ভারতের পিকাসো: মকবুল ফিদা হুসেন

ভারতীয় উপমহাদেশের পিকাসো খ্যাত চিত্রশিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন, যার চিত্রকর জীবন শুরু হয়েছিল সিনেমার পোস্টার আঁকতে আঁকতে। কে জানতো তিনি একদিন সত্যিকারের শিল্পী হয়ে উঠবেন। পৃথিবীতে তার চিত্রশিল্পের সুনাম হবে অভাবনীয়। দিকে দিকে ছড়িয়ে যাবে তার নাম।

তার রঙের খেলায় প্রাণ পাবে অদ্ভুত সব দৃশ্য। মকবুলের বাল্যকাল মধুর ছিল না কখনো, বরাবরই তা ছিল কষ্টের এক অদৃষ্টবাদে মোড়ানো। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষারও জোর খুব ছিল না তার। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত ছেলেবেলা ছিল মকবুল ফিদার। 

পান্ধারপুর নামে একটি স্থান যা ছিল মুম্বাইয়ের কাছেই, সেখানেই ১৯১৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। শিশু অবস্থাতেই হুসেন মাতৃহীন হয়ে যান। বাবা ফিদা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সংসার স্থানান্তরিত হয় ফিদা পরিবারের, এবারে তারা চলে যান ইন্দোরে। সেখানেই প্রাথমিক শিক্ষার শুরু বালক হুসেনের। মকবুল ফিদা হুসেন তার দাদার ন্যাওটা ছিলেন। ঘুরতেন দাদার সঙ্গে। দাদা কখন কী করতো তা ছিল তার এক কৌতূহলের বিষয়। দাদার কাজ ছিল কুপি, হারিকেনসহ বিভিন্ন ব্যবহারিক জিনিস বানানো। এইসব বানানো দেখতেন হুসেন।


দাদা তার জীবনে বিরাট প্রভাব ফেলেছিল, দাদার দৈনন্দিন জীবন, ভাবনাচিন্তা এবং এই কুপির আলো যেন মুকবুলকে পেয়ে বসে। ফলে দেখা যায় দাদার ছবি ও তার চিন্তা বারবার ফিরে এসেছে মকবুলের চিত্রে। মুসলিম পরিবারের সন্তান মকবুল একসময় মাদ্রাসা শিক্ষাও গ্রহণ করেছিলেন পরিবারের ইচ্ছায়। ফলে পরবর্তীকালে আমরা মকবুলের ছবিতে উঠে আসতে দেখেছি আরব ক্যালিওগ্রাফিক কায়দায় জ্যামিতিক সব চিত্রিক গড়ন আর প্রলম্বিত, আনুভূমিক রেখার সরব উপস্থিতি।

হুসেনের চিত্রকলার ভাবনা ছিল এক ধরনের বহুমাত্রিক প্রাণের সঞ্চারি। তার আঁকার প্রতি তিনি নিবিষ্ট ছিলেন অনেক বেশি। ফলে তার কাছে ভারতীয় মৌলবাদীদের আক্রমণকেও গণতান্ত্রিক চর্চার পর্যায়ে মনে হয়েছিল। তিনি যখন মৌলবাদীদের আক্রমণের স্বীকার হন তখন তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন- ‘এসব আমাকে খুব একটা বিপর্যস্ত করেনি। ভারত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানে প্রত্যেকেরই মতো প্রকাশের অধিকার আছে। আমি শুধু কামনা করি, মানুষের মতো প্রকাশটা যেন যুক্তির মাধ্যমে হয়, সহিংসতার মাধ্যমে নয়। মিডিয়া আমার কাছে আসছে, আশা করছে যেন আমি কড়া কিছু বলি; কিন্তু আমি ভারতকে নিয়ে খুবই আশাবাদী।

সময়ের স্রোতে এটা সামান্য একটা মুহূর্ত মাত্র। পাঁচ হাজার বছর ধরে আমাদের শিল্পের স্রোত প্রবহমান। সেখানে এটা সামান্য একটা হেঁচকি মাত্র। আমি নিশ্চিত, তরুণ প্রজন্ম এইসব মৌলবাদ, রক্ষণশীলদের ব্যাপারে অনাস্থা জানাবে। পরিবর্তনের জন্য তারা এগিয়ে আসবে। আমি নিজের ঘর ছাড়তে চাই না। একই সঙ্গে আমি এটাও চাই না- এই রক্ষণশীলরা সমাজ থেকে মুছে যাক। আমরা সবাই একটা বড় পরিবারের অংশ। একটা শিশু যখন কিছু একটা ভেঙে ফেলে, তাকে কেউ ঘর থেকে বের করে দেয় না। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। এটা অনেকটা পারিবারিক ব্যাপার। যারা বিরোধিতা করছে, তারা আমার কাজগুলো বোঝেইনি। অনেকে হয়তো দেখেওনি।’

মকবুলের এই নিজের অকপট স্বীকারোক্তি শিল্পের জন্য শিল্পীর জন্য খুব জরুরি। একটা সময় ছিল যখন ইউরোপীয় রেনেসাঁসের যুগ ছিল না তখন কেবল হুকুম ছিল, চিত্রকরেরা ছিল বন্দি। রাজা সম্রাটদের অধীন হাতের পুতুল। এসবকে ভেঙে বেরিয়ে এলো যখন মাইকেল অ্যাঞ্জেলোরা, তখন সত্যি শিল্পের দুনিয়ায় ঘটলো এক বড় মুক্তি। আর্টিস্ট তার ইচ্ছায় আঁকতে পারেন এটাই ছিল মূল বিপ্লব। শিল্পীর স্বাধীনতা না থাকলে সে শিল্পী কোথায়? মকবুলও ঠিক ছিলেন তেমনি। চিত্রের ব্যাপারে গতিময়তায় ভরা আর রঙের ব্যবহারে তিনি ঔজ্জ্বল্যের দিকেই বেশি আগ্রহী ছিলেন।


মকবুল ফিদা হুসেন আঁকার জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন মিথ এবং এ ধরনের চরিত্রগুলোকে। পিকাসোর মতো করে রঙের ছটায় বিমূর্তকে এক মূর্ততায় আনতেন, যা ছিল কেবল তারই স্বাতন্ত্র্যতা। দারিদ্র্যকে রঙ দিয়ে কষাঘাত হানতে চাইতেন বারংবার। ভুলতে পারতেন না হয়তো সেই অখ্যাত মুম্বাইয়ের পল্লী, ফুটপাতে কাটানো জীবন। ঘুরতেন রেল স্টেশনে, দেখতেন জীর্ণজীবনকে। ঘুরে বেড়ানোর সেদিনগুলো কি করে ভুলে থাকবেন- রঙে রঙে তাই হুসেন আঁকেন বারংবার সেইসব মুহূর্ত। 

একসময় তিনি সিনেমার হোর্ডিং বানানোর কাজ পান। তা শিখতেও সময় লেগেছিল অনেকদিন, তবে ধীরে ধীরে তিনি সবটা শিখে নেন আর শুরু করেন বিরাট বিরাট সিনেমার ব্যানার পোস্টার আঁকা। তিনি দেখতেন তার আঁকা ছবি পোস্টারে জ্বলজ্বল করছে। গতিময়তায় একটা অন্যরকম আনন্দ লক্ষ্য করতেন নিজেই। ফলে তিনি এ কাজটা বেশ মন দিয়েই করতে থাকেন। একাজে দিকে দিকে তার বেশ সুনামও তৈরি হয় তখন। হুসেন গতিময়তার শিল্পী ছিলেন। শিল্পের ভাষার চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু নেই এটা হুসেন বিশ্বাস করতেন।


