নাজিম হিকমত-মানুষের কবি

কবি নাজিম হিকমত।

কবি নাজিম হিকমত।

নাজিম হিকম-সাহিত্য সমাজের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। বিংশ শতাব্দীর সাহিত্যিকদের নিয়ে যদি ভাবা যায়, তবে নাজিম হিকমতের নামটি ছাড়া যেন শতাব্দীটা পূরণই হয় না। তুরস্কের ভূখন্ডকে নাজিম শুধু কবিতাই দেননি, বরং দেখিয়েছেন সাম্যবাদের স্বপ্ন, বলেছেন মানুষের কথা, অধিকারের কথা। 

১৯২১ এর শুরুর দিকে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেওয়া এই কবি সোভিয়েত ইউনিয়নকে কাছ থেকে জানার তাগিদে ছুটে যান সুদূর জর্জিয়ায়, তারপর সেখান থেকে মস্কোতে। সেখানকার কম্যুনিস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় সৌভাগ্যক্রমে পরিচিতি লাভ করেন সর্বহারা অধিকার বঞ্চিত মানুষদের পথপ্রদর্শক সাম্যবাদের প্রতিষ্ঠাতা, মার্কস-লেনিনের সঙ্গে।

১৯২৪ সালে তুরস্ক স্বাধীন হবার পর দু’চোখ ভরা সুদিনের স্বপ্ন নিয়ে ফিরে আসেন দেশে। লেগে পড়েন দেশ গড়ার কাজে। সংকল্প করেন মানুষকে নিয়ে কাজ করার। প্রথমবারের মতো মানুষকে নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাবতে শেখান তিনি, জানতে শেখান কি তাদের অধিকার। 

নাজিমের দেখা স্বপ্ন ছিল তুরস্কের জন্যে ভীতির কারণ। ‘স্বাধীন সার্বভৌম’ শব্দগুলো তুরস্কের জন্য ছিল লোক দেখানো। শুধু শোষকেরই পরিবর্তন হয়েছিল এই যুদ্ধের মাধ্যমে। কারণ, এই স্বাধীনতা ছিল না গণমানুষের জন্যে, বরং আইনের ছত্রছায়ায় মানুষকে শোষণের আরও একটি দলিল ছিল মাত্র।

এমন অবস্থায় নাজিমের জ্বালাময়ী কবিতা ছিল সরকার তথা শাসকদের জন্যে হুমকিস্বরূপ। তাই তাকে আটকানো অতীব জরুরি হয়ে উঠল। নাজিমকে পাঠানো হল জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। তারা চেয়েছিল নাজিমের কণ্ঠরোধ করতে, চেয়েছিল মানুষের মন থেকে নাজিমের নাম চিরতরে মুছে দিতে। কিন্তু তাদের কোনো অভিসন্ধিই পূরণ হয়নি। নাজিমের কলমও থেমে থাকেনি। মানুষের ভালোবাসাও হয়েছে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর। জেলের অন্ধকার নাজিমের স্বপ্নকে স্পর্শও পর্যন্ত পারেনি। বরং দ্বিগুণ উদ্যমে তিনি লিখে গেছেন নতুন নতুন কবিতা।

জীবনের প্রায় পুরোটাই নাজিম কাটিয়েছেন জেলখানায়, যেখানে বসে তিনি লিখেছেন বিপ্লবী সব কবিতা। অশুভ শক্তিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছিলেন- ‘মানুষের মুন্ডুটা তো বোঁটার ফুল নয়, ইচ্ছে করলেই ছিঁড়ে নেবে।’ মানুষের প্রতি, স্বপ্নের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ আত্মবিশ্বাস। তাইতো তিনি বলেছিলেন- ‘দুঃসময় থেকে সুসময়ে মানুষ পৌঁছে দেবে মানুষকে।’

১৯৪৯ সালে পাবলো নেরুদা, পল রবসন এবং জ্যাঁ পল সার্ত্রে এক সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক কমিটি গঠন করেন। একবছর পর ১৯৫০ সালে পাবলো নেরুদার সঙ্গে যৌথভাবে তিনি নোবেল পুরস্কার পান শান্তিতে। অতঃপর তিনি অনশন শুরু করেন। তুরস্কের গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের পর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। তাঁকে দুইবার হত্যা করার চেষ্টা করা হলে, তিনি আবার সোভিয়েত ইউনিয়নে পাড়ি জমান। এসময় তুরস্ক সরকার তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল করেন। 

নাজিমের জীবনের সীমাহীন দুর্দশার মাঝে একমাত্র স্বস্তি কিংবা শান্তির জায়গা ছিল তাঁর প্রেমিকা, তাঁর স্ত্রী ভেরা তুলিয়্যাকোভা। নাজিম ছিল তেপ্পান্ন আর ভেরা তখন মাত্র সাতাশ বছরের তরুণী- যখন প্রথমবারের মতো দেখা হয় তাঁদের। ভেরাকে উৎসর্গ করে নাজিম লিখে গেছেন অসংখ্য কবিতা। যেখানে তিনি লিখে গেছেন ভেরার সঙ্গে কাটানো অসামান্য মুহূর্তের কথা, বলে গেছেন কি করে ভেরা হয়ে উঠলো তাঁর অনুপ্রেরণা, তাঁর বেঁচে থাকার তাগিদ।

নাজিম যখন যেখানে গেছেন, সেখান থেকেই যোগাযোগ করেছেন ভেরার সঙ্গে। তাদের অসম বয়সের প্রেমকে নিয়ে তৎকালীন সময়ে প্রচুর দ্বিমতের সৃষ্টি হলেও কোনো বাধাই তাদের ভালবাসাকে স্পর্শ করতে পারেনি। ভেরা যেমন ছিলেন নাজিমের অনুপ্রেরণা, তেমনি নাজিম ছিলেন ভেরার নির্ভরতা। তাইতো মৃত্যুর পরও নাজিমের প্রতি স্ত্রী ভেরার ভালোবাসা এক বিন্দু পরিমাণও কমেনি। স্বামীর মৃত্যুর পর প্রতিদিন ভেরা ছুটে গেছেন তাঁর কবরে। স্বামীর কবরের পাশে কাটানো মুহূর্তটুকুই যেন ছিল তাঁর স্বস্তি।

নাজিমকে নিয়ে ভেরা লিখে গিয়েছিলেন প্রণয় উপাখ্যান ‘দ্য লাস্ট কনভারসেশন উইথ নাজিম।’ রাশিয়ান রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নাজিম ও ভেরার অসামান্য ভালোবাসাকে চিত্রিত করে- ‘বিয়ন্ড ইভেন লাভ’ শিরনামের এক তথ্যচিত্র তৈরি করে, যা তারা পরবর্তীতে তার্কিশ ভাষায় ডাবিংও করেন।

শত সহস্র বিপত্তি থামাতে পারেনি নাজিম ও ভেরার ভালোবাসাকে। দুটি মানুষ তাদের ভালোবাসা দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেলেন সর্বকালের মানুষের জন্য, যা আজও অমর হয়ে রয়েছে মানুষের পৃথিবীতে। 

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh