ধান-চালের ন্যায্য দাম দিতে চান প্রধানমন্ত্রী: খাদ্যমন্ত্রী

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার।

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার।

সাধন চন্দ্র মজুমদার। নওগাঁ-১ আসন থেকে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি তিনি খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও উদ্যোগ নিয়ে মন্ত্রী কথা বলেন সাম্প্রতিক দেশকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন এম ডি হোসাইন।

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, ‘চাহিদার চেয়ে বেশি ধান উৎপাদন হওয়ায় বর্তমানে ধানের দাম অনেক কম। এ ছাড়া ধান উদ্বৃত্ত থাকায় ধান ও চালের দাম পাচ্ছেন না কৃষক। অনেক জায়গায় ৫০০ টাকার কমে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে। এ নিয়ে সরকারও চিন্তিত। এ জন্য নতুন ধানের ন্যায্য দাম নির্ধারণের কাজ চলছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী অবগত। তিনি কৃষককে ধান ও চালের ন্যায্য দাম দিতে চান। এ জন্য কী করা যায়, প্রধানমন্ত্রী ভাবছেন। আমরাও ভাবছি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কাজ করছে।’ সাম্প্রতিক দেশকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।

সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, ‘কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ না করলে দেশ পিছিয়ে যাবে। তাই সারাদেশে ধান সংরক্ষণের জন্য দুই শতাধিক আধুনিক সাইলো নির্মাণ করা হবে। যাতে ধান উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে কৃষকরা বিক্রি করতে পারে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে প্রয়োজনে বাইরে চাল রফতানি করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে উৎকৃষ্টমানের চাল উৎপাদন করতে হবে, যাতে বাজার নষ্ট না হয়। চাল রফতানির বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে।’ 

খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের থেকে নয়, প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকেই ধান সংগ্রহ নিশ্চিত করতে হবে। ধান পাকার আগেই ফসল আবাদের পরিমাণ ও সংশ্লিষ্ট কৃষকদের তথ্য কৃষি অফিস সরবরাহ করবে। কৃষকরা এখন সরকারি খাদ্য গুদামে ধান দিতে আগ্রহী। ধান সংরক্ষণের উপযুক্ত আর্দ্রতা নিশ্চিত করেই ধান সংগ্রহ করতে হবে।’ দুর্নীতি ও অদক্ষতার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, ‘খাদ্য বিভাগের প্রতি সাধারণ মানুষের নেতিবাচক ধারণার পরিবর্তনে কাজ করা প্রয়োজন। উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়তে দুর্নীতি দূর করতে হবে। ধান সংগ্রহের সময় পরিমাপে বেশি নেওয়া পরিহার করতে হবে। একই সঙ্গে সংগৃহীত চালের মান নিশ্চিত করতে হবে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘বন্ধ মিল কোনোভাবেই চাল বরাদ্দ পাবে না। বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটর করা হচ্ছে। দেশে প্রয়োজনের তুলনায় খাদ্য গুদামের সংখ্যা খুবই কম। তারপরও এ বছর প্রায় ২৮ লাখ টন ধান ও চাল কেনা হচ্ছে। তবে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের জন্য সারাদেশে আরও ১৭০টি খাদ্য গুদাম নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব গুদামের মধ্যে ১ লাখ ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন গুদাম রয়েছে ১৬২টি এবং ৫.১৮ টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ৮টি স্টিল সাইলো রয়েছে। এর বাইরে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয় করে সংরক্ষণের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫ হাজার টন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন আরও ২০০টি ধানের সাইলো নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে।’

সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, ‘চাহিদার চেয়ে বেশি খাদ্য উৎপাদন হওয়ায় দেশে খাদ্যের কোনো ঘাটতি নেই। দেশে বর্তমানে ১৬ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যার জন্য প্রতিদিন প্রতিজনের ৫০৯ গ্রাম হিসাবে বছরে ৩ কোটি ৬ লাখ ৫৫ হাজার টন খাদ্যশস্যের চাহিদা রয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩ কোটি ২৮ লাখ ৬০ হাজার টন খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ৩ কোটি ১৯ লাখ ৫৫ হাজার টন চাল এবং ৯ লাখ ৩৪ হাজার টন অন্যান্য খাদ্যশস্য রয়েছে। এ হিসাবে ২২ লাখ ৫ হাজার টন খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত উৎপাদন হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কৃষি এখন বিশ্বের অন্যতম রোল মডেল। বিশ্বের বহু দেশের মানুষ কৃষির এই অকল্পনীয় উন্নয়নের গল্প শুনতে আসেন। খাদ্য উৎপাদন, সংগ্রহ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে জনগণের শতভাগ পুষ্টিমানের খাবার নিশ্চিত করে অচিরেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ মধ্যম আয়ের দেশের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। ইতিমধ্যে দেশ দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এখন জনগনের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিমানের খাবার নিশ্চিতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’

মন্ত্রী বলেন, ‘শুধু আইন দিয়ে এবং সরকার চেষ্টা করলেই হবে না, নিরাপদ ও পুষ্টিমানের খাবার নিশ্চিতের জন্য দেশের জনগণকেও সচেতন হতে হবে। বলতে হবে, ভেজাল খাব না, ভেজাল বিক্রি করতে দেবো না। ধানের নায্যমূল্য নিশ্চিত করতে খাদ্য শষ্য সংগ্রহ অভিযানে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হবে। কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত ফসলের নায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত না হন বিশেষ করে কৃষকদের উৎপাদিত ধানের নায্যমূল্য নিশ্চিত করে তাদের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা যায়, সে জন্য দেশের অধিক ধান উৎপাদিত এলাকায় ৫ হাজার মেট্রিকটন ক্ষমতাসম্পন্ন প্যাডি সাইলো নির্মাণে সরকার আগ্রহী। ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং ক্ষতি পুষিয়ে দিতে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনবে সরকার। প্রয়োজনে সংগ্রহের পরিমাণ আরও বাড়বে। ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোনো রকম অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা যেন ফায়দা লুটতে না পারে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। প্রান্তিক চাষিদের কাছ থেকে ধান কিনতে হবে। প্রতিটি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে ধান চাল সংগ্রহ অভিযান অব্যাহত থাকবে। কৃষকদের হয়রানি করলে সংশ্লিষ্ট খাদ্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ বরাদ্দ একবারই হবে, স্পেশাল বরাদ্দ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মানসম্পন্ন চাল কেনা নিশ্চিত করতে হবে। সরকার কৃষকদের ধানের ন্যায্য মূল্য দিতে সংগ্রহ মূল্য ধার্য্য করেছে। এতে শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হলে চালের দাম আরও বাড়তে পারে।’

খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। যারা খাবারে ভেজাল দেয় তারা সমাজের শক্র, মানবতার শক্র। শুধু রমজান মাসেই নয়, আমরা চাই ১২ মাসই জনগণ নিরাপদ খাদ্য খাবে। খাদ্যে ভেজালের বিষয়ে সবার মধ্যে আরও সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে সবাই মিলে একযোগে, এক হয়ে কাজ করে এটিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে হবে।’

সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, ‘বর্তমান মেয়াদে দেশের সর্বস্তরে পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশ অবশ্যই নিরাপদ খাদ্যের দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে। সেই লক্ষ্য নিয়েই সরকার কাজ করছে। কারণ আমরা জানি, দেশ বর্তমানে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, কিন্তু নিরাপদ খাদ্যে পিছিয়ে রয়েছে। আর এই লক্ষ্য অর্জনে যার যার অবস্থান থেকে জনগণকে সচেতন করার দায়িত্ব পালন করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার অঙ্গীকার আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে রয়েছে। সরকার গঠনের পর এই ইশতেহার বাস্তবায়ন করা এখন ম্যান্ডেটে পরিণত হয়েছে। কাজেই দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার প্রয়াসে সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায়ে রান্নাঘর পর্যন্ত সব প্রক্রিয়ায় নিরাপদের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিজ নিজ অবস্থান থেকে জাতিকে সচেতন করার দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে।’


মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh