কর্মকর্তাদের দ্বন্দ্বে অনিশ্চিত গন্তব্যে বাংলাদেশের শুটিং

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সবেধন নীলমনির নাম শুটিং। নব্বই দশকের গোড়ার দিকে সাফল্যের শুরু এই খেলায়। এই ধারাটা কয়েক দশক ধরে চলমান ছিল; কিন্তু এখন আর সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারছে না অতি সম্ভাবনাময় খেলা ‘শুটিং’। কর্মকর্তাদের দ্বন্দ্বে একরকম দমবন্ধ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে আবদুল্লাহ হেল বাকিরা।

বিশেষ করে বাংলাদেশ শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের সভাপতি নাজিম উদ্দিন চৌধুরী ও মহাসচিব ইন্তেখাবুল হামিদ অপুর মধ্যকার দ্বন্দ্বে যেমন রেঞ্জের খেলা বন্ধ রয়েছে, ঠিক তেমনি তৈরি হচ্ছে ভজঘট পরিস্থিতি। কখনোই শুটারদের রাইফেল নিয়ে প্রশ্ন না ওঠা এখন বড় ধরনের সমস্যার নাম হয়ে আছে। নানা রকম সমস্যার বেড়াজালে বন্দি হয়ে একসময় অনেক বেশি আন্তর্জাতিক সাফল্য পাওয়া খেলাটি এখন অনেকটাই স্থবির। বিশেষ করে গুলশানের শুটিং কমপ্লেক্সের অডিটোরিয়ামের উন্নয়ন কাজের জন্যই সমস্যার সূত্রপাত বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে।

বিয়ের মৌসুমে যে অডিটোরিয়াম ভাড়া দিয়ে মাসে ৩০ লাখ টাকারও বেশি আয় হতো সেই টাকাই এখন গলার কাটা হয়ে গেছে। কারণ শুটিংয়ের মতো ব্যয়বহুল খেলা সরকার থেকে প্রাপ্ত ১৬ লাখ টাকা দিয়ে বছরে পরিচালনা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়; কিন্তু অনুষ্ঠান করে প্রাপ্ত অর্থ কোথায় আছে, কীভাবে খরচ হচ্ছে সেটি নাকি কেউ জানে না! যদিও অডিট রিপোর্ট আর বিভিন্ন সভায় এসব নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি বলে দাবি করেছেন ফেডারেশনের মহাসচিব।

এ ছাড়া অডিটোরিয়ামের উন্নয়ন কাজ টেন্ডারে অংশ নেওয়া কোম্পানির মধ্যে চতুর্থ হওয়া প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া নিয়ে সমস্যার সূত্রপাত। এরপর ২ কোটি ৭২ লাখ টাকার কাজের বিল নাকি এখন ৫ কোটি টাকার বেশি হয়ে গেছে। অভিযোগ আছে কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি সভাপতির আজ্ঞাবহ।

এ ছাড়া জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের দরপত্রের মাধ্যমে ১০টি ইলেকট্রনিক টার্গেট মেশিন কেনা হয় ২৬ লাখ টাকা করে। পরে একই মেশিন আনা হয় ৬ লাখ টাকায়। যেটি ক্রয় করেছেন মহাসচিব। এ ছাড়া মহাসচিব ইন্তেখাবুল হামিদের বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র এনে ব্যবসা করারও অভিযোগ করেছেন সভাপতি নিজে। যার সূত্র ধরে ফেডারেশনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চিঠি আসে। গত ২৫ জুন চিঠি আসার পর ১৮ জুলাই সভা করে ফেডারেশন; কিন্তু সময়মতো শুটারদের বিষয়টি জানানো হয়নি। পাশাপাশি সভাপতি ছাড়া বাকিদের প্রায় একমাস পর চিঠির বিষয়টি জানানো হয়েছে। সভাপতি-মহাসচিব দ্বন্দ্বে এখন খেলাটা পড়ে গেছে পাথরের নিচে।

মহাসচিবের বিরুদ্ধে ৫০ পৃষ্ঠার তদন্ত রিপোর্ট করা হয়েছে, সেখানে দুই পাতার রিপোর্টও নেই খেলাটির উন্নয়নে। তাহলে সভাপতি নিজেও যে শুটিংয়ের উন্নয়ন চান না অবস্থাদৃষ্টে তাই মনে হচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশি কোচদেরও এনে রাখা হচ্ছে না। ফেডারেশনের সমন্বয়হীনতা আর লক্ষ্যহীনতার বলি হচ্ছেন শুটাররা। এই যেমন আইএসএফের ‘এ’ লাইসেন্সধারী কোচ স্টিফেনসন ক্লাউস ২০১৭ সালে বাংলাদেশে আসেন। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর, এখন তিনি সিঙ্গাপুরের কোচ। দেশটির দু’জন শুটার কোটা প্লেস নিয়ে সরাসরি সুযোগ পেয়েছেন টোকিও অলিম্পিকে। সেই কোচের অধীনে কমনওয়েলথ গেমসে দুটি রৌপ্য জেতে বাংলাদেশ। সবচেয়ে বড় বিষয় ফেডারেশনের মূল কাজ যেখানে খেলা, সেখানে সেটি হয়ে পড়েছে সবচেয়ে অবহেলা আর অনাদরের বিষয়।

সবচেয়ে বড় বিষয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) ‘অবৈধ’ অস্ত্র আনার বিষয়ে ডেকে পাঠানোর বিষয়টি খেলোয়াড়রা কিছুতেই যেন মেনে নিতে পারছেন না। এরই মধ্যে শুটিং শুরুর একটা পরিকল্পনা নিলেও সেটি যে সহসাই শুরু হতে পারছে না, তা একরকম নিশ্চিত করেই বলা যায়। অবৈধভাবে অস্ত্র আনার অভিযোগে এনবিআরের তলবে রীতিমতো বিব্রত আর অপমানজনক অবস্থায় পড়েছেন জাতীয় শুটাররা। আগে চারজন এনবিআর কর্মকর্তাদের জেরার মুখোমুখি হয়েছেন। এরপর হাজির হয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন আরও ৯ শুটার।

এটি মূলত ফেডারেশনের সভাপতি-মহাসচিবের দ্বন্দ্বের ফলেই হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শুটাররা দ্রুত এই সমস্যার সমাধান চেয়েছেন। ২০১৭ সালে রাইফেল তৈরির প্রতিষ্ঠান ওয়ালথার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া ৮টি রাইফেল নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন শুটাররা। অথচ তিন বছর পর এক উড়ো চিঠির কারণে এই করোনা ভাইরাসের মহামারির মধ্যেও এনবিআরে সাক্ষ্য দিতে যেতে হয়েছে জাতীয় শুটারদের। আবদুল্লাহ হেল বাকি, অর্ণব শারার লাদিফ, রাব্বি হাসান মুন্না ও রিসালাতুল ইসলাম শুরুতে জেরার মুখে পড়েন। এরপর একে একে হাজিরা দেন মাহফুজা খাতুন জুঁই, আতকিয়া হাসান দিশা, শাকিল আহমেদ, আরমিন আশা, রবিউল ইসলাম, আবু সুফিয়ান, নুর হোসেন আলী, আরদিনা ফেরদৌস, শোভন চৌধুরী। 

এদিকে জার্মানি থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে রাইফেল আনার অভিযোগ নিয়ে এনবিআরের তলবে বিব্রত শুটার আরমিন আশা বলেন, ‘যে রাইফেলগুলোর কথা বলা হয়েছে। সেগুলোর বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। কারণ আমি রাইফেল শুটার না, আমি পিস্তল শুটার। তাছাড়া ২০১৭ সালে আমি কোনো অস্ত্র ক্রয় করিনি। তারা আমার কাছে আমার অস্ত্রের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। ২০১৮ সালে আমি ফেডারেশন থেকে নগদ টাকা দিয়ে একটি পিস্তল কিনেছি। তারা আমার কাছে আমার পিস্তলের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন’। শুটাররা এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান চাইছেন। যাতে করে শুটিংয়ে ফিরতে বেশি সময় অপেক্ষা করতে না হয়।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh