রোববার,  ১৮ আগস্ট ২০১৯  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৯, ১৫:২৫:৩২

প্রবাসীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পালটাতে হবে

প্রবাস মানে বিদেশ বা দূরদেশ, প্রবাস মানে আত্মীয়স্বজন বিহীন বছরের পর বছর একাকী কাটিয়ে দেওয়া, প্রবাস মানে দেয়ালবিহীন কারাগার, প্রবাস মানে শত দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে বিরামহীন জীবনযুদ্ধ করা। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় জীবিকার তাগিদে কারো ছেলে, কারো ভাই, কারো বাবা, কারো স্বামী নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে দেশান্তরী হয়। এই দেশান্তরী হওয়া মানুষগুলোর সুন্দর একটি নাম প্রবাসী। প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা অর্থাত্ রেমিটেন্স বাংলাদেশের আয়ের প্রধান উত্স। বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ প্রবাসী। এই এক কোটির সঙ্গে পরিবারের পাঁচ জন করে সদস্য হিসাব করলে মোট ছয় কোটি মানুষের ভাগ্য জড়িত।
আমি শতকরা ৯০ ভাগ প্রবাসী অর্থাৎ সাধারণ শ্রমিকদের কথা বলছি। প্রবাসীরা মাসিক যে বেতন পায় তার এক-তৃতীয়াংশ নিজের রুম ভাড়া, খাওয়া, মোবাইলফোন ও অন্যান্য খরচে চলে যায়। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেয়; তাতেই ঘর বা বাড়ি ভাড়া, ছেলেমেয়ের স্কুলের খরচ, ভাইবোনের বিয়ে, মা-বাবার চিকিত্সা খরচ, স্ত্রীর হাতখরচ ইত্যাদি। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সাহায্য-সহযোগিতাও করে থাকে। কিন্তু অনেকের ভাগ্যে ঠিকমতো বেতন জোটে না, চার-পাঁচ মাস পর্যন্ত বেতন বাকি থাকে। তখন ধারকর্জ করে প্রিয়জনকে টাকা পাঠিয়ে থাকে। কিন্তু সে দুঃখ কাউকে বুঝতে দেয় না। বলে—মা আমি ভালো আছি, বাবা আমি ভালো আছি।
প্রবাসীদের কাজের ধারা বিভিন্ন। যেমন বড় কোম্পানিতে ভোর চারটায় উঠে দুপুরের খাবার নিয়ে ৩০-৪০ কিলোমিটার দূরে বিল্ডিং কন্সট্রাকশনের কাজে যেতে হয়। দোকানের চাকরি সকাল পাঁচটা-ছয়টা থেকে রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত। সবচেয়ে কষ্টের কাজ হচ্ছে বাগান ও ঘরের চাকরি। যেখানে শুধু ঘুমটাই বিশ্রাম। কাজের মাঝে একটু বিশ্রাম নেবে তার সুযোগ নেই। তার ওপর আবার মানসিক নির্যাতনও চলে। বছরে দুই ঈদে দুই দিন করে মোট চার দিন বন্ধ পাওয়া যায়। বছরের পর বছর যাদের জন্য তারা প্রবাসে; সেই পরিবারও অনেক সময় তাদের ভুল বোঝে। এই কষ্ট কাকে বলবে? কে শুনবে? এটা আমার কথা নয়, প্রতিটি প্রবাসীর আত্মকথা। প্রবাসে একা থাকা, নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যত্ নিয়ে দুশ্চিন্তা, খারাপ পরিবেশে কাজ করা ইত্যাদি কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, হৃদরোগ, কর্মক্ষেত্রে বা সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি মাসে ১০০-১৫০ জন ফেরে লাশ হয়ে।
প্রবাস মানে নিঃসঙ্গতা, প্রবাস মানে নিজে রান্না করে খাওয়া, প্রবাস মানে জুন, জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর মাসে ৪৫-৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কাজ করে যাওয়া, প্রবাস মানে ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও চোখ বুজে সহ্য করা, প্রবাস মানে দীর্ঘ নিঃশ্বাস। সবকিছু থেকে বঞ্চিত হওয়া সত্ত্বেও কষ্টার্জিত টাকা প্রবাসীরা পরিবারকে পাঠায়। সেই টাকায় প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভাবে দেশের উন্নতি হয়। দেশে কাজ করা আর বিদেশের মাটিতে কাজ করার পার্থক্য অনেক। বিমানবন্দরে প্রবাসীদের কামলা বলে অপমান করা এবং মালপত্র নিয়ে হয়রানির শিকার হতে হয়। প্রবাসীরা চায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সুন্দর ব্যবহার ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। প্রবাসী পরিবারকে আইনি সহায়তা, চিকিত্সা, ব্যাংক, শিক্ষা ও সামাজিকতায় অগ্রাধিকার দেওয়া। দুঃখের বিষয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছ থেকে ন্যূনতম সেবা পাওয়া যায় না। প্রবাসীদের প্রতি দেশ ও সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি পালটাতে হবে।
 
লেখক: শ্রীধর দত্ত
সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী।
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com