দেশের সব জেলা রেলের আওতায় আসছে: রেলপথমন্ত্রী

রেলপথমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. নূরুল ইসলাম সুজন।

রেলপথমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. নূরুল ইসলাম সুজন।

অ্যাডভোকেট মো. নূরুল ইসলাম সুজন। পঞ্চগড়-২ আসন থেকে নবম, দশম এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি রেলপথমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। রেলপথে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও উদ্যোগ নিয়ে মন্ত্রী কথা বলেন সাম্প্রতিক দেশকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন এমডি হোসাইন।

‘দেশের সব জেলাকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনার জন্য কাজ করছে সরকার। রেল যোগাযোগের উন্নয়নে সারাদেশে একযোগে নতুন রেলপথ স্থাপন এবং বিদ্যমান রেলপথের সংস্কার কাজ চলছে। সড়ক ও জলপথের সঙ্গে রেলপথেরও ভারসাম্যপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায় বর্তমান সরকার।’ সাম্প্রতিক দেশকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেন রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন। 

রেলমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে ৪৪টি জেলা রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে। বাকি সব জেলার সঙ্গে রেল সংযোগ স্থাপনের অংশ হিসেবে মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, মেহেরপুর, মাগুরা, সাতক্ষীরা, বরিশাল, বান্দরবান, কক্সবাজার, নড়াইল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, মানিকগঞ্জ, পিরোজপুর ও বরগুনা জেলা রেলওয়ের নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হবে। ইতিমধ্যে এর বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয়েছে। সরকার নিরলসভাবে দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে, রেলপথের উন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু সেতুর সমান্তরালে যমুনা নদীর উপরে নতুন করে ব্রডগেজ ও মিটারগেজ রেল সেতু এবং খুলনা-মোংলা রেলপথ নির্মাণ করা হবে। ঢাকা-জয়দেবপুরে নতুন লাইন স্থাপন করা হচ্ছে। এতে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে রেল চলাচল স্বাভাবিক হবে। একসঙ্গে অনেক রেল চলতে পারবে। রেলের সিডিউল বিপর্যয় হবে না।’ 

রেলে বর্তমান সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের পর ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৮ হাজার ৬১৬ কোটি ৩৭ লাখ ব্যয়ে ৮১টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৭টি প্রকল্প সমাপ্ত হয়েছে। এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হওয়ায় রেলপথের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বিদ্যমান রেল রুটের পরিমাণ ২,৯৫৫.৫৩ কিলোমিটার। এর মধ্যে মিটারগেজ রেলপথের পরিমাণ ১,৮৪৬.০৯ কিলোমিটার, ব্রডগেজ রেলপথের পরিমাণ ৬৭৬.৬৬ কিলোমিটার এবং ডুয়েলগেজ রেলপথের পরিমাণ ৪৩২.৭৮ কিলোমিটার। ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩৭১.৩৩ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ ও ১১৫২.৪৮ কিলোমিটার রেলপথ পুনর্বাসন করা হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের এডিপিতে বাংলাদেশ রেলওয়েতে ৩৩টি বিনিয়োগ প্রকল্প এবং ৩টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প অর্থাৎ মোট ৩৬টি উন্নয়ন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।’ 

প্রতি ইঞ্চি রেললাইন নিরাপদ এবং সঠিক কি-না, তা দেখার লোক নিয়োগ করা আছে রেলে। প্রতিটি যাত্রার আগে ইঞ্জিন, কোচ নিরাপদ কি-না তাও নিশ্চিত করতে কয়েক স্তরের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু এরপরও রেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হচ্ছে। বিশেষ করে ট্রেন লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। এ ছাড়া বর্তমান সরকারের আমলে নতুন লোকবল নিয়োগ করা হয়েছে ১৩ হাজারের মতো। এরপরও রেলে দুর্ঘটনা কমছে না। 

এসব বিষয়ে রেলপথমন্ত্রী সুজন বলেন, ‘বিপুল বিনিয়োগ এবং নতুন লোকবল নিয়োগের পর ট্রেনে লাইনচ্যুতির ঘটনা মেনে নেওয়া কঠিন। এজন্য এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে অভিযান শুরু হয়ে গেছে। রেলের এসব অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধেও অভিযান চলবে। নতুন ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি আছে কি-না সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘রেলের নিরাপত্তাব্যবস্থা খুবই বৈজ্ঞানিক। সবাই সবার দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করলে লাইনচ্যুতি বা দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা খুবই কম। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেন লাইনচ্যুতি হওয়ার ঘটনাগুলো তদন্ত করা হচ্ছে। অনেক বিষয়ে তদন্ত শেষ হয়েছে। ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। পাশাপাশি রেললাইনে কি পরিমাণ খরচ হয়েছে, এর সঙ্গে বাস্তবতার মিল আছে কি-না, তাও দেখা হবে। রেলের বিনিয়োগের একটা বড় অংশ উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ হচ্ছে। রক্ষণাবেক্ষণে আরও জোর দেওয়া হচ্ছে। দুদক রেলের অনেক অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে সুপারিশ করেছে। আমরা সে বিষয়ে তৎপর রয়েছি। তবে অনিয়ম-দুর্নীতি রোধে আগে থেকেই কাজ করা হচ্ছে।’ 

বিভিন্ন দেশের সঙ্গে রেল যোগাযোগের বিষয়ে নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘আগামী ২০২২ সালে প্রকল্প মেয়াদের মধ্যেই কাজ শেষে মোংলা-খুলনা রেলপথ চালু হবে। মোংলা থেকে সরাসরি পণ্য নিয়ে ট্রেন যাবে ভারত, নেপাল ও ভুটানে। দেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মোংলার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য খুলনা থেকে মোংলা পর্যন্ত রেল লাইন স্থাপনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এই রেল পথ দিয়ে যাত্রী পরিবহণসহ মোংলা বন্দরের মালামাল পরিবহন করা হবে। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড় থেকে বাংলাবান্ধা হয়ে ভারতের শিলিগুড়ির সাথে এ রেল যোগাযোগ সরাসরি সংযুক্ত হবে। এর ফলে ভারত, নেপাল ও ভুটান সরাসরি রেল পথে পণ্য পরিবহনে মোংলাবন্দর ব্যবহারের সুযোগ পাবে। এই রেলপথের মধ্য দিয়ে জাতীয় অর্থনীতির অগ্রগতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে মোংলাবন্দর।’

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘সারাদেশে ট্রেন যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করার কাজ চলছে। ট্রেন যোগাযোগ ব্যবস্থা সবচেয়ে আরামদায়ক ও সহজতর যোগাযোগ মাধ্যম। উন্নত বিশ্বের মতো ট্রেনকে এগিয়ে নিতে আমরা বড় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। ২০৪৫ সাল পর্যন্ত ট্রেনকে নিয়ে পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। ২০২৫ সাল নাগাদ ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে বরিশালের পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেল সংযোগ স্থাপিত হবে। দেশের সব জেলায় রেল সংযোগ স্থাপন করে আপামর জনসাধারণকে স্বল্প খরচে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবহন সেবা প্রদানের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের বহুদিনের লালিত স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ স্থাপনের কাজও চলছে। পদ্মা সেতু হয়ে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পর্যন্ত রেল সংযোগ স্থাপনের জন্য বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে। আগামী বছরের মধ্য সাড়ে পাঁচশ’ নতুন কোচ সংযোজন করা হলে সারাদেশে যে চাহিদা রয়েছে, তা পূরণ করা যাবে।’ বন্ধ থাকা সব রেললাইন ফের চালু করা হবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত ও আধুনিক করতে রেলকে ঢেলে সাজানোর মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সারাদেশের রেল লাইনকে পর্যায়ক্রমে ব্রডগেজ লাইনে রূপান্তর করা হবে। এ ছাড়া ভারতের সঙ্গে বন্ধ কানেকটিভিটি পুনরায় চালু করা হবে।’


মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh