রোববার,  ২৫ আগস্ট ২০১৯  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০১৯, ১৭:১০:৩০

মন্ত্রীদের উত্থান পতন পলায়ন কম দেখিনি

নঈম নিজাম
একটি ইংরেজি দৈনিকের অনুষ্ঠানে প্রথম ভদ্রলোককে দেখি। আমার সঙ্গে চেনাজানা নেই। তিনি তখন প্রতিমন্ত্রী। আমি গিয়ে পরিচিত হলাম। কথা বলে বুঝলাম আমার সম্পাদিত কাগজটি সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। এর মাঝে অনুষ্ঠানে আসেন সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার। ভদ্রলোক খেয়াল করলেন, উপস্থিত সুধীজন সারওয়ার ভাইকে দেখে দাঁড়িয়ে অনেক সম্মান দিচ্ছেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, আপনি কোথায় আছেন? বিস্ময় নিয়ে তাকালাম আমি। বললাম, আপনি আসলে সারওয়ার ভাইকে চেনেন না? তিনিও অবাক চোখে তাকালেন আমার দিকে। সারওয়ার ভাই আমাকে থামালেন। তারপর নিজের ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বললেন, আমি গোলাম সারওয়ার। সম্পাদক, সমকাল। সেই তিনি দেখলাম, প্রতিমন্ত্রী থেকে পদোন্নতি পেলেন। পূর্ণমন্ত্রী হলেন। বিস্মিত, হতাশ কোনোটাই হইনি। এখন কোনো কিছুতে হতাশ-বিস্মিত হই না। এর মাঝে আবার তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী। আর দেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কথা না বলাই ভালো। হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সাপ্লাই না দিয়েই টাকা তুলে নেওয়া যায় এই মন্ত্রণালয়ে। এমন কাহিনি সভ্য দুনিয়ার কোথাও শুনিনি। এমনকি সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোতেও হয় কিনা সন্দেহ। তবে বাংলাদেশে হচ্ছে অনেক দিন থেকে। আজকের লেখাটি লেখার সময় একটি পুরনো গল্প মনে পড়ে গেল। গল্পটি অনেক দিন আগের। দুর্নীতিগ্রস্ত দুই আফ্রিকান দেশের মন্ত্রীদের নিয়ে। একবার আফ্রিকান এক দেশের মন্ত্রী গেলেন পাশের দেশের উন্নয়ন সরেজমিন দেখতে। দিনভর ঘোরাঘুরি করলেন। রাতে তার সম্মানে ডিনার দিলেন হোস্ট দেশের মন্ত্রী। চমৎকার বাড়িতে ডিনার খেতে খেতে মন্ত্রী জানতে চাইলেন, এটি কি সরকারি বাড়ি? জবাবে মন্ত্রী বললেন, আরে ভাই, সরকারি বাড়িতে কি থাকা যায়? এডিস মশারা যন্ত্রণা দেয়। পরিবেশও যাচ্ছেতাই। সরকারি বাড়ি ভাঙাচোরা। তাই থাকি না। প্রথম দিকে উঠেছিলাম। পরে ছেড়ে দিয়ে নিজের করা নতুন বাড়িতে উঠেছি। আপনি আসবেন বলেই এ বাড়ির কাজ দ্রুত শেষ করেছি। এখানে আয়োজন করেছি ডিনারের। আশা করছি আপনি খুশি হয়েছেন। প্রতিবেশী মন্ত্রী বললেন, অবশ্যই আমি খুশি হয়েছি। মন্ত্রী চমৎকার কারুকার্যের বাড়ি দেখে হোস্ট দেশের মন্ত্রীর রুচির প্রশংসা করে বললেন, এ তো বিশাল প্রাসাদ! কী করে বানালেন? এত অর্থ পেলেন কোথায়?
জবাবে মন্ত্রী জানালা খুললেন। তারপর বললেন, সামনে নদী দেখতে পাচ্ছেন?
- হ্যাঁ দেখতে পাচ্ছি।
নদীতে ব্রিজ দেখতে পাচ্ছেন?
-দেখব না কেন? এত বড় ব্রিজ, না দেখার কী আছে! দিনেও একবার দেখেছি।
হাসলেন মন্ত্রী সাহেব। তারপর বললেন, এই ব্রিজ থেকে মাত্র ৫০% নিয়েছি। সেই টাকা দিয়ে এই বাড়ি বানালাম; যা দেখে মুগ্ধ হয়ে আপনি প্রশংসা করছেন। তৃপ্তির হাসি মন্ত্রীর চোখেমুখে। মাত্র ৫০ শতাংশে এত সুন্দর বিশাল বাড়ি করার অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরলেন প্রতিবেশী মন্ত্রী। দুই বছর পর নিজ দেশে আমন্ত্রণ জানালেন পাশের দেশের সেই মন্ত্রীকে। যথারীতি রাতে ডিনারের আয়োজন করা হলো। অসাধারণ এক প্রাসাদে ডিনার খেতে এসে বিস্মিত হলেন মন্ত্রী সাহেব। তারপর প্রশ্ন করলেন, আমার ৫০ শতাংশে করা বাড়ি দেখে আপনি তখন বিস্মিত হয়েছিলেন। এখন দেখছি আমার চেয়ে সুন্দর, অনেক বেশি খরচ করে বাড়ি করেছেন। কীভাবে সম্ভব? জবাবে হাসলেন সেই মন্ত্রী। কিছু বললেন না। তারপর হাত ধরে নিয়ে গেলেন লনে। হাঁটতে হাঁটতে বললেন, সামনের নদীটি দেখছেন? জবাবে মন্ত্রী সাহেব বললেন, দেখছি। খুব সুন্দর নদী। এবার সেই মন্ত্রী বললেন, নদীতে বিশাল ব্রিজটি দেখতে পাচ্ছেন?
না, দেখতে পাচ্ছি না। এখানে কোনো ব্রিজ তো নেই। শুধুই পানি। আপনি ব্রিজ কই দেখছেন?
হাসলেন হোস্ট মন্ত্রী। তারপর বললেন, কিছুই বুঝতে পারেননি?
না, বুঝতে পারিনি। এত রহস্যের দরকার নেই ভাই। দম বন্ধ হয়ে আসছে। খুলে বলুন আসলে কীভাবে এসব করলেন। ভাই, বন্ধু হিসেবে আমরা তো অনেক কিছু শেয়ার করি।
জবাবে হাসলেন মন্ত্রী সাহেব। তারপর বললেন, ভাই, শতভাগ নিয়েছি। আপনি ফিফটি পার্সেন্ট নিয়ে বাড়ি করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা আপনার কাছ থেকে নিয়েছি আমি। যখন দেখলাম ৫০ শতাংশে আপনার চেয়ে ভালো বাড়ি বানানো সম্ভব নয়, তখন শতভাগ নিয়ে নিয়েছি। নো ব্রিজ। নদী আছে, ব্রিজ নেই। ব্রিজ আছে কাগজে-কলমে- বাস্তবে নেই। পরে কোনো দিন প্রশ্ন উঠলে বলব, ব্রিজ তলিয়ে গেছে নদীর পানির স্রোতে। আমি তো ব্রিজ করেছিলাম। বর্ষার পানিতে ব্রিজ তলিয়ে গেলে কার কী করার আছে?
পাঠক, বিশ্বাস করুন এ ধরনের গল্পের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের কোনো সম্পর্ক নেই। চাণক্য বলেছেন, ‘নখযুক্ত প্রাণী, শিংওয়ালা জন্তু, অস্ত্রধারী ব্যক্তি এবং রাজনীতিবিদকে কখনই বিশ্বাস করতে নেই।’ চাণক্যকে বলা হয় ভারতবর্ষের মেকিয়াভেলি। যদিও তিনি নিকালো মেকিয়াভেলির ১ হাজার ৮০০ বছর আগে জন্মেছিলেন। এই দার্শনিক, রাজ-উপদেষ্টার আরেকটি কথা- ‘চাঁদ নক্ষত্রসমূহের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। একজন সুশাসক রাষ্ট্রের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন।’ এখন এসব পুরনো দিনের কথা কেউ মানেন না। রাষ্ট্রের নীতিকথাও বদল হয়েছে। না হলে একজন মন্ত্রী দেশবাসীকে ডেঙ্গু মহামারীতে রেখে বিদেশ চলে যেতে পারেন? দেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে তুঘলকি কা- চলছে। এ কা-কারখানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হয়। কিন্তু অনিয়ম, অব্যবস্থা বন্ধ হয় না। অনিয়ম বাড়তেই থাকে। সাধারণ মানুষ এখানে জিম্মি। কারও কিছু বলার নেই। কারও কিছু করারও নেই। এখানে মন্ত্রী যায়, মন্ত্রী আসে। সমস্যার সমাধান হয় না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গোলক-ধাঁধা নিয়ে আমার নিজেরও ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমার বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের গোহারুয়া গ্রামে। এ গ্রামে সরকার ৩২ শয্যার একটি হাসপাতাল নির্মাণ করেছে রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় করে। দুর্ভাগ্যবশত, হাসপাতালটি আমার বাড়ির সামনে। হাসপাতালের কাজ শেষ সেই ২০০৭ সালে। ডাক্তার-নার্সদের থাকার চমৎকার ব্যবস্থা। রোগীদের জন্য বিশাল বিশাল ওয়ার্ড। শুধু হাসপাতালটি চালু হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না, কেউ জানে না। তাহলে সরকার হাসপাতালটি বানাল কেন? এ প্রশ্ন নিয়ে ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রীর তখনকার উপদেষ্টা অধ্যাপক সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীকে সব জানালাম। তিনি বললেন, ভাইরে, মন্ত্রী রুহুল হক কথা শোনেন না। তুমি মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বল। এভাবে ২০১০ সাল পার হয়ে গেল। রুহুল হক সাহেব চমৎকার মানুষ। আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কও ভালো। আমি তাকে ডাক্তার হিসেবে পছন্দ করি। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চুরির সিন্ডিকেট নিয়ে সংবাদ করার দায়ে তিনি আমার ওপর অখুশি হন। সেই অখুশিতে আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন কয়েকটি। দেখা হলে বলেন, মামলা প্রত্যাহার করবেন, পরে আর করেন না। সে বিষয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমাদের প্রিয় রুহুল হকের আমলেই স্বাস্থ্য খাতে মিঠু সিন্ডিকেটের উত্থান। সেই সিন্ডিকেটের কাজ দিনকে রাত করা। এ নিয়ে খবর প্রকাশের কারণে মন্ত্রী মন খারাপ করলেন। মামলা করলেন। এক পর্যায়ে সরকারের পাঁচ বছর শেষ হলো। মন্ত্রী হিসেবে এলেন মোহাম্মদ নাসিম। প্রবীণ এই রাজনীতিবিদকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করি। সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। তিনি আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক থাকাকালে আমি মাঠের রিপোর্টার। আওয়ামী লীগ বিট করতাম। নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ, কথা হতো। একদিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক মতবিনিময় সভায় মন্ত্রীর অনুরোধে যোগ দিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম অনুষ্ঠানটি ভালোই। অনেক সিনিয়র সাংবাদিক, সম্পাদকের পাশাপাশি সিভিল সোসাইটির অনেকেই আছেন। সবাই পরামর্শ দিচ্ছেন। স্বাস্থ্য খাতকে এগিয়ে নেওয়া নিয়ে একজন নগরবিদ বললেন, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালগুলো ব্যবহারের উপযোগিতা হারিয়েছে। দেয়াল ও বাথরুমগুলো দেখলেই হাসপাতালের চিত্র বোঝা যায়। সঙ্গে সঙ্গে সচিব ও ডিজি সাহেব উত্তর দিলেন, এত কম লোক দিয়ে মেইনটেন করা সম্ভব নয়। আমি বললাম, কেন সম্ভব নয়! দুনিয়ার সবচেয়ে ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলো থেকে শিক্ষা নিন। কীভাবে ঝকঝকে তকতকে রাখছে তারা এত ব্যবহারের পরও। বেসরকারি হাসপাতালগুলো আপনাদের চেয়ে কম অর্থ ব্যয় করে। তারা কী করে সব ঝকঝকে রাখে?
এর মাঝে আমার গ্রামের হাসপাতাল চালু নিয়ে স্থানীয় এমপি হিসেবে ডিও লেটার দিলেন আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি তখন পরিকল্পনামন্ত্রী। খবর পেয়ে একদিন নাসিম ভাইকে বললাম, লোটাস কামাল ভাই যে অনুরোধ করেছেন, এই হাসপাতালটি আমার বাড়ির সামনে। সরকার একটি হাসপাতাল বানিয়েছে জনগণের ট্যাক্সের টাকায়। হাসপাতালটি চালু করে দিন। তিনি আমাকে বললেন, কামাল সাহেবের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমি নিজে যাব আপনার গ্রামে। হাসপাতাল চালু করে দিয়ে আসব। মহাখুশির এই খবরের কিছুদিন পরই পরিকল্পনামন্ত্রী লোটাস কামাল উদ্যোগ নিয়েই স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমকে নিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় আমাকেও অনুরোধ করেছিলেন যাওয়ার জন্য। আমার আর যাওয়া হয়নি। তবে খুশি হয়েছিলাম অজপাড়াগাঁয়ে একটি সরকারি হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর খবরে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ডিজিসহ কর্তারা গেলেন। সাধারণ মানুষ আশার আলো দেখল। সেই আশা আর আলোর মুখ দেখাই শুধু সার। সরকারি অর্থে নির্মিত হাসপাতালটি এখনো ভূতের বাড়ি। দু-চার মাস পর একজন ডাক্তার আসেন। হাঁটাহাঁটি করে চলে যান। মোহাম্মদ নাসিম বিদায় নিলেন। সরকারের নতুন মেয়াদে পদোন্নতি পেয়ে প্রতিমন্ত্রী থেকে মন্ত্রী হলেন জাহিদ মালেক। তিনি এরশাদ সরকারের সময় ঢাকার আলোচিত মেয়র কর্নেল (অব.) মালেকের পুত্র। ২০০১ সালের ভোটের আগে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ভোটে ফেল করে ডুব দেন। ২০০৮ সালের ভোটের আগে আবার ফিরে এসে মনোনয়ন নেন। এবার পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে জাহিদ মালেক দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাসের মাথায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ইকুইপমেন্ট সাপ্লাই না দিয়েই বিল নিয়ে নেওয়া সেই মিঠু সিন্ডিকেটের আবার উত্থান হলো। এ নিয়ে আর কথা বলতে চাই না। সরকার যা ভালো বোঝে করছে, করুক। আমরা বললে থামে না। বরং দেখি আরও বেড়ে যায়। অনিয়মে জড়িতদের পদোন্নতি হয়। আমার গ্রামের হাসপাতালের মতোই স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন। এ উন্নয়নের দিকে তাকিয়েই মন্ত্রী ডেঙ্গুকে গুরুত্বের সঙ্গে নেননি। অথবা নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেননি। তিনি সারা দেশের মানুষকে ভয়াবহ ডেঙ্গু আক্রান্ত রেখে পরিবার-পরিজন নিয়ে চলে গেলেন মালয়েশিয়া।
দেশের কঠিন সময়ে একজন দায়িত্ববান মন্ত্রীর বিদেশ সফর মানতে পারছি না। তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে আমোদ-ভ্রমণে যেতেই পারেন। কিন্তু তার একটা সময় আছে। দেশের ক্রান্তিকাল চলছে। হাসপাতালে ঠাঁই নেই। যথাযথ চিকিৎসা -সামগ্রী নেই। শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশে ডেঙ্গু আতঙ্ক। চলছে সমন্বয়হীনতা। এ মুহূর্তে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে বিদেশ যেতে হবে কেন? মানুষের প্রতি দরদ না থাকলে এমনই হয়। নিশিরাতের এমপি-মন্ত্রীরা মানুষের মনের ভাষা বোঝেন না। আওয়ামী লীগের রাজনীতি না করে এলে এমনই হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বাবা কর্নেল (অব.) মালেককে আমাদের চেনা আছে। তিনি ছিলেন এরশাদ জমানায় ঢাকার অনির্বাচিত মেয়র। ’৮৬ ও ’৮৮ সালে জাতীয় পার্টির ভোট ডাকাতির এমপি। পরে কিছুদিন বস্ত্রমন্ত্রীও ছিলেন। মালেক সাহেবকে নিয়ে অনেক কাহিনি তখন মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়েছিল। ’৯০ সালে এরশাদের পতনের পর মালেক সাহেব পালিয়েছিলেন। এর আগে ছাত্র-জনতা কর্নেল মালেকের মতিঝিল অফিস ভাঙচুর করে। সেসব দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে। তার ১০ বছর পর তার পুত্র আবার ফিরে আসেন আওয়ামী লীগের ব্যানারে। ভোট করেন ২০০১ সালে। সেই ভোটে জয়ী হননি। এরপর বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলনে রাজপথে তাকে দেখিনি। ২০০৯ সালের ভোটের আগে আবার ফিরে আসেন। সেই জাহিদ মালেকের এত ভাবের কী আছে? মন্ত্রী মানে মানুষের খাদেম। আওয়ামী লীগ এ দেশের গণমানুষের দল। এ দলের মূল নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা। সেই দলের মন্ত্রী হয়ে ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে আপনি একজন সাংবাদিককে ধমক দিতে পারেন না। সমালোচনার মুখে বিদেশ থেকে ফিরেছেন। সাংবাদিক যখন প্রশ্ন করলেন, হঠাৎ এই মুহূর্তে বিদেশ কেন গেলেন? জবাবটা শালীনভাবে দিতে পারতেন। ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলতে পারতেন। দুঃখ প্রকাশ করতে পারতেন দেশবাসীর কাছে। ধমক দিলেন প্রশ্নকারী সাংবাদিককে। দুঃখজনক এই কান্ডে ও আমি বিস্মিত হইনি। কারণ, এরশাদের দোসরের পুত্র আওয়ামী লীগে এলে কি নিজের অতীত বদলাতে পারবেন?
পাদটীকা: গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মোবাইলে একটি ফোন আসে। টেলিফোনকারী নিজেকে পরিচয় দিলেন কৃষিমন্ত্রীর পিএস হিসেবে। তারপর বললেন, আমার মন্ত্রী জানতে চেয়েছেন গতকালের সংবাদ সম্মেলনটি কেন প্রকাশ করলেন না? তিনি আরও বললেন, আপনার কোনো ভিন্নমত থাকলে তাও বলতে হবে। হতবাক হয়ে গেলাম। কৃষিমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন হবে কেউ আমাকে ফোন করেননি। আমার কাছে কোনো অনুরোধ, কোনো কাগজও আসেনি। আমার চিফ রিপোর্টারও পাননি। কোনো কারণে রিপোর্টার কভার করতে পারেননি। কিন্তু সৌজন্যতা বলে একটা কথা আছে। এই জীবনে মন্ত্রীদের উত্থান-পতন, বাদপড়া, কান্না, পালানো কম দেখিনি। তার পরও সংবাদ সম্মেলন নিয়ে কোনো কিছু জানার থাকলে মাননীয় কৃষিমন্ত্রী সাহেব নিজেই ফোন করতে পারতেন। তার সঙ্গে তো আমার পরিচয় আছে। তিনি আমাকে পিএস দিয়ে জবাব চাইতে কেন গেলেন! বুঝলাম না। সরকারের প্রথম মেয়াদে তিনি মন্ত্রী ছিলেন। মাঝে পাঁচ বছর ছিলেন না। আমি পিএস সাহেবকে বললাম, আমি কি আপনার মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি কর্মকর্তা? আমি কি আপনার মন্ত্রীর অধীনে চাকরি করি? জবাবদিহি আপনি পিএস সাহেবের কাছে কেন করতে হবে? মাঝে মাঝে মনটা বিষাদে ছেয়ে যায়। আমরা কোথায় যাচ্ছি? এ দেশের অনেক সিনিয়র মন্ত্রী, নেতাকে কাছ থেকে দেখেছি। বন্ধুদের মাঝেও অনেকে মন্ত্রী ছিলেন, আছেন। ভালোমন্দে ফোন করতেন। পরামর্শ নিতেন। দিতেনও। এখনো কেউ কেউ এ সৌজন্যতা দেখান। এই ফোনটির পর মনে হলো, সরকারের এই মেয়াদে এখন সবাই আকাশে উড়ছেন। ভালো লাগে না এসব দেখে আজকাল। আমাদের বয়স বাড়ছে। চারপাশ দেখে হতাশা বাড়ছে। মনে হচ্ছে, সুর তাল লয় ক্ষয়ে যাচ্ছে সবার অজান্তেই।
 
লেখক: সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।
 
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com