বাংলাদেশ এখন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনারও রোল মডেল: ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান। দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনে ঢাকা-১৯ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। সাম্প্রতিক দেশকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কে বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম ডি হোসাইন।

দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের সাফল্য তুলে ধরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেছেন, ‘বিশ্বে এখন আমরা শুধু উন্নয়নের রোল মডেলই নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলাতেও রোল মডেল হিসেবে একটা সম্মান পেয়েছি।’ বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড এসবে ক্ষয়ক্ষতি যাতে হ্রাস পায়, তার জন্য যা ব্যবস্থা নেওয়ার ইতিমধ্যেই তা নেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে এবং সবাই মনে করে, এটাও বাংলাদেশের কাছ থেকে শেখার রয়েছে। অনেকে বাংলাদেশের কাছ থেকে এটা এখন জানতে চায়।’ সাম্প্রতিক দেশকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাতকারে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

ডা. এনামুর রহমান বলেন, ‘দুর্গত মানুষের জন্য সরকারের পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যবস্থা রয়েছে। যে কোনো দুর্যোগে কেউ ত্রাণবঞ্চিত হবেন না। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ত্রাণসামগ্রী আগেই পৌঁছানো হয়। সরকারের সর্বোচ্চ প্রস্তুতির জন্য ক্ষতিও কম হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কোনো অনিয়ম মেনে নেওয়া হবে না। মন্ত্রণালয়ের কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে ভুয়া কমিটি তৈরি করে বরাদ্দের অর্থ কেউ লোপাট করার চেষ্টা করলে তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। ত্রাণ নিয়ে কেউ টালবাহানা করলে কোনোভাবেই ক্ষমা করা হবে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কোনো মানুষ যেন দুর্ভোগে না পড়ে, সেজন্য সকল প্রকার সহযোগিতায় প্রস্তুত রয়েছে বর্তমান জনবান্ধব সরকার।’

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের উল্লেখ করে ডা. এনাম যে কোনো ধরনের দুর্যোগের জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যে কোনো মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগই আসুক না কেন, সব ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশ সবসময় প্রস্তুত থাকবে, সেটাই সরকার চায়। ভলান্টিয়াররা নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করবে, সেটাই আশা করি। যে কোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় জান-মালের ক্ষতি কমিয়ে আনার জন্য তড়িৎ পদক্ষেপ গ্রহণেও জন্য সরকার সব সময় কাজ করছে। জাতির পিতা স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। তার একটা স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ হবে ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য মুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ। বর্তমান সরকার সেই সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে।’

ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী জানান, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরই ‘দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি-১৯৯৭’ প্রণয়ন করেছিল পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সরকারই আবার ২০১০ সালে এটি হালনাগাদ করেছে। জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল গঠন করেছে। ২০১২ সালে সরকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন করে একথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই আইনের আওতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর গঠন করা হয়েছে, যা দুর্যোগ মোকাবেলা, ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুহারা মানুষের দুর্দশার বিষয়গুলো আমলে নিয়ে ২০১৫ সালে একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় রিজিলিয়েন্স পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যা সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক ও এসডিজির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। ২০১৫ সালে সরকার ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার (এনইওসি) প্রতিষ্ঠা করেছে। বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য পূর্বাচলে একটি স্টেজিং এরিয়া নির্মাণ করা হচ্ছে। মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে সিভিল-মিলিটারি সমন্বয়ে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় রিজিওনাল কনসালটেটিভ গ্রুপের (আরসিজি) মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, “জাতির পিতা ১৯৭৩ সালে ‘ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি)’ প্রতিষ্ঠা করেন। যেখানে দুর্যোগ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বর্তমানে ৫৫ হাজার ৫১৫ জন সে¦চ্ছাসেবকের মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ৩২ হাজার নগর স্বেচ্ছাসেবক, প্রায় ২৪ লাখ আনসার-ভিডিপি, ১৭ লাখ স্কাউটস, ৪ লাখ বিএনসিসি এবং গার্লস গাইডের ৪ লাখ সদস্য যে কোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে। বর্তমান সরকার আরও ৩৭৮টি মুজিব কেল্লা নির্মাণ করছে। এ ছাড়া সরকার দেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলে ৩ হাজার ৮৬৮টি বহুমুখী সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করেছে। পর্যায়ক্রমে আরও ১ হাজার ৬৫০টি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতিকর প্রভাব অনেকাংশে কমে এসেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস দেওয়া, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সেই লোকগুলোকে সাইক্লোন শেল্টারে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা এবং দুর্যোগকালীন করণীয় বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা সৃষ্টির জন্য নিয়মিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, ‘যেখানে নদীভাঙন হবে, সেখানেই ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বাড়ি তৈরি করে দেওয়া হবে। নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বাজেটে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণ করার ফলে চর, পার্বত্য অঞ্চল, দ্বীপসহ দুর্গম অঞ্চলে আবহাওয়া বার্তা পৌঁছানো সহজ হয়েছে। দুর্যোগের সময় প্রতিবন্ধীদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে বিষয়ে সজাগ রয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার।’ ডা. এনামুর রহমান বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে ইতিহাসের সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষকে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলাম। ৫ হাজার ৫৮৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২১ লাখ ৬ হাজার ৯১৮ জনকে সফলভাবে সরিয়ে নিতে পেরেছি। নিরাপত্তা দিতে পেরেছি। ফলে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে।’ 

তিনি জানান, দেশে অধিক মাত্রার ভূমিকম্প হলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার ও অনুসন্ধান কাজে ব্যবহারের জন্য প্রায় ৬৩ কোটি টাকার ফর্ক লিফট, পাইলট ট্রান্সপোর্টার, এক্সক্যাভেটর, হুইল ডোজার, ক্রেন, মোবাইল লাইট ইউনিটসহ বেশ কিছু আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয় করে সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারী সংস্থা সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়াও ১৫৩ কোটি ৫২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা ব্যয়ে রেসকিউ ভেহিক্যাল পিকআপ, রিচার্জেবল সার্চ লাইট, ফোল্ডেবল স্ট্রেচার, বডি ব্যাগ, ফেস বা গ্যাস মাস্ক, রেসকিউ ইকুইপমেন্ট ফর ভলান্টিয়ারস ও সার্চ ক্যামেরা ক্রয় করে ব্যবহারকারী সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে তিনি জানান। ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার অভিযানে সফল অংশগ্রহণের জন্য ৬২ হাজার আরবান সার্চ অ্যান্ড রিসকিউ ভলান্টিয়ার তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে ৩৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। ভূমিকম্প-পরবর্তী ধ্বংসাবশেষ অপসারণের জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট সিটির জন্য পৃথক ডেবরিস ম্যানেজমেন্ট প্যান এবং ডেবরিস ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইনস প্রস্তুতের কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে। নিয়মতান্ত্রিক ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দুর্যোগের ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানসমূহ দুর্যোগকালে দ্রুত ও সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারবে।

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh