সোমবার,  ১৯ আগস্ট ২০১৯  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০১৯, ১৫:১৪:৪৯

মধ্যবিত্তরা এখন ভোগের বাইরে চিন্তা করতে পারছে না

সাজ্জাদ আলম খান
মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক উল্লম্ফন ঘটে ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লবের সময়। ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসের শ্রমিক, কারিগর এবং গরিব মানুষ খাদ্যের দাবিতে এক দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু করে।
প্যারিসের সর্বত্র চলে বিক্ষোভ। উত্তেজিত জনতা আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহের জন্য বাস্তিল দুর্গে আক্রমণ করে। এরপর মানবসভ্যতার ইতিহাসে অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের শুরু হয়ে যায়। যার মূলমন্ত্র ছিল সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা।
পরের শতকে এ বিপ্লব দেশে দেশে নতুন ভাবধারার সূচনা করেছিল। তবে মধ্যবিত্তের তেজ কমতে শুরু করেছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের ভাষায়, ‘ইউরোপে রেনেসাঁর জন্ম দিয়েছে যে মধ্যবিত্ত, সে মধ্যবিত্ত এ দেশে হয়নি।
এ দেশের মধ্যবিত্ত ৮০ হাজার টাকা দিয়ে আইফোন কেনে; কিন্তু বই কেনে না। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এ মধ্যবিত্ত কোনো কাজে আসবে না।’
মধ্যবিত্তের সংজ্ঞা নিয়েও সমাজে বিভ্রান্তি আছে। আর্থিক মানদণ্ডেই কি শুধু এদের চিহ্নিত করা হবে? না মেধা, মননশীলতা, সংস্কৃতিবোধ, শিল্প-সাহিত্যে পদচারণা, এসব বিবেচনায় নিতে হবে।
আর্থিক সক্ষমতার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, সামাজিক মর্যাদাও মানদণ্ডে আনা প্রয়োজন। দৈনিক দুই হাজার ১২২ কিলো ক্যালরির কম খাদ্য গ্রহণ করলে কিংবা দৈনিক আয় ১ দশমিক ৯২ ডলারের কম হলে তাকে দরিদ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর পরের স্তরে মধ্যবিত্তের অবস্থান।
তবে সমাজের বড় একটি জনগোষ্ঠী নিজেদের মধ্যবিত্ত মনে করে থাকে। দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির নেপথ্যে থেকে বড় ভূমিকা রাখে এরাই।
বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের হার কত এবং মধ্যবিত্ত নিয়ে বছরচারেক আগে একটি গবেষণা করেছিলেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক বিনায়ক সেন। ওই প্রতিবেদন বলছে, দেশে এখন মধ্যবিত্তের হার মোট জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশ।
১৯৯১ সালে এ হার ছিল ৯ শতাংশ। দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটির বেশি। এর মধ্যে ২০ শতাংশ বা চার কোটি মানুষ মধ্যবিত্তের কাতারে। বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের হার যেভাবে বাড়ছে, এটি অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সালে এ হার ২৫ শতাংশে আর ২০৩০ সালে ৩৩ শতাংশে উন্নীত হবে।
সরকারি আনুকূল্যে পরিচালিত এ গবেষণার সংস্থার মতে, দৈনিক দুই থেকে তিন ডলার পর্যন্ত আয় করলে তাকে মধ্যবিত্তের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংজ্ঞা হল দুই থেকে ১৩ ডলার।
তবে মধ্যবিত্তের জীবনে ঝুঁকি আছে। হঠাৎ নদীভাঙন, বড় ধরনের অশুভ বা সড়ক দুর্ঘটনার কারণে মধ্যবিত্ত শ্রেণি দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। আর্থিক মানদণ্ড, বিশেষ করে ভোগ্যপণ্য কেনার সামর্থ্য বিবেচনায় দেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়ছে।
বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ বলছে, বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা দেড় কোটি। প্রতি বছর ২০ লাখ মানুষ মধ্যবিত্তের কাতারে যুক্ত হচ্ছে। মধ্যবিত্তের বিকাশে দেশে দ্রুত বড় হচ্ছে কনজিউমার ইলেকট্রনিকসের বাজার। প্রতি বছর গড়ে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে এ বাজারের আকার।
এরই মধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এ বাজারের আকার, যা ২০২২ সালে ২০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করবে। কনজিউমার ইলেকট্রনিকস পণ্যের মধ্যে রয়েছে টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, এয়ারকন্ডিশনার ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স। বাংলাদেশে ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদক ও বাজারজাতকারীদের তথ্যমতে, এ বাজারের সবচেয়ে বড় অংশ রেফ্রিজারেটরের।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও মধ্যবিত্ত শ্রেণি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। এক সময় মধ্যবিত্তের সরব উপস্থিতি ছিল রাজনীতির সদর ও অন্দর মহলে। এখন যেন থিতিয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর প্রতিবাদে বাম দলগুলো হরতাল ঘোষণা দিয়েছিল; কিন্তু রাজপথে তেমন সাড়া মেলেনি।
এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। আয় ও সম্পদ বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা এ রাষ্ট্রে এখন বৈষম্য বাড়ছে। প্রচলিত বৈষম্য-বঞ্চনামূলক ভূমি ব্যবস্থাপনায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
শোষণের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বিকৃত মুক্তবাজার অর্থনীতি। অন্যের সম্পদ দখলকারী, দুর্বৃত্ত, পরজীবী শ্রেণি, লুটেরা, আত্মসাৎকারী, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে এখন আর তেমনভাবে সোচ্চার নয় মধ্যবিত্ত সমাজ।
ড. আবুল বারকাতের ভাষায়- রেন্ট শিকাররা সমস্বার্থের ত্রিভুজ আকৃতির আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক পোক্ত কাঠামো সৃষ্টি করে শোষণ করছে। তারা প্রান্তিক গোষ্ঠীর সম্পদ শোষণ করে অতি ধনীদের পুঁজি পকেটস্থ করার ক্ষেত্র তৈরি করছে।
কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্পায়নের অভিযাত্রায় দেশে সেবা খাতেরও বিকাশ হয়েছে। অসাম্যতার সঙ্গে বেড়ে ওঠা অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে উপার্জনের মানদণ্ডে অনেকেই মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে প্রবেশ করছে।
পোশাক কারখানার মধ্যম সারির নির্বাহী, পরিবহন খাতের কর্মজীবী, মধ্যম সারির হোটেল-রেস্টুরেন্ট, টেক্সটাইল খাতের সুপারভাইজারসহ এ ধরনের অনেক কর্মজীবী আছেন, যাদের অনেকে মেধা-মননে, সংস্কৃতিতে বিকশিত হতে পারেননি; কিন্তু আর্থিক কাঠামোতে মধ্যম সারিতে।
মাঝারি দোকানি, খুদে ব্যবসায়ীরাও মধ্যবিত্ত কাঠামোতেই পড়ছেন। বাজার অর্থনীতির বৈকল্য থেকে সুবিধা পাচ্ছেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের এমন অনেকে এখন বিস্তর অর্থ উপার্জন করে থাকেন। মধ্যবিত্ত-নিুমধ্যবিত্ত এক সময় ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী ছিল। ধনবানদের সংখ্যা আরও কম। বেশিরভাগ মানুষই ছিল দরিদ্র।
এখন ধনবানদের সংখ্যা বাড়ছে। দরিদ্র্য মানুষের উত্তরণ ঘটে নিুমধ্যবিত্তের কাতারে চলে আসছে। আর বনেদি মধ্যবিত্তদের একটা অংশ পতনের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। গেল শতাব্দীর ষাট, সত্তর, আশি ও নব্বই দশকে মধ্যবিত্ত ও নিুমধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি এক ধরনেরই ছিল।
অর্থনৈতিক উল্লম্ফনের কারণে এখন নিুমধ্যবিত্তের প্রসার ঘটে চলেছে। দারিদ্র্যমুক্তির মধ্য দিয়ে অনেকের উত্তরণ ঘটছে। কিন্তু এদের মধ্যে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্পোবোধের চর্চা নেই। বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে মধ্যবিত্ত সমাজ। চাকরির গণ্ডি ছাড়িয়ে মধ্যবিত্তরা এখন নানা উদ্যোগ ও বাণিজ্যে যুক্ত হচ্ছে।
মূলত ভোগ দিয়ে পরিমাপ করা হচ্ছে মধ্যবিত্তদের। একটা সময় মধ্যবিত্তকে ভাবা হতো সামাজিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে। মধ্যবিত্তরা এখন আর নেতৃত্বে ভূমিকা রাখতে পারছে না। সমাজ পরিবর্তনের কথাও তারা আর উচ্চকিত কণ্ঠে বলছে না। ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে তারা। ভোগের বাইরে তারা চিন্তা করতে পারছে না। মধ্যবিত্ত এখন আসলে কোথাও নেই।
একটা সময় নির্বাচনে অতি সাধারণরা জয়ী হয়ে আসতেন। জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতৃত্বও নির্বাচনে সফল হতে পারত না। মনোনয়ন পাওয়ার আগে থেকেই অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি জড়িয়ে পড়েছে। মনোনয়ন পেলে তো যথেচ্ছ ব্যয় করতে হবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যকার পার্থক্য আসলে মানসপটে। ড
সেলিম জাহানের ধারণা ধার করে বলা যায়, বিশ্বায়ন ও অর্থনৈতিক উদারীকরণের উন্নয়নশীল দেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়ছে। মধ্যবিত্তের নতুন ও পুরনো শ্রেণি বিভাজন রয়েছে। এর একটিকে সেলিম জাহান বলছেন, ‘সামাজিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি’, অন্যটি ‘অর্থনৈতিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি’।
উন্নয়নশীল দেশে মধ্যবিত্তরা ‘সিম্পল লিভিং অ্যান্ড হাই থিংকিং’ করে থাকে। সামাজিক সংকটে তারা বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দেয়। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী তাদের ওপর ভরসা রাখে; কিন্তু নতুন ধারার মধ্যবিত্তরা কি আস্থা অর্জন করতে পারবে?
বিশ্বের মোট সম্পদে অতি ধনীদের অংশ দিন দিন বাড়ছে। যার কারণে চাপের মধ্যে রয়েছে মধ্যবিত্ত পরিবার। অর্গানাইজেশন ফর কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রতিবেদন বলছে, অতি ধনীদের সম্পদ বাড়ার কারণে মধ্যবিত্তের আয় স্থির অবস্থায় রয়েছে।
মধ্যবিত্তের উন্নতির সম্ভাবনা কমছে এবং কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তা বাড়ছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মধ্যে পিছিয়ে পড়ার মনোভাব দেখা যাচ্ছে এবং তারা ক্রমে প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন সমর্থন করছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ও সরকারি সেবা খাতের গুরুত্বপূর্ণ জোগানদাতা হল মধ্যবিত্ত শ্রেণি।
আয় বৈষম্য বাড়তে থাকলে মধ্যবিত্ত শ্রেণি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা হারাবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ‘সুযোগ হ্রাসের’ উপলব্ধির কারণে অসন্তোষ বেড়ে চলেছে। বিশ্বে নতুন ধরনের জাতীয়তাবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ, পপুলিজম ও সংরক্ষণবাদ উত্থানের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবন মানেও স্থবিরতা এসেছে।
সামাজিক গতিশীলতা ও উন্নয়নের পরিবর্তে মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদের পিছিয়ে পড়া নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তবে নীতিনির্ধারকরা খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন না। শিল্পী কুমার বিশ্বজিতের কণ্ঠে তাইতো অমরত্ব পেয়েছে, ‘মধ্যবিত্ত আমার এ মন/কীভাবে ছোঁবে বল,/তোমার বিত্তশালী মন?’
 
লেখক: সাজ্জাদ আলম খান
অর্থনীতি বিশ্লেষক
sirajgonjbd@gmail. com
 
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com