতাম না। তিনি কিছু বলতে পারতেন না কারণ কাজটা তাঁর দরকার। প্রয়োজন মানুষকে কেমন কুঁচকে করে দেয় তার আগে জানা ছিল না।
সমুদ্রগুপ্তের মেয়ে ইন্টারমিডিয়েটের ফরম ফিলাপ করবে, তিন হাজার টাকার দরকার। আমাকে বললেন, ‘ভাইকে আপনি একথা না বলে কিছু টাকা নিয়ে দিয়েন।’ আমার চেষ্টা ব্যর্থ হলো। তাঁকে দিয়ে অন্য এক সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুও একই কাজ করাতেন। বন্ধুকে সে কথা বললাম। সে ওই টাকা ম্যানেজ করে দিয়েছিল। 
সমুদ্রগুপ্তের ঘাড়ে সবসময় একটা ব্যাগ থাকতো। সে ব্যাগে বয়ে বেড়াতেন আয়ূর্বেদীয় ওষুধ। নানাজনের কাছে তা বিক্রি করতেন। ঢাকা শহরে এইসব ধানাই-পানাই আয় দিয়ে স্ত্রী-সন্তানসহ কীভাবে জীবন তিনি যাপন করতেন কেউ সেটা জানতো না। তাঁর মেয়ের ফরমফিলাপের ব্যবস্থা আমি করে দিতে পারিনি। জীবনে প্রথম একজন মানুষের জন্য কিছু করতে না পারার বেদনা আমাকে বহুদিন কষ্ট দিয়েছে। তখন আমি মনে মনে এই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম কোনোদিন লেখক-সাহিত্যিক হবো না। 
ওই প্রেসে আরও বহু কবি-সাহত্যিককে আসতে দেখেছি। যাঁরা ছিলেন সমুদ্রগুপ্তের বিপরীত। তাঁদের বেশিরভাগকে মনে হয়েছে নীতিহীন এবং অসৎ।
কবিদের জীবনবোধ কেমন হওয়া উচিত সে সম্পর্কে খ্রিস্টপূর্ব ৬৫ অব্দের গ্রিক সাহিত্যতাত্ত্বিক হোরেস লিখেছেন, কবিদের পক্ষে রীতিগত সৌন্দর্য থাকাই যথেষ্ট নয়; কবিতাকে যদি শ্রোতার মন জয় করতে হয়, তা হলে তার সন্মোহনী শক্তিও থাকতে হবে। যেমন হাসিমুখের দিকেই মানুষ হাসিমুখে তাকায়, তেমনি কান্নাভরা মুখের দিকেই মানুষ সহানুভূতির চোখে তাকায়। তুমি যদি আমাকে কাঁদাতে চাও, তা হলে  প্রথমে তোমার নিজেকেই দুঃখের অনুভবে আবিষ্ট হতে হবে।’ 
হোরেস আরও বলেছেন, ‘একবার যখন ব্যক্তিগত লাভের ক্ষয়কারী লোভ আমাদের আত্মাকে কলুষিত করে তখন তার মধ্য থেকে আর সেই ধরনের কবিতা লেখা সম্ভব হয় না। একজন বড় মাপের কবি একজন বড়মাপের দার্শনিকও।’
বাংলাদেশে শিল্প সৃষ্টিকারী অ-কলুষিত আত্মার কবি-সাহত্যিক খুব কমই জন্মেছেন। 
প্রেসের ওই চাকরির বেতনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছোটবোনকে তিনশ’ টাকার একজোড়া স্যান্ডেলই কিনে দিতে পেরেছিলাম। এমএ’র রেজাল্ট হওয়ার পর সেই চাকরি ছেড়ে দেই। প্রায় বছর খানেক চাকরি করে ঢাকা শহরের লেখক-সাহিত্যিকদের তলাটা তখন দেখেছি। 
প্রেসের মালিক ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টি থেকে রাশিয়ায় ডাক্তারি পড়তে যাওয়াদের একজন। বাংলাদেশ থেকে প্রেরিত হয়ে রাশিয়ায় লেখাপড়া করে ইরানে পাঁচবছর ডাক্তারি চাকরির মাধ্যমে যা রোজগার করেছেন সেটা দিয়ে এবং ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে প্রেস দিয়েছিলেন। অসৎ এবং ধড়িবাজ লেখক-সাহিত্যিকরা সেখানে আসতেন নানা কিছু খেতে। আর সেটাই ছিল তার ব্যবসার গুডউইল।
দেশের শত শত তরুণ রাশিয়ায় কমিউনিস্ট দীক্ষার জন্য গিয়েছিলেন আর এইসব নষ্ট রাশিয়ান শিক্ষিতরা ফিরে এসে হয়েছিলেন অন্যরকম মানুষ। 
সমুদ্রগুপ্তের কবিতা নিয়ে এখানে আর আলোচনা করে লেখাটা বড় করতে চাই না। জীবন দিয়েও অনেকে লিখেছেন কবিতা তাঁদেরই একজন সমুদ্রগুপ্ত, যাঁকে আমরা চিনি না।
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com