তিনি রঙে রঙে তাই নির্মাণ করেন তার আপনার জগত। হুসেন কেবল এঁকে এঁকে জীবন পার করেছেন তা নয়। হুসেন সিনেমা বানিয়েছেন। লিখেছেন কবিতা। চিত্রকলায় হুসেন ১৯৫০ সালে তার প্রথম প্রদর্শনীর মাধ্যমে পরিচিতি পান। এবং এরপর তিনি ফ্রান্সিস নিউটন সুজার আমন্ত্রণে প্রগ্রেসিভ আর্টিস্ট গ্রুপে যোগ দেন। এভাবে তিনি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করতে থাকেন। ১৯৭১ সালে পাবলো পিকাসোও তাকে আমন্ত্রণ জানান এবং এই সালেই তিনি পাওলো বিয়েনালে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পান। এরপর আর তাকে পেছোনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নিজভূমি ভারতে তিনি হয়ে ওঠেন রাতারাতি আলোচিত চিত্রকর। ভারত সরকার তাকে পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ পুরস্কারে ভূষিত করে। এ ছাড়া তিনি বিদেশের বহু পুরস্কারও পান।

তিনি ১৯৬৭ সালে ‘থ্রু দ্য আইজ অব আ পেইন্টার’ নামের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এটিই ছিল তার প্রথম চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্রটি বার্লিন উৎসবে জিতে নেয় গোল্ডেন বেয়ার পুরস্কার। বহুমুখী প্রতিভার বিচিত্র এক জীবন্ত কিংবদন্তি ছিলেন মকবুল ফিদা হুসেন। হিন্দু পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারতের চরিত্র, দেবী এই ছিল তার প্রিয় বিষয়। কারও কারও মতে তিনি ছিলেন- দেবীপ্রিয়ও কিংবা নারী প্রিয়ও বলা চলে। তিনি একবার জ্ঞানের দেবী সরস্বতীর নগ্ন দৃশ্য আঁকেন। হুসেন এরকমটাই ভালোবাসতেন- দেখতেন এবং আঁকতেন, এটাই ছিল তার দৃষ্টি ভঙ্গি। ফলে হিন্দুত্ববাদিদের রোষের শিকার হন তিনি; কিন্তু তিনি সামান্যতম ভেঙে পড়েননি।

তিনি তখন তেহেলকা পত্রিকায় বলেছিলেন- ‘ছোটবেলায় পান্ধারপুর, তারপর ইন্দোরে রামলীলা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমি আর আমার বন্ধু মানকেশ্বর সবসময় এগুলো অভিনয় করতাম। রামায়ন খুবই সমৃদ্ধ, শক্তিশালী একটা গল্প। ড. রাজা গোপালাচার্য যেমনটা বলেছেন- এটা পুরাণ অথচ প্রায় জীবন্ত হয়ে গেছে। কিন্তু সত্যিকারের আধ্যাত্মিক লেখাগুলো পড়তে শুরু করি যখন আমার বয়স উনিশ। কারণ সে-সময় অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এসেছি আমি। মাকে হারিয়েছি। আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

আমার বয়স যখন চৌদ্দ-পনেরো, তখন ভয়াবহ সব দুঃস্বপ্ন দেখতাম। উনিশ বছর বয়সে এসে এই সবকিছুই থেমে গেল। আমার একজন গুরু ছিলেন মোহাম্মদ ইসহাক। তার কাছে দুই বছর পবিত্র কোরআন পড়েছি। একই সময় আমি মানকেশ্বরের সঙ্গে গীতা, উপনিষদ আর পুরাণ নিয়ে আলোচনা করতাম। মানকেশ্বর ততদিনে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেছে। হিমালয়ের উদ্দেশে একদিন রওনা হয়ে গেল মানকেশ্বর। তারপরও বেশ অনেক বছর আমি এসব নিয়ে পড়াশোনা করেছি। এই সবকিছু আমাকে যথেষ্ট প্রশান্ত করেছে। আমি আর কখনো দুঃস্বপ্ন দেখিনি। পরে হায়দ্রাবাদে ড. রাম মনোহর লোহিয়া আমাকে বললেন রামায়নের ছবি আঁকতে। সেটা ১৯৬৮ সালের কথা। খুবই দরিদ্র ছিলাম তখন। কিন্তু আট বছরের মধ্যে দেড়শো ছবি এঁকেছি আমি। আমি বাল্মীকি আর তুলসী দাসের রামায়ন পড়লাম। এরপর বেনারস থেকে পন্ডতদের আমন্ত্রণ জানালাম, যাতে এর অস্পষ্ট দিকগুলো আমাকে বুঝিয়ে দেন।


আমি যখন এটা করছিলাম, তখন কিছু রক্ষণশীল মুসলমান বলল, ইসলামিক বিষয় নিয়ে কেন আমি কিছু আঁকছি না। আমি বললাম, ইসলামে কি সেই ধরনের সহনশীলতা আছে? আপনি যদি এমনকি ক্যালিগ্রাফিতেও ভুল করেন, তারা ক্যানভাস টেনে ছিঁড়ে ফেলবে। আমার জীবদ্দশায় শত শত গণেশের ছবি এঁকেছি আমি- খুবই মজা পেয়েছি ওগুলো এঁকে। বড় যে কোনো কাজ শুরুর আগে আমি গণেশের একটা ছবি আঁকি। শিবের প্রতিকৃতি আঁকতেও বেশ লাগে আমার। নটরাজ পৃথিবীর জটিলতম কাঠামোগুলোর একটা- এটার বিবর্তন হয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে অনেকটা আইনস্টাইনের সূত্রের মতো, মহাবিশ্ব আর বাস্তব জগতের প্রকৃতি নিয়ে গভীর দার্শনিক আর গাণিতিক হিসাব-নিকাশের ফলাফল এটা। আমার মেয়ে রাইসা যখন বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলো, কোনো অনুষ্ঠান করতে চায়নি সে। তখন আমি ওর বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে একটা কার্ড এঁকে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় আত্মীয়স্বজনের কাছে পাঠালাম।

কার্ডের ছবিতে পার্বতী শিবের ঊরুর ওপর বসে আছে, আর শিবের একটা হাত তার স্তনের ওপর- মহাবিশ্বের প্রথম বিয়ে ছিল সেটা। হিন্দু সংস্কৃতিতে ন্যুড বিষয়টা পবিত্রতার সমার্থক। যে-বিষয়টাকে আমি খুব অন্তর থেকে অনুভব করছি, সেটাকে কি আমি অবজ্ঞা করতে পারি? শিয়াদের একটা ধারা সুলেইমানি সম্প্রদায়ে আমার জন্ম। হিন্দুদের সঙ্গে অনেক জায়গায় আমাদের মিল আছে।

এর মধ্যে পুনর্জন্ম একটি। সংস্কৃতির দিক থেকে ইহুদি আর খ্রিস্টানদের মধ্যে দূরত্বটা সবচেয়ে বেশি; কিন্তু যারা আমার বিরোধিতা করছে, তাদের সঙ্গে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা অসম্ভব। খাজুরাহো নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখুন, তারা বলবেন জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করতে এরকম ভাস্কর্য গড়া হয়েছিল তখনকার দিনে। এখন এর আর কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। গ্রামের মানুষেরা বরং হিন্দু দেবতাদের সংবেদনশীল, জীবন্ত আর বিবর্তনশীল ব্যাপারগুলো আরও ভালো বোঝে। পাথরের ওপর শুধু কমলা রং মেখে সেটাকে তারা হনুমানের প্রতিকৃতি হিসেবে দাঁড় করিয়ে ফেলে।’

এমন করেই হুসেন সেদিন তার আঁকা নগ্ন ছবির বিরুদ্ধে যারা দাঁড়িয়েছিল তাদেরকে বলেছিলেন নিজের ভাবনা আর দর্শনের দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে। এই যে চিত্রকলার এক অভাবনীয় শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন। যিনি তার জীবনের পাঠ নিয়েছেন কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে নয়, জীবন থেকে, সিনেমার হোর্ডিং থেকে। যে জীবনের থরেথরে কেবল রঙ রঙ আর রঙ। একসময় তাকে দেশ ত্যাগও করতে হয়েছিল। তবুও শিল্পের দুনিয়ায় তিনি স্বাতন্ত্র্য হয়ে আছেন। ২০১১ সালের ৯ জুন রঙের দুনিয়া ছেড়ে এশিয়ার পিকাসো মকবুল ফিদা হুসেন চিরবিদায় নেন। তার মতো জিনিয়াস, খামখেয়ালি ভরা চিত্রশিল্পীর মূল্যায়ন কেবল শিল্পের সমঝদাররাই করতে পারেন।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh