রোববার,  ১৮ আগস্ট ২০১৯  | সময় লোডিং...
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯, ১৪:২২:৩৬

বড়লোকের স্বার্থ বনাম রিকশামুক্ত রাজধানী

চিররঞ্জন সরকার
বড়লোকের স্বার্থ দেখতে আমাদের ক্ষমতাসীনরা মরিয়া হয়ে উঠেছেন। একের পর এক গরিবের স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছেন। প্রথমে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ৯ শতাংশ সুদে ১০ বছরে খেলাপি ঋণ পরিশোধের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলো।
 
গ্রামের কৃষকদের বিরুদ্ধে সামান্য ঋণের জন্য মামলা হচ্ছে। অন্যদিকে, বড় বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করছে। এরপর জুলাইয়ে নতুন মূল্য সংযোজন কর আইন বাস্তবায়ন করা হলো। বাড়ানো হলো পরোক্ষ করের আওতা। আর পরোক্ষ কর যে গরিবের ওপর বাড়তি জুলুম, তাদের পকেট নিংড়ে নেওয়ার ব্যবস্থা-একথা কে না জানে? এরপর বাড়ানো হলো গ্যাসের দাম।
 
শেষ পর্যন্ত এই গ্যাসের দাম বাড়ানোর মাশুল গরিবদেরকেই বহন করতে হবে। কারণ গ্যাসের দাম বাড়ানোর ফলে পরিবহন, বিদ্যুৎ, বাসা ভাড়া বাড়বে। বাড়বে শিল্প ও কৃষির উৎপাদন ব্যয়, ব্যবসার পরিচালন ব্যয়। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবার কারণে বাড়বে মল্যূস্ফীতি। এখন তোড়জোড় চলছে ঢাকাকে রিকশামুক্ত নগরী গড়ে তোলার। রিকশায় কারা চলে? কারা চালায়? হ্যাঁ, মধ্যবিত্ত ও গরিবরা। শেষ পর্যন্ত ‘যানজটমুক্ত’ ‘গতিশীল মহানগর’ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা আসলে গরিবদের আরও বেশি বিপন্ন করারই আরেকটি প্রয়াস! এ সরকার যা সহজেই করতে পারে!
 
এই শহরের ৪৩ শতাংশ মানুষ কাঁচা ঝুপড়ি ঘরে বাস করে। আমরা যেভাবেই বলি না কেন, এই নগর কিন্তু মোটেও ‘নগর’ হয়ে ওঠেনি। প্রাইভেট কারে কাজে যায় মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ। বাস, মিনিবাস, মোটরসাইকেলে কাজে যায় ৩২ শতাংশ মানুষ। ৬০ শতাংশ মানুষ রিকশায় ও হেঁটে যাতায়াত করে। যে শহরে এত বিশাল একটা জনগণ হেঁটে ও রিকশায় যাতায়াত করে, তাকে কীভাবে ‘মহানগর’ বলা যায়? এ শহর কি আমার-আপনার মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করতে পারছে?
 
যানজটমুক্ত গতিশীল ঢাকা শহর কে না চায়? কিন্তু সেটা করার প্রকৃত উদ্যোগ ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা কোথায়? বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত কিছু ‘গণবিরোধী’ উদ্যোগ নিলেই কী সেটা সম্ভব হবে? বিশেষজ্ঞরা কেউ-ই বলছেন না যে, ঢাকা শহরের যানজটের প্রধান কারণ রিকশা। তারপরও কেন যানজট দূর করার নামে রিকশামুক্ত সড়ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়? ঢাকায় যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ প্রাইভেট কার৷
 
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) হিসেবে, ঢাকার রাস্তায় বাস ও মিনিবাসের চেয়ে সাত গুণ বেশি চলেছে প্রাইভেট কার৷ঢাকায় ১৫ ভাগ যাত্রী দখল করে আছেন মোট সড়কের ৭০ ভাগ৷ স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান বা এসটিপি-র হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকায় কম-বেশি ১৫ ভাগ যাত্রী প্রাইভেট কারে যাতায়াত করেন৷ এই প্রাইভেট কারের দখলে থাকে ৭০ ভাগেরও বেশি রাস্তা৷
 
বাকি ৮৫ ভাগ যাত্রী অন্য কোনো ধরনের গণপরিবহন ব্যবহার করেন৷ অর্থাৎ তারা গণপরিবহন সড়কের মাত্র ৩০ ভাগ এলাকা ব্যবহারের সুযোগ পায়৷ জনসংখ্যার হিসেবে শতকরা এক ভাগের মতো মানুষের প্রাইভেট কার আছে৷ কিন্তু সড়ক চলে গেছে তাদের দখলে৷ এই প্রাইভেট কার, শহরের নতুন উৎপাত মোটর সাইকেল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না করে কেবল রিকশার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা কেন?
 
রিকশার যাত্রী ও চালকরা তুলনামূলক গরিব বলে? গরিবদের পথে বসাতে সরকার ধারাবাহিক উদ্যোগ নিয়ে চলেছে। এই ঢাকা শহরে ৪৪ শতাংশ মানুষ বস্তিতে বাস করে। তারা সবচেয়ে বেশি ভাড়া দেয়। প্রতি বর্গমিটারে তারা ভাড়া দেয় ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। অথচ বড়লোকেরা এর থেকে অনেক কম ভাড়া দিয়ে সরকারের সব সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছে। বনশ্রীসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পানির দামে জায়গা কিনে আবাসন ব্যবসায়ীরা সোনার দামে বিক্রি করেছে। জমিবিক্রেতারা শত শত কোটি টাকা লাভ করেছে।
 
ঢাকা শহরের মোট আবাসনের ৯৩ শতাংশ ব্যক্তিগত। মাত্র ৭ শতাংশ সরকার কর্তৃক সরবরাহকৃত। উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান রাজউক ১৩টি আবাসন প্রকল্প করেছে। অথচ শহরে নিম্নবিত্তদের জন্য কোনো আবাসন প্রকল্প নেই। সরকার কি কেবল বড়লোকের?
 
ঢাকা শহরের বস্তিতে থাকে কারা? দরিদ্র মানুষ, যাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, মূলত তারাই এখানে বাস করে। এদের অনেকেই রিকশা চালায়। গ্রামে কাজ নেই। সবকিছু খুইয়ে শহরে এসেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদী ভাঙ্গন, বন্যা, ক্ষুদ্র ঋণের কারবারীদের চাপ ইত্যাদি বহু কারণে একদল মানুষ কোনো মতে বেঁচে থাকবার জন্যই রাজধানীতে এসে আশ্রয় নেয়। রিকশা চালায়। ঢাকা শহরে এমন মানুষদের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। বাড়ছে, কেননা এই মানুষগুলোর জন্য এলাকাভিত্তিক কোনো কাজের ব্যবস্থা সরকার করতে পারেনি।
 
বেঁচে থাকার ব্যবস্থা সরকার করতে না পারলে কী হবে? অত্যাচার তো করতে পারবে। তাই মেয়র সাহেবদের মাধ্যমে ‘রিকশামুক্ত রাজধানী’ গড়ার ফরমান জারি করা হয়েছে! ছিন্নমূল মানুষ, নদীভাঙা মানুষের একটা বড় জীবিকা রিকশা। শ্রমটি অমানবিক হলেও এখানে নগদ আয়ের নিশ্চয়তা আছে। এখন কৃষি শ্রমিকেরাও অনেকে ধাবিত হচ্ছেন শহরে, রিকশা চালাতে। তাইতো এখানে রিকশা বেড়েই চলেছে।
 
অন্য যে কোনো ধরনের গাড়ি চালাতে যে ধরনের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, রিকশার বেলায় তা একেবারেই নেই। মাস খানেক চালালেই বেশ একটা ভালো ‘রিকশাওয়ালা’ হওয়া যায়। তার লাইসেন্স লাগে না। আইন অমান্য করলে শাস্তি ট্রাফিক পুলিশের দু-এক ঘা লাঠির বাড়ি। তার জরিমানার কোনো ব্যবস্থা নেই। জরিমানা মানে পুলিশকে সামান্য কিছু উৎকোচ। এমন সহজ পেশায় শ্রমজীবী মানুষ সহজেই আকৃষ্ট হয়।
 
রাজধানীকে রিকশামুক্ত করতে হবে-এটা খুবই ভালো কথা। কিন্তু রিকশার বিকল্প কি? যারা রিকশা চালায় তাদের জন্য বিকল্প পেশার ব্যবস্থা কি করা হচ্ছে? এই লোকগুলোকে যদি নিজ এলাকায় জীবিকার ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়, তাহলে ঢাকা শহরে রিকশা এমনিতেই কমে আসবে। তা না করে কিছু সড়ক থেকে রিকশা-অপসারণের সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিযুক্ত?
 
পৃথিবীর কোনো বড় শহর-নগরে রিকশার মতো যান নেই। কারণ যন্ত্রচালিত যানের সঙ্গে রিকশার মতো ধীর গতির যান একেবারেই সাংঘর্ষিক। এ উপমহাদেশে যেখানে প্রথম রিকশা শুরু হয়েছিল, সেই কলকাতায় বহু আগে রিকশা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পাশাপাশি গণপরিবহনের ব্যবস্থাটি সুনিশ্চিত করা হয়েছে। সেখানে পাতাল রেলের মতো সবচেয়ে কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু আমরা তেমন কোনো বিকল্প চালু না করেই প্রধান সড়কগুলোতে রিকশা বন্ধ করতে চাইছি।
 
আমাদের দেশে সাধারণ মধ্যবিত্তদের জন্য পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেই বললেই চলে। ধানমণ্ডি এলাকা থেকে একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। যারা ধানমণ্ডি এলাকা থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত আসতে চাইবেন, তাদের লেগুনা ছাড়া কোনো উপায় রাখেনি সরকার। লেগুনায় একটু জায়গা পেতে শহরের একজন মানুষকে কী পরিমাণ কষ্ট করতে হয়, কেমন গরম লাগে, এই গাড়ি কী পরিমাণ বিপজ্জনক, সেটি কি নগরের নীতিনির্ধারকরা জানেন? শুধু ধানমন্ডি ফার্মগেট নয়, পুরো ঢাকার অবস্থাই কম-বেশি এক।
 
কাছের দূরত্বে দ্রুত যাওয়া-আসা, মধ্যরাতে হাসপাতাল বা অন্য কোনো জরুরি মুহূর্তে, বাচ্চার স্কুল যাতায়াতে, অফিসে যেতে-আসতে রিকশা আমাদের অন্যতম ভরসা। সবাই তো আর মেইন রোডের মাথায় থাকেন না। অনেক ভেতর থেকে বাচ্চাকে কোলে করে কিংবা পাশে বসিয়ে রিকশায় যত দ্রুত আসা যায়, সেটি কি অন্যভাবে সম্ভব?
 
অনেকের অভিযোগ, আমরা খুবই অলস এবং আয়েশী জাতি। দু কদমও হাঁটতে চাই না। পারলে ড্রয়ইং রুম থেকে রিকশা চড়ে গন্তব্যে যেতে চাই। আবার গন্তব্য থেকে রিকশায় বসে শোবার ঘরে পর্যন্ত আসতে চাই। আবার আরেক পক্ষের অভিযোগ, আমাদের শহরে হেঁটে যাবার পথ কোথায়? ফুটপাত বলে আদৌ কি কিছু আছে? রাস্তা পারাপরের সুযোগ আছে? খানা-খন্দ-ময়লা-আবর্জনা, হকার-ছোট দোকানদার, ভিক্ষুক-ভবঘুরে-নেশাখোররাই তো ফুটপাত দখল করে থাকে।
 
এখানে এমন পরিস্থিতি আপনি চাইলেও হাঁটতে পারবেন না। অনেকে এমন দাবিও করছেন, আমাদের বিকল্প যানবাহন চাই না, শুধু হাঁটার পথটা ফিরিয়ে দেওয়া হোক। নিরাপদে-নির্বিঘ্নে যেন আমরা হাঁটতে পারি, তা নিশ্চিত করা হোক। তাহলে মানুষ এমনিতেই রিকশা ছেড়ে দিয়ে হাঁটার অভ্যাস করবে।
 
আরেকটি কথা, কর্তাব্যক্তিদেরও হাঁটার অভ্যাস করতে হবে। আমাদের মেয়র-মন্ত্রীরা যদি হেঁটে চলাচলের অভ্যাস করেন, তা হলেও তো ঢাকা শহরে কিছুটা যানজট কমে যায়। কারণ তাদের গাড়িগুলোও ঢাকার যানজটের অন্যতম কারণ।
 
মন্ত্রী-এমপি-মেয়ররা নিজেরা না হেঁটে সাধারণ মানুষকে হাঁটার পরামর্শ দিয়ে রিকশা তুলে দেওয়ার নীতি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যান, তাহলে গরিব-বড়লোক যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প থাকবে বলে মনে হয় না!
এই পাতার আরো খবর
সর্বশেষ সংবাদসর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ

প্রকাশক: নাহিদা আকতার জাহেদী

১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

Powered by orangebd.com