রোববার,  ২৫ আগস্ট ২০১৯  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০১৯, ২০:০৮:৫৪

৩৭০ ধারা বাতিল: কাশ্মীরে ভুল শোধরানো, নাকি নতুন ভুল?

আব্দুল্লাহ আল সাফি
নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার ভারতীয় সংসদে জম্মু ও কাশ্মীর (Jammu and Kashmir) বিষয়ে তাদের সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে দিয়েছে। এরফলে জম্মু ও কাশ্মীর এখন আর ভারতের আলাদা রাজ্য নয়, কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল বলে বিবেচিত হবে। সোমবার সকালে নরেন্দ্র মোদি মন্ত্রিসভার এক জরুরি বৈঠকের পরে সংসদে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ওই ঘোষণা জানান।
বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে বৃহত্তর গণতন্ত্রের দেশ ভারতের রাজনীতিবিদরা। সংসদে ওই সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য-প্রতিবাদের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমেও নিজ নিজ অবস্থান তুলে ধরছেন তারা। এখন পর্যন্ত ওই সিদ্ধান্তের সমর্থন জানিয়েছে বসপা, বিজেডি, শিবসেনা, ওয়াইএসআরসিপি, আপ। অন্যদিকে, বিরোধিতা জানিয়ে সরব হয়েছে কংগ্রেস ও জেডিইউ।
বিজেপির রাজ্যবর্ধন রাঠৌর টুইটারে লিখেছেন, ‘ঐতিহাসিক ভুল শোধরাচ্ছে মোদি সরকার’। আর প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছেন, ‘এটা সরকারের সাহসী সিদ্ধান্ত, ঐতিহাসিক’। জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল।  অন্যদিকে, জম্মু-কাশ্মীরে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি টুইটারে লিখেছেন, ‘দেশের গণতন্ত্রের জন্য আজ কালো দিন। কেন্দ্র তার প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে’।
যে যাই বলুক মোদি সরকার এই বিষয়ে পরিষ্কার এক অবস্থানে আছে বলেই মনে হচ্ছে তাদের বক্তব্যে। জম্মু ও কাশ্মীরকে “পুনর্গঠন” করা হবে বলে সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন বিজেপির অন্যতম শক্তিশালী নেতা ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। আর জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সংসদে বিক্ষোভ দেখালেন পিডিপির দুই সাংসদ নাজির আহমেদ ও এমএম ফায়েজ। বিরোধীদলগুলো কাশ্মীর ইস্যুতে মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানাচ্ছে।
৩৭০ ধারায় কী ছিল, বাতিলে কী হবে?
ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারাটি (Article 370) একটি ‘অস্থায়ী বিধান’ যা জম্মু ও কাশ্মীরকে (Jammu and Kashmir) বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত রাজ্যের মর্যাদা দিয়েছিল। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ১৯৪৯ সালের ১৭ অক্টোবর। ওই ধারা অনুসারে, জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতীয় সংবিধানের আওতামুক্ত রাখা হয় (অনুচ্ছেদ ১ ব্যতিরেকে) এবং ওই রাজ্যকে নিজস্ব সংবিধানের খসড়া তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই ধারা অনুসারে, ওই রাজ্যে সংসদের ক্ষমতা সীমিত। ভারতভুক্তিসহ কোনও কেন্দ্রীয় আইন কার্যকর রাখতে রাজ্যের মত নিলেই চলতো। কিন্তু অন্যান্য বিষয়ে রাজ্য সরকারের একমত হওয়া আবশ্যক। ১৯৪৭ সালে, ব্রিটিশ ওই অঞ্চলকে ভারত ও পাকিস্তানে বিভাজন করে ভারতীয় সাংবিধানিক আইন কার্যকর হওয়ার সময়কাল থেকেই ভারতভুক্তির বিষয়টি কার্যকরী হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
ওই ধারা অনুসারে, জম্মু কাশ্মীরের সংসদ প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ- এই তিন বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে ক্ষমতাধর ছিল।
রাষ্ট্রপতি সই করে দিয়েছেন ৩৭০ ধারার অবলুপ্তিতে
‘জম্মু ও কাশ্মীর সংরক্ষণ (দ্বিতীয় সংশোধনী) বিল, ২০১৯’ নামক নতুন একটি বিলের মাধ্যমে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতের রাষ্ট্রপতি সই করে দিয়েছেন ৩৭০ ধারার অবলুপ্তিতে। ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব বিষয়ে সংবিধানের ৩৫-এ ধারারও পরিবর্তন হয়েছে।  ৩৫এ ধারা ৩৭০ ধারার উপরে তৈরি, যার ফলে জম্মু ও কাশ্মীর ‘স্পেশাল স্ট্যাটাস’ পেতো। এই ধারায় ফলে জম্মু ও কাশ্মীরে কারা রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা হবে এবং তাদের কী কী বিশেষ অধিকার দেওয়া হবে সরকারি চাকরি, সম্পত্তি ক্রয়, বৃত্তি ও অন্যান্য প্রকল্পে, তা নির্ধারিত ছিল।
বর্তমান ক্ষমতাসীন বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইস্তেহারে ওই দু’টি ধারার বিরুদ্ধে তাদের মত জানিয়েছিল।
ওই ধারাটি বাতিলের ফলে স্বায়ত্তশাসিত স্ট্যাটাস হারিয়ে কেন্দ্রের অধীনে চলে গেল তারা। জম্মু ও কাশ্মীরে যে বিধানসভা ছিল তা থাকবে, কিন্তু কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ থাকবে বলে ঘোষণা এসেছে।
কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল হিসেবে অধিকারে পরিবর্তনের পাশাপাশি জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখের মধ্যে মানচিত্রে আলাদা অবস্থান আসেবে।
জম্মু ও কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থা
ওই ঘোষণার পাশাপাশি জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন তিন মুখ্যমন্ত্রী ও শীর্ষ নেতা ওমর আবদুল্লাহ, ফারুক আবদুল্লাহ, মেহবুবা মুফতিকে গৃহবন্দি করা হয়েছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
মোবাইল ও ইন্টারনেট সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিপুল পরিমাণে সেনা মোতায়েন হয়েছে জম্মু-কাশ্মীরে। আর রবিবার গভীর রাত থেকে শ্রীনগরে জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা। এর ফলে নতুন করে কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে সঙ্কট তৈরি হয়েছে বলা যেতে পারে।
কোনো একটি বড় ঘোষণা আসছে, এমনটি আন্দাজ করা যাচ্ছিল আগে থেকেই। গত শুক্রবার ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, অমরনাথের তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের দ্রুত রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে হবে। ওই ঘোষণার পরেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ওইসব এলাকায়।
ভারতীয় গণমাধ্যমে দেখা যায়, ওইসব এলাকার বাসিন্দারা দোকানবাজারে ভিড় করে প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত করছে। সেইসঙ্গে পর্যটকদেরও অবিলম্বে কাশ্মীর ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্র-শিক্ষকদেরও বাড়ি ফিরে যেতে বলা হয়।
জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলের ভারতীয় ক্রিকেটারদেরও ওই এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সার্বিক বিষয়গুলো নিয়ে পুরো ভারত জুড়ে চলছে তোলপাড়।
সমস্যার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
কাশ্মীর অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভারত সরকার, কাশ্মীরি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি এবং পাকিস্তান সরকারের মধ্যে বিরোধ দীর্ঘদিনের। কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৪৭, ১৯৬৫ এবং ১৯৯৯-এ অন্ততঃ তিনটি যুদ্ধ হয়েছে। ভারত পুরো জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যটি তাদের বলে দাবি করে এবং যার মধ্যে ২০১০ সালের হিসাবে, জম্মু বেশিরভাগ অংশ, কাশ্মীর উপত্যকা, লাডাখ এবং সিয়াচেন হিমবাহ নিয়ে প্রায় ৪৩% অঞ্চল শাসন করছে। পাকিস্তান এই দাবির বিরোধিতা করে, যারা প্রায় কাশ্মীরের ৩৭% নিয়ন্ত্রণ করে- এর মধ্যে আছে আজাদ কাশ্মীর 
এবং গিলগিট বাল্টিস্থানের উত্তরাঞ্চল রয়েছে।
ভারত ১৯৪৭ সালে সাক্ষরিত সংযুক্তিকরণ চুক্তির ভিত্তিতে পূর্বতন জম্মু ও কাশ্মীর করদ রাজ্যকে সম্পূর্ণভাবে দাবি করে। তার অধিকাংশ মুসলিম জনসংখ্যার উপর ভিত্তি করে পাকিস্তান জম্মু ও কাশ্মীর দাবি করে, অপর পক্ষে চীন শাকসাম উপত্যকা ও আকসাই চীন নিজেদের দাবি করে।
সাম্প্রতিক সময়ে পুলওয়ামা এলাকায় হামলাকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তান প্রায় যুদ্ধের মুখ থেকে ফিরে এসে নতুন করে আলোচনার তৈরি করেছে, সেই ঘটনা প্রবাহেই হয়তো নতুন এই পরিস্থিতি।
প্রাকৃতিক সৌর্ন্দয্যের কারণে ‘ভূস্বর্গ’ বলে বিবেচিত ওই অঞ্চলের মানুষ শান্তিপ্রিয় বলে পরিচিত পেয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। কাশ্মীরের ওই অঞ্চলে বহু প্রাণহানি ও হিংসা-সংঘাত দেখেছে সারাবিশ্ব। আবারও নতুন করে কোনো কিছু হতে যাচ্ছে কিনা, সেই আশঙ্কাও রয়েছে বর্তমান প্রেক্ষাপটে। ভূরাজনীতির মারপ্যাঁচে ওই অঞ্চলে কোনো নতুন সংঘাত যেন না হয়, তা কামনা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। আমরা চাই ‘কাশ্মীরে শান্তি ফিরে আসুক’।
 
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com