শহরের মানুষের আয় কমেছে ৭৫ শতাংশ, গ্রামের ৬২ শতাংশ

বৈশ্বিক মহামারি নভেল করোনাভাইরাসের কারণে দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের মানুষ ঘরবন্দি থাকায় ধমকে গেছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এতে আয়ের পথ বন্ধ হয়ে দরিদ্র-অতি দরিদ্র মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।

দেশে করোনা পরিস্থিতির কারণে গ্রামে ৬২ ও শহরের ৭৫ শতাংশ মানুষের আয়-রোজগার কমে গেছে। নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়েছে ৩ কোটি ৬৯ লাখ ৪৪ হাজার মানুষ।

যদিও দেশে আগে থেকে দরিদ্র ছিল ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ। সবমিলিয়ে ৭ কোটি দরিদ্র মানুষ করোনার কারণে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। তাদের খাদ্য সহায়তা ও অতি প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে প্রতি মাসে ১০ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা প্রয়োজন।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক জরিপ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

গতকাল বুধবার (২০ মে) এক ওয়েবিনারে ‘কভিড-১৯ এর সময় জীবিকা,ক্ষতি ও সহায়তা’ শীর্ষক গবেষণা তুলে ধরা হয়। অতি দরিদ্র, দরিদ্র,ঝুঁকিপূর্ণ ও ‘দারিদ্র্য সীমার বাইরে’ জনগোষ্ঠী এই চার শ্রেণীর ৫ হাজার ৪৭১ জন মানুষের ওপর জরিপ চালিয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। যার মধ্যে ৫১ শতাংশ মানুষ গ্রামের। এতে গত ফেব্রুয়ারির সাথে এপ্রিলের তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি হিসেবে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। করোনাভাইরাসের কারণে এই সংখ্যা আরো ২২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে হবে ৪৩ শতাংশ।

করোনার কারণে অতি দরিদ্র ৭৩ শতাংশ, মধ্যম দরিদ্র ৭৫ শতাংশ,দারিদ্র্য সীমার বাইরে কিন্তু ঝুকিপুর্ণ মানুষের ৬৭ শতাংশ এবং দারিদ্র সীমার বাইরের মানুষের রোজগার ৬৫ শতাংশ কমে গেছে। পেশাওয়ারি সবচেয়ে বেশি রোজগার কমেছে রেস্তোরাঁ কর্মীদের। তাদের রোজগার কমেছে ৯৯ শতাংশ।

রোজগার কমার ক্ষেত্রে এর পরের অবস্থানে আছে ভাঙারি ওয়ার্কাররা। তাদের রোজগার কমেছে ৮৮ শতাংশ। রিকশা চালকদের আয় কমেছে ৮৪ শতাংশ। দিনমজুর ও শিল্পী সমাজের আয় কমেছে ৮৩ শতাংশ। মালি ও কারখানা কর্মীদের আয় কমেছে ৮০ শতাংশ। এছাড়া দক্ষ শ্রমিকদের ৭৯ শতাংশ, কৃষি শ্রমিকদের ৭৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ৭৩ শতাংশ এবং দোকান, সেলুন ও পার্লারের কর্মীদের রোজগার কমেছে ৭২ শতাংশ।

পোশাক কর্মীদের আয় কমেছে ৪৯ শতাংশ, কৃষকের ৪৪ শতাংশ, পিয়ন ও নিরাপত্তারক্ষীদের ৪৩ শতাংশ, অফিসের আনুষ্ঠানিক কর্মীদের কমেছে ৩৩ শতাংশ এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের আয় কমেছে ২৭ শতাংশ। আয় কমে যাওয়ায় তারা খাবারের পিছনে ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছেন।

ওয়েবিনারে বক্তব্য দেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহান, পিপিআরসির নির্বাহী পরিচালক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য অধ্যাপক শামছুল আলম, বিআইজিডিরি নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন প্রমুখ।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে মানুষের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তাদেরকে অবশ্যই সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। সরকার যথাসাধ্য চেস্টা করছে। ইতোমধ্যে অর্থনীতি ও মানুষকে সহায়তায় প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। সেই প্যাকেজ ব্যাংক ঋণ নির্ভর। ব্যাংক নিজেই ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে রয়েছে। তারপরও সরকার সত্যিকার অর্থেই কিছু করার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতি মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করতে সরকারকে স্বচ্ছতার সাথে কার্যকরী সহায়তা প্রকল্প হাতে নিতে হবে। আয় কমে যাওয়া মানুষদের সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনির আওতায় আনতে হবে। তাদের জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সঠিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে সহায়তা পৌঁছে দেয়ার জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

পিপিআরসির নির্বাহী পরিচালক হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, করোনার কারণে জীবিকা নির্বাহ ও পুনরায় কাজে ফিরে যেতে ৩ কোটি ৩০ লাখ দরিদ্র মানুষের জন্য প্রতিমাসে সহায়তা প্রয়োজনে ৫ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। আর নতুন দরিদ্রে পরিণত হওয়া ৩ কোটি ৭ লাখ মানুষের জন্য ৫ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে ৭ কোটি দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করতে সরকারকে কমপক্ষে প্রতিমাসে ১০ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা ব্যয় করা প্রয়োজন। যদিও এটা সরকারের জন্য অনেকটাই কষ্টসাধ্য। তারপরও এটি কমপক্ষে তিনমাস অব্যাহত রাখতে হবে।-বাসস

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh