স্বাধীনতার চেতনা থেকে বাংলাদেশ অনেক দূরে: বসির আহমেদ

বসির আহমেদ। ছবি: সাম্প্রতিক দেশকাল

বসির আহমেদ। ছবি: সাম্প্রতিক দেশকাল

একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ শহর-গ্রাম মিলিয়ে দূর্বার গতিতে সংগঠিত হয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখ সমরের ইতিহাস আলোচনায় মফস্বলের মুক্তিযোদ্ধারা বরাবরই থেকে গেছেন অনালোচিত। তেমনই এক মুক্তিযোদ্ধ বসির আহমেদ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জাকারিয়া জাহাঙ্গীর।

কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।
আমাদের বাড়ির কাছেই ছিল ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প। যুদ্ধে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও ছোট বলে বাড়ি থেকে অনুমতি মিলেনি। ভাগিনাকে সঙ্গে নিয়ে একদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে যাই। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের বিলডোবা বিএসএফ ক্যাম্প হয়ে মহেন্দ্রগঞ্জে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেই। সেখান থেকে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যাই। সেখানে দেখা হয় আমার স্কুলশিক্ষক সোলায়মান হক স্যারের সঙ্গে। তিনি মুক্তিযোদ্ধা তালিকা তৈরির কাজ করতেন। তিনি আমাকে ছোট বলে নানাভাবে বুঝিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেন। ১৫ দিন আত্মীয় বাড়িতে থাকার পর মে মাসের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধে লোক নেওয়ার খবর পাই। ক্যাম্পে গিয়ে পুনরায় লাইনে দাঁড়াই। সোলায়মান স্যার আমাকে দেখে বলেন- তুমি আবার এসেছ? আমি বলি- স্যার, মরি আর বাঁচি আমাকে সুযোগ দেন। আমার আগ্রহ দেখে তিনি তালিকায় নাম লেখান। বিকেলে বিছানাপত্র নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে আসতে বলেন। সেখান থেকেই আমার যুদ্ধ যাত্রা শুরু।

মুক্তিযুদ্ধে প্রশিক্ষণ সম্পর্কে বলুন।
সোলায়মান স্যার প্রথমে আমাকে ফেরত পাঠিয়েছেন মূলত অস্ত্র নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে পারব না বলে। কিন্তু প্রশিক্ষণ শুরুর পর তার ধারণা পাল্টে যায়। মহেন্দ্রগঞ্জ ক্যাম্পেই আমার প্রশিক্ষণ হয়েছে। হাবিলদার ধন বাহাদুর সিং প্রথমে বাঁশের লাঠির এবং পরে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেন। তারপর ভারতীয় সেনাক্যাম্পে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নেই।

কোন কোম্পানির অধীনে কী ধরনের অপারেশনে অংশ নিয়েছিলেন?
আমি ১১ নং সেক্টরে হেলাল কোম্পানির অধীনে যুদ্ধ করেছি। যুদ্ধক্ষেত্রে রেকি করা, দোভাষীর দায়িত্ব পালন করাসহ সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেই। বেশিরভাগ অপারেশন কামালপুরেই করেছি। দেওয়ানগঞ্জেও অপারেশনে গিয়েছি।

যুদ্ধকালীন উল্লেখযোগ্য স্মৃতির কথা শুনতে চাই।
১৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের স্যার নির্দেশ দিলেন কামালপুরে আক্রমণে যেতে হবে। আমরা কামালপুর পাকিস্তানি ক্যাম্পের উত্তরে অবস্থান নেই। আমাদের সরাসরি আক্রমণ করতে প্রস্তুত করা হয়। আমাদের সহযোগিতা করতে আরও দুটি প্লাটুন দুই দিকে প্রস্তুত রাখা হয়। মধ্যরাতে অপারেশনের খবর জানাজানি হওয়ায় তা বাতিল করে আমাদের নিয়ে ভারতীয় গ্রাম ব্রাহ্মণপাড়া থেকে পুর্বদিকে টুংরো চর গ্রাম হয়ে বাংলাদেশে নয়াপাড়া গ্রাম দিয়ে মৃধাপাড়া মোড়ে চলে আসি। এ সময় আসতে সকাল হয়ে যায়। মৃধাপাড়া মোড়ের পশ্চিমে কাঠের ব্রিজ ছিল। ব্রিজের পশ্চিমে কিছু পাকসেনা দেখা যাচ্ছিল। আমরা তাহের স্যারকে বললাম- তাদের ওপর আক্রমণ করা হোক। 

তিনি বললেন- তাদের মারব না, ধরব- বলেই তাহের স্যার রাস্তার উত্তর পাশ দিয়ে কাঠের ব্রিজের নিচে গেলে ৫০০ গজ দূরেই শিমুল গাছে পাক সেনারা অবজারবেশন পোস্ট থেকে দেখে ফেলে। কামালপুর পাকিস্তানি বাহিনী ক্যাম্পে ওয়ারলেসে তারা বার্তা পাঠালে মুহূর্তেই ৬০ মিলিমিটার মর্টার সেল নিক্ষেপ করে। এতে তাহের স্যারের পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দ্রুত স্ট্রেচারে করে তাকে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে নিয়ে যাই। সেখান থেকে হেলিকপ্টারযোগে আসামের গৌহাটিতে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিন যে ভযাবহ হামলার মুখে পড়েছিলাম, সেই ভয়াল দৃশ্যটি আজও মনে পড়ে।

বিজয়ের বার্তা বহনের গৌরবময় অভিজ্ঞতার কথা বলুন।
৪ ডিসেম্বর সকালে যৌথবাহিনীর সেক্টর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার হরদেব সিং ক্লে ২০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার সামনে প্রস্তাব রাখলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধাকে কামালপুর পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব নিয়ে যেতে হবে। সবাই যখন নিশ্চুপ, আমি উঠে দাঁড়িয়ে হাত তুলে বললাম- আমি যাবো। কমান্ডার আমাকে নির্দেশনা দিলেন, তুমি এক হাতে সাদা পতাকা আরেক হাতে সারেন্ডার লেটার নিয়ে যাবে। ক্যাম্পের কাছে বাঁধ রোডের কিছু উপরে উঠবে সাদা পতাকা ও সারেন্ডার লেটার দেখাবে এবং ইশারায় ডাকবে। তারা আসলে হাতে সেরেন্ডার লেটার হস্তান্তর করবে আর গুলি চালালে নিচে পজিশন নিয়ে নেমে পড়বে। আমরা আর্টিলারি ফায়ার দিয়ে তাদের দমিয়ে রাখব তুমি চলে আসবে। 

সকাল ৮টায় সাদা পতাকা ও সেরেন্ডার লেটার নিয়ে কামালপুর ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ব্রাহ্মণপাড়া থেকে কামালপুর ক্যাম্প পর্যন্ত পুরো জায়গাটা ফাঁকা। আমি সাদা পতাকা উড়িয়ে মাঝামাঝি জায়গায় পৌঁছালে পাকিস্তানি সেনারা দেখে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যার যার ব্যাংকারে পজিশন নেয়। আমি অর্ধেক না উঠে সাহস করে বাঁধ রোডের উপরে উঠে পড়লাম। তাদের সারেন্ডার লেটার দেখালাম ও ইশারায় ডাকতে থাকলাম। প্রায় ৩০ মিনিট ডাকলেও তারা কাছে না এসে উল্টো ইশায়ায় তাদের কাছে যেতে বলে। ক্যাম্পে ঢোকার রাস্তায় গ্রেনেড মাইন লে আউট করে রেখেছে। সে পথ দিয়ে হেটে যাওয়া খুবই ঝুঁকি ছিল। দীর্ঘসময় পার হওয়ার পর গুলি করতে পারে ভেবে সাবধানে পা ফেলে ক্যাম্পে পৌছাই। 

একজন পাকিস্তানি আর্মি অফিসার এসে আমার হাত থেকে সেরেন্ডার লেটার ও সাদা পতাকা নিয়ে পিঠে হাত দিয়ে বলে- মুক্তিযোদ্ধা তুম মাত গাবরাও। সেখানে আমাকে দুটি রুটি, ডাল ও পানি খেতে দেয় তারা। আমার নিরাপত্তার জন্য একজন অফিসার নিয়োগ করে আশপাশে সৈন্যদের না আসার নির্দেশ দিলেন। 

যুদ্ধে যাওয়ার প্রেরণা কীভাবে পেয়েছিলেন?
পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের অধিকার বঞ্চিতসহ দেশের মানুষকে হত্যা, নারীদের ধর্ষণ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও নানা ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। কিশোর মনে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। মনে মনে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে। তারপর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে দেশ মুক্তির যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।

যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন তা কী বাস্তবায়িত হয়েছে বলে মনে করেন?
না, তা বাস্তবায়ন হয়নি। অপূর্ণ রয়ে গেছে অনেকটাই। স্বাধীনতার সত্যিকারের চেতনা থেকে বাংলাদেশ অনেক দূরে। এ সব ভেবে কষ্ট পাই।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু বলুন।
দেশের নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য থাকবে না, দুর্নীতি থাকবে না। বিশ্বের মধ্যে সেরা রাষ্ট্রের অন্যতম হবে বাংলাদেশÑ প্রজন্মকে এই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh